পাঁচ টাকার নোট ছিল ক্ষুধার কাছে
ভাঙা পাখির ডানা,
দুই টাকার মুদ্রায় ঘুরত রোগের গোল চাকা—
শরীর মানে তখন রাষ্ট্রহীন জমি,
যেখানে ইচ্ছেরা চাষ করত কাঁটা।
সন্ধ্যার দিকে পাহাড়ি মেয়েরা
নিজের নাম খুলে রেখে যেত অন্ধকারে,
এক মুঠো খিদের বিনিময়ে
দেখিয়ে দিত মানচিত্রহীন মহাদেশ—
কালো, নীরব, লবণহীন।
ব্রাহ্মমন্দিরে যাওয়ার আগে
আমাদের পেরোতে হত লাল বাতির গলি,
সেখানে সারারাত বসে থাকত
এক রোগা সম্পাদক—
চোখের পাতায় জমে থাকত ছাপাখানার কালি
আর ব্যর্থ বিপ্লবের ঘুম।
হারিকেনের কাঁপা আলোয়
আমরা পড়তাম অক্ষরের কঙ্কাল—
চর্যাপদ, অন্ধকারের ইতিহাস,
ভাঁজ করা চিঠিতে মেয়েলি হাতের কাঁপুনি।
দশ টাকার ঋণে তখন
একদিনের জন্য কেনা যেত মৃত্যু।
মন্বন্তর ছিল ঘরের আরেকজন নারী,
বাবার অনুপস্থিতিতে
সে বসত চুলার পাশে,
মায়ের দীর্ঘশ্বাসে ভিজত দুপুর।
শাকের বদলে ভাত পেত যে মেয়েটি,
তার মুখে নুনের অভাব
আমাদের দেশের মানচিত্রের মতোই ফাঁকা।
বাবা গেলে সীমান্তের দিকে,
আমরা খেলতাম তার ফেলে যাওয়া স্বপ্ন নিয়ে—
পোস্টকার্ডে লিখত,
“লক্ষ্য করো, বাঁ দিকের কোণটা,
ওখানেই গোলপোস্ট, ওখানেই ইতিহাস।”
তিনি বিশ্বাস করতেন এক দাড়িওয়ালা নামকে,
যেন তা কোনো অদৃশ্য দেবতা—
এক মুঠো চাল,
একটা জং ধরা বন্দুক,
আর খালি পা নিয়ে
তিনি হেঁটে গেলেন দেশের বাইরে,
আমাদের ভিতরে রেখে গেলেন
আরেকটা অসমাপ্ত যুদ্ধ।
কবিতা - গৃহযুদ্ধের পরে
আজিজুল হক
রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
দেশাত্মবোধক কবিতা, বিদ্রোহী-দ্রোহের কবিতা
২৭

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন