বিছানায় একা পাশবালিশটা শুয়ে আছে। এখন এটাকে নিয়ে ঝগড়া করার কেউ নেই। এই পাশবালিশটা আমার সম্পর্ক অনেক পুরানো। ও সময় আমাদের কাছে পাশবালিশ কেনাটা বিলাসিতা ছিলো। তবে জানেন কি ? একটা সময় এ পৃথিবীতে বালিশ ব্যবহার টা বিলাসিতাই ছিলো।প্রথম বালিশ ব্যবহার শুরু হয়েছিল মেসোপটেমিয়া তে। তখন বালিশ ব্যবহার ধনীরাই কারণ এটা মর্যাদার প্রতীক ছিল। প্রথম বালিশ কিন্তু আরামের জন্য তৈরি হয়নি। ঘুমানোর সময় চোখে মুখে নাকে কানে যাতে পোকামাকড় না ঢুকে যায়, তাই বালিশ ব্যবহার শুরু হয়। আর ঘুমানোর সময় বারবার গলা ঘাড় পিঠে ব্যাথা হতো , তার হাত থেকে বাঁচতে বালিশ তৈরি হয়। মিশরের মমিতে কাঠের পাথরের বালিশ দেখা যায়। রোমান বা গ্রীকরা প্রথম নরম বালিশ ব্যবহার শুরু করে। বড়লোক অভিজাত ছাড়া তখন বালিশ ব্যবহার করতেন না। গীর্জাতে বই উঁচু করে রাখতে বালিশ ব্যবহার হতো তখন। তবে চিনের রাজারা নিরেট বালিশ ব্যবহার করতো কাঠ, মাটি , ধাতু দিয়ে তৈরি হতো এদের বালিশ। তবে মুম্বাই এর ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষ জনরা এখনো ইটকেই বালিশ হিসেবে ব্যবহার করে।
তবে সামার্থ্য ছাড়াও পাশবালিশ কেনা আমাদের বাড়িতে কারণটা ছিলো আমাকে ঠকানো। দুপুর বেলায় মাকে জড়িয়ে ঘুমাতাম।মা কাজে যাবার সময়ে, মায়ের জায়গায় ঐ পাশবালিশটা রেখে আমাকে ঠোকিয়ে কাজে চলে যেতো। পরে ওটাই আমার বন্ধু হয়ে যায়। মানে কিশোর বয়সেটা থেকে যৌবনের অনেকটাই সময় ও হয়েছিল আমার জীবন সঙ্গীনি। একসময় মনে হতো চন্দ্রবিন্দুর পাশবালিশ গানটা বোধহয় আমার জন্য ই লেখা হয়েছিল।
বিয়ের পর ভেবেছিলাম ওটার আর কাজ নেই। কিন্ত দিন বৌভাতের পরে দিন দেখি ওটা খোঁজ করলো বৌ। ওতো বাড়িতে নতুন নয়। পাশবালিশ হলো। আমাদের মধ্য লক্ষণ গন্ডী। ওর বাবা ওকে পড়াবে না বলেছিলো। ও উচ্চাকাঙ্খী ছিলো সাত তারাতারি মা হতে চায় নি তাই পাশবালিশ একটা নতুন ভুমিকা পেলো।
তাই দেখলাম বিপদ আরো বাড়লো পাশবালিশটা। পাশবালিশকে যতোই জাপটা জাপটি করতাম প্রতিবাদ করতো না। কিন্তু বৌ তো আর জড় পদার্থ নয়। ওর ইচ্ছে অনিচ্ছা আছে । সে প্রতিবাদ করতে জানে। আমাদের ঘরের একজন সদস্য মত ভুমিকা নিলো এই পাশ বালিশটা। ঝগড়া হলেই ও হয়ে যেতো বডার ওয়াল বা পাঁচিল । তবে আদর সোহাগ একেবারেই বন্ধ হলো না। কিন্ত সেইসময়ও নাক গলাতো এই পাশবালিশ। আবার ঘুমের সময় রোজ ঝগড়া হতো এই পাশবালিশ এর দখলদারি নিয়ে। আজ ও নেই সেই সব নেই।
মুম্বইয়ে গেলাম কাজের খোঁজে। পাশবালিশ দূরে থাক। ভালোবিছানা জোটে না আমার । সেই সময় নাকি আমার বৌ কাছে পাশবালিশ খুব কাছের মানুষ হলো। আমাকে মিস করে ওকে জরিয়ে রাত কাটাতো। কিন্ত ওর অফিসে প্রোমশান আগে ওর পাশবালিশটার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলো। আর প্রোমশান পর আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলো।
আমার চোখের জল মুছে দেয় আজকাল ওই পাশবালিশটা ।বুকের স্পন্দনে শুনতে চায় রাত জেগে , রূপকথার মতো সেই রাতের গল্প গুলোকে মনে করায় । আজ যেনো ও সন্তানের মতো জরিয়ে ধরে শীতল করে বুকটা।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন