প্রসূন গোস্বামী

গল্প - দাবার বোর্ড ও রক্তাক্ত মানচিত্র

প্রসূন গোস্বামী
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ অন্যান

(১)

## ক্যাম্প ডেভিডের সেই রহস্যময় তালিকা

শীতের সেই শনিবার বিকেলের আকাশটা ছিল বেশ শান্ত। চারদিকে একটা মায়া মায়া নিস্তব্ধতা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তখন শহর থেকে দূরে, ক্যাম্প ডেভিডের নির্জনতায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। তখন নভেম্বর মাসের শেষ, থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের ছুটির আমেজ ফুরিয়ে আসছে । কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সনের মাথায় অন্য চিন্তা। তিনি বেশ অস্থির হয়ে আছেন, নতুন বছরের জন্য মনে মনে তৈরি করছেন বড়ো সব পরিকল্পনা। একটা কাগজে তিনি খসখস করে লিখে ফেললেন তাঁর আগামীর লক্ষ্যগুলো, যার শিরোনাম দিলেন— ‘৭১-৭২ এর লক্ষ্যসমূহ’।
সেই তালিকার একেবারে এক নম্বরে যা লেখা ছিল, তা বেশ ভারী কথা। নিক্সন চাইলেন তিনি হবেন আমেরিকার ‘নৈতিক নেতা’ আর ‘জাতির বিবেক’ । কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নৈতিকতার এই লম্বা লম্বা কথা দক্ষিণ এশিয়ার একটা বিশেষ দেশের বেলায় এসে একদম উধাও হয়ে যেত। সেই দেশটির নাম— ভারত।
নিক্সন কেন জানি ভারতকে একদম সহ্য করতে পারতেন না। তিনি একবার বিরক্তি নিয়ে বলেই ফেলেছিলেন, “উফ, এই দক্ষিণ এশিয়াটা না জাস্ট অবিশ্বাস্য! ওখানে গেলেই শুধু দারিদ্র্য আর হাহাকার দেখা যায়”। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি যখন প্রথমবার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এশিয়ার সফরে এসেছিলেন, তখনই ভারতের ওপর তাঁর একটা স্থায়ী বিরক্তি জন্ম নেয়।
ভারতের প্রতি নিক্সনের এই রাগের পেছনে একটা বড়ো কারণ ছিল ভারতের নিরপেক্ষ নীতি। তখন তো কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের সময়। ভারত বলত তারা কোনো দলেই নেই, কিন্তু নিক্সনের চোখে এটা ছিল সেরেফ ভণ্ডামি। তাঁর ধারণা ছিল, ভারত আসলে মনে মনে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাহায্য করে। ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকেও তাঁর মোটেও পছন্দ হয়নি। নেহরু যখন সারাক্ষণ পাকিস্তান নিয়ে অভিযোগ করতেন, নিক্সন মনে মনে বেশ চটে যেতেন। নিক্সনের কাছে মনে হতো নেহরু আসলে বড্ড অহংকারী আর নিজেকে বড্ড বেশি নীতিবান ভাবেন । এমনকি নেহরুর সেই ব্রিটিশ ধাঁচের ইংরেজি বলার কায়দাটাও তাঁর কাছে বেশ বিরক্তিকর লাগত।
ভারত সফর শেষে নিক্সন যখন পাকিস্তানে পৌঁছালেন, তখন তাঁর মেজাজ একদম ফুরফুরে হয়ে গেল! পাকিস্তানের আতিথেয়তায় তিনি এতটাই মুগ্ধ হলেন যে ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়েই ঘোষণা করলেন, “পাকিস্তান এমন একটা দেশ যার জন্য আমি যা খুশি করতে পারি”! তাঁর মনে হলো পাকিস্তানিরা অনেক বেশি খোলা মনের এবং ভারতবাসীদের তুলনায় তারা অনেক বেশি স্পষ্টভাষী।
বিশেষ করে পাকিস্তানের গম্ভীর আর জেদি জেনারেলদের সাথে কথা বলে নিক্সন দারুণ রোমাঞ্চ অনুভব করলেন। বিশেষ করে জেনারেল আইয়ুব খান নামের এক আর্মি অফিসারের সাথে তাঁর খুব জমে গেল। নিক্সন মনে মনে ঠিক করে ফেললেন, পাকিস্তানের জন্য অনেক সাহায্য পাঠাতে হবে। আমেরিকা তখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে আটকানোর জন্য বন্ধু খুঁজছিল, আর পাকিস্তানও হাসিমুখে আমেরিকার সাথে হাত মিলিয়ে ফেলল। এমনকি পেশোয়ারে তারা আমেরিকাকে একটি গুপ্তচর ঘাঁটি তৈরি করার অনুমতিও দিল।
বিনিময়ে আমেরিকা পাকিস্তানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিতে শুরু করল। শত শত ট্যাংক, সাবমেরিন, আধুনিক যুদ্ধবিমান আর সেই বিশাল সি-১৩০ সৈন্যবাহী প্লেন— কী নেই সেই তালিকায়! ভারত যখন ভয়ে কাঁপছিল যে এই অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে, তখন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আরে না, এগুলো তো কমিউনিস্টদের জন্য!” কিন্তু ভারত জানত, আসল লক্ষ্য তারাই। ভারত তখন উপায় না দেখে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা শুরু করল। এভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় দাবার গুটি সাজানো শুরু হয়ে গেল।

(২)

## দুই বন্ধুর টানাপড়েন আর আকাশের কালো মেঘ

ক্যাম্প ডেভিডের সেই নিস্তব্ধতার পর দৃশ্যপটে এলেন জন এফ কেনেডি। তিনি যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন তিনি চাইলেন ভারতের সাথে ভাঙা সম্পর্কটা জোড়া লাগাতে। কেনেডির চোখে ভারত ছিল গণতন্ত্রের একটা দারুণ উদাহরণ, তাই তিনি ভারতকে অনেক অর্থনৈতিক সাহায্য দিতে শুরু করলেন।
কিন্তু ১৯৬২ সালে হঠাৎ করে চীন যখন ভারতকে আক্রমণ করে বসল, তখন দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেল। ভারতীয় সৈন্যরা তখন বেশ বিপাকে, আর ঠিক সেই সময় নেহরু সরাসরি কেনেডির কাছে বড়ো ধরনের সামরিক সাহায্য চাইলেন। কেনেডি হয়তো নেহরুর সব আবদার মেটাননি, কিন্তু তিনি প্রচুর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, গোলাবারুদ আর সৈন্য সরানোর জন্য বিশাল সব সি-১৩০ প্লেন পাঠিয়ে দিলেন। চীনের কাছে হেরে যাওয়ার সেই অপমানজনক স্মৃতির পর ভারত আরও কিছু সামরিক সাহায্য পেল—যেমন মর্টার আর গ্রেনেড, যাতে হিমালয়ের পাহাড়ে তারা চীনাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারে। ভারত এই সাহায্য নিল ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনে মনে ভাবত, “এ তো খুবই সামান্য সাহায্য, পাকিস্তান তো এর চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছে!”।
এরপর এলো ১৯৬৫ সাল। কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান যখন ভারতকে আক্রমণ করল, তখন আমেরিকা পড়ল এক অদ্ভুত মহাবিপদে। তারা দেখল, যুদ্ধের দুই পক্ষকেই তো তারা অস্ত্র দিচ্ছে! তখন লিন্ডন জনসনের প্রশাসন তড়িঘড়ি করে ভারত আর পাকিস্তান—উভয় দেশের ওপরই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করল। যদিও নিষেধাজ্ঞা ছিল সবার জন্য, কিন্তু এতে পাকিস্তানেরই ক্ষতি হলো সবচেয়ে বেশি, আর তারা মনে করল আমেরিকা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ভারতও খুব একটা খুশি হতে পারেনি, কারণ তারা চেয়েছিল আমেরিকা অন্তত পাকিস্তানকে ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে দোষারোপ করুক, কিন্তু আমেরিকা তা করেনি।
সব মিলিয়ে দেখা গেল, ভারত আমেরিকার কাছ থেকে যা অস্ত্র পেয়েছে, তা পাকিস্তানের পাওয়া অস্ত্রের চারভাগের একভাগও নয়। এর মধ্যে ভারত যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার সমালোচনা শুরু করল, তখন প্রেসিডেন্ট জনসন বেশ চটে গেলেন। তিনি ভারতের কৃষি সাহায্য আটকে দিলেন, যেন ভারতকে একটু টাইট দেওয়া যায়। দুই দেশের সরকার একে অপরের দিকে গরগর করে তাকাতে লাগল। ঠিক এই রকম একটা গুমোট আর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রিচার্ড নিক্সন যখন আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হয়ে এলেন, তখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন—এখন কী হবে?

(৩)

## ম্যাডাম গান্ধী আর নিক্সনের সেই বিশুষ্ক বৈঠক

নিক্সন যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে ফিরলেন, তখন তাঁর মনের ভেতর ভারতের জন্য এক ফোঁটাও জায়গা ছিল না। তিনি সরাসরি বলেই ফেলতেন, “আমি ইন্ডিয়ানদের একদম দেখতে পারি না।” শুধু যে তাঁর মনে কুসংস্কার ছিল তা নয়, এর পেছনে ছিল অনেকগুলো শক্ত কারণ। প্রথমত, সেই পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধ—ভারত কেন আমেরিকার কথা না শুনে নিজের মতো ‘নিরপেক্ষ’ থাকতে চায়, সেটা নিক্সনের কাছে ছিল চরম বিরক্তির বিষয়। তার ওপর ভারত আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বেশ মাখামাখি করছিল আর ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকাকে সারাক্ষণ কথা শোনাচ্ছিল।
নিক্সন মানুষটা ছিলেন অদ্ভুত। অন্য অনেক আমেরিকান যখন ভারতের গণতন্ত্রের প্রশংসা করত, নিক্সন ভাবতেন এগুলো সব মনের ব্যারাম বা এক ধরনের ‘সাইকোসিস’। তিনি মনে করতেন, একটা দেশ নিজের মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছে সেটা বড়ো কথা নয়, বরং বিদেশের মাটিতে তারা আমেরিকার কতটা উপকারে আসছে সেটাই আসল। যারা ভারতকে পছন্দ করত, যেমন স্টেট ডিপার্টমেন্টের লোকজন বা সেই সময়ের হিপি ছেলেমেয়েরা, তাদের নিক্সন একদম সহ্য করতে পারতেন না। হেনরি কিসিঞ্জারও বুঝতে পেরেছিলেন যে, ডেমোক্র্যাটরা ভারতের প্রতি যে নরম ভাব দেখায়, সেটা নিক্সনের চোখে ছিল চরম বোকামি। জন কেনেডি ভারতকে পছন্দ করতেন বলেই হয়তো নিক্সন জেদ করে ভারতকে আরও বেশি অপছন্দ করতে শুরু করেছিলেন।
কিন্তু সবকিছুর ওপরে ছিল ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সেই সাপে-নেউলে সম্পর্ক। নিক্সন এর আগে জওহরলাল নেহরুকে অপছন্দ করতেন ঠিকই, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী যেন তাঁর হাড়ের ভেতরে জ্বালিয়ে দিতেন। ১৯৬৭ সালের কথা—নিক্সন তখন ক্ষমতায় নেই, ঘুরতে এসেছেন দিল্লিতে। তিনি যখন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যেন হাহাসি তো দূরে থাক, উলটো চরম বিরক্ত হয়ে বসে রইলেন। মাত্র বিশ মিনিটের সেই আলাপের মাঝে ইন্দিরা গান্ধী হঠাৎ তাঁর সহকারীর দিকে তাকিয়ে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, “আর কতক্ষণ লাগবে?” নিক্সন হিন্দি বুঝতেন না ঠিকই, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর গলার সুর শুনেই বুঝে ফেলেছিলেন যে তাঁকে অপমান করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নিক্সন সারা পৃথিবী ঘুরে বেরাতেন, কিন্তু সেই দিল্লিতে কাটানো বিশ মিনিটের স্মৃতি তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। তিনি একবার রাগ করে বলেছিলেন, “মেয়ের মতো বাবাটাও ঠিক একই রকম খারাপ ছিল!” নিক্সন মানুষটা এমনিতেই খুব একা আর লাজুক প্রকৃতির ছিলেন, খুব কম মানুষকে তিনি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতেন। কিন্তু সেই নির্জন মানুষটার হৃদয়ে পাকিস্তানের একজনের জন্য ছিল অগাধ মায়া আর ভালোবাসা—তিনি হলেন জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান।

(৪)
## অদ্ভুত সেই জেনারেল আর দুই বন্ধুর গল্প
নিক্সন মানুষটা ছিলেন খুব একা, সবার সাথে মিশতে পারতেন না। তাঁর কোনো সত্যিকারের বন্ধু ছিল না বললেই চলে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, তিনি পাকিস্তানের জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। ইয়াহিয়া খানের চেহারাটাও ছিল বেশ অদ্ভুত—ভারী শরীর, কুচকুচে কালো আর খাড়া খাড়া ভ্রূ, আর মাঝখানে সাদা রেখাওয়ালা পেছানো ধূসর চুল। তিনি নিজেকে সবসময় বলতেন, “আমি একজন সৈনিক,” আর রাজনীতিবিদদের একদমই সহ্য করতে পারতেন না।
১৯৬৯ সালে আরেকজন জেনারেলকে সরিয়ে দিয়ে মার্শাল ল’ জারি করে তিনি পাকিস্তানের ক্ষমতার গদিতে বসেন। নিক্সনের কাছে মনে হতো ইয়াহিয়া খুব বুদ্ধিমান এবং সাহসী, কিন্তু আসলে কি তাই? ইয়াহিয়া সকালবেলা কনিয়াক খেয়ে নাস্তা করতেন আর সারাদিন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলী ভুট্টো তো হেসেই বলতেন যে, রাত হলে ইয়াহিয়া একদম কাদা হয়ে যেতেন। আমেরিকার কূটনীতিক আর্চার ব্লাডও ইয়াহিয়াকে খুব একটা পছন্দ করতেন না, তাঁর কাছে মনে হতো ইয়াহিয়া খুব দেমাগি আর অকারণে গটগট করে হাঁটেন। এমনকি হেনরি কিসিঞ্জারও একসময় আড়ালে বলে ফেলেছিলেন যে ইয়াহিয়া লোকটা আসলে একটা আস্ত গর্দভ!
কিন্তু ইয়াহিয়া লোকটা ধূর্ত ছিলেন। তিনি জানতেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে পারলে তাঁর অনেক লাভ। নিক্সন আর কিসিঞ্জারের চোখে ইয়াহিয়া ছিলেন একজন ‘আসল পুরুষ’, যিনি একজন ‘মহিলা’র মতো দেশ চালাচ্ছিলেন না—এখানে তাঁরা ভারতের ইন্দিরা গান্ধীকে একটু খাটো করেই দেখতেন।
১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে ইয়াহিয়া যখন হোয়াইট হাউসে নিক্সনের সাথে দেখা করতে এলেন, তখন নিক্সন তাঁকে এক দারুণ উপহার দিলেন। যদিও ১৯৬৫ সাল থেকে পাকিস্তানের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু নিক্সন সেই নিয়ম ভেঙে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, এটা সেরেফ একবারের জন্য ব্যতিক্রম। সেই ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে পাকিস্তান পেল ছয়টি এফ-১০৪ যুদ্ধবিমান, সাতটি বি-৫৭ বোমারু বিমান আর ৩০০টি সাঁজোয়া গাড়ি। নিক্সন ইয়াহিয়াকে কানে কানে বললেন, “আমেরিকার সবাই ভারতকে পছন্দ করলেও আমি তোমার পাশে আছি, আমি তোমার সব কথা রাখব” । ইয়াহিয়াও খুব খুশি হয়ে বললেন, “আমাদের এই বন্ধুত্ব কখনো ভুলব না।”
ভারত এই খবর শুনে একদম দমে গেল। ইন্দিরা গান্ধী খুব বিরক্ত হলেন আর ভারতীয় সেনাপ্রধান মানেকশ’ চিন্তায় পড়ে গেলেন যে, আমেরিকা আর চীনের দেওয়া এই অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তান এখন ভারতের সাথে আরও বেশি ঝগড়া শুরু করবে।
(৫)
## হোয়াইট হাউসের সেই জাদুকর ও তার দাবার চাল
হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজারের অফিসটা ছিল এক দারুণ রোমাঞ্চকর জায়গা। সেখানে কাজ করা স্যামুয়েল হসকিনসন নামের একজন কর্মকর্তা মনে করেন, সেই অফিসটা ছিল পুরো মহাবিশ্বের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। আর সেই কেন্দ্রের আসল জাদুকর ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র আটচল্লিশ বছর। তিনি ছিলেন অসম্ভব বুদ্ধিমান, হার্ভার্ড থেকে আসা এক ‘উইজার্ড’ বা জাদুকর।
কিসিঞ্জারের ব্যক্তিত্ব ছিল দুই রকমের। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সামনে তিনি ছিলেন একদম অনুগত আর মিষ্টিভাষী, সবসময় নিক্সনের মেজাজ বুঝে কথা বলতেন। কিন্তু নিজের অফিসের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন ভীষণ কড়া আর মেজাজি। মাঝেমধ্যে তিনি চিৎকার করে কর্মীদের বকাঝকা করতেন, এমনকি তাঁদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতেন। তবুও তাঁর কর্মীরা তাঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন কারণ তিনি ছিলেন অসামান্য প্রতিভাবান।
আসল সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো নিক্সন আর কিসিঞ্জারের গোপন বৈঠকে। কিসিঞ্জার জনসমক্ষে বা মিটিংয়ে সবার কথা শুনতেন, কিন্তু নিক্সনের সাথে একা হলে তাঁর আসল রূপ বেরিয়ে আসত। নিক্সন যখন ভারতীয়দের ওপর রেগে গিয়ে গালাগাল করতেন, কিসিঞ্জারও পাল্লা দিয়ে তাল মেলাতেন। নিক্সন খুব গর্ব করে বলতেন, “আমার এখানে কিসিঞ্জারই হলো একমাত্র মানুষ যে অন্তত ভারতকে অন্ধের মতো ভালোবাসে না।”
কিসিঞ্জারের আসল দর্শন ছিল ‘রিয়েলপলিটিক’ বা বাস্তববাদী রাজনীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ন্যায়বিচারের দাবিকেও মাঝেমধ্যে বিসর্জন দিতে হয়। তাঁর পুরো নজর ছিল বড়ো বড়ো শক্তিগুলোর দিকে। তিনি এবং নিক্সন দুজনেই মনে করতেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ভারত উপমহাদেশ—সবকিছুই আসলে দাবার চালের মতো, যেখানে মূল লক্ষ্য হলো কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের ভারসাম্য রক্ষা করা।
কিসিঞ্জার চাইতেন পুরো ক্ষমতা নিজের মুঠোয় রাখতে। তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমলাদের একদমই পছন্দ করতেন না, ভাবতেন তারা বড্ড সেকেলে আর সংকীর্ণমনা। এই ব্যাপারে নিক্সনের সাথে তাঁর দারুণ মিল ছিল। নিক্সন মনে করতেন সরকারের নিচের দিকের ৯৬ শতাংশ মানুষই তাঁর বিরোধী। এমনকি নিজের কর্মীদের মধ্যেও তিনি সারাক্ষণ ‘বিশ্বাসঘাতক’ খুঁজতেন।
কিসিঞ্জার যে কতটা প্রভাবশালী ছিলেন, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের কূটনীতিকদের মাঝে অনেক গল্প প্রচলিত ছিল। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত একবার মজা করে লিখেছিলেন যে, কিসিঞ্জার নিজের গুরুত্ব বোঝানোর কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেন না। একবার এক রাতের খাবারের মাঝখানে, কিসিঞ্জারের কাছে পাঁচবার ফোন এসেছিল, আর তিনি এমন ভাব করছিলেন যেন প্রতিবারই খোদ প্রেসিডেন্ট তাঁকে ফোন দিচ্ছেন!
(৬)
## দাবার বোর্ড আর পর্দার আড়ালের কারিগররা
কিসিঞ্জারের অফিসের সেই জাদুকরী আবহে কাজ করত একদল তরুণ আর তুখোড় মেধাবী মানুষ। এদের মধ্যে একজনের নাম ছিল হ্যারল্ড সন্ডার্স, যাকে সবাই হ্যাল বলে ডাকত। হ্যাল ছিলেন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ের আসল বিশেষজ্ঞ। শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি সবসময় চেষ্টা করতেন যেন আবেগ দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধি দিয়ে সবকিছু বিচার করা হয়। তাঁর সাথে ছিলেন স্যামুয়েল হসকিনসন, যিনি সিআইএ (CIA) থেকে এসেছিলেন। স্যামুয়েল ছিলেন একটু রসিক ঘরানার, তিনি বলতেন তাঁদের এই ছোট দলটিই আসলে পুরো পৃথিবীর গতিপথ ঠিক করে দিচ্ছে।
কিন্তু সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়। হোয়াইট হাউসের এই প্রভাবশালী মানুষগুলো যখন দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে পরিকল্পনা করতেন, তখন তাঁদের মাথায় কেবল ভারত আর পাকিস্তান থাকত না। তাঁদের কাছে পুরো পৃথিবীটা ছিল একটা বড়ো দাবার বোর্ড। সেখানে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর অন্যপাশে আমেরিকা। ভারত যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ত, তবে নিক্সন আর কিসিঞ্জার তড়িঘড়ি করে পাকিস্তানকে আরও বেশি জাপটে ধরতেন।
আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের পেশাদার আমলারা অবশ্য মাঝেমধ্যে একটু অন্যরকম চিন্তা করতেন। তাঁরা ভাবতেন, ভারতের মতো বিশাল একটা গণতান্ত্রিক দেশকে চটিয়ে পাকিস্তানের সামরিক জেনারেলদের সাথে এত মাখামাখি করাটা কি ঠিক হচ্ছে? কিন্তু কিসিঞ্জার এই সব আমলাদের একদম পাত্তা দিতেন না। তিনি মনে করতেন, এই আমলারা বড্ড বেশি নিয়মকানুন আর নীতিবাক্য নিয়ে পড়ে থাকে, এদের মাথায় কোনো ‘বড়ো পরিকল্পনা’ নেই।
নিক্সন আর কিসিঞ্জারের এই গোপন পরিকল্পনার নাম ছিল ‘ব্যাকচ্যানেল’। মানে, সরাসরি সবার সামনে কোনো আলোচনা না করে পর্দার আড়ালে নিজেদের বিশ্বস্ত লোক দিয়ে কাজ গুছিয়ে নেওয়া। তাঁরা মনে করতেন, সাধারণ মানুষের কাছে বা কংগ্রেসের কাছে সব তথ্য গেলে কাজ নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তাঁরা তাঁদের এই ছোট দলটিকে নিয়ে এক গোপন বলয় তৈরি করেছিলেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই দাবার বোর্ডে তখন একটা নতুন খুঁটি যোগ হতে যাচ্ছিল। সেটি হলো চীন। আমেরিকা আর চীনের মধ্যে তখন কোনো সম্পর্ক ছিল না, তারা ছিল একে অপরের চরম শত্রু। কিন্তু নিক্সন মনে মনে ভাবছিলেন, যদি কোনোভাবে চীনের সাথে বন্ধুত্ব করা যায়, তবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে এক হাত দেখে নেওয়া যাবে। আর এই বন্ধুত্বের সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই অদ্ভুত চেহারার জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া ছিলেন নিক্সন আর চীনের নেতাদের মাঝখানের গোপন দূত। তাই দক্ষিণ এশিয়ায় যাই ঘটুক না কেন, নিক্সন জানতেন পাকিস্তানকে খুশি রাখা তাঁর জন্য কতটা জরুরি।
(৭)
## বেইজিংয়ের গোপন দরজা আর ইয়াহিয়ার সেই চিঠি
১৯৭১ সালের সেই উত্তাল সময়ে হোয়াইট হাউসের ভেতর এক অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর কাণ্ড ঘটছিল। প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর তাঁর উপদেষ্টা কিসিঞ্জার মিলে এমন এক পরিকল্পনা ফেঁদেছিলেন, যা বাইরের কেউ কল্পনাও করতে পারছিল না। তাঁরা চাইছিলেন শত্রু দেশ চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে। কিন্তু সমস্যা হলো, দুই দেশের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই। কথা বলার জন্য তাদের একজন বিশ্বস্ত মাঝামাঝি লোক দরকার।
আর ঠিক সেই মাঝখানের মানুষটি ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। নিক্সন আর কিসিঞ্জার জানতেন, ইয়াহিয়া আর যাই হোন, তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারেন। তা ছাড়া চীনের নেতাদের সাথে তাঁর বেশ দহরম-মহরম ছিল। নিক্সন ইয়াহিয়ার মাধ্যমে চীনের প্রিমিয়ার চৌ এন-লাইয়ের কাছে বার্তা পাঠাতে শুরু করলেন। ইয়াহিয়া সেই বার্তাগুলো খুব সাবধানে বেইজিংয়ে পৌঁছে দিতেন।
কিসিঞ্জার তো একদিন হেসেই কেলিন, “ভাবো একবার, আমরা একটা কমিউনিস্ট দেশের সাথে যোগাযোগ করছি এমন এক জেনারেলের মাধ্যমে যে নিজেও একজন ডিক্টেটর!” কিন্তু রাজনীতির দাবার বোর্ডে এটাই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড়ো চাল। নিক্সন মনে করতেন, যদি কোনোভাবে চীনের সাথে হাত মেলানো যায়, তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভয় পেয়ে যাবে এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে। আর এই পুরো নাটকের মঞ্চ সাজিয়ে দিচ্ছিলেন ইয়াহিয়া খান।
কিসিঞ্জার যখন তাঁর ডায়েরিতে লিখছিলেন, তখন তিনি ইয়াহিয়ার বুদ্ধিমত্তার চেয়ে তাঁর ‘সৈনিক সুলভ’ আচরণের বেশি প্রশংসা করতেন। ইয়াহিয়াও খুব গর্ববোধ করতেন যে, তিনি পৃথিবীর দুই শক্তিশালী দেশের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তিনি নিক্সনকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বেইজিংয়ের দরজা খোলার চাবিকাঠি তাঁর কাছেই আছে।
কিন্তু এর মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় মেঘ জমতে শুরু করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে। কিন্তু নিক্সন আর কিসিঞ্জারের কাছে সেই মানুষের কান্নার চেয়ে বেইজিংয়ের গোপন মিশন ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা ভাবছিলেন, যদি এই সময় ইয়াহিয়াকে চটিয়ে দেওয়া হয় বা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কথা বলা হয়, তবে ইয়াহিয়া হয়তো রেগে গিয়ে চীনের সাথে যোগাযোগের এই সুতোটা ছিঁড়ে দেবেন।
তাই হোয়াইট হাউস থেকে কড়া নির্দেশ এল— পাকিস্তানে যাই ঘটুক না কেন, ইয়াহিয়ার ওপর যেন কোনো চাপ সৃষ্টি করা না হয়। কিসিঞ্জারের ভাষায়, “আমাদের এই বড়ো লক্ষ্যের সামনে বাকি সবকিছুই তুচ্ছ।” বেইজিংয়ের সেই গোপন দরজার ওপারে কী আছে, তা দেখার জন্য নিক্সন তখন উন্মুখ হয়ে বসে ছিলেন, আর ওদিকে পাকিস্তানের আকাশে তখন ঘনিয়ে আসছিল এক ভয়ংকর কালবৈশাখি ঝড়।
(৮)
## ভোটের ফল আর ইয়াহিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে একটা কাণ্ড ঘটে গেল, যা সচরাচর ঘটে না। জাঁদরেল জেনারেল ইয়াহিয়া খান দেশে একটা সাধারণ নির্বাচন দিলেন। তিনি আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা ভেবেছিলেন, অনেকগুলো দল মিলে ভোট ভাগাভাগি করে ফেলবে, আর শেষমেষ ক্ষমতা থাকবে তাঁর মতো কোনো সামরিক জান্তার হাতেই। কিন্তু ভোটের ফল যখন বেরোলো, তখন ইয়াহিয়ার অবস্থা হলো খাঁচায় বন্দি বাঘের মতো!
পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ প্রায় সবকটি আসনে জিতে এক বিশাল বিজয় ছিনিয়ে আনল। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেল। অর্থাৎ, নিয়ম অনুযায়ী এখন শেখ মুজিবুর রহমানেরই হওয়ার কথা পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্ধত শাসক আর জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো চতুর রাজনীতিকরা সেটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁরা ভাবতেও পারছিলেন না যে, বাঙালির হাতে পুরো দেশের শাসনভার ছেড়ে দিতে হবে।
ইয়াহিয়ার সামনে তখন এক মহা বিপদ। একদিকে দেশের মানুষের ভোটের রায়, আর অন্যদিকে তাঁর নিজের ক্ষমতার লোভ। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। ঠিক সেই সময়েই নিক্সন আর কিসিঞ্জারের সেই গোপন বেইজিং মিশনের কাজও পুরোদমে চলছে। ইয়াহিয়া ভাবলেন, এখন যদি তিনি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেন, তবে হয়তো আমেরিকার সেই গোপন মিশনের গুরুত্ব কমে যাবে। নিক্সনও কিন্তু তখন ইয়াহিয়ার এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছিলেন না। তাঁর কাছে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ভোটের চেয়ে চীনের সাথে বন্ধুত্ব করা ছিল অনেক বেশি বড়ো লক্ষ্য।
ইয়াহিয়া খান তখন এক ভয়ংকর খেলা খেলতে শুরু করলেন। তিনি আলোচনার নাটক সাজালেন, কিন্তু মনে মনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাহাজে করে সৈন্য আর গোলাবারুদ আসতে শুরু করল পূর্ব পাকিস্তানে। ঢাকার রাস্তায় তখন গুমোট এক অস্থিরতা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও বুঝতে পারছিল কিছু একটা হতে যাচ্ছে।
নিক্সন আর কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে বসে সব খবর পাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁরা অদ্ভুত এক নীরবতা পালন করছিলেন। তাঁদের কাছে ইয়াহিয়া ছিলেন একজন ‘নির্ভরযোগ্য বন্ধু’, যার হাতে নিজের দেশের মানুষের রক্ত লেগে থাকলেও তাতে তাঁদের কিছু যায় আসত না। তাঁরা ভাবছিলেন, এই ছোটোখাটো ঝামেলা ইয়াহিয়া নিজেই মিটিয়ে ফেলবেন। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেননি, দাবার বোর্ডের এই চালটা আসলে তাঁদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
(৯)
## অন্ধকারের নীল নকশা আর সাদা বাড়ির নীরবতা
১৯৭১ সালের মার্চ মাসটা ছিল গুমোট গরমের মতো অস্বস্তিকর। ঢাকার আকাশ তখন ভারী হয়ে আছে এক অজানা আতঙ্কে। ইয়াহিয়া খান আর তাঁর জেনারেলরা মিলে এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করলেন, যার নাম দেওয়া হলো ‘অপারেশন সার্চলাইট’। তাঁরা চাইলেন গায়ের জোরে বাঙালির স্বাধিকারের দাবি স্তব্ধ করে দিতে। ২৫শে মার্চ মাঝরাতে যখন সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন ট্যাংক আর মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। চারদিকে শুধু আর্তনাদ আর আগুনের লেলিহান শিখা।
ঢাকায় আমেরিকার কনসুলেটে তখন কাজ করতেন আর্চার ব্লাড নামের একজন সাহসী কূটনীতিক। তিনি নিজের চোখে এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা দেখলেন এবং স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি সাথে সাথে ওয়াশিংটনে টেলিগ্রাম পাঠালেন, যার শিরোনাম ছিল— ‘নির্বিচার হত্যাকাণ্ড’। তিনি পরিষ্কার লিখে দিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা সেরেফ কোনো দাঙ্গা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত গণহত্যা। আর্চার ব্লাড আশা করেছিলেন, এই খবর শুনে প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর কিসিঞ্জার অন্তত একটা কড়া প্রতিবাদ জানাবেন।
কিন্তু হোয়াইট হাউসে তখন অন্য সুর। নিক্সন আর কিসিঞ্জার যখন এই গণহত্যার খবর পেলেন, তখন তাঁদের চেহারায় কোনো উদ্‌বেগের ছাপ দেখা গেল না। বরং তাঁরা আর্চার ব্লাডের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন। কিসিঞ্জার রাগতস্বরে বললেন, “এই লোকগুলো কেন বুঝতে পারছে না যে আমাদের সামনে আরও বড়ো কাজ আছে?” তাঁদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষের জীবনের চেয়ে ইয়াহিয়ার মাধ্যমে চীনের সাথে যোগাযোগের সেই ‘ব্যাকচ্যানেল’ বা গোপন পথটি ছিল অনেক বেশি মূল্যবান।
নিক্সন তো সরাসরি বলেই দিলেন, “পাকিস্তানিরা যা করছে তা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমাদের এতে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।” তিনি এমনকি পাকিস্তানকে দেওয়া সামরিক সাহায্য বন্ধ করতেও রাজি হলেন না। কিসিঞ্জার মনে করতেন, যদি এই সময় আমেরিকার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়, তবে ইয়াহিয়া হয়তো অপমানিত বোধ করবেন এবং চীনের বেইজিং মিশন মাঝপথেই ভেস্তে যাবে।
আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের অনেক কর্মকর্তা যখন নৈতিকতার দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলছিলেন, কিসিঞ্জার তখন তাঁদের ‘আবেগপ্রবণ বোকা’ বলে হাসাহাসি করতেন। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে ছিল শুধু ক্ষমতা আর স্বার্থের হিসাব। নীতি বা আদর্শের সেখানে কোনো ঠাঁই ছিল না। ফলে যখন পূর্ব পাকিস্তানে ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম হত্যাযজ্ঞ চলছিল, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ আমেরিকার দুই কর্ণধার দাবার চাল মেলাতে ব্যস্ত ছিলেন আর ইয়াহিয়াকে আড়ালে আশ্বস্ত করছিলেন এই বলে— “বন্ধু, আমরা তোমার পাশেই আছি।”
(১০)
রক্তাভ মানচিত্র আর ইতিহাসের কাঠগড়া
মার্চের সেই ভয়ংকর রাতটা যখন শেষ হলো, তখন ঢাকার আকাশ আর নীল ছিল না, সেটা হয়ে গিয়েছিল কুচকুচে কালো আর ছাই রঙের একটা মিশ্রণ। চারদিকে বারুদের গন্ধ। আর্চার ব্লাড সাহেব যখন তাঁর কনস্যুলেটের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন, তিনি যা দেখলেন তা বর্ণনা করার মতো কোনো ভাষা কোনো ডিকশনারিতে নেই। তিনি সাথে সাথে তাঁর টাইপরাইটার নিয়ে বসলেন। খটখট শব্দে টাইপ হতে লাগল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এক সত্য।
ব্লাড সাহেব লিখলেন, এটি কোনো সাধারণ গোলযোগ নয়, এটি হলো ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ বা বেছে বেছে করা গণহত্যা। পাকিস্তানি সৈন্যরা বড়ো বড়ো সার্চলাইট জ্বালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। জগন্নাথ হল আর ইকবাল হলের সেই দৃশ্যগুলো ছিল একদম নরকের মতো। তারা লাইনে দাঁড় করিয়ে হলের ছাত্রদের ওপর মেশিনগান চালিয়ে দিল। যারা প্রাণভয়ে খাটের নিচে বা আলমারির ভেতরে লুকিয়ে ছিল, তাদের টেনে বের করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হলো। ব্লাড সাহেবের টেলিগ্রামে উঠে এল সেই হাহাকার— মাঠের ওপর পড়ে থাকা শত শত নিথর দেহ, যাদের অপরাধ ছিল তারা শুধু নিজের দেশের স্বাধীনতা চেয়েছিল।
নিক্সন আর কিসিঞ্জারের কাছে এই খবরগুলো যখন পৌঁছাল, তখন তাঁরা অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত রইলেন। কিসিঞ্জার তখন দাবার ছকে মগ্ন। তিনি ভাবছিলেন, “আরে, ইয়াহিয়া যদি এখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তো আমার বেইজিং যাওয়ার গোপন রাস্তাটা বন্ধ হয়ে যাবে!” তিনি আর্চার ব্লাডের সেই সাহসী রিপোর্টগুলোকে সেরেফ ‘আবেগপ্রবণ পাগলামি’ বলে উড়িয়ে দিলেন। নিক্সন তো আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, “ওরা নিজেদের লোক মারছে, তাতে আমাদের কী? আমাদের দরকার বেইজিংকে।”
কিন্তু ব্লাড সাহেব দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি এবং তাঁর সাথে কাজ করা আরও বিশজন আমেরিকান কর্মকর্তা মিলে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ করলেন। তাঁরা সরাসরি ওয়াশিংটনে এক ‘ডিসেন্ট ক্যাবল’ বা ভিন্নমতের চিঠি পাঠালেন। সেখানে তাঁরা লিখলেন যে, আমেরিকা যেখানে নিজেকে নৈতিকতার প্রতীক বলে দাবি করে, সেখানে এই গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা না বলে তারা আসলে গণতন্ত্রকে হত্যা করছে। তারা ইয়াহিয়াকে শুধু সমর্থনই দিচ্ছে না, বরং আমেরিকার দেওয়া অস্ত্র দিয়েই এই মানুষগুলোকে মারা হচ্ছে।
নিক্সন যখন এই চিঠির কথা শুনলেন, তিনি রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, “এই ব্লাড লোকটা কে? ওকে এখনই ওখান থেকে সরিয়ে দাও!” কিসিঞ্জারও সায় দিলেন। তাঁদের কাছে একজন সৎ মানুষের সত্য কথার চেয়ে একজন ডিক্টেটরের বন্ধুত্বের দাম ছিল অনেক বেশি।
শহরের অলিগলিতে তখন তখন শুধু লাশের স্তূপ। পুরোনো ঢাকার সরু গলিগুলোতে সৈন্যরা আগুন লাগিয়ে দিল। আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখনই রাস্তার মোড়ে ওত পেতে থাকা সৈন্যরা তাদের ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল। বুড়িগঙ্গা নদীর পানি তখন আর স্বচ্ছ নেই, সেখানে ভেসে যাচ্ছিল অগুনতি মানুষের রক্ত আর স্বপ্ন।
ব্লাড সাহেবের রিপোর্টে ফুটে উঠল আরও এক করুণ দৃশ্য— রোকেয়া হলের সেই মেয়েদের আর্তনাদ, যারা ডিক্টেটরদের ক্ষমতার লড়াইয়ের বলি হয়েছিল। কিসিঞ্জার তখনো হোয়াইট হাউসের ডিনার টেবিলে বসে কৌতুক করছিলেন। তিনি ইয়াহিয়ার পাঠানো দামি দামি উপহারের প্রশংসা করছিলেন আর মনে মনে হিসাব মেলাচ্ছিলেন আর কতদিন পর তিনি বেইজিংয়ের সেই জাদুকরী সফরে যেতে পারবেন।
পুরো পৃথিবী তখন এই নৃশংসতার খবর পেয়ে শিউরে উঠছিল। ব্রিটিশ পত্রিকাগুলো একে বলছিল ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’। কিন্তু ওয়াশিংটনের সেই ঠান্ডা ঘরের এসি রুমে বসে নিক্সন আর কিসিঞ্জার তখনো ভাবছিলেন, ভারত হয়তো এই সুযোগে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে বসবে। তাঁরা ভারতকে সাহায্য করা তো দূরে থাক, উলটো ইন্দিরা গান্ধীকে হুমকি দিতে শুরু করলেন। তাঁদের দাবার বোর্ডে তখন শুধু রাজারাই টিকে ছিল, সাধারণ মানুষগুলো যেন কেবলই ফেলে দেওয়া বোড়ে।
রাতের অন্ধকারে যখন ঢাকা শহর কাঁদছিল, তখন বেইজিং আর ওয়াশিংটনের মধ্যে গোপন তারে বার্তা যাচ্ছিল। ইয়াহিয়া খান তখনো মাঝখানের সেই পাহারাদার। রক্তের ওপর দিয়ে যে বন্ধুত্বের সেতু তৈরি হচ্ছিল, কিসিঞ্জার সেই সেতুর ওপর দিয়েই তাঁর সেই বহুল প্রতীক্ষিত স্বপ্নের সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দাবার চালটা তখনো তাদের হাতেই ছিল, কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেননি যে এই রক্তমাখা মানচিত্র একদিন পৃথিবীর মানচিত্রটাই বদলে দেবে। ওদিকে আর্চার ব্লাড তাঁর ডেস্কে বসে শেষবারের মতো লিখছিলেন, “ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।”

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন