বৃদ্ধ ডাকপিয়ন রহমত আলী আজ বহু বছর পর তার ব্যাগে থাকা শেষ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কত মানুষের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ডাক দিয়েছে, কতজনের হাতে তুলে দিয়েছে অক্ষরের গোপন কান্না, কাগজে মোড়ানো স্বপ্ন কিংবা অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু আজ, এই শেষ চিঠিটি যেন এক অদ্ভুত রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সামনে।
চিঠির উপর প্রেরকের নাম মলিন হয়ে গেছে, ঠিকানাটাও ঝাপসা। কেবল কয়েকটি অস্পষ্ট হরফ টিকে আছে— “পথের ধারে, তালগাছের ছায়ায়, লাল দরজা”। কোথায় সে ঠিকানা? কোন শহরের কোন কোণে? রহমত জানে না। তবু একটা অজানা তাগিদ অনুভব করল বুকের ভেতর—এই চিঠিটি যে হাতে পৌঁছানোর কথা ছিল, সে যদি আজও অপেক্ষায় থাকে?
সারা শহর চষে বেড়াল রহমত। রাস্তার ধারের প্রতিটি লাল দরজার সামনে দাঁড়াল। কোথাও কেউ নেই চিঠির অপেক্ষায়, কোথাও তালগাছ থাকলেও দরজা কালো, কোথাও দরজা লাল থাকলেও তালগাছ নেই। তারপর একদিন সে পৌছাল এক জরাজীর্ণ বাড়ির সামনে, যার লাল রঙ বিবর্ণ হয়ে ধূসর হয়ে গেছে। দরজায় কড়া নাড়তেই এক বৃদ্ধা দরজা খুলল—চোখে কৌতূহল।
“মা, এই ঠিকানায় কেউ ছিল?”
বৃদ্ধা তার কোটরে ঢোকা চোখে রহমতের দিকে তাকায়, একটু যেন ভাবতে থাকে, তারপর ফিসফিস করে বলে—
“ছিল তো! কিন্তু সে তো বহু আগেই চলে গেছে…”
রহমতের বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা বাজে। বৃদ্ধার চোখের ভাষা বলে দেয়, সেই ‘সে’-এর ফেরার কোনো উপায় নেই। চিঠিটি হাতে নিয়ে বৃদ্ধাকে দিতে চাইল সে। কিন্তু বৃদ্ধা হাত বাড়াল না।
বলল, “যার জন্য চিঠি, সে-ই যদি না থাকে, তবে আর পাঠানোর মানে কী?”
রহমত আলী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এত দূর এসে, এত বছর চিঠি বিলিয়ে, আজ বুঝতে পারল—সব চিঠির উত্তর থাকে না, সব অপেক্ষার প্রাপ্তি হয় না।
সে ধীরে ধীরে সেই লাল দরজার পাশে রাখা তালগাছের নিচে বসল। চিঠিটা হাতে নিল, তারপর একসময় খামটা খুলে ফেলল।
ভেতরে কেবল কয়েকটি লাইন—
“তোমাকে আর একবার দেখতে চাই,
শুধু একবার,
তারপর তুমি চাইলে আমাকে ভুলে যেতে পারো।”
বৃদ্ধ ডাকপিয়নের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু এক পশলা বাতাসের ঝাপটায় মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। বাতাসে উড়ে যাওয়া চিঠির কাগজের মতোই হয়তো অনেক অপেক্ষা, অনেক ভালোবাসা—যা পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন