ওগো কাজল নিশি
তোর শরতের আকাশ হলাম বুঝি
এবার আমায় ডাক
তোর খোঁপায় বেঁধে রাখ
নিশীথ বরন চুলে
শ্যামল দীঘির জলে
ফাগুনের হাওয়ার মত
ফুলের মুটে জড়িয়ে আমায় রাখ
আমার মনটা বেধে রাখ
দীঘির শ্যাওলা শীতল জলে
মনভোলানো হাওয়ার দুলে
স্বপ্ন জাগাক রাত
এই যে আকাশ তারার আলো
তবু আকাশ কেন কালো
তোর কাজলের রূপ নিয়ে
আকাশ হলো কালো
সজল জলে চোখটি তোর
রাত কেটে হয় নতুন ভোর
দীঘল দীঘল চুলের বেনী
চিনিরে তোরে আমি চিনি
কাজল নিশি কাজল কালো
কালো ফুলের ডালি
তবুও আমি তার বনমালী
একটা সাদা একটা কালো ফুল
হাওয়ার পরে দোলে
দুঃখবতী দু জনেই সম ব্যাথার কোলে
তখন সজল হাওয়ায় ধানের শিষ দোলে
সবুজ গাঁয়ের রূপটি যে তার মায়ার আঁচলে
যখন সে যায় হেটে ওই পথটার বাঁকে
পথের ধূলিও যেন আপন করে ডাকে
যেমন নামহীন ফুল ফোটে অরন্যে
খোঁপায় তার ফুল ছিল না মোটে
তাই জড়িয়ে ধরে বনের লতা
চলল সে যে দ্রুত পায়ে লুটে
তখন পড়ল যে শ্যামা মেয়ের কথা
কাজল ধোয়া মেঘের চোখে
যখন সে একা দাঁড়িয়ে রয়
রাতের তারা নিরব ভাষায়
তার সাথেই কথা কয়
কাজল নিশির সেই মেয়েটি
আজো বুঝি ছায়া ছড়ায়
নূপুরবিহীন চপল পায়ে
হাওয়ার বুকে হাত বাড়ায়
ওগো মেঘবরনী পল্লী মায়ের মেয়ে
তোর কাজল চোখে চেয়ে
আমি পাড়ি দিলাম প্রেমের তরী
আমি তোর প্রেমেই ডুবে মরি
তারে আমি সেদিন দেখেছিলাম হাটে
আমার আকাশ মেঘে মেঘে কাটে
মেঘ বালিকার অবাধ্য চুল
কালো যদি মেঘের বরণ হয় তবে কি সে কালো
তার চেয়ে যে আকাশ জুড়ে জ্বেলেছে সে আলো
গায়ের লোকে শুধুই তাকেই কালো বলে ডাকে
আমি তখন রূপ দেখি তার শান্ত নদীর বাঁকে
হাত দুখানি নরম যেন শিউলি ফুলের ডাল
ধানের ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে মায়া রূপের জাল
সবাই খুঁজে রূপ রস মেঘ বালিকার নেয়ে
আমি না হয় নিলাম এ সোনা মাটির মেয়ে
কালো যদি হয় সে তবে হোক
জুড়িয়ে নিলাম আমার দুটি চোখ
মেঘ কেটেছে জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে
দাঁড়িয়েছিল সান বাঁধানো ঘাটে এসে
তার আঁচলখানি লুটিয়ে পড়ে মাঠে
কলসী কাঁখে ফিরছিল সে ঘাটে
লোকেরা বলে কালো, আমি বলি না রে
তারে দেখেছিলেম গাঁয়ের নদীর ধারে
তখন মেঘ জমেছে আমার গগন কোণে
বাদল-হাওয়া বইছে বনে বনে
দুপুরবেলা মাঠের পথে যেতে
হঠাৎ আমি থমকে গেলাম খেতে
লুকিয়ে থাকা একটি কালো ফুলে
মনটা আমার উঠলো দুলোদুলে
লোকে বলে ওতো পথের ধুলো
নাম না জানা তুচ্ছ মেঠো ফুলও
আমি বলি রূপ কি শুধু গোরে
চোখ জুড়ালো মেঘলা দিনের সুরে
কালো মেঘের ছায়ায় মাখামাখি
তার পানেতেই রইল চেয়ে আঁখি
বনের কোণে ফুটেছে যে ফুল একা
তার মাঝে পাই খাঁটি রূপের দেখা
আমি কেবল দেখেছি এক পলক
মেঘের গায়ে যেমন বিদ্যুত ঝলক
লোকেরা কয়, ‘মেয়েটি বড় কালো’,
আমি বলি, ‘ওরই চোখের আলো
আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ জ্বালো
বাঁকা গাঁয়ের মেঠো পথের বাঁকে
কলসি কাঁখে একলা যখন থাকে
বাতাস এসে আঁচল ওড়ায় তার
বুক জাগে প্রেম বিশাখার পার
কালো মেঘে যেমন বাদল নামে
তেমন ধারা ওই মেয়েটির ঘামে
রোদে পোড়া ওই তামাটে চিবুক
দেখলে জুড়ায় গাঁয়ের চাষার বুক
ও যে মাঠের ফসল, ও যে নদীর জল
ও যে আমাদের মাটির মায়ের বল
এই তো আমার মাটির ঘরের মেয়ে
মন জুড়ায় ওর চোখেতে চেয়ে
মেঘ জমেছে ওই গাঁয়ের মাথায়
বাদলা-হাওয়া বনের পাতায় পাতায়
সবাই বলে ও যে কালো মেয়ে
আমি বলি দেখ তার দিকে চেয়ে
কৃষ্ণমেঘের মতন দুটি চোখ
ঘুচিয়ে দিল মনের যত দুখ
আমি তারে দেখেছি এই মাঠে
কলসি কাঁখে একলা যখন হাটে
বাঁকা গাঁয়ের মেঠো পথের বাঁকে
সবুজ ঘাসেরা জড়িয়ে ধরে তাকে
চৈত্রমাসের রোদের মতন গায়
চমক লেগে আলোর দ্যুতি বায়
লোকে বলে ও যে কালো অতি
আমি বলি স্বর্ন-শিখার বাতি!
আঁধার রাতে যেমন তারা হাসে
তেমনি সে মোর বুকের মাঝে ভাসে
কালো যদি রূপ না ধরে তবে
মেঘের কোলে চাতক কেন রবে
কলো ভ্রমর কেন খোঁজে ফুল
কালো চুলে কেন বাঁধে চুল
মাথার ওপর কালো মেঘের ছায়া
কেমন করে জড়িয়ে রাখে মায়া
তারেই আমি দেখেছিলেম মাঠে
কালো মেঘের ছায়া যখন ঘাটে
মেঘের মায়া ঘনিয়ে এলো শেষে
হঠাৎ দেখি দাঁড়িয়ে আছে এসে
কালো মেয়েটি মুক্তকেশীর বেশে
লোকে তারে কালো বলে বলুক
আমি দেখি তার কাজল কালো-চোখ