মানব মন্ডল

গল্প - ব্যানার্জি বাড়ি

মানব মন্ডল
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬ জীবনবাদী, ভালোবাসা

মামা বাড়ির পাড়ায় আমি ছিলাম  বাঁশ বনে শিয়াল রাজা।  কিন্ত  বাঁশ বনের  শিয়াল  রাজা হল কি হবে সাঙ পাঙও আছে। তাছাড়া সাম্রাজ্যবিস্তারে ইচ্ছাও আছে। এবং সেই লক্ষ্যে পাশের পাড়া ক্রিকেট মাঠটি আমাদের দখলে।সত্যিই কথা বলতে মাঠটা আমাদের পাওয়ানা। বৈদ্যপাড়ায় কোন ভালো মাঠ নেই বলে নয়। রবীন্দ্র আবাসন তো আসলে বৈদ্য পাড়াই অংশ।

আসলে আমি যে সময়ে কথা বলছি সে সময় সবে কলকাতা বড় হচ্ছে।ধরুন আজ যেখানে ইএম বাইপাস বড় বড় হাসপাতাল সপিং মল, দেখছেন সে গুলো ছিলো ধান খেত আর মাছের ভেরি রামলাল বাজারে নাম শুনেছেন তো। রামলাল ছিলেন এক সময় এ অঞ্চলের ডাকাত। তাঁর গল্প শুলেই জানবেন কেবল দস্যুবৃত্তির, জন্যে নয় রামলাল ডাকাত বিখ্যাত হয়েছিল তাঁর বীরত্ব, মহানুভবতা জন্যেই। তাই তো তাঁর নামে তৈরি হয়েছে বাজার।
আসলেই ডাকাত নাম শুনলেই গা ছম ছম করে উঠলেও বাংলার বেশিরভাগ ডাকাতরাই ছিলেন ভালো মানুষ। পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পরবর্তী অরাজকতার সময় বাংলায় ডাকাতের উপদ্রব ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল, যা ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত প্রকট হয়েছিল ।ডাকাতরা সাধারণত গভীর জঙ্গল, নদীর ধারে, বা নির্জন রাজপথের কাছে তাদের আস্তানা স্থাপন করত । তারা দলবদ্ধভাবে বা সশস্ত্র দলে হামলা চালাত । এই বৈদ্য পাড়াই পাশে একটা দিঘি বা ঝিল ছিলো। তাকে ঘিরে ছিলো জঙ্গল। এখনেই আস্তানা ছিলো রামলাল ডাকাতের। যাইহোক এই ঝিলটার পাশ দিয়ে আবার খাল কাটা হয়েছিল। ফলে গরফা , শহিদ নগর , ব্যাঙ্ক প্ল্যাটের ছেলে ছোকরা এই ঝিলের ওপর কোনদিনই নিজেদের অধিকার ফলতে আসতো না।
কিন্ত মুস্কিল হলো হঠাৎই একদিন ঝিলটা রাতারাতি মাটি ভরাট হলো। আমরা হারালাম আমাদের শৈশবের কিছু সোনালী স্মৃতি, শালিক তোলা, কলার ভেলা চড়া , ডাহুক পাখি বাচ্চাদের ধরা,গামছা দিয়ে মাছ ধরা আরও কত কি??
যাইহোক ঝিল ভরাট হয়ে চোখের নিমিষেই কত বাড়ি হয়ে গেলো, কতো লোক এলো তার হিসাব নেই। ওরা গড়লো নতুন পাড়া। তবে ওদের খেলার মাঠটা আমাদের দখলে থাকলো।
যাইহোক আমাদের তখন উরতি বয়স। রায়ন ওদের জ্যাঠাদের বাড়ির জোরা লাল বারান্দার মাঝখান দিয়ে, ঝিল ভরাট নতুন পাড়া মানে রবীন্দ্র আবাসন বাসীদের বেড়ানোর একমাত্র রাস্তা। তাই এখনে বৈদ্য পাড়া আর নস্কর পাড়া ছেলেরা আড্ডা মারি। এখনে আপনি কিশর থেকে রফি সবাইকেই পেয়ে যাবেন । রবীন্দ্র আবাসন এর মেয়েদের দেখিয়ে এরা নিজেদের প্রতিভা জাহির করে।
যাইহোক ঐ আড্ডায় আমি অংশ গ্রহণ করতাম না। কারণ সমাজে গোপল এবং রাখাল বালকদের মধ্য বরাবর একটা দূরত্ব থাকে।গোপল যখন ছাতা মাথায় স্কুল বাসে করে রামমোহন বিদ্যাসাগর হতে স্কুলে যায় তখন রাখাল বালক বাবাকে চায়ের দোকান কাপ ধুয়ে কিংবা মুদি দোকানে মাল মেপে সাহায্য করে দেয়। যাইহোক আমি গোপল , ভালোছেলেদের দলে। কিন্ত হিরো পন্ডি করার ইচ্ছাটা আমার মনেও আছে। তারপর যখন শুনলাম মেয়েটি বেলডাঙা লঙ্কার মতো ঝাঁঝালো। কেউ বাগে আনতে পারে নি তখন মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করার চ্যালেঞ্জটা মনে মনে নিয়ে ফেলাম।
স্ক্রিপ্ট রেডিও করলাম। ব্যাট হাতে নতুন ছেলেটাকেই বল দিলাম। বল করার সুযোগ পেয়ে তো খুব খুশি। আরো খুশি আমাকে প্রথম বলে আউট করে। কারণ এখানে ওভার বাউন্ডারি নেই। কিন্ত বল আনতে কে যাবে ব্যানার্জি বাড়ির ছাদে পরেছে। আমি মনে মনে খুশি বল আনতে যেতে হবে। 32 ইঞ্চি বুকটা 36 ইঞ্চি করে চললাম। মুখোমুখি হলাম বাঘণীর। কারণ এই সময়টা সে রোজই ছাদে পাইচারি করে।
কিন্ত অবাক করা কথা সে আমাকে সাগত জানালো।
তার হাতে আমাদের ক্রিকেট বলটি। দেখে বললাম ” সরি অনেক দিন পর খেলতে এলাম। তাই ভুলে জোরে মেরে ফেলছি। বড় গ্রাউন্ড খেলে অভ্যাস তো তাই লুজ বল দেখে ছক্কা হাকতে ইচ্ছা হলো।”
ও বলল : ” এ মা তাই ! আমি ভাবলাম আপনি আমার সাথে আলাপ করার ছুতো করে বলটা এদিকে মারলেন। যদিও আমার আপনার সাথে আলাপ ইচ্ছা ছিলো। পাড়ার বড়রা আপানার কথা সবাই বলে। একমাত্র আপনিই নাকি মেয়েদের বড়দের সম্মান করেন। ”
আমার বুকটা ফুলে 56 ইঞ্চি হয়ে গেলো। আমি বিনয় বলে ফেললাম ” না না তেমন কিছু না । তবে আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে।”
ও বলল ” তাই স্বপ্ন দেখেছিলেন হয়তো । ”
আমি বললাম ” না না স্বপ্ন টপনো আমি দেখি না।”
ও বললো ” ও তাই ! আমাকে স্বপ্নে দেখন নি তাহলে। কোথায় দেখেছিলেন আমি বলে দেবো। আগে বলুন আজ সন্ধ্যা ফ্রি আছেন। ”
আমার মন লাড্ডু ফুটলো কিন্ত মুখে বললাম ” কেন সূর্য সেন লাইব্রেরিতে কার্ড বানাবেন নাকি। ”
ও বলল ” আপনি কোন বাড়িতে থাকুন সেটা বলুন আমি সন্ধ্যায়। আপনাকে ডেকে নেবো।”
কথার মায়াজালে ফাসার লোক আমি না। আমি সেনদের বাড়িটিই দেখিয়ে দিলাম।
ও সাথে সাথেই বল ছুড়ে সেনদের কাঁচের জানালা ভেঙে দিলো। আর হঠাৎই আপনি থেকে লাফ দিয়ে তুই নেমে এলো।
” সন্ধ্যায় ফ্রি আছিস না , মিস্ত্রী খুজে সারা ভাঙা জানালা। পাড়ায় ভাজা মাছ উল্লটে খেতে ডানে না। আসলেই কি শয়তান তুই আমি সেটা ভালো করে জানি।। আমাদের কলেজে গত 20 বছরে কখনও র‌্যাগিং হয়ে না জেনে তুই তোর সাঙ্গ পাঙগো রা অন্য কলেজের ছাত্র হয়েও আমাদের কলেজের সিনিয়র সেজে র‌্যাগিং করেছি আমাদের। এতো তারাতারি ভুলে গেছিস মুখটা।কিন্ত আজ থেকে মুখ টা চিনে রাখ। গ্রামের মেয়ে আমি। ঢিল ছুড়ে আম জাম পারা মেয়ে আমি। এক ঢিলে মাথা ফাটিয়ে দিতে পারি। ”

এই রকম একটা হুমকির পর ভেবেছিলাম গল্পটায় দাড়ি পরে গেলো। কিন্ত ভগবান আমাদের গল্পটা অন্যভাবে লিখেছিলো। পাড়াতুতো রাঙাদিদির মেয়ে হয়েছিল । ওদের আনতেই সেন্টু আর জামাই বাবুর সাথে হাসপাতালে গিয়েছিল আমি। রায়ে বাঘণীর সাথে আবার ওখানে দেখা। কিছুটা অসহায় ওর দিদা অসুখ । ভীষণ ছোটাছুটি করছে। জামাইবাবুর কথাতেই সেন্টু আমি থেকে গেলাম ওর সাথে ওকে সাহায্য করতে।
মেয়ে হিসাবে খুব ভালো। ও আসলে ডিমের মতো, ওপরে কঠিন হলেও ভিতরে নরম। বাবা সাথে ঝগড়া করে মা ওকে নিয়ে মামা বাড়িতে চলে এসেছে। তাই অন্যকোন স্বপ্ন দেখার সময় ওর নেই । তবে আমাদের বন্ধুত্ব হলো ভালোই। আমিও কোনদিন স্বপ্ন দেখি নি। কারণ আমার ঘন ঘণ মামা বাড়িতে আসার অভ্যাসটা কারণ ছিলো আমার বাবার কাজ। বাবা ছিলেন বাস কনডাক্টর। মাঝেই মাঝেই গাড়ি বন্ধ হতো। খবর পেলেই মামারা আমাকে ছুটে নিয়ে আসতো।
যাতে আমার খাওয়া পড়ায়। অসুবিধা না হয়।
দুইজনই কোন দিন স্বপ্ন দেখতাম না। ঈশ্বর কি লিলা বন্ধুত্ব হতেই দুইজনেই স্বপ্ন দেখা শিখে গেলাম।

পরে পড়বো
১০
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন