প্রসূন গোস্বামী

কবিতা - রক্তের প্রচ্ছদে লেখা এক দীর্ঘ ইশতাহার

প্রসূন গোস্বামী
শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ অন্যান্য কবিতা

আমি তোমাদের এই সাজানো দরবারে আর কোনো আরজি রাখব না,
কারণ তোমাদের দাঁড়িপাল্লায় শুধু জং ধরা লোহার হিসেব মেলে।

তোমাদের ঠান্ডা ঘরে যে আইনের কঙ্কাল বসে আছে নিথর,
সে কখনো কোনো হারানো প্রাণের ভাষা বুঝতে শেখেনি।

তোমরা বিচার করতে পারবে না— এই ধ্রুব সত্য আমি জানি,
তোমাদের মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে কেবল আপসের নোংরা চোরাবালি।

যে আঁধার আমার ঘরকে গ্রাস করেছে অতর্কিতে,
সেখানে তোমাদের ওই ঠুনকো মোমবাতির আলো পৌঁছায় না কখনো।

আমার বুকের ভেতর যে শূন্যতার গভীর এক মহাসমুদ্র,
সেখানে জোয়ার এনে আমার মেয়েকে আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না কেউ।

সে আর ফিরবে না এই চেনা উঠোনে, এই বুনো ঘাসের গালিচায়,
সে হারিয়ে গেছে তোমাদের এই হিংস্র, শ্বাপদসংকুল লোকালয়ে।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখি তোমাদের কোনো নজির নেই,
তোমাদের কোনো বিচারের দলিলে ন্যায়ের কোনো স্বাক্ষর নেই।

তোমাদের এই ক্ষোভ, এই মোমবাতি মিছিল, এই ফেস্টুনের আস্ফালন,
এ তো বড়োজোর পনেরোটা দিনের এক চটকদার তামাশা মাত্র।

পনেরো দিন পর এই রাজপথ আবার সটান ভুলে যাবে সব রক্তের দাগ,
চায়ের কাপে ঝড় তুলে মানুষ মেতে উঠবে অন্য কোনো উৎসবে।

তারপর ঠিক কোনো এক গোধূলি বেলায় আবার ঘটবে নতুন এক নির্মমতা,
আবার কোনো এক কড়া নাড়বে মৃত্যুর চেনা হাহাকার।

নতুন কোনো লাশের গন্ধে বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠবে যখন,
পুরোনো এই ক্ষত ঢাকা পড়ে যাবে এক পশলা নতুন কান্নায়।

তোমাদের ফাইলের নিচে, সস্তায় কেনা কাগজের স্তূপের আড়ালে,
আমার মেয়ের আর্তনাদ ধামাচাপা পড়ে যাবে চিরতরে।

এই হিংস্র জনপদে মানুষের চামড়া পরে ঘোরে যে বুনো পশুরা,
তাদের নখের আঁচড়ে প্রতিদিন ছিন্নভিন্ন হয় একটা করে স্বপ্ন।

তোমরা মেকি সভ্যতার মুখোশ পরে বসে থাকো সিংহাসনে,
অথচ তোমাদের আঙুল ছুঁয়ে চুইয়ে পড়ে শোষণের কালচে পুঁজ।

আমি তাই কোনো রাজসাক্ষী হতে আসিনি তোমাদের এই ভাঙা মঞ্চে,
আমি কোনো ভিক্ষা চাই না তোমাদের এই করুণার থালা পেতে।

তোমাদের আইন তো আসলে এক অন্ধ জাদুকরের তাসের খেলা,
যেখানে জেতার আগেই ঠিক হয়ে থাকে কার গলায় উঠবে ফাঁসি।

আমার মেয়ের নিথর চোখের মণি যে প্রশ্ন রেখে গেছে বাতাসে,
তোমাদের কোনো সাজানো ধারা বা উপধারায় তার উত্তর লেখা নেই।

পনেরোটা দিন তোমরা হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় দেখাবে শোকের নাটক,
বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে বিক্রি হবে একটা পরিবারের নিদারুণ কান্না।

উত্তাল স্লোগানেরা ক্লান্ত হয়ে একদিন ফিরে যাবে নিজের নিজের ঘরে,
আর আমার ঘরটা অন্ধকারই রয়ে যাবে, ঠিক এক ফালি শ্মশানের মতো।

আবার কোনো এক গলির মোড়ে ওত পেতে থাকবে হিংস্র শ্বাপদের দল,
আবার কোনো এক মায়ের কোল খালি করে মেতে উঠবে উল্লাসে।

নতুন কোনো ঘটনার চাদরে ঢেকে দেওয়া হবে এই পুরোনো অধ্যায়,
শাসকের কলম আবার নতুন করে লিখবে এক মিথ্যে আশ্বাসের গল্প।

তোমাদের এই মেকি সমাজ, এই পচে যাওয়া নিয়মের বেড়াজাল,
এ তো আসলে অপরাধীর পিঠ চাপড়ে দেওয়ার এক গোপন আস্তানা।

আমি বিচার চাই না, কারণ বিচারের নামে তোমরা শুধু প্রহসন জানো,
তোমরা টেবিলের তলা দিয়ে হাতবদল করো রক্তের নিখুঁত খতিয়ান।

যে হিংস্রতা গ্রাস করেছে এই সবুজ বদ্বীপের প্রতিটি কোণ,
তার সামনে দাঁড়িয়ে তোমাদের আদালত এক ঠুনকো তাসের ঘর।

পনেরো দিনের এই মেকি সহানুভূতির মেয়াদ শেষ হলে পরেই,
সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজের নিজের আখের গোছানোর লড়াইয়ে।

স্মৃতির পাতা থেকে মুছে যাবে একটা ফুটফুটে মেয়ের হাসিমুখ,
ধুলোর আস্তরণ জমবে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের নথিপত্রে।

সব ধামাচাপা পড়ে যাবে, যেমন করে পড়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে,
ক্ষমতার চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে যাবে আরও শত শত আর্তনাদ।

আমি এই বধির শহরের বুকে দাঁড়িয়ে শুধু ধিক্কার দিয়ে গেলাম,
আমি তোমাদের এই সভ্যতার কপালে এঁকে দিয়ে গেলাম এক তীব্র ঘৃণা।

যে মেয়ে আর ফিরবে না, তার পবিত্র স্মৃতির শপথ নিয়ে বলছি,
তোমাদের এই কলঙ্কিত হাত কোনোদিন ধুয়ে সাফ করতে পারবে না এই পাপ।

বিচারহীনতার এই বুনো উল্লাসে তোমরা মেতে থাকো অন্ধের মতো,
আমি শুধু রেখে গেলাম এক জ্বলন্ত ক্ষোভের অবিনাশী ইশতাহার।

পরে পড়বো
১৪

মন্তব্য করুন