কুনিও ইয়ানাগিতা
(জাপানী পণ্ডিত লেখক এবং লোককাহিনীবিদ্)
শংকর ব্রহ্ম


ইয়ানগিতার ছোটবেলা থেকে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল। বিশেষ করে কবিতার উপর ছিল গভীর আকর্ষণ। তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্যের অনুগামীও ছিলেন। যখন তাঁর লোককথার প্রতি কৌতূহল হয়, উনি এডওয়ার্ড বুরনেট টেলর এবং অন্যান্য পাশ্চত জাতিবিদের (anthropologists) জাতীতত্ব (ethnology) সংক্রান্ত লেখা পড়েতে থাকেন। এই পড়াশুনোর প্রভাব ইয়ানগিতার নিজস্ব গবেষণায় দেখা যায়।

কুনিও ইয়ানগিতা, ৩১শে জুলাই , ১৮৭৫ সালে ফুকুশাকি শহরে, হয়োগো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মাৎসুওকা পরিবারের পঞ্চম সন্তান।
তাঁর জন্মনাম ছিল কুনিও মাৎসুওকা (বা মৎসুওকা কুনিও, জাপানি মতে), তাঁর জাপানি নাম 'হিরাগানা', 'কিউজিতাই, 'শিঞ্জিভাই রোমানীকরণ মতে নাম - ' ইয়ানগিতা কুনিও' (Yanagita Kunio)।
তাঁকে এক নাওহেই ইয়ানগিতা নামক বিচারকের পরিবার আশ্রয় দেয়। একটি ছোট ছেলে বা একটি পুরুষকে নিজের পরিবারে আশ্রয় দেওয়া, উত্তরসূরি হওয়ার কারণে, তখনকার যুগের প্রচলিত প্রথা ছিল। এটা বিবাহের মাধ্যমে হতো, পুরুষটি আশ্রিত পরিবারের মেয়ের সঙ্গে বিবাহ করে মেয়ের পরিবারের অংশ হত। এই ক্ষেত্রে, নাওহেইর পুত্রী তাকা এবং ভবিষত্বের লোককাহিনীবিদের মধ্যে একটি সম্বন্ধ করা হয়। এই বিবাহ চুক্তিটি ১৯০১ সালে হয় এবং ওনার নাম বদলে কুনিও ইয়ানগিতা হয়। তাঁর পিতা ইয়াকুসাই মাৎসুওকা (পিতা) নাওহেই ইয়ানগিতা (শ্বশুর)।

মাৎসুওকা ভাইরা, ইয়ানগিতার পরিবার ছাড়ার আগে ইয়ানাগিতা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে পাশ করেন, কৃষি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্গত কৃষি প্রশাসন দপ্তরে আমলা পদে নিযুক্ত হন। আমলা হিসাবে কাজ করতে গিয়ে, তাঁর জাপানের গ্রামীণ জীবন এবং তার লোকঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ গড়ে উঠে। এটি তাঁর কর্মজীবনে পরিবর্তন ঘটায়। এই উদ্যোগের ফলস্বরূপ, জাপানে লোককাহিনীবিদ্যা (মিনজোকুগাকু) একটি শিক্ষার বিষয় রূপে গণ্য হয়। ইয়ানগিতাকে তাই আধুনিক জাপানি লোককাহিনী অধ্যয়নের জনক বলা হয়।
মোট কুড়ি বছর চাকরি করেন ইয়ানাগিতা। কাজের সূত্রে, তিনি জাপানের প্রধান দ্বীপ হোনশুর গ্রামীণ এলাকায় প্রায়ই যাতায়াত করতেন। এই যাত্রার দরুন ইয়ানাগিতার মনে গ্রামীণ জীবনশৈলী এবং কৃষি অর্থনীতির প্রতি আগ্রহ জন্মায়।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯০৪ সালে 'তাকা ইয়ানগিতা'-কে বিয়ে করেছিলেন।

ইয়ানাগিতা নিজের সহ-আমলাদের স্থানীয় স্বশাসনের প্রতি উদাসীন মনোভাবের নিন্দা করতে শুরু করলেন। ইয়ানাগিতা ক্রমে এই স্বশাসনের সমর্থনে আওয়াজ ওঠাতে শুরু করলেন। ওনার মতে কৃষিনীতির, বড়লোক জমিদারের ওপর ভিত্তি না করে ছোট কৃষকদের সমবায়ের ওপর ভিত্তি করে করা উচিত। সরকারের তরফ থেকে ওনার মতামতের বিরোধিতা করা হয়, যার কারণে উনি আমলার চাকরি ছেড়ে দেন, এবং লোককাহিনীবিদ্যার দিকে অগ্রসর হন।

কৃষি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ইস্তফা দেয়ার পর তাঁর সুযোগ হয় গ্রামীন জাপানকে আরও ভালভাবে অনুসন্ধান করার। উনি ঘুরে-ঘুরে লোককথা, কাহিনি, প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান, লোক-বিশ্বাস সংগ্রহ করে, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করা শুরু করলেন। এই সময় ইয়ানাগিতার সাহিত্যিক বন্ধুরা, তার মধ্যে লেখক 'শিমাজাকি টোশন' অন্যতম, তাঁর নিজের লোককথা এবং গ্রামীন প্রথার ওপর গবেষণা প্রকাশিত করার জন্য অনুপ্রেরণা দিতে লাগলেন। এই সব লেখা এবং গবেষণার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ১৯১২ সালে প্রকাশিত বই টোনোর গল্পকথা (টোনো মোনোগাতারি / The Legends of Tono)। এই বইতে ইয়ানাগিতা ইবাতে অঞ্চলের টোনো নামক একটি পাহাড় ঘেরা গ্রামের (এখন শহর) লোককথা, আচার-অনুষ্ঠান,লোক-বিশ্বাস , প্রথা, কাহিনি সংগ্রহ করেন। এটি ওনার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ।
এরপর, ইয়ানাগিতা লোককথা নিয়ে নৃ-বিজ্ঞানগামী (anthropological) গবেষণা শুরু করেন, যার জন্য তিনি আজও প্রসিদ্ধ। তিনি নিজের আরও কাজ প্রকাশিত করেন, তার মধ্যে অনেকগুলো লোককাহিনীবিদ 'কিজেন সাসাকি-র সহযোগিতায়।

স্থানীয় লোককথার ওপর ইয়ানাগিতার একাগ্রতা, জাতীয় ইতিহাসে জন-সাধারণের জীবন তুলে ধরার তাঁর অক্লান্ত চেষ্টার স্বরূপ ছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল ইতিহাস গবেষণা এবং লেখায় খালি অভিজাতদের সঙ্গে হওয়া ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের ইতিহাস বাদ পড়ে যায় এবং এরকম মনে হয় যে সাধারণ জাপানিরা সব সময় একই রকম ছাঁচে জীবন কাটাতেন।
ইয়ানগিতা নানান সাধারণ মানুষের গোষ্ঠীর অনন্য প্রথা তুলে ধরার চেষ্টা করতেন, যেমন পাহাড়ি অঞ্চলের বসবাসকারীর (সাঙ্কা) এবং দ্বীপে বসবাসকারীর প্রথা। উনি লোককথার তিনটি দিক চিহ্নিত করেন - ব্যবহার্য বস্তুসামগ্রী, মৌখিক ভাষা এবং মানসিক বা আবেগপূর্ণ বাহ্যিক-মুর্তি। এই তৃতীয় দিকটি শুধু তাদেরই প্রাপ্ত যারা সমান অনুভতি দ্বারা গভীর বোধ্যগম্যতা অর্জন করেছেন। ইয়ানাগিতার মতে এটাই লোককাহিনীবিদ্যার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

সামগ্রিক ভাবে, ইয়ানাগিতার গবেষণা ভীষণ ভাবে স্মরণীয়।
ইয়ানাগিতা জাপানের অন্যতম প্রধান লোককাহিনীবিদ যিনি জাপানে লোককাহিনীবিদ্যার (মিনজোকুগাকু) শিক্ষণীয় বিষয় করে তুলে ধরেছিলেন। জাপানে তিনি "আধুনিক জাপানের লোককাহিনীর জনক" উপাধিতে খ্যাত।
ইয়াকুসাই মাৎসুওকার বাড়ি
টোনো মোনোগাতারি (টোনোর গল্পকথা) - ইয়ানাগিতার সবথেকে প্রসিদ্ধ বই। বইটি ইবাতে অঞ্চলের টোনো গ্রামের লোককথা, প্রথা, লোকবিশ্বাস প্রভৃতির সংগ্রহ। জনপ্রিয় ইওকাই কাপ্পা এবং যাসিকি-ওরাশির লোককথা এই বইতে লেখা।
কাগুইউকো - এই লেখায় ইয়ানাগিতা দেখান কিরকম 'শামুক' শব্দটির লবজ বিতরণ, জাপানি দ্বীপপুঞ্জে একটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত ধারণ করে। (সময়ক্রমে লবজ বিতরণের কেন্দ্র বনাম পরিধি ভাষাবিজ্ঞানিক তত্ব)
মোমোতারো নো টাঞ্জ – এই লেখায় ইয়ানাগিতা জাপানি লোককথার এবং সমাজের মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। নিবন্ধের নামটি একটি বহুপ্রচলিত জাপানি লোককথা 'মোমোতারো' থেকে নেয়া। নিবন্ধে, লেখক মোমোতারো লোককথাটির ওপর টিপ্পনি করে বলেন যে এইরকম লোককথা জাপানি সমাজকে বোঝার তথ্যসূত্র প্রদান করে। মোমোতারোর কিছু বিষয় আলোচনা করে উনি সেটা সমগ্র জাপানি সমাজের সঙ্গে তুলনা করেন। ইয়ানাগিতার এই কৌশল আজ অনেক মানবজাতি বিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানি এবং লোককাহিনীবিদ মেনে চলেন।
কাইজো নো মিচি - এই লেখাটি ইয়ানাগিতার মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত হয়। এই বইতে ইয়ানাগিতা ওকিনাওয়া দ্বীপের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং লোককথার সমগ্র। নিজের ওকিনাওয়ার অধ্যয়নে, ইয়ানাগিতা জাপানি সংস্কৃতির শুরু খুঁজতে চাইছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালের গবেষকেরা ইয়ানাগিতার এই নিয়ে অনেক ভাবনাকে খারিজ করে দেয়। এটা বলা হয় যে এই গবেষণা করার অনুপ্রেরণা ইয়ানাগিতা পায় একটি তালগাছের বীজ থেকে যেটা কুরোশিও স্রোত দ্বারা ভেসে এসেছিল, জখন ইয়ানাগিতা আকেচি অঞ্চলের ইরাগো মাসাকি অন্তরিপের সুমুদ্র সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।
Kunio Guide to the Japanese Folk tale (কুনিও গাইড টু জাপানিজ ফল্ক টেল) - এটি কিছু জাপানি লোককথা এবং তথ্যের চয়ন। কুনিও ইয়ানাগিতার 'নিহন মুকাশি-বানাসি মেই' বইটি থেকে। অনুবাদ করেছেন ফ্যানি হাগিন মেয়ের।
নোচি নো কারি-কোতোবা নো কি - ইয়ানাগিতা এই লেখাটি গোপনে প্রকাশ করেন। উনি এটা লিখেছেন কিউশু দ্বীপপুঞ্জে যাত্রার উপর ভিত্তি করে। এই লেখার কেন্দ্র মিয়াজাকি অঞ্চলের একটি পাহাড়ি সম্প্রদায়কে নিয়ে, তাদের শিকারকার্য এবং শিকার সংক্রান্ত ভাষা সম্বন্ধে। এটি আজকে জাপানের প্রথম লোককথা গবেষণার রূপে দেখা হয়।
৮ই আগস্ট ১৯৬২ সালে (বয়স ৮৭)
টোকিও, জাপানে তিনি মারা যান।
তাঁর পরিচিতির কারণ
টোনো মোনোগাতারি, মোমোতারো নো টাঞ্জ
নিহন মুকাশিবানাশী মেই ("জাপানি লোককথা")।