বেশ অনেকদিন পর আজ কবরস্থানে গেলাম।
সেখানে গেলে অজানা কারণেই মাটির গন্ধটা কেন যেন ভালো লাগে।
আহ, কত সমাধি।
কত মানুষ শুয়ে আছেন এখানে।
ধন-সম্পদ, প্রতিপত্তি, পরিচয় সব রেখে সময়ের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন তারা।
একটি কবরের সামনে দাঁড়ালাম। শুকনো বাঁশের বেড়া বয়সের ভারে হেলে পড়েছে।
আমি সবসময় কবরের বুকে ঘাস কল্পনা করেছি। কিন্তু আজ কবরগুলোকে অন্যভাবে দেখলাম।

একটি কবরে জবা ফুটে আছে।
অন্য একটি কবরের বুকে কচুপাতা বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিচ্ছে।
কোথাও লেবু গাছ, কোথাও পাতাবাহার, অলকানন্দা, রজনীগন্ধা।
আর যে কবরটির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানেও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি কামরাঙা গাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে গোলাপি ফুল।
গাছটি আমার পরিচিত। বয়স প্রায় ১২ বছর ১ মাস। তার শিকড় কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তা হয়তো সে নিজেও জানে না।।

ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে নামফলকে কত পরিচিত নাম দেখলাম। নামগুলো পরিচিত, অথচ মানুষগুলো অপরিচিত। একটি নিজের নামের নামফলকও ভেসে উঠল।
একটি নারীর নামফলকে চোখ আটকে গেল।
মৃত্যু সাল: ২০০৪।
হঠাৎ একটু হকচকিয়ে উঠলাম।
প্রায় ২২ বছর!

এত পুরোনো কবর, এখনো আছে?

কবরটির অপর পাশে আরেকটি নামফলক। সেখানে লেখা—
স্ত্রী অমুক, মৃত্যু ২০০৪
স্বামী অমুক, মৃত্যু ২০২৫

একই জায়গায় পাশাপাশি দুটি নাম।
একজন চলে গেছেন ২২ বছর আগে, আরেকজন মাত্র এক বছর আগে।
সময় তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত দুজনকেই একই মাটির কাছে এনে দিয়েছে।।

ঠিক তখনই নতুন একটি লাশ নিয়ে এলো কয়েকজন।

যে মানুষটি হয়তো কয়েক ঘণ্টা আগেও মানুষের কাছে একজন মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন, এখন তাঁর পরিচয় বদলে গেছে।
তিনি এখন লাশ।
আর কিছুক্ষণ পর হয়তো তাঁর নামটিও একটি নামফলকে আটকে যাবে। তারপর একদিন নামফলকটিও মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।

আহ, কত মানুষ শুয়ে আছেন এখানে!

কিন্তু কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
মাটি সবাইকে নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে।
কারও ধন-সম্পদ নেই, প্রতিপত্তি নেই, অহংকার নেই।
আছে শুধু নীরবতা।।

আর হয়তো সেই নীরব মানুষগুলোর বুকের ওপর দিয়েই গাছগুলো বড় হয়ে উঠছে।
কেউ জবা হয়ে ফুটছে, কেউ কচুপাতা হয়ে বাতাসে দুলছে, কেউ কামরাঙা হয়ে ফল দিচ্ছে।।

হয়তো এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে নির্মম ও সুন্দর নিয়ম।

মানুষ মাটির নিচে হারিয়ে যায়,
আর মাটি তাকে দিয়েই নতুন জীবন তৈরি করে।

কবরের বুকে যে ঘাস জন্মায়,
যে ফুল ফোটে,
যে গাছ আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করে-

হয়তো তাদের শিকড়ের নিচেই কোনো একদিন
আমাদেরও সমস্ত পরিচয় ঘুমিয়ে থাকবে।।

© অরণ্য
#অনিকেত_কান্তা