প্রতিদিন সকাল আটটা বারো মিনিটে বাসটি আসে।
গ্রামের ভাঙা পিচের রাস্তায় যেন হঠাৎ অন্য এক পৃথিবী নেমে দাঁড়ায়। চকচকে হলুদ গাড়ি, কাচে সকালের রোদ, আর জানালার ভেতরে একই রঙের পোশাক পরা শিশুরা। তাদের হাসির শব্দ রাস্তায় নামে না; কাচের গায়ে লেগে ফিরে যায়।
সেই সময় রাস্তার পাশে কদমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে বারো বছরের সামিউল।
তারও স্কুল আছে। আধঘণ্টা হাঁটতে হয়। বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা পেরোতে হয়। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির জল টুপটাপ বেঞ্চে পড়ে। ব্ল্যাকবোর্ডের কালো রং বহু আগেই ধূসর হয়ে গেছে।
তবু সামিউল বাসটির জন্য অপেক্ষা করে।
বাসের জন্য নয়।
জানালার জন্য।
সে বিশ্বাস করে, ওই জানালার ওপাশেই "ভালো স্কুল" থাকে।
ভালো স্কুল মানে—বইয়ের আলাদা গন্ধ, গোল পৃথিবীটা ঘোরানোর জন্য একটা গ্লোব, দেয়ালজুড়ে মানচিত্র, লাইব্রেরির নীরবতা, আর এমন শিক্ষক, যিনি প্রশ্ন করলে রাগ করেন না।
এসব সে কখনো দেখেনি।
তবু বিশ্বাস করে।
তার বাবা ভ্যান চালান। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে সামিউল একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,
—আব্বা, শহরের স্কুলে পড়তে কত টাকা লাগে?
বাবা উত্তর দেননি।
চুপচাপ নিজের হাতের তালু দেখছিলেন। সারাদিন হ্যান্ডেল টানতে টানতে তালুর চামড়া শক্ত হয়ে গেছে। তারপর খুব আস্তে বলেছিলেন,
—কিছু হিসাব টাকা দিয়ে হয় না বাবা। কিছু হিসাব মানুষ না পারলেও সংসার ঠিকই কষে ফেলে।
সামিউল বুঝতে পারেনি।
শুধু আর কোনোদিন প্রশ্ন করেনি।
শীতের এক সকালে বাসটি হঠাৎ থামল।
একটি নীল ব্যাগ দরজার কাছে পড়ে ছিল। হয়তো তাড়াহুড়োয় কারও হাত থেকে পড়ে গেছে। বাস চলে গেলে ধুলো থিতিয়ে এলে সামিউল ব্যাগটা তুলে নিল।
ব্যাগটা ছিল অদ্ভুত হালকা।
মনে হলো, স্বপ্নেরও বুঝি ওজন খুব বেশি হয় না।
বাড়িতে এসে ব্যাগ খুলতেই ভেতরে পেল একটি খাতা, আধখাওয়া চকোলেট আর ছোট্ট একটি গোল পৃথিবী।
প্লাস্টিকের গ্লোব।
সে আঙুল দিয়ে পৃথিবী ঘোরাতে লাগল।
কত দেশ!
কত সমুদ্র!
তার গ্রামের নাম নেই।
তার স্কুলেরও নাম নেই।
তবু পৃথিবীটা ঘুরছে।
রাতের খাবারের পর সে কুপি জ্বেলে খাতাটা খুলল।
প্রথম পাতায় নাম লেখা—
অর্ণব চৌধুরী।
তার নিচে শিক্ষক লাল কালি দিয়ে লিখেছেন—
"মনোযোগ কম। আরও চেষ্টা দরকার।"
পাতা উল্টাতেই একটি রচনা।
শিরোনাম—
"আমি বড় হয়ে কী হতে চাই।"
রচনার শেষ লাইনে লেখা—
"আমি জানি না। পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না।"
সামিউল দীর্ঘক্ষণ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই পৃথিবীতে মানুষ শুধু অভাব নিয়েই জন্মায় না।
কেউ কেউ প্রাচুর্যের ভেতরেও শূন্যতা নিয়ে জন্মায়।
পরদিন বাসটি আবার এল।
সামিউল ব্যাগটি ড্রাইভারের হাতে তুলে দিল।
কিছুক্ষণ পর একটি ছেলে নেমে এল।
চোখেমুখে বিরক্তি।
—আমার ব্যাগ?
—হ্যাঁ।
ছেলেটি ব্যাগ খুলে দেখে নিশ্চিন্ত হলো।
তারপর বলল,
—থ্যাঙ্কস।
সামিউল সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল,
—তোমাদের স্কুলে... লাইব্রেরি আছে?
—আছে।
—তুমি যাও?
ছেলেটি কাঁধ ঝাঁকাল।
—সময় পাই না। কোচিং থাকে।
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর বাসের হর্ন।
ছেলেটি উঠে গেল।
সামিউল রাস্তার ধুলোয় দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, মানুষ কখনো কখনো নদীর ধারে বসে থেকেও তৃষ্ণার কথা ভুলে যায়।
বহু বছর পরে সেই গ্রামে একটি পাঠাগার গড়ে উঠল।
বড় নয়।
দুটি ঘর।
কাঠের তাক।
কিছু পুরোনো বই।
এক কোণে একটি ছোট্ট নীল গ্লোব।
দরজার ওপরে কোনো দাতার নাম নেই।
শুধু একটি বাক্য—
"যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, সেটিই অন্য কারও জন্য দরজা হয়ে থাকুক।"
গ্রামের ছেলেমেয়েরা জানত না, পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সেই মানুষটি প্রতিদিন বইয়ের ধুলো মুছতে মুছতে কখনো কখনো একটি পুরোনো নীল ব্যাগের কথা ভাবেন।
তিনি জানতেন—
তিনি শহরের স্কুলে পড়তে পারেননি।
কিন্তু একদিন বুঝেছিলেন, স্কুলের ভবন বড় হতে পারে, সুযোগও বড় হতে পারে; তবু শিক্ষার সবচেয়ে বড় ঘরটি মানুষের ভেতরেই তৈরি হয়।
আর সেই ঘরের জানালা খুলে যায় ঠিক সেদিন, যেদিন নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে অন্য কারও প্রাপ্তিতে রূপ দেওয়ার সাহস জন্মায়।
---
অনুসন্ধান করুন
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
সুন্দর লেখা, অভিনন্দন কবি
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
আনিস খান শিহাব
আসসালামু আলাইকুম । বাংলা কবিতা নেট কবিতা অঙ্গনে সক...
আরো দেখুন
নূর মোহাম্মদ কল্পকবি
লেখক:
নূর মোহাম্মদ কল্পকবি