এ কে সরকার শাওন

গল্প - প্রজাপতি ইফেক্ট

এ কে সরকার শাওন
রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ জীবনবাদী, প্রকৃতি

জাকারিয়া ইসহাক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় কখনো চোখ বুলান না। আজ সকালের ব্ল্যাক কোল্ড কফিতে চুমুক দেবার সময় পাতা ওল্টাতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল একটি কবিতার শিরোনাম ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’। তিনি মনে মনে কিছুটা বিস্মিত হলেন; সাহিত্যিকদের ভাবনায় বিজ্ঞান এতটা নিখুঁতভাবে ধরা দিচ্ছে দেখে ভালো লাগল। তিনি কৌতূহল নিয়ে পুরো কবিতাটি পড়লেন:

ওহে জ্ঞানী ওহে মানী
ভেবে বলেন তো শুনি;
একটি ধূলিকণা হারালে
কী ক্ষতি তৎক্ষুণি!

পাতা মরে ঝরে পড়ে
বৃক্ষের কী যায় আসে?
কত মানুষ নিমিষেই মরে
অন্যেরা কী ক্ষতি কষে?

জনপদ শেষ ধ্বংস দেশ
পৃথিবীর কী হারায় লয়?
পৃথিবী অতলে হারালে
সৌরজগতের কী ক্ষয়?

সৌরজগত হারালে তাবৎ
আকাশগঙ্গা থেমে রয়?
আকাশগঙ্গা হারিয়ে গেলে
মহাবিশ্বের কী হয়?

আমার মন্ত্র সবই স্বতন্ত্র
সবই স্বতন্ত্র সম্পদ!
পান থেকে চুন খসলেই
ক্ষণিক বিপর্যয়-বিপদ।

কবিতা পাঠের পর জাকারিয়া যখন তাঁর ল্যাবের ডেটা অ্যানালাইসিস স্ক্রিনগুলো দেখছিলেন, তখন তাঁর মাথায় বারবার সেই কবিতার লাইনগুলো বাজছিল
“একটি ধূলিকণা হারালে কী ক্ষতি তৎক্ষুণি!”

জাকারিয়া ইসহাক একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, যাঁর ধ্যানজ্ঞান হলো মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব বা ‘কেওস থিওরি’। তিনি জানেন, এই মহাবিশ্বে কোনো কিছুই আসলে বিচ্ছিন্ন বা তুচ্ছ নয়; প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্পন্দনের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক গভীর শৃঙ্খলা। এই সামান্য ধূলিকণা বা একটি পাতার ঝরে যাওয়াও সামগ্রিক মহাকর্ষীয় ও জাগতিক ভারসাম্যের অংশ। মহাবিশ্বের জটিল হিসাবগুলো বোঝার জন্য এই অতি ক্ষুদ্র চলকগুলোকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

সেই বিকেলেই শেষ ক্লাসটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাকারিয়া’র ল্যাবে এলেন জুলিয়া মোহসীন। জাকারিয়ার স্ত্রী জুলিয়া শিক্ষাবিদ হলেও একজন শৌখিন চিত্রশিল্পী এবং, যিনি ক্যানভাসে রঙের আঁচড়ে জীবনের গূঢ় মানে খোঁজেন। ল্যাবে ঢুকে তিনি দেখলেন জাকারিয়া খুব নিবিষ্ট মনে একটা থ্রি-ডি সিমুলেশন দেখছেন। কতক্ষণ চুপচাপ বসে
-কী এত মন দিয়ে দেখছো?
কথাটি বলেই জুলিয়া আলতো করে জাকারিয়ার কাঁধে হাত রাখলেন।

জাকারিয়া চশমাটা ঠিক করে জুলিয়ার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত দার্শনিক দীপ্তি।
-জুলিয়া, এই কবিতাটা দেখো। কবি এ কে সরকার শাওন সাহেব কী চমৎকার লিখেছেন। আমরা ভাবি একটা ধূলিকণা বা একটা শুকনো পাতার ঝরে যাওয়া কোনো বিষয় না। কিন্তু বাটারফ্লাই ইফেক্ট বলে, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র ঘটনাও ঠিক তেমন। পুরো শৃঙ্খলে একটা ছোট ফাটলও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

জুলিয়া মৃদু হেসে বললেন,
-তোমার মাথায় চব্বিশ ঘণ্টা বিজ্ঞানের পোকা ঘোরে। আজ আবার সাহিত্য যোগ হল।
এখন এসব রাখো তো। আজ জগলুল ভাইয়ের বাড়িতে আমাদের নিমন্ত্রণ, মনে আছে? সবাই অপেক্ষা করছে, চলো।

জগলুল হায়দার সাহেব শহরের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী স্থপতি। জাকারিয়া তাঁর শ্যালক। তাঁর নাজ ম্যানশনের বিশাল ড্রয়িংরুমে আজ এক ঘরোয়া আড্ডা বসেছে। জগলুল সাহেব সোফায় বসে আয়েশ করে পাইপ টানছেন। পাশে বসে আছেন জাকারিয়ার বোন নাজমা পারভীন। নাজমা সবসময়ই একটু গোছগাছ আর চিন্তিত স্বভাবের। তিনি জাকারিয়াকে দেখে একটু অনুযোগের সুরে বললেন,
-তুই তো আকাশ আর মহাকাশ নিয়েই থাকলি জ্যাকি। দরিকান্দিতে বা দেশের বাড়ির খবরাখবর কিছু কী রাখিস?

জগলুল সাহেব হেসেই উঠলেন,
-আরে নাজ, ও হলো আকাশগঙ্গার খবর রাখা বিজ্ঞানী। ওর কাছে একটা দেশের ধ্বংস হওয়া মানে তো মহাবিশ্বের এক কোণে সামান্য ধূলিকণা ওড়া। ও রাখবে বাড়ির খবর!

জাকারিয়া বিনীতভাবে হাসলেন,
-আসলে জগলুল ভাই, কবি শাওন সাহেবের কবিতাটা কিন্তু অন্য কথা বলে। একটি ধূলিকণা হারালে হয়তো তৎক্ষণাৎ কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু মহাজাগতিক ভারসাম্যে তার অভাব থেকেই যায়।

আড্ডার মাঝখানে যোগ দিল জগলুল সাহেবের বড় মেয়ে তৃষা। একটু পরেই ড্রয়িংরুমে ঢুকল তার ছোট বোন চঞ্চলা তৃতু। সে রান্নাঘর থেকে আমসত্ত্বের শরবত বানিয়েছে। প্রিয় ‘জ্যাকি মামা’কে নিজ হাতে খাওয়াবে বলে তৃতু কাঁপা হাতে সাবধানে এক গ্লাস শরবত নিয়ে আসছিল। ঠিক সেই সময় কার্পেটের একটা উল্টানো কোণে তার পা আটকে গেল। তৃতু সামলাতে পারল না; তার হাত থেকে গ্লাসটা ছিটকে পড়ল। শরবতের একটি ঝাপটা জগলুল সাহেবের টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইলের ওপর পড়লো।

ফাইলটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল মাস্টারপ্ল্যান। নকশাটি সম্পূর্ণ হাতে আঁকা এবং ডিজিটাল ব্যাকআপ নেওয়ার জন্য আজ রাতে কুরিয়ার করার কথা ছিল।

মুহূর্তের মধ্যে ড্রয়িংরুমের শান্ত পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। জগলুল সাহেব আর্তনাদ করে উঠলেন। কালিতে শরবত মিশে সব রেখা ও পরিমাপ অস্পষ্ট হয়ে গেছে। এই নকশাটির ওপর ভিত্তি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নির্ভর করছে।
-তৃতু! তুমি এটা কী করলে মা?

জগলুল সাহেবের চিৎকারে তৃতু ভয়ে কুঁকড়ে গেল। জুলিয়া দ্রুত টেবিল থেকে টিস্যু পেপার নিয়ে শরবতটা মুছে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর্ট পেপারের বিশেষ কালি শরবতের তরলে মিশে গিয়ে পুরো ড্রয়িংটা এক কদর্য রূপ নিল।

নাজমা পারভীন ভাই জাকারিয়ার দিকে অসহায়ভাবে তাকালেন। জাকারিয়া দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। তাঁর মাথায় তখন কবিতার সেই লাইনগুলো বাজছে
পান থেকে চুন খসলেই ক্ষণিক বিপর্যয়-বিপদ। এই এক গ্লাস শরবত পড়ে যাওয়াটা একটা ক্ষুদ্র ‘ধূলিকণা’র মতোই তুচ্ছ ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে শুরু করল। জাকারিয়া বললো
-আচ্ছা যা হবার হয়েছে দুলাভাই। আমি ডিনারের পর নকশার ফাইলটি নিয়ে যাচ্ছি। দেখি কী করতে পারি!

পরদিন সকালে জগলুল সাহেব সময়মতো নকশা পাঠাতে পারলেন না। বিনিয়োগকারীরা চুক্তি বাতিল করার হুমকি দিল। সেই বিশাল প্রকল্পের কাজ স্থগিত হওয়ার আশঙ্কায় শত শত ইঞ্জিনিয়ার আর হাজার হাজার শ্রমিকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। খবরের কাগজেও প্রজেক্টটি আটকে যেতে পারে এমন খবর চলে এল।

জাকারিয়া এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তিনি ল্যাবের অত্যাধুনিক থ্রি-ডি হাই-রেজোলিউশন স্ক্যানার এবং ইমেজ প্রোসেসিং এআই সফটওয়্যার ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। নষ্ট হয়ে যাওয়া নকশাটি ল্যাবে আনা হলো। কালির দাগের নিচ দিয়ে পেনসিলের যে সূক্ষ্ম কার্বন চাপ ছিল, জাকারিয়া তাঁর বিশেষ লেন্স ও স্ক্যানার দিয়ে তা ডিজিটাল স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুললেন।

এরপর শুরু হলো আসল লড়াই। টানা তিন দিন ও তিন রাত জাকারিয়া আর জুলিয়া ল্যাবেই কাটালেন। জাকারিয়া গাণিতিক মাপজোখ আর আর্কিটেকচারাল কো-অর্ডিনেটগুলো নিখুঁতভাবে লাইনে রূপান্তর করছিলেন, আর জুলিয়া তাঁর নিপুণ শিল্পীসত্তায় নষ্ট হয়ে যাওয়া রেখাগুলোকে ডিজিটাল স্ক্রিনে পুনর্নির্মাণ করছিলেন। বিজ্ঞান আর শিল্পের এই মেলবন্ধনে নকশাটি আবার প্রাণ ফিরে পেতে চললো।

সেদিন দিন সন্ধ্যায় জাকারিয়া তাঁর ল্যাবে কাজ করছিলেন। জুলিয়া এসে তাঁর পাশে বসলেন। তিনি বিমর্ষ কণ্ঠে বললেন,
-ভাবতে পারো জাকারিয়া? তৃতুর হাত থেকে সেই শরবত পড়া থেকে শুরু করে আজ প্রজেক্টটা প্রায় বন্ধের মুখে। এটাই কি তোমার বাটারফ্লাই ইফেক্ট?
জাকারিয়া শান্ত গলায় বললেন,
-হ্যাঁ জুলিয়া। আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি পরত একে অপরের সাথে যুক্ত।

ঠিক তখন নাজমা পারভীন ল্যাবে এলেন। তাঁর চোখে-মুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ। জাকারিয়া বোনের হাত ধরে আশ্বস্ত করে বললেন,
আপা, শান্ত হও। আমি জানি পান থেকে চুন খসলে বিপদ আসে, কিন্তু সেই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার বুদ্ধি আর শক্তিও মানুষের আছে। প্রতিটি মানুষই একেকটি ‘স্বতন্ত্র সম্পদ’। জগলুল ভাইয়ের নকশাটা প্রায় রিকভারি’র পথে। আজ বা কাল সম্পূর্ণ ওকে হয়ে যাবে।

৫ম দিন সকালে জাকারিয়া ও জুলিয়া জগলুল সাহেবের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। ল্যাপটপটি অন করে জগলুল সাহেবের সামনে ধরলেন জাকারিয়া।
-জগলুল ভাই, আপনার নকশা শুধু পুনরুদ্ধারই করা হয়নি, জুলিয়া আর আমি মিলে এর স্ট্রাকচারাল ব্যালেন্স আরও উন্নত করেছি। এটার ডিজিটাল কপি এখন পুরোপুরি তৈরি।
জগলুল সাহেব যেন মেঘের আড়ালে সূর্য দেখলেন। তাঁর চোখ আনন্দে ভিজে উঠল।

কয়েক বছর পর। বিমানবন্দরের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। জাকারিয়া আর জুলিয়া শহরের এক প্রান্তে নৌকায় বসে নদী তীরে সূর্যাস্ত দেখছেন। জুলিয়া ছবি তুললেন। পরে বললেন
-জ্যাকি, আজ আমার মনে হচ্ছে, আমি যখন ক্যানভাসে একটা ছোট বিন্দু দিই, সেটাও হয়তো কোথাও কোনো মহাজাগতিক কম্পন সৃষ্টি করে।

জাকারিয়া মাথা নাড়লেন।
অবশ্যই করে। সৃষ্টিকর্তা কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেন নাই। প্রতিটি ‘স্বতন্ত্র সম্পদ’ বা ‘স্বতন্ত্র মন্ত্র’ এই মহাবিশ্বের পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য। অথচ আমরা মানুষেরা সৃষ্টিকর্তার বিশালতা ও বৈচিত্র্যকে ভেদাভেদে সংকীর্ণ করে তুলি!

আকাশে তখন প্রথম তারাটা ফুটে উঠেছে। জুলিয়া গভীর তৃপ্তি নিয়ে কবি শাওন সাহেবের কবিতার শেষ অনুচ্ছেদটি আবার আওড়ালেন:

“আমার মন্ত্র সবই স্বতন্ত্র
সবই স্বতন্ত্র সম্পদ!
পান থেকে চুন খসলেই
ক্ষণিক বিপর্যয়-বিপদ।”

তিনি বুঝলেন, জাকারিয়ার হিসেবে সকল ক্ষুদ্র অস্তিত্বই আসলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ। বাটারফ্লাই ইফেক্ট শুধু বিপর্যয়ই আনে না, মানুষের মেধা, ধৈর্য আর ভালোবাসার ছোঁয়ায় তা নতুন সৃষ্টির পথও তৈরি করে।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক
শাওনাজ ভিলা
১৫ মে ২০২৬

পরে পড়বো
৭৬

মন্তব্য করুন