সুজতা খুব হতাশ হলো। ওর সব পরিশ্রম ব্যার্থ হলো। সুজতা ভেবেছিলো মায়ের গণনার বাক্স বোধহয় অনেক দামি দামি গহনা থাকবে। কারন অত বড় বাড়ির মেয়ে তার ওপর জমিদার বাড়ির এক মাত্র বৌমা ।কিন্ত পাওয়া গেল শেষ মেশ কিনা, দুইটি শুকনো রজনী গন্ধার মালা , একটি লাল টকটকে বেনারসী শাড়ির সাথে গাঁটছড়া বাধা নির্লিপ্ত সাদা ধুতি।
এই সাদা ধুতির মালিককে কিছুদিন আগে পর্যন্ত চিনতো না সুজতা। সুজাতা কোনদিনই মায়ের পূর্ব জীবন নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে নি। বৌ মা হিসাবে কোনদিনই শাশুড়ি মায়ের সেবায় অবহেলাও দেখায় নি কখনও। বরং লোকজন বলে শাশুড়ি মায়ের এমন সেবা কখনও কোন বৌমাকে করতে দেখা যায় না।
সাদা ধুতির মালিকের পরিচয় পাবার পর থেকেই। সুজাতা জীবনের হিসাব নিকাশ গুলো বদলে গেলো। শাশুড়ি মায়ের আলমারীতে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা গহনার বাক্স উপর তাঁর চোখ পড়লো। কি গহনা অলঙ্কার আছে তা উধার করতে ও আজ শাশুড়ি আলমারীতে হাত দিলো। এমনিতে সুজতা লোভী নয়। শুধুমাত্র কৌতুহলের বসেই গহনা বাক্সটা বের করেছিলো।
সুজাতা যেদিন প্রথম এ বাড়িতে এলো। পাড়া পড়শিরা বললো। ” নতুন বৌ মুখ খালি হাতে দেখিছিস । কিছু একটা গহনা দিলি না।”
উত্তরে ওর শাশুড়ি বলছিলো। ” আমার ছেলেই তো আমার গহনা। সেইটাই তো আমি তোমার হাতে তুলে দিলাম। আশির্বাদ ছাড়া অন্যকিছু দেবার সামর্থ্য নাই আমার মা। তুমি ক্ষমা করো মা।”
সতিই ওর মায়ের গহনা নেই। কোন একদিন গ্রামের রাধা-গোপীনাথে মন্দিরে রাধুনী কাজ নিয়ে এসেছিলেন ওর শাশুড়ি মা এক দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে। তারপর রাধুনীর কাজের সাথে সাথে, বাচ্চাদের পড়ানো থেকে, লোকের জন্য নকশী কাথা আসন বুনে ছেলেকে কলেজের অধ্যাপক বানিয়েছেন উনি। উনার জীবন সংগ্রামের গল্প আজও লোকের মুখে ঘোরে রূপকথার গল্পের মতো। আজও উনি সবার উদাহরণ।
ধুতির মালিকের সন্ধান মিলো এক নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। সুজতার স্মামীকে বর্ষসেরা শিক্ষক হিসাবে পুরস্কৃত করার জন্য রাজা বাবু এসেছেন বিদেশ থেকে। লোক বলছেন, এবার উনি নির্বাচনে লড়াই করবে বলেই এতো বছর পরে দেশে ফিরলেন।
কিন্ত মঞ্চ রাজাবাবুকে দেখে সুজাতার মতোই সবাই অবাক। রাজা বাবু আর সুজাতার স্বামী একে অপরের প্রতিবিম্ব। রাজা বাবু একটুও অবাক হয়নি। তৎক্ষনাত ছুটে এলো সুজাতার শাশুড়ি কাছে।
সুজাতার শাশুড়ি কিছু একটা কাজ করছিলেন। রাজা বাবু প্রশ্ন করলেন। ” নীলাঞ্জনা কেমন আছো?”
নীলাঞ্জনার হাতের গ্লাসটা মাটিতে পড়লো না। সে কিছু বলার পূর্বে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
গহনার শুন্য বাক্স দেখে। ধুতির মালিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো। ” সেইদিন বাবা মশাই আমাকে কিছুতেই বিদেশ যেতে দেবেন না। তখন ও ওর গহনা গুলো দিয়ে বলেছিলো যান আপনার পড়াশোনাটা শেষ করে আসুন। আমি পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য এনাকে বিয়ে করছি বলাতে ও কোন আপত্তি করলো না। কিন্ত বিয়ে হয়ে গেছে শোনার পর এক রাত কাটালো না রাজবাড়িতে। নাকি এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল কাউকে কিছু না বলে। কিন্ত কেন ও এমনটি করলো ও সেটা জানতেই ছুটে এলাম আমি এতদূর। কিন্ত ও তো আর কথাই বলছে না “

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন