কাঠগোলাপের ছায়ায়
গ্রীষ্মের দুপুর। ক্যাম্পাসের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠগোলাপ গাছটা যেন নিজেই এক ইতিহাস। সাদা ফুলে ভরা ডালে হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছে, আর নিচে ছায়ায় বসে আছে এক মেয়ের অবয়ব। মাথা নিচু, হাতে বই, আর পায়ের কাছে ছড়িয়ে থাকা কিছু কাঠগোলাপের পাঁপড়ি।
\”মায়া\”অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, দর্শন। রোজ দুপুরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে বসে এই গাছটার নিচে। কেউ জানে না কেন এখানে বসে থাকে। কেউ কখনো জিজ্ঞেসও করেনি।
রুদ্র, এক ক্লাস সিনিয়র, কিন্তু কখনো ঠিকমতো কথা হয়নি মায়ার সঙ্গে। প্রতিদিন দূর থেকে দেখতে দেখতে ওর মধ্যে একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। যেন মায়াকে না দেখলে দিনটা শেষ হয় না। একদিন সাহস করে এগিয়ে গেল সে।
\”তুমি কি প্রতিদিন এখানে বসো?\”
মায়া একটু তাকিয়ে হেসে বলল, \”এই গাছটার ছায়া ভালো লাগে। আর কাঠগোলাপ গন্ধ ছড়ায় একরকম শান্তি নিয়ে।\”
সেই প্রথম কথা, সেদিন রুদ্র পাশে বসে অনেকক্ষণ গল্প করেছিল। আবহাওয়ার, পড়াশোনার, এমনকি কাঠগোলাপের ইতিহাস নিয়েও।
দুজনের মধ্যে তৈরি হলো এক নিঃশব্দ বোঝাপড়া। কথা বেশি নয়, কিন্তু চোখে চোখ পড়লেই যেন বুঝে ফেলা যায়—
—
দিন যেতে লাগলো। ক্যাম্পাসের রুটিন, ক্লাস, টিউশনি—সবকিছুর ফাঁকেও রুদ্র আর মায়ার কাঠগোলাপের নিচে বসা যেন নিয়ম হয়ে উঠল। তারা কথা কম বলত, কিন্তু উপস্থিতিটাই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় মধুর।
একদিন মায়া বলল, “তুমি কী মনে করো, ভালোবাসা বলতে ঠিক কী বোঝায়?”
রুদ্র একটু থেমে বলল, \”ভালোবাসা কি বা কাকে বলে বুঝি না। “ভালোবাসা দাবি নায়, শুধু চোখে চোখ রেখে বুঝে যাওয়া।”
মায়া হেসে বলল, “তোমার উত্তরটা কাঠগোলাপের মতো—শব্দে নয়, গন্ধে কথা বলে।”
রুদ্র বুঝে গিয়েছিল—ওদের মধ্যে ভালোবাসা জন্ম নিচ্ছে। না বলা, না ছোঁয়া, তবুও গভীর।
——————
এক সন্ধ্যায়, রুদ্র মায়ার জন্য একটা চিঠি লিখল। খুব সাধারণ সাদা খামে ভরে, কাঠগোলাপের একটা শুকনো পাঁপড়ি রাখল ভেতরে। চিঠিতে লিখল:
\”প্রিয় মায়া, তুমি জানো, কাঠগোলাপ ঝরে পড়ে, কিন্তু তার গন্ধ রয়ে যায়। তেমনি তুমি প্রতিদিন একটু একটু করে আমার দিন, মন, স্বপ্নে মিশে যাচ্ছ। আমি হয়তো বলতে পারি না, কিন্তু ভালোবাসি—নীরবে, নিঃশব্দে। তোমার পাশে বসে থাকা আমার দিনের সবচেয়ে প্রিয় সময়। তুমি যদি একদিন হারিয়ে যাও, আমি ঠিক এই গাছটার নিচে বসে থাকবো, তোমার ফেলে যাওয়া ছায়া ছুঁয়ে। তোমার, রুদ্র\”
————-
চিঠি পাওয়ার পরদিন মায়া কিছু বলেনি। শুধু এসে বসেছিল, চোখে একটা অদ্ভুত আলোর রেখা নিয়ে। দিন শেষে চলে যাওয়ার আগে একটা ছোট কাগজ রুদ্রর হাতে দিয়ে বলেছিল, “এটা পড়ো বাড়ি গিয়ে।”
রুদ্র রাতে খাম খুলে পড়ল:
\”রুদ্র, তোমার চিঠির গন্ধ পেয়েছি কাঠগোলাপের মতো। আমি চুপচাপ ভালোবেসে ফেলেছি সেইদিন, যেদিন তুমি পাশে বসে গল্প করেছিলে। আমি চাইনি বলতে, কারণ এই নীরবতা আমায় বলে দেয় না বলা কথা। কিন্তু এখন বলতে পারি—তোমার ভালোবাসা আমায় শান্তি দেয়, যেমন এই গাছটা। তোমার পাশে থাকতেই ভালো লাগে। কথা না বলেও বুঝে নেওয়া ভালোবাসাটুকু… সেটাই তো আসল। তোমার, মায়া\”
———-
একটা বিশেষ দিন। আকাশটা যেন বেশি নীল, আর হাওয়ায় একরকম উত্তেজনা। রুদ্র আর মায়া দুজনেই ঠিক করেছিল আজ কিছু বলবে। তাদের সম্পর্কটাকে একটা নতুন মাত্রা দেবে।
রুদ্র কাঠগোলাপ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে ছিল একটা কাঠগোলাপ ফুল আর মায়ার জন্য ছোট্ট একটুকরো কবিতা। মায়া এলো ধীরে, হাওয়ায় উড়ছিল ওর চুল।
রুদ্র বলল, “তোমার চোখে যখন আলো পড়ে, তখন আমার পৃথিবীটা একটু সুন্দর লাগে। তুমি থাকো বলেই সবকিছু এত শান্ত লাগে।”
মায়া কিছু না বলে ফুলটা হাতে নিলো, বলল, “আমিও তো প্রতিদিন ভাবি—তুমি আছো বলেই আমি আছি।”
——-
সময় বদলায়। একটা ভুল বোঝাবুঝিতে তারা কিছুদিন আলাদা হয়েছিল। কিন্তু ভালোবাসা কি দূরে থাকতে পারে?
বর্ষার এক ভিজে দিনে, কাঠগোলাপ গাছের নিচে রুদ্র এসে দাঁড়াল। ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু তবুও নড়ল না। হঠাৎ পেছন থেকে মায়া বলল, “তুমি এখনো এখানে আসো?”
রুদ্র বলল, “আমি কোনোদিন যাইনি। তুমি না এলে গাছটা কাঁদে।”
মায়া এগিয়ে এসে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে বলল, “চলো, বসি।
——-
বহু বছর পর। রুদ্র একা এসে বসে কাঠগোলাপ গাছের নিচে। হাতে মায়ার লেখা শেষ চিঠি। তাতে লেখা:
\”রুদ্র, তুমি যদি আগে এসে বসো এই গাছটার নিচে, জানবে—আমি আজও তোমায় ভালোবাসি। আমি নেই, কিন্তু ভালোবাসা গন্ধে রয়ে গেছে। তুমি চোখ বন্ধ করলেই আমি পাশে বসে থাকি। ভালো থেকো, কাঠগোলাপের ছায়ায়। তোমার, মায়া\”
রুদ্র চোখ বন্ধ করল। বাতাসে একটা পাঁপড়ি ভেসে এলো। কোথাও থেকে একটা নিঃশব্দ ভালোবাসা ফিরে এলো।
——
পুরনো চিঠি, কাঠগোলাপ ফুলে ভরা একটা বাক্স, আর কিছু ফটো। মায়া নেই, কিন্তু রুদ্র একা নন। তিনি প্রতিদিন গাছটার নিচে বসে থাকেন, আশেপাশের ছেলেমেয়েদের দেখে মনে মনে বলেন—“ভালোবাসো, কিন্তু শব্দ ছাড়া। বুঝে নিও, ধরে রেখো।”
——-
একদিন, এক নবদম্পতি এসে বসে কাঠগোলাপ গাছের নিচে। তারা পায় একটা পুরনো খাম, তাতে লেখা—“ভালোবাসা শব্দে নয়, অনুভবে বাঁচে।”
শেষ।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন