তৃষা ওর ছবির দ্বিতীয় ভাগটা করলো না। হঠকারী মহিলা ও। ওর দ্বিতীয় ভাগটা করলে আমার অভিনয় জগতে পা রাখা হয়ে যেতো। ওর দ্বিতীয় ভাগটা করা খরচ আমি দেবো বলেছিলাম কিন্তু দিইনি, কারণ ওর সাথে ওর ক্যামেরা ম্যান ছেলেটার ঘনিষ্ঠতা আমি ভালো চোখে দেখিনি।
তাছাড়া প্রিয়া সাথেও আমার একটা ভুল বোঝাবুঝি হলো ওর জন্য তাই ওর সাথে সম্পর্কে দাঁড়ি ফেলে দিলাম। নয়তো জেন এক্স দের জন্য ভালো বার্তা ছিলো এই ছবিতে। তারপর সংস্কৃতিক জীবন থেকে পলাতক হলাম কিছুদিনের জন্য।ওর সাথে আমার মুল লাড়াই ছিলো অন্য জায়গায় আমি বলতাম সফলতা অর্জন করতে সময় লাগে, ও বলতো টাকা লাগে।
বেসমেন্ট থেকে একটা হাইরাইজ এর টপ ফ্লোরে পৌঁছতে হলে একের পর এক ধাপ পেরোতে হয়। কিন্তু সফলতার এভারেস্ট পৌঁছে পিক সাবমিটের ঠিক আগের রাতটা বোধহয় সবচেয়ে অদ্ভুত—কারণ তখন স্বপ্নটা আর দূরের কোনো পাহাড় নয়, চোখের সামনে মাত্র ২০০–৩০০ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ সেই শেষ কয়েকশো ফুটই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন পথ।
আজ আমার কাছে ঠিক তেমনই এক রাত।
আগামীকাল ফার্স্ট আওয়ারেই আমাকে যেতে হবে সেই জায়গায়। সেখানে যদি সফল হই, তাহলে হয়তো পিক সাবমিটের মতোই নিজের পতাকা ওড়াব। নিজের একটা চিহ্ন রেখে আসব আমার লক্ষ্যের চূড়ায়।
জানি না, আগামীকালের সেই মিটিংয়ের পর কী অপেক্ষা করছে। ফলাফল কী হবে, সেটাও জানি না। কিন্তু একটা জিনিস জানি—যাই হোক না কেন, আমি ছেড়ে দেব না।
নিজের শরীরের শেষটুকু সামর্থ্য, মনের সমস্ত জেদ আর এতদিনের পরিশ্রম সঙ্গে নিয়ে সেই চূড়াটা ছোঁয়ার চেষ্টা করব। যদি এবার না পারি, আবার প্রথম ধাপ থেকে শুরু করব। আবার উঠব। আবার লড়ব।
কারণ কিছু স্বপ্ন শুধু দেখার জন্য আসে না—তাদের কাছে পৌঁছনোর জন্য লড়াই করতে হয়।
আজ তাই আমার স্বপ্নকে ছোঁয়ার লড়াইয়ের আগের রাত।একটা দীর্ঘ অপেক্ষার রাত।
আর আগামীকাল—হয়তো সেই চূড়ার আরও একটু কাছে পৌঁছনোর দিন।
আজ সন্ধার ফোন ধরি নি অথচ ও আমার সফলতার একটি ধাপ। সেই দিন বৃন্দাবন থেকে সবে ফিরেছি। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো স্বভাবটা আমার পুরাতন। সন্ধার হঠাৎ করেই ফোন করেছিলো। ওর অসুস্থ বাবার জন্য এক বোতল রক্তের প্রয়োজন। ব্যবস্থা করলাম। আর সেই থেকে ওদের বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পেলাম।
নামে তালপুকুর কিন্তু এখন ওদের ঘটি ডোবে না। ও পড়াশোনা ভালো। ও বাড়ির এক মেয়ে,ভালো একটা চাকরি করতো। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে বাবা বিছানায় । তাই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। আসলে কোন একদিন ওদের কোন পরিচিত, ওদের অনুপস্থিততে ওদের বাড়িতে ঢুকে ওর মাকে অজ্ঞান করে, সব গহনা আর টাকা পয়সা চুরি করে নেয় সেই সময় ওর মা অসুস্থ হলো। ওর একে একে পর এক জমি বিক্রি করতে হলো ওদের।
অবস্থা খারাপ হচ্ছে খবর পেয়ে ওর বাগদত্তা ওর জীবন থেকে পলাতক হলো। এরপরে ওর বাবার হার্ট অ্যাটাক, তারপর বিছানা শয্যা নিলো। প্রায় নিস্ব করে ওর বাবা গত হলেন।এই সময় ওর পাশে ওর নিকট আত্মীয়রা ছিলোনা। না কিন্তু আমি ছিলাম। তাই একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো। ওর মা অসুস্থ। তাই বাধ্য হয়ে কোন স্থায়ী কাজ না গিয়ে ও রাজনীতি যোগ দিয়েছিলো। কিন্তু রাজ্য ক্ষমতা পরিবর্তন হলো। সবাই দল বদলালেও ও পারলো না। কারণ ওকে সবাই চেনে। এই চেনাশোনা কাজে লাগিয়ে আজ ক্ষমতা থাকা দলের কিছু রাজ্য নেতৃত্ব সাথে বৈঠক।
প্রায় তিরিশ বছর সাহিত্য সাধনায় যুক্ত, সংবাদিকতার কাজ করেছি, সমাজ সেবা মুলক কাজ করেছি। বামজমনায় শেষ দিকে চাকরি দিতে চেয়েছিল কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী বর্ষীয়ান নেতা মন্ত্রী, চাকরি নিয়নি কারণ সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম ইস্যুতে আন্দোলনের একজন কর্মকর্তা ছিলাম আমি। এদিকে এই আন্দোলন হাইজ্যাক করে ক্ষমতায় এলো তৃনমুল। ওরা একটা চাকরি দিতে চেয়েছিল কিন্তু নিইনি কারণ চাকরি নেওয়াটা আমার কাছে ছিলো অপমানের। এই কারণে নীলাঞ্জনাও চলে গেলো। আজ একটা বড় সুযোগ।
কিন্তু বৈঠক পর হতাশ হলাম। বিদেশ চাকরি করেছি কিছুদিন। একটা ছোটখাটো ব্যাবসা আছে। তাই একটি মন্দির করে দেবার বিনিময়ে টিকিট দেবে আমাকে ওরা। সন্ধার মা নাকি ঐ জমিটা দিছেন। কিন্তু সন্ধার সাথে সম্পর্কে তৈরি হবার আগে আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে, বৃন্দাবনে একটি আশ্রম তৈরি করেছি। ওখানে গো সেবার জন্য যা ভিক্ষা পাই তা দিয়ে আমার চলে যায়। আর আমি সন্ধার কে বিয়ে করে ওখানে নিয়ে যাবো ঠিক করেছি। সুতরাং মন্দির করে দেবার টাকা আমি পাই কোথায়??
তাই মানে মানে ঐ সংগঠনের অফিস থেকে পলাতক হলাম। কিন্তু সব সময় পলায়ন করা আমাদের হাতে থাকে না। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে নিয়ে চলেন আরো এক বর্ষীয়ান নেতার বাড়ি। বাড়িটা আমার চেনা কিন্তু এখন আরো অভিজাত হয়েছে বাড়িটা। বাড়ি মালিক আমার চেনা গুরু গম্ভীর ভাষায় জিজ্ঞাসা করলেন। " এতো ভালো প্রস্তাব হাতছাড়া করছো কেন? তুমি তো আবার সমাজ সেবী, মানুষের সেবা করতে ভালোবাসো।"
আমি কিছুটা চুপ করে থেকে বললাম " রাজনৈতিক মঞ্চে আমাদের জন্য নয়, সমাজ সেবা করতে নির্বাচন জিতে হয় এমন কথা নেই।"
উনি বললেন " কমবেশি ত্রিশ বছর আগেই বোধহয় তোমার সাথে আমার এ ঘরেই কথা হয়েছিল। তোমার স্বভাবটা বদলাবার না। সেইদিন তুমি লড়াইএর ময়দান থেকে পালিয়েছিল। মনে পড়ে? "
আমি বললাম " পলাতক আমাকে আপনি বলেছেন ঠিকই কিন্তু আমি দৃষ্টিকোণ আলাদা, বামন হয়ে চাঁদ হাত দেবার চেষ্টা করা উচিত নয়।"
উনি কিছু বলার আগেই দাদু বলেন " আমার বাবা মা ডাইরেক্ট একসান ডে-তে মারা গেছিল, আমার তখন দাদার তখন নয় বছর বয়স , আমি তিন আমার গায়ে রক্ত মাখিয়ে দিলো দাদা, আমার মুখ চেপে লাশ মতো শুয়ে ছিলাম। আত্মীয়হীন এ শহরে বেঁচে ছিলাম, ফুটপাত থেকে ব্যবসা শুরু করে ব্যবসা দাঁড়িয়ে করেছিলাম। তোমাকে তো দিদিভাই ভালোবাসাতো , আমরা তোমাকে মেনে নিয়েছিলাম। ও শুধু বলেছিলো তোমার বাবা যা আয় করে তা থেকে আমাদের চাকরবাকরদের মাইনে দিয়ে থাকি। তোমার কাছে সময় ছিলো নিজে দাঁড় করানোর, তুমি কলেজ ড্রপ করে কোথায় হারিয়ে গেলে? জীবনে সংগ্রাম কোন দিন করলে না। বলতো তুমি অনেক সুযোগ পেয়েছো কিন্তু সফল হলে না কেন?"
আমি বললাম " আমি সফল আমার যোগ্যতা অনুযায়ী আমি যা পেয়েছি তাতে জীবন নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই।"
উনি বলেন " রাসেকেল, তোমার অভিযোগ নেই ঠিক আছে কিন্তু আমার আছে। তুমি কলেজ ড্রপ করলে, কিন্তু সোনাই ভাবলো আমি প্রভাব খাটিয়ে তোমাকে কলেজ ক্যাম্পাসে থেকে যব পেতে দিইনি। তাই তুমি কলেজ ছেড়ে দিয়েছিলে। কারণ তুমি বাবা মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছিলে। আর ক্যাম্পাসে চাকরি না পাওয়ার মানে তুমি বাড়ির লোকজন কাছে হরে গেছো। তোমার ইগোর জন্য তুমি কলেজ ছাড়লে। পড়া শেষ করে সোনাই ইচ্ছে করে ব্যাঙ্গালোর চলে গেল, তারপর ইউরোপ, আজো আমরা ওকে বিয়ে পিঁড়িতে বসতে পারলাম না। ও আজো তোমাকেই চায়। কিন্তু তুমি ওর সাথে একবার দেখা করা চেষ্টা করোনি বলে ও তোমার কাছে যায় নি। আমি তোমাকে নির্বাচনের টিকিট এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি তুমি সোনাইকে বিয়ে করো।"
আমি বললাম " আপনি বোধহয় জানেন না। আমি এখানে এসেছি সন্ধ্যা বলে একটি মেয়ের রেফারেন্সে, আমরা একটা সম্পর্ক আছি।"
উনি বললেন " আমি এ অঞ্চলের তিনবারের বিধায়ক, আমি সবখবর রাখি। রায়চৌধুরীদের মেয়ের সাথে তোমার সম্পর্কে কনাঘুসো হচ্ছে। আমার সাথে কথা হয়েছে ওর। তোমার জীবনের স্রোত তলিয়ে যাওয়ার আগে খরকুটো মতো একেঅপরকে জরিয়ে বাঁচাতে চাইছো। কিন্তু বেটার অপশান সবাই খোঁজে। আমি ওকে আশাকর্মীর কাজ দেবো বলেছি তাতে ও তোমার সাথে সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে। ফোন করে দেখো ফোন ধরলে সে কথাই ও বলবে। হয়তো বলবে আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি তাই তোমার জন্যে এইটুকু আত্মত্যাগ করতে পারি।"
আমি চুপচাপ বসে রইলাম, স্বার্থপর এই জীবন থেকে সত্যি পলাতক হতে পারলাম কৈ??
গল্প — পলাতক
২৫
এআই বিশ্লেষণ (মূলভাব)
'পলাতক' রচনাটি জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, প্রেম এবং আত্মসম্মানবোধের এক গভীর আখ্যান। কেন্দ্রীয় চরিত্রটি সফলতা অর্জনের জন্য লড়াই ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে নিজের নীতিতে অটল থেকেছে। রাজনীতি, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতার ভিড়েও নিজের সততা বজায় রেখে জীবনকে নতুনভাবে আবিষ্কারের করুণ অথচ প্রেরণাদায়ক বার্তা এতে প্রকাশ পেয়েছে।
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
প্রেমেন্দ্র মিত্র
শুভ জন্মদিন! 🎈
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক প্রশংসার জন্য হৃদয...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক ভালো লাগার জন্য কৃ...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম