প্রসূন গোস্বামী

গল্প - পৈতা ছেঁড়ার শব্দ

প্রসূন গোস্বামী
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ অন্যান

(১)
আকাশে আজ মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি নামবে নামবে করছে। টগর সাহেবের মনটা আজ ভালো নেই। তিনি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ইংরেজির শিক্ষক, কিন্তু অবসর পেলেই ইতিহাসের পুরোনো পুথি নিয়ে বসেন। আজ তিনি ভাবছেন ভারতের মাটিতে ইসলামের পদচিহ্ন নিয়ে।
ইতিহাস বড়ো অদ্ভুত জিনিস। মধ্যযুগের ঐতিহাসিকরা যখন সুলতানদের বিজয়গাথা লেখেন, তখন তলোয়ারের ঝনঝনানি শোনা যায়। তাঁরা খুব রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করেছেন কীভাবে দলে দলে মানুষ ধর্মান্তরিত হলো। যেন এটা একটা জাদুমন্ত্র—ছোঁয়া লাগল আর বদলে গেল সব! কিন্তু আদতে সংখ্যাটা কত? সেটা কেউ জানে না। ডট ডট ডট।
টগর সাহেব তাঁর চশমাটা মুছলেন। ভারতবর্ষের বিশাল মানচিত্রে ইসলাম কোনো সুশৃঙ্খল কায়দায় ছড়ায়নি। কোনো সুসংহত বর্ণনা নেই যে কীভাবে বছরের পর বছর এই পরিবর্তনটা এল। হ্যাঁ, আরব থেকে কিছু মানুষ এসেছে, পারস্য থেকে এসেছে, এমনকি সুদূর আবিসিনিয়া থেকেও ভাগ্যান্বেষীরা এসেছে। কেউ এসেছে সৈন্য হয়ে, কেউ শরণার্থী হয়ে, আবার কেউবা রাজকীয় নিমন্ত্রণে। কিন্তু তারা তো ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। তবে কি বাকি সবাই এ দেশেরই মানুষ? হিন্দু ধর্ম থেকে আসা মানুষ?
টগর সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ইতিহাসের পাতা উলটে দেখা যায়, মধ্যযুগের জনসংখ্যা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে—একেবারে আঁকাবাঁকা রেখার মতো। কিন্তু একটা জায়গায় এসে রেখাটা স্থির। মুসলিম জনসংখ্যা কেবলই বেড়েছে। অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী চেষ্টা করেও পুরো ভারতবর্ষকে কিন্তু পুরোপুরি বদলে ফেলা যায়নি। পারস্য বা মেসোপটেমিয়ার মতো এখানে ইসলামের জোয়ারে সবাই ভেসে যায়নি। ভারতের প্রাচীন মাটি কোথাও যেন একটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেই বাধার মুখে পড়েই কি তবে মুসলিম শাসকরা আরও জেদ ধরেছিলেন? আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে প্রচারে নেমেছিলেন? তথ্যগুলো সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফারসি পাণ্ডুলিপিতে। শূন্য থেকে কীভাবে একটি বিশাল জনপদ তৈরি হলো, তার রহস্য ওখানেই লুকিয়ে আছে।
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। টগর সাহেব ভাবলেন, এক হাজার খ্রিষ্টাব্দের আগে উত্তর ভারতে কি কোনো মুসলমান ছিল? ঐতিহাসিক লেনপুল সাহেব বলছেন—না, সিন্ধু নদের পূর্ব দিকে কেউ ছিল না। তবে কি তার আগে কিছুই হয়নি?
৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে আবদুর রহমান যখন কাবুল আক্রমণ করলেন, তখন কয়েক হাজার মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল। সিন্ধু নদে তখন আরবের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে এলেন মুহাম্মদ বিন কাসিম। তিনি যেখানেই গেলেন—আলোর, দেবুল কি মুলতান—সবখানেই তৈরি হলো মসজিদ। দেবুলের সেই চার হাজার সৈন্যের গ্যারিসন কিংবা মুলতানের ছয় হাজার ধর্মান্তরিত মানুষ—এগুলোই ছিল শুরুর কথা।
কিন্তু মানুষের মন কি এতই পলকা? খলিফা ওমরের আহ্বানে অনেকে আরবি নাম নিলেন ঠিকই, কিন্তু কাসিম বিদায় নিতেই চাকা ঘুরে গেল। অধিকাংশ নব্য-মুসলিম আবার তাঁদের পুরোনো ধর্মে ফিরে গেলেন। হাকিম যখন ক্ষমতায় এলেন, তিনি দেখলেন কাসসা শহর ছাড়া আর কোথাও মুসলমানদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। সিন্ধুর উত্তাল হাওয়া যেন সব ধুয়ে মুছে নিয়ে গেল। মানসুরার মুসলমানরা তো রীতিমতো হিন্দু ধর্মই গ্রহণ করে ফেলল।
গুজরাট আর মালাবার উপকূলে অবশ্য চিত্রটা অন্যরকম। সেখানে তলোয়ার নয়, এল জাহাজ। আরব বণিকরা এলেন মশলার লোভে। হিন্দু রাজারা তাঁদের জায়গা দিলেন, মসজিদ বানাতে দিলেন। কিন্তু সেই সংখ্যাটাও ছিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখার মতো ছোট। সুলায়মান নামের এক পর্যটক নবম শতাব্দীতে এসে মালাবার ঘুরে গেলেন, কিন্তু অবাক কাণ্ড—তিনি কোনো আরবি ভাষী মানুষই খুঁজে পেলেন না!
টগর সাহেব জানালা দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, ইতিহাস কি তবে কেবলই একটা গোলকধাঁধা? এক হাজার খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই জনপদে ইসলামের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। কিন্তু ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। সেই ঝড় এল সুলতান মাহমুদের হাত ধরে।
গজনী থেকে ধুলো উড়িয়ে যখন ঘোড়াগুলো ছুটল, তখন ভারতবর্ষের বুক কেঁপে উঠেছিল। সেই ঝড়ের গল্প শুরু হবে পরের পরিচ্ছেদে। আপাতত চা দরকার। চিনি ছাড়া কড়া এক কাপ চা।

(২)
বৃষ্টির বেগ একটু কমেছে, তবে বাতাসের ঝাপটায় জানালার পাল্লাটা খটখট করছে। টগর সাহেব চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিলেন। চিনির বদলে স্মৃতির মিষ্টতা খোঁজার চেষ্টা করছেন তিনি। ইতিহাস তো শুধু সাল-তারিখ নয়, ইতিহাস হলো মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সংকলন।
১০০০ খ্রিষ্টাব্দ। বছরটা মনে রাখা সহজ। এই বছরই প্রথম ঝাপটা দিলেন সুলতান মাহমুদ। পেশোয়ার থেকে কনৌজ, আর পেশোয়ার থেকে অনহিলওয়ারা—বড় বিশাল সেই চারণভূমি। সুলতান যেখানেই গেলেন, সঙ্গে নিয়ে গেলেন তাঁর অটল বিশ্বাস আর ধারালো তলোয়ার।
ওয়াইহিন্দের যুদ্ধে জয়পাল আর তাঁর পনেরোজন সেনাপতি বন্দি হলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুখপাল। বন্দিদশায় তাঁরা নতুন ধর্ম গ্রহণ করলেন। টগর সাহেব ভাবলেন, সুখপাল যখন প্রথম ‘কলমা’ পড়লেন, তাঁর মনে কি তখন ভিটেমাটির জন্য হাহাকার জেগেছিল? নাকি তিনি দেখেছিলেন এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন?
বিহেরা নামের জনপদটি তো রীতিমতো এক আজব জায়গা। যারা ইসলাম কবুল করল না, তারা সবাই তলোয়ারের নিচে গেল। পুরো শহরটাই রাতারাতি বদলে গেল। এরপর এল মুলতান। সুলতান মাহমুদের ইতিহাস লেখক উতবি সাহেব খুব গর্ব করে লিখেছেন—এসব বিজয় আসলে ধর্মেরই জয়। কাশ্মীরেও তিনি ছড়ালেন নতুন বিশ্বাস। কনৌজের দুর্গগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হলো। যারা অস্ত্র ধরল না, তারা ধরল নতুন ধর্ম।
বরন নামের জায়গায় তো দশ হাজার মানুষ একসঙ্গে মুসলমান হয়ে গেল। রাজা স্বয়ং রাজমুকুট ছেড়ে টুপি মাথায় দিলেন। নিজামুদ্দিন আহমদ লিখেছেন—এই পরিবর্তন নাকি হয়েছিল মানুষের সম্মতিতে এবং শক্তির প্রভাবে। অদ্ভুত কথা! সম্মতি আর শক্তি কি কখনো একসঙ্গে চলে? তলোয়ারের ডগায় বসে কি সত্যি সম্মতি দেওয়া যায়?
সুলতান মাহমুদ নিজে কোরআনের খুব বড়ো পণ্ডিত ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম শাসক হতে। যেখানেই গেছেন, মসজিদ বানিয়েছেন, মাদ্রাসা তৈরি করেছেন। শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনেক হিন্দু রাজা যুদ্ধ না করেই পালাতেন। ভীমপাল তাঁর আত্মীয় চাদ রায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন—পালিয়ে যাও, নইলে সুলতানের জালে ধরা পড়লে নির্ঘাত মুসলমান হতে হবে। যেমনটা হয়েছে আমার কাকাদের ক্ষেত্রে!
১০৩০ খ্রিষ্টাব্দে যখন সুলতান মারা গেলেন, তখন উত্তর ভারতের নানা জায়গায়—কনৌজ, বারাণসী, বাহরাইচে—মুসলমানদের ছোট ছোট বসতি গড়ে উঠেছে। এমনকি মগধের ওদন্তপুরী আর বিক্রমশিলার মঠগুলোর আশেপাশে তুর্কিদের আনাগোনা বেড়ে গেল। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ভয়ে কুঁকড়ে রইলেন।
কিন্তু টগর সাহেবের মনে একটা খটকা লাগল। সিন্ধুর মতো এখানেও কি একই ইতিহাস ফিরে আসেনি? সুলতানের উত্তরাধিকারীরা পাঞ্জাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। আর সেই যে জোর করে ধর্মান্তর—সেটা কি ধোপে টিকেছিল? আল বেরুনী সাহেব কড়া কড়া কিছু কথা লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু ‘দেবল স্মৃতি’ বলছে অন্য কথা। হিন্দু সমাজ তখন উদার হতে শুরু করেছে। বলা হলো, যারা বিশ বছরও অন্য ধর্মে ছিল, তারা চাইলেই প্রায়শ্চিত্ত করে ফিরে আসতে পারে।
সুখপাল সুযোগ পাওয়া মাত্রই আবার নিজের ধর্মে ফিরে গেলেন। রাই সালও তাই করলেন। ১১৯১ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ মুহাম্মদ ঘুরীর আসার আগ পর্যন্ত, ভারতের মাটিতে মুসলমানদের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। বরং যারা ছিল, তারা যেন এক মহাসমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া বিন্দুর মতো টিকে রইল।
টগর সাহেব তাঁর ডায়েরিতে লিখলেন— “ধর্ম বদলানো সহজ, কিন্তু শেকড় বদলানো কঠিন। মাটির টান বড়ো ভয়ংকর টান।”
এখন রাত গভীর। কাল সকালে কলেজে ক্লাস আছে। ছাত্রদের পড়াতে হবে ইংরেজি ব্যাকরণ, অথচ তাঁর মাথায় ঘুরছে ঘুরী আর আইবেকের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলো। ১১৯২ সালে মুহাম্মদ ঘুরী যখন ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে আবার এলেন, তখন ভারতবর্ষের ভাগ্য আকাশ থেকে মাটির দিকে নেমে এল।
আইবেক নামের সেই তুর্কি সেনাপতি কোল (আজকের আলিগড়) দখল করে দিলেন এক চরম ঘোষণা— “হয় ইসলাম, নয় মৃত্যু।” ২০ হাজার বন্দি গুজরাটে, আর কালঞ্জরে ৫০ হাজার! ফেরেশতা লিখেছেন, এই ৫০ হাজার মানুষ দাসত্ব মেনে নিয়ে ‘ইসলামের সম্মানে’ সম্মানিত হলো।
বখতিয়ার খলজি যখন বিহারের নালন্দা আর বিক্রমশিলা জ্বালিয়ে দিলেন, তখন হাজার হাজার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মারা গেলেন। সাধারণ মানুষ শিক্ষকহীন হয়ে পড়ল। কেউ হলো ব্রাহ্মণ, কেউ হলো মুসলমান। হিমালয়ের পাদদেশের উপজাতিরা, এমনকি ‘আলী মেচ’ নামের এক সর্দারও বদলে ফেললেন তাঁর বংশীয় বিশ্বাস।
১২১০ খ্রিষ্টাব্দে যখন আইবেক মারা গেলেন, ততদিনে ভারতবর্ষে প্রায় আড়াই লক্ষ মুসলমানের এক নতুন সমাজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
টগর সাহেব ভাবলেন, এই আড়াই লক্ষ মানুষ কি এক ছিল? নাকি তাদের মধ্যেও ছিল যোজন যোজন দূরত্ব?

(৩)
রাত এখন গভীর। বাইরে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। টগর সাহেব টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বসে একটা পুরোনো ম্যাপ দেখছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, ইতিহাস আসলে একটা বিশাল ভাঙা আয়না। একেকজন একেক টুকরোয় নিজের মুখ দেখে।
১২১০ খ্রিষ্টাব্দ। কুতুবউদ্দিন আইবেক ঘোড়া থেকে পড়ে মারা গেলেন। রেখে গেলেন এক নতুন ভারতবর্ষ। আড়াই লক্ষ মুসলমান তখন এই বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। টগর সাহেব ভাবলেন, এই যে ‘আড়াই লক্ষ’—এঁরা কারা?
পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য। কেউ একজন তলোয়ার নিয়ে এল, লটবহর লুট করল, আর তারপর গ্রামের মোড়লকে বলল, “কলমা পড়ো, নইলে গর্দান যাবে।” মুহূর্তের মধ্যে মাথার টিকি বা শিখা (যাকে টগর সাহেব মনে মনে ‘চটি’ বলেন) কেটে ফেলা হলো। পৈতা ছিঁড়ে ফেলা হলো। কারো কারো খতনা হলো। নাম বদলে গেল। রামপ্রদাস হয়ে গেলেন রহিমউল্লাহ। কিন্তু রহিমউল্লাহ কি পরদিন সকালেই মনে মনে মুসলমান হয়ে গেলেন?
না, তা হয় না। টগর সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই নব্য-মুসলিমরা বাস করতেন তাঁদের পুরোনো হিন্দু প্রতিবেশীদের মাঝেই। তাঁদের পেশা বদলায়নি, সমাজ বদলায়নি। তাঁরা আগের মতোই লাঙল চষতেন, আগের মতোই পাড়ার চণ্ডীমণ্ডপে বসতেন। তাঁদের কাছে এই নতুন ধর্ম ছিল একটা রাজকীয় শিল মোহরের মতো—বিপদ থেকে বাঁচার বর্ম।
অনেক জায়গায় তো উলটো পুরাণ ঘটল। সিন্ধুর সেই আরব শাসকরা যখন দুর্বল হয়ে পড়লেন, নব্য-মুসলিমরা দিব্যি আবার হিন্দু হয়ে গেলেন। মানসুরার মুসলমানরা তো রীতিমতো হিন্দু ধর্মের রীতিনীতিই পালন করতে শুরু করল। এমনকি যারা টিকে রইল, তারা প্রাণের ভয়ে হিন্দু সেজে দিন কাটাতে লাগল। ১১৭৫ সালে শিহাবুদ্দিন ঘুরী যখন শিয়াদের ওপর চড়াও হলেন, বাকিরা তো আত্মরক্ষার জন্য পুরোপুরি হিন্দুদের ভিড়ে মিশে গেল।
ইতিহাসের বইয়ে এই ‘ফিরে আসার’ গল্পগুলো বড়ো একটা লেখা থাকে না। ঐতিহাসিকরা শুধু জয়ের কথা লিখতে ভালোবাসেন। কিন্তু টগর সাহেবের মনে হয়, পরাজয়ের ভেতরেও একটা বড়ো গল্প থাকে।
তবে সময় বড়ো অদ্ভুত এক মলম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যখন পার হয়, তখন মানুষ ভুলে যায় তার পূর্বপুরুষের সেই ‘চটি’ কাটার করুণ কাহিনি। তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মে এসে সেই নব্য-মুসলিমরা নিজেদের এক আলাদা সত্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করলেন।
হিন্দু সমাজও তখন খুব কড়া। বর্ণাশ্রমের সেই নিগড় এতটাই শক্ত যে, একবার যে বাইরে গেছে, তাকে আর সহজে ভেতরে নিতে চায় না। ফলে এই মুসলমানরা ধীরে ধীরে নিজেদের ভেতর একটা সংহতি বা ‘একাত্মতা’ খুঁজে পেলেন। তাঁরা তখন আর গ্রামের মোড়লের দিকে তাকাতেন না, তাকাতেন দিল্লি বা লাহোরের সুলতানি দরবারের দিকে। ওখান থেকেই আসত তাঁদের নিরাপত্তা, ওখান থেকেই আসত নতুন আইন—শরিয়ত।
একই পাড়ায় থেকেও তাঁরা আলাদা হয়ে গেলেন। তাঁদের বিয়ের নিয়ম বদলে গেল, মৃতদেহ সৎকারের ধরণ বদলে গেল। জামাতে নামাজ পড়া শুরু হলো। টগর সাহেবের মনে হলো, এ যেন এক বাড়ির ভেতরেই আরেকটা নতুন বাড়ি তোলা। দেয়ালটা অদৃশ্য, কিন্তু খুব উঁচু।
দিল্লি আর লাহোর হয়ে উঠল তাঁদের স্বপ্নের শহর। ভারতবর্ষের কপালে তখন এক নতুন তিলক আঁকা হচ্ছে—যার রং নীলও নয়, লালও নয়; বরং এক অজানা ধোঁয়াটে রং।
টগর সাহেব তাঁর নোটবুক বন্ধ করলেন। কাল সকালে ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের বলতে হবে, “History is not just about kings, it’s about the silence between the words.”

(৪)
টগর সাহেবের চোখে আজ ঘুম নেই। টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাসে রাখা পানিটুকু স্থির হয়ে আছে। তিনি ভাবছেন, ক্ষমতা জিনিসটা অনেকটা বুনো ঘোড়ার মতো। যে একবার এর পিঠে চড়ে, সে আর নামতে পারে না।
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। দিল্লি তখন আর কেবল একটা শহর নয়, সেটা একটা দপদপে আকাঙ্ক্ষার নাম। কুতুবউদ্দিন আইবেকের পর এলেন ইলতুৎমিশ। সুলতানি শাসনের ভিত শক্ত হতে শুরু করল। কিন্তু এই বিশাল সাম্রাজ্যের ভেতরে যে সাধারণ মানুষগুলো বাস করত, তাদের খবর কজন রাখে?
টগর সাহেব তাঁর ডায়েরির পাতায় লিখলেন, “ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি হলো সাধারণ মানুষের নীরবতা।”
সে সময় ধর্মান্তরের প্রক্রিয়াটা ছিল এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। কোথাও ছিল সরাসরি রাজকীয় ফরমান, আবার কোথাও ছিল চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তির হাহাকার। বখতিয়ার খলজির সেই দুর্ধর্ষ অভিযানের কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। ওদন্তপুরী বা বিক্রমশিলার সেই বৌদ্ধ বিহারগুলোর ধ্বংসস্তূপের ওপর যখন নতুন উপাসনালয় উঠল, তখন সেখানকার সাধারণ মানুষের মনে কী চলছিল? তাদের প্রিয় শিক্ষকরা নেই, পুরোহিতরা নেই। তারা দিশেহারা হয়ে কেউ ব্রাহ্মণ্যবাদের পুরনো ছায়ায় ফিরল, আবার কেউবা নতুন বিজেতাদের ধর্ম কবুল করল।
গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল, যাকে ঐতিহাসিকরা ‘অন্তরবেদী’ বলেন, সেখানেও তুর্কিদের সংখ্যা হুহু করে বাড়তে লাগল। কিন্তু এই বাড়ার পেছনে কি কেবলই তলোয়ার ছিল? টগর সাহেব একটু হাসলেন। না, শুধু তলোয়ার দিয়ে এত বড় দেশ শাসন করা যায় না। সেখানে ছিল অন্য এক রাজনীতি—যাকে বলে ‘সুবিধাবাদের রাজনীতি’।
যাঁরা নতুন ধর্ম গ্রহণ করলেন, তাঁরা দেখলেন এক অদ্ভুত জগৎ। এতদিন যাঁরা ছিলেন সমাজের নিচতলার মানুষ, যাঁদের ছায়া মাড়ালে বামুনরা স্নান করত, তাঁরা হঠাৎ করে রাজধর্মের অংশ হয়ে গেলেন। অন্তত কাগজে-কলমে। যদিও সুলতানি দরবারের তুর্কি আমিররা এই দেশি ‘নব্য-মুসলিম’দের খুব একটা আমল দিত না, তবুও একটা মানসিক জয়ের তৃপ্তি তো ছিলই।
তবে মুদ্রার উলটো পিঠও ছিল। টগর সাহেব একটি পুরোনো নথিতে পড়েছিলেন যে, গুজরাটের ক্যাম্বো বা খাম্বাত এলাকায় একবার এক দাঙ্গা হয়েছিল। সেখানে মাত্র আশি জন মুসলমান মারা গিয়েছিলেন। এর মানে কী? এর মানে হলো, একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত গুজরাটে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। তাঁরা ছিলেন মূলত ব্যবসায়ী, যাঁরা সমুদ্রপথে এসে বসতি গড়েছিলেন। তাঁদের প্রভাব ছিল কিন্তু সংখ্যা ছিল না।
তাহলে এই সংখ্যাটা হঠাৎ করে বাড়ল কবে? যখন বারাণসীর হাজার হাজার মন্দির ভেঙে সেখানে নতুন শাসন কায়েম হলো, যখন আজমির আর গোয়ালিয়র বারবার আক্রান্ত হলো, তখন প্রতিবারই একদল যুদ্ধবন্দি তৈরি হতো। আর সেই মধ্যযুগে যুদ্ধবন্দি মানেই ছিল দাসত্ব। আর দাসের কোনো ধর্ম থাকে না, মালিকের ধর্মই তার ধর্ম।
টগর সাহেব জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। কৃষ্ণপক্ষের রাত। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। তাঁর মনে হলো, এই অন্ধকারেই যেন লুকিয়ে আছে সেই সব নামহীন মানুষের ইতিহাস, যারা সেরেফ বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের নাম, গোত্র আর বিশ্বাস বিসর্জন দিয়েছিল।
কিন্তু এই পরিবর্তন কি স্থায়ী হয়েছিল? অনেক ঐতিহাসিক বলেন, সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর বহু মানুষ আবার নিজেদের পুরোনো ধর্মে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঘুরী আর আইবেকের পর সেই ফেরার পথটা যেন ক্রমশ সরু হয়ে আসছিল। কারণ সমাজ ততদিনে তাঁদের ‘অচ্ছুত’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছে।
একবার যে দেয়াল পার হয়েছে, তার জন্য আর কোনো দরজা খোলা নেই।

(৫)
ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। টগর সাহেবের টেবিল ল্যাম্পের তেল ফুরিয়ে আসছে, আলোটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। তিনি খাতার শেষ পাতায় কলম রাখলেন। ১২১০ খ্রিষ্টাব্দ—আইবেকের মৃত্যু। এই সালটি যেন একটি মোহনা। এখান থেকেই ভারতবর্ষের ইতিহাস দুটি ভিন্ন স্রোতে ভাগ হয়ে গেল।
টগর সাহেব ভাবলেন, এই যে আড়াই লক্ষ মানুষের কথা ঐতিহাসিকরা বলছেন, তাঁরা কি জানতেন তাঁরা একটি মহাকাব্যের অংশ হতে যাচ্ছেন? লাহোর আর দিল্লির অলিগলিতে তখন নতুন আজান শোনা যাচ্ছে। তুর্কি আভিজাত্য আর এদেশি নবদীক্ষিতদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম দেয়াল থাকলেও, শরিয়তের শাসন তাঁদের এক সুতোয় বাঁধতে শুরু করেছে।
এতদিন যাঁরা ছিলেন বিচ্ছিন্ন, ভয়ে কুঁকড়ে থাকা একদল মানুষ, তাঁরা হঠাৎ অনুভব করলেন এক নতুন শক্তি—’উম্মাহ’ বা ভ্রাতৃত্ব। যদিও এই ভ্রাতৃত্বের পেছনে ছিল যুদ্ধের রক্ত আর দাসত্বের শৃঙ্খল, তবুও কয়েক প্রজন্ম পরে সেই শিকলগুলোই অলংকার হয়ে উঠল। মানুষ তার যন্ত্রণার ইতিহাস ভুলে যেতে ভালোবাসে; সে মনে রাখে শুধু তার বর্তমানের পরিচয়।
টগর সাহেব জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলেন। বাইরের আবছা অন্ধকারে ডালিম গাছটা দেখা যাচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, সিন্ধুর সেই নব্য-মুসলিমরা যারা একসময় আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে গিয়েছিল, তাদের সংখ্যা কেন বাড়ল না? উত্তরটা সহজ। কারণ তখন কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল না। কিন্তু ঘুরী আর আইবেক যে ভিত গড়ে দিলেন, তা ছিল পাথরের মতো শক্ত।
হিন্দু সমাজও ততদিনে নিজের চারপাশে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছে। বর্ণপ্রথার সেই কঠিন নিয়মগুলো এক অদ্ভুত কাজ করল—যারা একবার বের হয়ে গেছে, তাদের আর ফেরার পথ রাখল না। ফলে নিরুপায় হয়েই এই মানুষগুলো নিজেদের আলাদা এক সমাজ গড়ে তুলল। তাঁরা নিজেদের মধ্যে বিয়ে করলেন, আলাদা কবরস্থান বানালেন, আর দিল্লির সুলতানকে ভাবলেন তাঁদের রক্ষাকর্তা।
টগর সাহেব শেষ লাইনে লিখলেন: “ভারতবর্ষের মাটি বড়ো বিচিত্র। সে যেমন সব কিছুকে আপন করে নেয়, তেমনি নিজের গভীরে লুকিয়ে রাখে হাজারো ক্ষত। এক হাজার বছর আগের সেই কয়েক হাজার ধর্মান্তরিত মানুষ আজ এক বিশাল মহিরুহ। তলোয়ারের ডগায় যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হলো এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়ে।”
পাখি ডাকছে। ডালিম গাছের পাতায় ভোরের আলো পড়েছে। টগর সাহেব চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর মনে হলো, ইতিহাস আসলে কোনো বিজয়গাথা নয়, ইতিহাস হলো টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াই।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, কাল ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের বলবেন— “বন্ধুরা, আমরা সবাই আসলে ইতিহাসের এক একটি ধূলিকণা। আমাদের পরিচয় আমাদের রক্তে নয়, আমাদের টিকে থাকায়।”

পরে পড়বো
১০
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন