ছা-পোষা নাগরিক
ছা-পোষা নাগরিক
এ কে সরকার শাওন

গল্প - ছা-পোষা নাগরিক

এ কে সরকার শাওন
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ জীবনবাদী, দেশের

আজও আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে আছে।দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ভরদুপুরে সূর্য মামা একটু উঁকি মারার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু মেঘ নানী তার কালো আঁচলে টেনে তাকে আবার ভালোভাবে মুড়িয়ে রেখেছে।

সূর্য: নানী, আমাকে জেগে উঠতে দাও। শীতে গরিবরা খুব কষ্ট করছে।
মেঘ: করুক। গরিব জন্মায়ই কষ্ট করার জন্য। তাছাড়া শীতে কষ্ট না করলে সে বসন্তের সুখ বুঝবে কীভাবে? তোকে না পি. বি. শেলির কবিতাটা শুনিয়েছিলাম! মনে নেই?
সূর্য: মনে আছে, নানী।
মেঘ: বল তো, দুটো লাইন।
সূর্য: “If winter comes,
can spring be far behind?”
মেঘ: গুড। তুই শুয়ে থাক। একদম উঠবি না। আমি যাই, পুরো আকাশটা ঢেকে দিই।

আজকের আবহাওয়ার সঙ্গে বর্তমান পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার একটা অদ্ভুত মিল আছে। গজলু নোটবুক কিছু টুকে রাখলো

“পৃথিবীতে চরম দুঃসময়
সূর্যগণ আঁধারে লুকায়;
ক্ষমতাসীন মেধাহীন,
মানীকে চাবুক হাঁকায়।”

“স্যার, এই নেন গরম পানি।”
অফিস সহকারী রীতার ডাকে গজলুর সম্বিৎ ফিরে এলো।
— সঙ্গে একটু লবণ দিয়েছ?
— হ্যাঁ, লগে একটু নুনও দিছি।
— আচ্ছা, যাও তুমি।
আজ এই নিয়ে দু’বার গড়গড়া, তিনবার আদা চা পান করা হলো। গলা আর শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। জ্বরও এসে যেতে পারে। আজ মাঘের প্রথম দিন। তাই সকাল সাতটায় অফিস শুরু হওয়ার আগেই সে পেছনে শীতলক্ষ্যার পাড়ে দাঁড়িয়ে শীতের তীব্রতা মাপার চেষ্টা করেছিলো। মহা শীত।
‘শীতের শুভেচ্ছা’ শিরোনামে দু’লাইন লিখেও ফেলল গজলু—
নদী–আকাশ–আশা–কুয়াশা
মিলে মিশে একাকার!
শীতলক্ষ্যার পুব পাড়ে
গজলু একা নির্বাক।
সেখান থেকেই ঠান্ডাটা পাকাপোক্ত হয়েছে।

অফিস পাঁচটা পর্যন্ত। গাড়ি ছাড়ার কথা ছিলো সোয়া পাঁচটায়। কিন্তু কয়েক মাস আগে মিষ্টার
আলী তৈলাক্ত ভাষায় তেলের বাটি উপুড় করে চিফ অপারেটিং অফিসারকে লাভ বুঝিয়ে গাড়িটা সোয়া ছয়টায় সেট করেছিলো।
সে বুঝিয়েছিল,
-“স্যার, অফিসের গাড়ি ব্যবহার করতে হলে এক ঘণ্টা অফিস বেশি করতে হবে। প্রতি মাইক্রোবাসে যদি দশজনও যায়, ওদের গড়ে মাসিক বেতন পঞ্চাশ হাজার ধরা হলে, এক ঘণ্টা করে বেশি অফিস করালে কোম্পানি প্রতিদিন এক মাইক্রোবাসে ২৪০৩.৮ টাকা গেইন করবে । ধরুন, এমন দশটা মাইক্রোবাস চললে, ২৬ দিনে মাস ধরলে, বছরে সেভ হবে ৭৪,৯৯,৮৫৬ টাকা।”
গজলু COO সাহেবকে বলেছিল,
-“স্যার, গাড়ির ব্যয় তো CSR (Corporate Social Responsibility) খাতে দেখানো হয়। তাহলে কর্মকর্তারা এক ঘণ্টা বেশি অফিস করবে কেন? হাশরের ময়দানে মালিককে এই টাকার সত্তর গুণ শোধ দিতে হবে—সুদ ছাড়া বলছি। সুদ ধরলে ক্যালকুলেটরে আসবে না।”
— গজলু সাহেব, আপনি চুপ করুন। আপনি তো প্রকৌশলী! হিসাব–নিকাশে আঙুল দেন কেন? তাছাড়া ধর্ম টানেন কেন?জিএম রফিকের এমন চামচামিতে কো–স্যার মুচকি হাসল।
এই রফিকরাই আসল মোনাফেক। সকালেই সে ধর্ম টেনে বলেছিল,“অফিসে নির্ধারিত সময়ের আগে ছুটি করা পাপ।”কিন্তু বেতন না দিয়ে বেশি কাজ করানো যে চিটারি—সে কথা এমবিএ করা রফিক সাহেব চেপে গেলো।
ফলাফল?চামচা আলী বছরের সেরা কর্মকর্তা, রফিক সেরা জিএম।আর সত্য কথা বলার অপরাধে গজলু তিরস্কৃত।
হায় রে জগৎ!
— স্যার, ছয়টা পনেরোর আগে কোনো গাড়ি নেই।ইঞ্জিনিয়ার হাসিব এসে জানাল।
গজলু বলল, “আমি চলে যাব। আল আমিনকে একটা সিএনজি ডাকতে বলেন।”
সিএনজি চলছে। ড্রাইভার জোরে চালাচ্ছে। গজলুর মনে কত ভাবনা কিলবিল করছে। নোটপ্যাড বের করে লিখতে চায়, কিন্তু রাস্তার ঝাঁকুনিতে মোবাইল পড়েই যায়।
সে লিখল—
মানুষের আকালেই মানুষ হয়ে
হয়ে গেছি পরগাছা!
মুখাবয়বে সবাই মানুষ,
মানুষ পাওয়া দুরাশা!

হঠাৎ থেমে গেল সিএনজি।
-এই থামালে কেন?
—সেনাদের মহড়া চলছে।ড্রাইভার বিরক্ত গলায় জানাল।
একটি ট্যাংকের ওপর এক জোয়ান সিএনজিটা আটকে দিল। বহরের পেছনে পড়লে আজ আর বাড়ি যাওয়া হবে না বুঝে গজলু চট করে নেমে পড়ল।
এক মুরুব্বীর উপদেশ মনে পড়ে গেলো তার—“হেল্প চাইলে বাংলায় না, ইংরেজিতে চাইবে।”
সে জোয়ানকে মিনতি করে বলল,“Excuse me, sir. I am suffering from fever. If you allow me to go to hospital, It will be highly appreciated.”
‘স্যার’ শব্দের তেলতেলে প্রলেপে কাজ হলো। জোয়ান ইশারায় গজলুর সিএনজিটিকে যেতে দিল।
আবার চলা শুরু…
কিছুক্ষণ চলার পর আবার থামলো।
সিটির ভেতরে ঢুকেই মিছিল। স্লোগান—
“সল্টু কারও করে নাই ক্ষতি,
ভোট দিলে হবে উন্নতি!”
গজলু হতাশ হয়ে জানতে পারল— অফিসের নির্ধারিত গাড়ি বিকল্প পথে আগেই পৌঁছে গেছে।
গজলুর গায়ে জ্বর চেপে বসেছে। সে হেঁটেই রওনা দিল। সে মনে মনে বললো—
আমি তথৈবচ, হেঁটে চলেছি
উন্মত্ত মিছিলের পিছে!
যারা বোঝে না ভূত–ভবিষ্যৎ,
ওদের ষোল আনাই মিছে!

এ কে সরকার শাওন
পাইকসা, নরসিংদী।
১৫ জানুয়ারি ২০২০

পরে পড়বো
২৫৯
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন