চরিত্র---
রৌনক — ১৯৭১-এর হিন্দু উদ্বাস্তু তরুণ।
আসিফা — মুসলিম পরিবারের মেয়ে।
আসিফার বাবা — কণ্ঠস্বর।
রৌনকের মা — স্মৃতির কণ্ঠ।
কয়েকটি জনতার কণ্ঠ — প্রয়োজনে অফ-স্টেজ।
দৃশ্য এক
১৯৭১ : একটি রাত
(অন্ধকার। দূরে গুলির শব্দ। মানুষের ছুটে চলা। আগুনের গর্জন।)
মা : রৌনক! দৌড়!
রৌনক : মা! তুমি কোথায়?
মা : পিছনে তাকাস না!
রৌনক : বাবা?
মা : তুই শুধু বাঁচ!
রৌনক : তোমাকে ছেড়ে যাব?
মা : আজ যদি তুই বাঁচিস, তাহলে আমারও একটা অংশ বেঁচে থাকবে।
(প্রচণ্ড শব্দ।)
রৌনক : মা!
মা!
(নীরবতা। তারপর নদীর স্রোত। হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়।)
রৌনক :---
সেই রাতে আমি দৌড়েছিলাম।
কোনও দেশের দিকে নয়।
শুধু মৃত্যুর বিপরীত দিকে।
পেছনে ছিল আমার বাড়ি।
আমার মা।
আমার বাবা।
আমার শৈশব।
সামনে ছিল একটা নদী।
আর নদীর ওপারে—
একটা অচেনা দেশ।
[নদী পার হওয়ার শব্দ।]
আমি জানতাম না,
সীমান্ত পার হলে
মানুষের দুঃখও কি সীমান্ত পার হয়?
পরে বুঝেছিলাম—
হয়।
শুধু দুঃখের কোনও কাঁটাতার নেই।
দৃশ্য দুই
আশ্রয়
(ভোর। পাখির ডাক। দূরে আজানের ক্ষীণ ধ্বনি।)
আসিফার বাবা : কে ওখানে?
রৌনক : জল ...
একটু জল ...
আসিফার বাবা : তুমি কে?
রৌনক : রৌনক।
আসিফার বাবা : কোথা থেকে?
রৌনক : ওপার থেকে।
আসিফার বাবা : বাড়ি?
রৌনক : নেই।
আসিফার বাবা : পরিবার?
(নীরবতা।)
রৌনক : নেই
আসিফার বাবা : ধর্ম?
(রৌনক তাকিয়ে থাকে।)
রৌনক : হিন্দু।
আসিফার বাবা : তাই?
রৌনক : আপনি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন?
আসিফার বাবা : ক্ষুধার কোনও ধর্ম হয়?
রৌনক : জানি না।
আসিফার বাবা : -- আমিও জানি না।
তবে আজ থেকে
তুই আমার বাড়িতে থাকবি।
রৌনক : কিন্তু আমি...
আসিফার বাবা : তোর নাম রৌনক।
এইটুকুই আজ যথেষ্ট।
(
দূরে আজানের শেষ ধ্বনি।)
দৃশ্য তিন----
প্রথম দেখা
[দু
(দুপুর। উঠোন। পাখির ডাক।)
আসিফা : আপনি রৌনক?
রৌনক : হ্যাঁ।
আসিফা : আব্বা বলেছেন, আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
রৌনক : কিছুদিন।
আসিফা : কতদিন?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : আপনার বাড়ি কোথায়?
রৌনক : ছিল।
আসিফা : এখন?
রৌনক : নদীর ওপারে।
আসিফা : ফিরে যাবেন?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : আপনি সব প্রশ্নের উত্তরে “জানি না” বলেন?
রৌনক : সব উত্তর হারিয়ে ফেলেছি।
আসিফা : তাহলে একটা সহজ প্রশ্ন করি।
রৌনক : করুন।
আসিফা : আপনি হাসতে পারেন?
রৌনক : পারি।
আসিফা : প্রমাণ?
(আসিফা হালকা হাসে।
রৌনক : আপনি অদ্ভুত।
আসিফা : আর আপনি খুব দুঃখী।
দৃশ্য চার-----
ধীরে ধীরে
(নদীর ধারে বিকেল।
আসিফা : তুমি নদীর দিকে এত তাকিয়ে থাকো কেন?
রৌনক : ওটা আমার বাড়ির দিক।
আসিফা : নদীর ওপারে?
রৌনক : হ্যাঁ।
আসিফা : তুমি কি তোমার বাড়িকে এখনও ভালোবাসো?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : মানুষ কি নিজের মৃত বাড়িকেও ভালোবাসে?
রৌনক : হয়তো।
আসিফা : তাহলে তুমি আমাকে কখনও ভালোবাসতে পারবে না।
রৌনক : কেন?
আসিফা : তোমার ভিতর তো এখনও একটা বাড়ি বেঁচে আছে।
রৌনক : তুমি কি আমার ভিতরে ঢুকতে চাও?
আসিফা : ভয় হয়।
রৌনক : কেন?
আসিফা : যদি দেখি সেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপ?
রৌনক : আর যদি একটা মানুষ থাকে?
আসিফা : তাহলে তাকে বাঁচাব।
(দীর্ঘ নীরবতা।)
দৃশ্য পাঁচ----
প্রেম
(বৃষ্টি। টিনের চালের উপর টুপটাপ শব্দ।)
আসিফা : তুমি আজ সারাদিন কিছু খাওনি।
রৌনক : ক্ষুধা নেই।
আসিফা : মিথ্যে।
রৌনক : তুমি সব বুঝে ফেলো কীভাবে?
আসিফা : তোমার চোখ কথা বলে।
রৌনক : আমার চোখে কী দেখো?
আসিফা : একটা ছেলে।
রৌনক : ছেলে?
আসিফা : যে এখনও তার মাকে খুঁজছে।
রৌনক : আর তুমি?
আসিফা : আমি?
রৌনক : তুমি আমাকে কী খুঁজে পাও?
আসিফা : একজন মানুষ।
রৌনক : শুধু মানুষ?
আসিফা : তার বেশি কিছু বললে তুমি ভয় পাবে।
রৌনক : বলো।
আসিফা : ভালোবাসি।
(দীর্ঘ নীরবতা।)
রৌনক : আসিফা...
আমি তোমাকে ভালোবাসতে ভয় পাই।
আসিফা : কেন?
রৌনক : কারণ যাদের ভালোবেসেছি, সবাইকে হারিয়েছি।
আসিফা : আমাকে হারানোর ভয়েই কি আমাকে ভালোবাসবে না?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : আবার জানি না!
(মৃদু হাসি।)
আসিফা : এবার উত্তরটা আমি জানি।
তুমি আমাকে ভালোবাসো।
----দৃশ্য ছয়----
ধর্মের ছায়া
=দূরে আজান। তারপর কিছুক্ষণ পর মন্দিরের ঘণ্টা।)
রৌনক : শুনছ?
আসিফা : হ্যাঁ
রৌনক : কখনও মনে হয় এই দুই শব্দের মাঝখানে
আমাদের ভালোবাসাটা দাঁড়িয়ে আছে।
আসিফা : তুমি ধর্মকে ভয় পাও?
রৌনক : ধর্মকে নয়।
ধর্মের নামে মানুষকে।
আসিফা : তুমি হিন্দু।
রৌনক : জানি।
আসিফা : আমি মুসলমান।
রৌনক : জানি।
আসিফা : তবু?
রৌনক : তবু তোমাকে ভালোবাসি।
আসিফা : একদিন যদি এই “তবু”টাই আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়?
রৌনক : আমি লড়ব।
আসিফা : কার বিরুদ্ধে?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : নিজের বিরুদ্ধে আগে লড়ো।
রৌনক : কী বলতে চাইছ।
আসিফা : তুমি এখনও ভাবো,
আমাদের ভালোবাসা তোমার কাছে একটা ঋণ।
আমার আব্বা তোমাকে আশ্রয় দিয়েছেন।
তুমি আমাদের কাছে ঋণী।
তাই হয়তো আমাকে ভালোবাসাটাও
তোমার কাছে একটা প্রতিদান।
রৌনক : না!
আসিফা : তাহলে প্রমাণ করো।
আমাকে ঋণ নয়—
স্বাধীনতা হিসেবে ভালোবাসো।
(নীরবতা।)
দৃশ্য সাত----
পিতার আপত্তি
)রাত। ঘরের ভিতর উত্তেজনা।)
আসিফার বাবা : রৌনক।
রৌনক : জি।
আসিফার বাবা : তুই আমার ঘরে আশ্রয় পেয়েছিলি।
রৌনক : জানি।
আসিফার বাবা : আমি তোর ধর্ম জিজ্ঞেস করেছিলাম।
রৌনক : তবু আশ্রয় দিয়েছিলেন।
আসিফার বাবা : কারণ তখন তুই শুধু একটা ছেলে ছিলি।
রৌনক : এখন?
আসিফার বাবা : এখন তুই আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাস।
রৌনক : হ্যাঁ।
আসিফার বাবা : এটা সহজ নয়।
রৌনক : জানি।
আসিফার বাবা : সমাজ মানবে না।
রৌনক : সমাজ কি ১৯৭১-এ আমাকে বাঁচিয়েছিল?
আসিফার বাবা : না।
রৌনক : তাহলে আজ সমাজ আমার জীবন ঠিক করবে কেন?
আসিফার বাবা : কারণ আমি শুধু বাবা নই।
আমি এই সমাজের মানুষও।
রৌনক : আর মানুষ হিসেবে?
(নীরবতা।)
আসিফার বাবা : মানুষ হিসেবে
আমি তোকে আজও ভালোবাসি।
রৌনক : তাহলে?
আসিফার বাবা : মানুষ অনেক সময়
নিজের ভালোবাসার কাছেই হেরে যায়।
দৃশ্য আট---
সিদ্ধান্ত
(নদীর ধারে রাত।)
আসিফা : আব্বা না বলেছেন।
রৌনক : জানি।
আসিফা : তুমি কী করবে?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : আবার?
রৌনক : এবার সত্যিই জানি না।
আমি একবার দেশ ছেড়েছি।
একবার পরিবার হারিয়েছি।
আমি আর কাউকে হারাতে চাই না।
আসিফা : তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও।
রৌনক : কী?
আসিফা : যদি ভয় পাও।
রৌনক : তুমি কি আমাকে ছেড়ে দিতে পারবে?
আসিফা : না।
রৌনক : তাহলে?
আসিফা : তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে।
আমাকে বেছে নিলে
আমার ধর্মটাকেও ভালোবাসতে হবে।
আমার পরিবারকে।
আমার ভয়কে।
আমার অসম্মতিগুলোকে।
আমাকে শুধু একজন নারী হিসেবে ভালোবাসলে হবে না।
আমাকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে নিতে হবে।
রৌনক : আর তুমি?
আসিফা : তোমার ১৯৭১-কে আমি মেনে নেব।
তোমার মৃত মাকে।
তোমার হারানো বাড়িকে।
তোমার ভয়কে।
কিন্তু একটা শর্ত আছে।
রৌনক : কী?
আসিফা : আমাকে তোমার অতীতের ছায়া বানাবে না।
---দৃশ্য নয়--=
বিবাহ ও সংসার
(শান্ত সুর। সময় অতিক্রমের অনুভূতি। তারপর শিশুর ক্ষীণ কান্না।)
আসিফা : রৌনক...
রৌনক : হুম?
আসিফা : আমাদের ছেলে হয়েছে।
রৌনক : ছেলে?
আসিফা : হ্যাঁ।
রৌনক : ওকে কী দেব আমরা?
আসিফা : কী দিতে চাও?
রৌনক : একটা পৃথিবী, যেখানে ওকে
নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হবে না।
আসিফা : সেটা আমরা দিতে পারব?
রৌনক : জানি না।
আসিফা : তুমি আবার “জানি না” বললে?
রৌনক : এবার সত্যিই জানি না।
আসিফা : তবে একটা জিনিস দিতে পারি।
রৌনক : কী?
আসিফা : ওকে শেখাব—
মানুষের নামের আগে
ধর্ম বসে না।
--দৃশ্য দশ
ফাটল
(রাত। শিশুর ঘুমন্ত শ্বাস।)
আসিফা : তুমি আজ আবার ওখানে গিয়েছিলে?
রৌনক : হ্যাঁ, আমার পূর্ব পুরুষের ভিটের কাছে?
আসিফা : হ্যাঁ।
রৌনক : হ্যাঁ।
আসিফা : কেন?
রৌনক : পুরোনো কিছু জিনিস আনতে।
আসিফা : কী জিনিস?
রৌনক : মায়ের স্মৃতি।
আসিফা : তোমার মা আমার শত্রু নন, রৌনক।
রৌনক : আমি তা বলিনি।
আসিফা : কিন্তু তুমি কখনও আমাকে তাঁর পাশে দাঁড় করাওনি।
রৌনক : তুমি কী চাও?
আসিফা : তোমার কাছে জায়গা।
রৌনক : তুমি তো আমার জীবনের সবটা।
আসিফা : না।
তোমার জীবনের একটা ঘর।
তোমার ভেতরে আরেকটা ঘর আছে।
সেখানে আমি ঢুকতে পারি না।
রৌনক : সেখানে মৃত্যু আছে।
আসিফা : আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না।
তোমার দরজা বন্ধ করে রাখা
জীবনটাকে ভয় পাই।
---দৃশ্য এগারো---
চলে যাওয়া
(ভোর। পাখির ডাক। ব্যাগ গোছানোর শব্দ।)
আসিফা : সত্যিই যাবে?
রৌনক : হ্যাঁ।
আসিফা : কেন?
রৌনক : আমি নিজেকে খুঁজতে।
আসিফা : নিজেকে?
রৌনক : এত বছর ধরে আমি
কখনও উদ্বাস্তু,
কখনও হিন্দু,
কখনও তোমার স্বামী,
কখনও কারও আশ্রিত।
আমি রৌনক কোথায়?
আসিফা : আমার কাছে।
রৌনক : তুমি কি আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসো?
আসিফা : হ্যাঁ।
রৌনক : তাহলে আমাকে যেতে দাও
আসিফা : যাও।
(বিরতি।)
কিন্তু একটা কথা মনে রেখো।
তুমি আবার সীমান্ত পার হচ্ছ।
এইবার নদী নেই।
কাঁটাতার নেই।
শুধু তুমি নিজে আছ।
রৌনক : তুমি আমাকে ক্ষমা করবে?
আসিফা : জানি না।
রৌনক : তুমিও “জানি না”?
আসিফা : তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।
(দরজা বন্ধ।)
দৃশ্য বারো--
বহু বছর পরে
(বৃদ্ধ রৌনকের ধীর শ্বাস। পুরোনো বাক্স খোলার শব্দ।)
রৌনক :
কত বছর হয়ে গেল...
আসিফা।
তুমি কি এখনও নদীর ধারে যাও?
আমি যাই।
প্রতিদিন।
তুমি একদিন বলেছিলে—
“তুমি এখনও বেঁচে নেই।”
তুমি ঠিক বলেছিলে।
আমি বেঁচেছিলাম।
কিন্তু আমার একটা অংশ
সেই রাতেই থেমে গিয়েছিল।
(কাগজের শব্দ।)
আজ পুরোনো বাক্স খুলতে গিয়ে
একটা ছবি পেলাম।
=দীর্ঘ বিরতি।)
ছবিতে—
আমি।
তুমি।
আর তোমার বাবা।
পেছনে আমাদের সেই উঠোন।
তারিখ—
১৯৭১।
(নীরবতা।)
ছবিটা উল্টে দেখি
তোমার হাতের লেখা।
“যেদিন সবাই তোমাকে ধর্ম দিয়ে চিনেছিল,
সেদিন আমার বাবা তোমাকে
ক্ষুধার্ত মানুষ বলে চিনেছিলেন।”
( রৌনকের শ্বাস ভারী হয়।)
আর নিচে—
“আমাকে যদি কোনওদিন ভুলেও যাও,
এই কথাটা ভুলে যেও না।”
(নীরবতা।)
আমি তোমাকে ভুলিনি, আসিফা।
আমি শুধু
নিজেকে খুঁজতে গিয়ে
তোমাকে হারিয়েছিলাম।
দৃশ্য তেরো---
শেষ প্রত্যাবর্তন--
(বহু বছর পরের একটি পুরোনো বাড়ি। বাতাস। ভাঙা দরজার শব্দ।)
রৌনক :
এখানেই ছিল?
হ্যাঁ...
এই উঠোনেই।
(মাটিতে কিছু সরানোর শব্দ।)
এটা কী?
টিনের বাক্স?
(বাক্স খোলে।)
একটা কাপড়...
[দীর্ঘ নীরবতা।]
এই কাপড়টা...
এটা মায়ের শাড়ি।
(রৌনকের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।)
এটা এখানে এল কীভাবে?
(আসিফার স্মৃতির কণ্ঠ ধীরে ভেসে ওঠে।)
আসিফা :
তোমার বাবা-মা যখন হারিয়ে গেলেন,
তখন তোমার কাছে কিছুই ছিল না।
আমার বাবা
তোমার গ্রামের একজনের কাছ থেকে
এই কাপড়ের টুকরোটা পেয়েছিলেন।
তিনি রেখে দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন—
“ছেলেটা যদি কোনওদিন ফিরে আসে,
তাকে তার অতীতটা ফিরিয়ে দেব।”
( নীরবতা।)
রৌনক :
আব্বা...
আপনি আমাকে শুধু আশ্রয় দেননি।
আমার হারানো মাকেও
এত বছর আগলে রেখেছিলেন।
(আসিফার কণ্ঠ।)
আসিফা :
রৌনক...
রৌনক :
আসিফা?
আসিফা :
মানুষকে ধর্ম দিয়ে চিনতে শিখো না।
ধর্ম দিয়ে মানুষকে হারানোর ইতিহাস
তোমার নিজের শরীরেই লেখা আছে।
রৌনক :
তুমি কোথায়?
আসিফা :
যেখানে তুমি আমাকে রেখে গিয়েছিলে।
তোমার ভিতরে।
(নদীর শব্দ শুরু।)
দৃশ্য চৌদ্দ
রৌনক :
১৯৭১-এ আমি একটি দেশ হারিয়েছিলাম।
তারপর ভাবতাম—
সীমান্তটা নদীর ওপারে।
আজ বুঝলাম—
সীমান্তটা ছিল আমার ভিতরে।
একদিকে আমার ধর্ম।
অন্যদিকে তোমার ধর্ম।
একদিকে আমার অতীত।
অন্যদিকে তোমার বর্তমান।
একদিকে আমার ভয়।
অন্যদিকে তোমার ভালোবাসা।
আমি সারাজীবন
সীমান্তের এক পাশ থেকে
অন্য পাশে যেতে চেয়েছি।
কিন্তু কোথাও পৌঁছাইনি।
আজ বুঝলাম—
সীমানা পার হতে হয় না।
সীমানার ওপারে দাঁড়াতে হয়।
যেখানে মানুষ
হিন্দু হওয়ার আগে মানুষ।
মুসলমান হওয়ার আগে মানুষ।
যেখানে আশ্রয়দাতা
ধর্ম দিয়ে নয়,
ক্ষুধার্ত চোখ দিয়ে
একজন উদ্বাস্তু ছেলেকে চেনে।
যেখানে ভালোবাসা
ধর্ম বদলায় না—
মানুষের ভিতরটা বদলে দেয়।
(দীর্ঘ নীরবতা।)
আসিফা...
তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?
(দূরে আজান। খুব ক্ষীণভাবে মন্দিরের ঘণ্টা। তারপর দুটোই মিলিয়ে যায়। শুধু নদী।)
আজ আর কোনও শব্দ চাই না।
শুধু নদী থাক।
কারণ নদী জানে—
দুই তীর কখনও এক হয় না।
তবু—
একই জলের মধ্যে
দুই তীরের আকাশ প্রতিদিন
মিশে থাকে।
(দুজনে সমস্বরে )
সেদিন মানুষ আবার মানুষ হবে...
(দীর্ঘ নীরবতা। নদীর স্রোত ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।)
— সমাপ্ত
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
তসলিমা নাসরিন
শুভ জন্মদিন! 🎈
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
প্রবর রিপন নিয়ে আমার কিছু বলার নাই তার মতো আর কেউ...
আরো দেখুন
pabel
লেখক:
প্রবর রিপন
কবি, আপনার সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইল। 🙏🌿
আরো দেখুন
নূর মোহাম্মদ কল্পকবি
লেখক:
স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী