অভিলাষ

লিখেছেন - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১ জনমনোমুগ্ধকর উচ্চ অভিলাষ! তোমার বন্ধুর পথ অনন্ত অপার । অতিক্রম করা যায় যত পান্থশালা , তত যেন অগ্রসর হতে ইচ্ছা হয় । ২ তোমার বাঁশরি স্বরে বিমোহিত মন — মানবেরা , ওই স্বর লক্ষ্য করি হায় , যত অগ্রসর হয় ততই যেমন কোথায় বাজিছে তাহা বুঝিতে না পারে । ৩ চলিল মানব দেখো বিমোহিত হয়ে , পর্বতের অত্যুন্নত শিখর লঙ্ঘিয়া , তুচ্ছ করি সাগরের তরঙ্গ ভীষণ , মরুর পথের ক্লেশ সহি অনায়াসে । ৪ হিমক্ষেত্র , জনশূন্য কানন , প্রান্তর , চলিল সকল বাধা করি অতিক্রম । কোথায় যে লক্ষ্যস্থান খুঁজিয়া না পায় , বুঝিতে না পারে কোথা বাজিছে বাঁশরি । ৫ ওই দেখো ছুটিয়াছে আর-এক দল , লোকারণ্য পথমাঝে সুখ্যাতি কিনিতে ; রণক্ষেত্রে মৃত্যুর বিকট মূর্তি মাঝে , শমনের দ্বার সম কামানের মুখে । ৬ ওই দেখো পুস্তকের প্রাচীর মাঝারে দিন রাত্রি আর স্বাস্থ্য করিতেছে ব্যয় । পহুঁছিতে তোমার ও দ্বারের সম্মুখে লেখনীরে করিয়াছে সোপান সমান । ৭ কোথায় তোমার অন্ত রে দুরভিলাষ ‘ স্বর্ণঅট্টালিকা মাঝে ?' তা নয় তা নয় । ‘ সুবর্ণখনির মাঝে অন্ত কি তোমার ?' তা নয় , যমের দ্বারে অন্ত আছে তব । ৮ তোমার পথের মাঝে , দুষ্ট অভিলাষ , ছুটিয়াছে মানবেরা সন্তোষ লভিতে । নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা , তোমার পথের মাঝে সন্তোষ থাকে না! ৯ নাহি জানে তারা হায় নাহি জানে তারা দরিদ্র কুটির মাঝে বিরাজে সন্তোষ । নিরজন তপোবনে বিরাজে সন্তোষ । পবিত্র ধর্মের দ্বারে সন্তোষ আসন । ১০ নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা তোমার কুটিল আর বন্ধুর পথেতে সন্তোষ নাহিকো পারে পাতিতে আসন । নাহি পশে সূর্যকর আঁধার নরকে । ১১ তোমার পথেতে ধায় সুখের আশয়ে নির্বোধ মানবগণ সুখের আশয়ে ; নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা কটাক্ষও নাহি করে সুখ তোমা পানে । ১২ সন্দেহ ভাবনা চিন্তা আশঙ্কা ও পাপ এরাই তোমার পথে ছড়ানো কেবল এরা কি হইতে পারে সুখের আসন এ-সব জঞ্জালে সুখ তিষ্ঠিতে কি পারে । ১৩ নাহি জানে তারা ইহা নাহি জানে তারা নির্বোধ মানবগন নাহি জানে ইহা পবিত্র ধর্মের দ্বারে চিরস্থায়ী সুখ পাতিয়াছে আপনার পবিত্র আসন । ১৪ ওই দেখো ছুটিয়াছে মানবের দল তোমার পথের মাঝে দুষ্ট অভিলাষ হত্যা অনুতাপ শোক বহিয়া মাথায় ছুটেছে তোমার পথে সন্দিগ্ধ হৃদয়ে । ১৫ প্রতারণা প্রবঞ্চনা অত্যাচারচয় পথের সম্বল করি চলে দ্রুতপদে তোমার মোহন জালে পড়িবার তরে । ব্যাধের বাঁশিতে যথা মৃগ পড়ে ফাঁদে । ১৬ দেখো দেখো বোধহীন মানবের দল তোমার ও মোহময়ী বাঁশরির স্বরে এবং তোমার সঙ্গী আশা উত্তেজনে পাপের সাগরে ডুবে মুক্তার আশয়ে । ১৭ রৌদ্রের প্রখর তাপে দরিদ্র কৃষক ঘর্মসিক্ত কলেবরে করিছে কর্ষণ দেখিতেছে চারি ধারে আনন্দিত মনে সমস্ত বর্ষের তার শ্রমের যে ফল । ১৮ দুরাকাঙ্ক্ষা হায় তব প্রলোভনে পড়ি কর্ষিতে কর্ষিতে সেই দরিদ্র কৃষক তোমার পথের শোভা মনোময় পটে চিত্রিতে লাগিল হায় বিমুগ্ধ হৃদয়ে । ১৯ ওই দেখো আঁকিয়াছে হৃদয়ে তাহার শোভাময় মনোহর অট্টালিকারাজি হীরক মাণিক্য পূর্ণ ধনের ভাণ্ডার নানা শিল্পে পরিপূর্ণ শোভন আপণ । ২০ মনোহর কুঞ্জবন সুখের আগার শিল্প-পারিপাট্যযুক্ত প্রমোদভবন গঙ্গা সমীরণ স্নিগ্ধ পল্লীর কানন প্রজাপূর্ণ লোভনীয় বৃহৎ প্রদেশ । ২১ ভাবিল মুহূর্ত-তরে ভাবিল কৃষক সকলই এসেছে যেন তারি অধিকারে তারি ওই বাড়ি ঘর তারি ও ভাণ্ডার তারি অধিকারে ওই শোভন প্রদেশ । ২২ মুহূর্তেক পরে তার মুহূর্তেক পরে লীন হল চিত্রচয় চিত্তপট হতে ভাবিল চমকি উঠি ভাবিল তখন ‘ আছে কি এমন সুখ আমার কপালে ?' ২৩ ‘ আমাদের হায় যত দুরাকাঙ্ক্ষাচয় মানসে উদয় হয় মুহূর্তের তরে কার্যে তাহা পরিণত না হতে না হতে হৃদয়ের ছবি হায় হৃদয়ে মিশায় । ' ২৪ ওই দেখো ছুটিয়াছে তোমার ও পথে রক্তমাখা হাতে এক মানবের দল সিংহাসন রাজদণ্ড ঐশ্বর্য মুকুট প্রভুত্ব রাজত্ব আর গৌরবের তরে । ২৫ ওই দেখো গুপ্তহত্যা করিয়া বহন চলিতেছে অঙ্গুলির ‘ পরে ভর দিয়া চুপি চুপি ধীরে ধীরে অলক্ষিত ভাবে তলবার হাতে করি চলিয়াছে দেখো । ২৬ হত্যা করিতেছে দেখো নিদ্রিত মানবে সুখের আশয়ে বৃথা সুখের আশয়ে ওই দেখো ওই দেখো রক্তমাখা হাতে ধরিয়াছে রাজদণ্ড সিংহাসনে বসি । ২৭ কিন্তু হায় সুখলেশ পাবে কি কখন ? সুখ কি তাহারে করিবেক আলিঙ্গন ? সুখ কি তাহার হৃদে পাতিবে আসন ? সুখ কভু তারে কিগো কটাক্ষ করিবে ? ২৮ নরহত্যা করিয়াছে যে সুখের তরে যে সুখের তরে পাপে ধর্ম ভাবিয়াছে বৃষ্টি বজ্র সহ্য করি যে সুখের তরে ছুটিয়াছে আপনার অভীষ্ট সাধনে ? ২৯ কখনোই নয় তাহা কখনোই নয় পাপের কী ফল কভু সুখ হতে পারে পাপের কী শাস্তি হয় আনন্দ ও সুখ কখনোই নয় তাহা কখনোই নয় ৩০ প্রজ্বলিত অনুতাপ হুতাশন কাছে বিমল সুখের হায় স্নিগ্ধ সমীরণ হুতাশনসম তপ্ত হয়ে উঠে যেন তখন কি সুখ কভু ভালো লাগে আর । ৩১ নরহত্যা করিয়াছে যে সুখের তরে যে সুখের তরে পাপে ধর্ম ভাবিয়াছে ছুটেছে না মানি বাধা অভীষ্ট সাধনে মনস্তাপে পরিণত হয়ে উঠে শেষে । ৩২ হৃদয়ের উচ্চাসনে বসি অভিলাষ মানবদিগকে লয়ে ক্রীড়া কর তুমি কাহারে বা তুলে দাও সিদ্ধির সোপানে কারে ফেল নৈরাশ্যের নিষ্ঠুর কবলে । ৩৩ কৈকেয়ী হৃদয়ে চাপে দুষ্ট অভিলাষ! চতুর্দশ বর্ষ রামে দিলে বনবাস , কাড়িয়া লইলে দশরথের জীবন , কাঁদালে সীতায় হায় অশোক-কাননে । ৩৪ রাবণের সুখময় সংসারের মাঝে শান্তির কলস এক ছিল সুরক্ষিত ভাঙিল হঠাৎ তাহা ভাঙিল হঠাৎ তুমিই তাহার হও প্রধান কারণ । ৩৫ দুর্যোধন-চিত্ত হায় অধিকার করি অবশেষে তাহারেই করিলে বিনাশ পাণ্ডুপুত্রগণে তুমি দিলে বনবাস পাণ্ডবদিগের হৃদে ক্রোধ জ্বালি দিলে । ৩৬ নিহত করিলে তুমি ভীষ্ম আদি বীরে কুরুক্ষেত্র রক্তময় করে দিলে তুমি কাঁপাইলে ভারতের সমস্ত প্রদেশ পাণ্ডবে ফিরায়ে দিলে শূন্য সিংহাসন । ৩৭ বলি না হে অভিলাষ তোমার ও পথ পাপেতেই পরিপূর্ণ পাপেই নি র্মি ত তোমার কতকগুলি আছয়ে সোপান কেহ কেহ উপকারী কেহ অপকারী । ৩৮ উচ্চ অভিলাষ! তুমি যদি নাহি কভু বিস্তারিতে নিজ পথ পৃথিবীমণ্ডলে তাহা হ ' লে উন্নতি কি আপনার জ্যোতি বিস্তার করিত এই ধরাতল-মাঝে ? ৩৯ সকলেই যদি নিজ নিজ অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিত নিজ বিদ্যা বুদ্ধিতেই তাহা হ ' লে উন্নতি কি আপনার জ্যোতি বিস্তার করিত এই ধরাতল-মাঝে ?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা,কবিতা, বাংলা কবিতা, বিশ্ব কবি,love poems by rabindranath tagore in bengali,bengali poetry ,rabindranath tagore poems in bengali,love poem in bengali ,sad poem in bengali,bengali romantic poem, bangla poetry