জেলে এলাম সেই কবে
তারপর দশবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী
পৃথিবীকে যদি বলো, সে বলবে-
“কিছুই নয়,
অণুমাত্র কাল।”
আমি ব’লব-
“আমার জীবনের দশটা বছর।”
যে বছর জেল এলাম
একটা পেন্সিল পেলাম
লিখে লিখে ক্ষইয়ে ফেলাতে এক সপ্তাহও লাগে নি।
পেন্সিলকে জিজ্ঞেস করলে সে বলবে:
“একটা গোটা জীবন।”
আমি ব’লব:
“এমন আর কী, একটা মাত্র সপ্তাহ।”
যখন জেলে গেলাম
খুনের আসামী ওসমান
কিছুকাল ছাড়া পেল
তারপর চোরাই চালানের দায়ে
ঘুরে এসে ছ’মাস কয়েদ খেটে আবার খালাস হ’ল
কাল তার চিঠি পেলাম বিয়ে হয়েছে তার
আগামী বসন্তে ছেলের মুখ দেখবে।
আমি জেলে আসবার সময়
যে সন্তানেরা জননীর গর্ভে ছিল
আজ তারা দশ বছরের বালক।
সেদিনকার রোগা ঠ্যাং-লম্বা ঘোড়ার বাচ্চাগুলো
বেশ কিছুদিন হ’ল রীতিমত নিতম্বিনী ঘোড়ায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু জলপাইয়ের জঙ্গল আজও সেই জঙ্গল
আজও তার তেমনি শিশু।

আমি জেলে যাবার পর
দূরবর্তী আমার শহরে জেগেছে নতুন নতুন পার্ক
আর আমার বাড়ির লোকগুলো
এখন উঠে গেছে অচেনা রাস্তায়
যে বাড়ি আমি কখনো চোখেও দেখি নি।
যে বছর আমি জেলে এসেছিলাম
রুটি ছিল তুলোর মত শাদা
তারপর এই রেশনের যুগ
এখানে এই জেলখানায়
লোকগুলো মুঠিভর রুটির জন্যে হন্যে হ’ল
আজ আবার অবাধে কিনতে পারো
কিন্তু কালো বিস্বাদ সেই রুটি।
যে বছর আমি জেলে এলাম
দ্বিতীয় যুদ্ধের সবে শুরু
দাচাউ-এর শ্মশান-চুল্লী তখন জ্বলে নি
তখনও এটম বোমা পড়ে নি হিরোশিমায়।
টুটি-টেপা শিশুর রক্তের মত সময় বয়ে গেল
তারপর সমাপ্ত সেই অধ্যায়
আজ মার্কিন ডলারে শোনো তৃতীয় মহাযুদ্ধের বোল।
কিন্তু আমি জেলে যাবার পর
আগের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল হয়েছে দিন।
আজ অন্ধকারের কিনার থেকে
ফুটপাথে তাদের ভারী হাতের ভর দিয়ে
তারা অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়েছে।
আমি জেলে যাবার পর
সূর্যকে দশবার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী
আর আমি বারম্বার সেই একই কথা বলছি
জেলখানায় কাটানো দশটা বছরে
যা লিখেছি সব তাদেরই জন্যে
তাদেরই জন্যে, যারা মাটির পিঁপড়ের মত
সমুদ্রের মাছের মত, আকাশের পাখির মত অগণিত,
যারা ভীরু, যারা বীর
যাঁরা নিরক্ষর, যারা শিক্ষিত
যারা শিশুর মত সরল
যারা ধ্বংশ করে
যারা সৃষ্টি করে
কেবল তাদেরই জীবনবৃত্তান্ত মুখর আমার গানে।
আর যা কিছু
ধরো, আমার জেলে দশটা বছর-
শুধুমাত্র কথার কথা।

(অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়)