❝ যে দেয়াল ভালোবাসাকে আটকাতে পারেনি। ❞
রুদ্রকেল্লা ছিল এমন এক নগর, যেখানে মানুষের অনুভূতির চেয়ে রাজাদেশের ওজন বেশি।
এখানে হাসি ছিল নিয়ন্ত্রিত, কান্না ছিল অপরাধ, আর ভালোবাসা—একটি অঘোষিত বিদ্রোহ।
এই কেল্লার রাজা রুদ্রদেব বিশ্বাস করতেন,
“রাষ্ট্র টিকে থাকে ভয় দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে নয়।”
তার একমাত্র পুত্র যুবরাজ অরিন ছিল সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম।
সে রাজসভার তলোয়ার নয়, ভালোবাসত শব্দ, সুর আর নীরবতার ভাষা।
আর সেই নীরবতার মধ্যেই একদিন সে খুঁজে পেল ইরাকে।
ইরা ছিল প্রাসাদের নৃত্যশালার এক সাধারণ শিল্পী।
কোনো রাজরক্ত নেই, নেই কোনো নামী পরিচয়—
শুধু চোখে ছিল এমন এক গভীরতা, যেখানে তাকালে মানুষ নিজের সত্য খুঁজে পায়।
উৎসবের রাতে অরিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি নাচছ না কেন?”
ইরা মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল—
“সব নাচ চোখে দেখা যায় না, কিছু নাচ ভেতরে হয়।”
সেই মুহূর্তেই অরিন বুঝেছিল,
এই মেয়েটি রাজ্যের নিয়ম মানবে না,
আর তার হৃদয়ও আর আগের মতো থাকবে না।
এরপর তাদের দেখা হতো গোপনে—
পুরোনো গ্রন্থাগারের ধুলোভরা সিঁড়িতে,
বাগানের অন্ধকারে,
যেখানে কোনো প্রহরী নেই, কিন্তু ভয় আছে।
এক সন্ধ্যায় ইরা বলেছিল—
“আমাদের প্রেম যদি অপরাধ হয়, তবে এই রাজ্যটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।”
অরিন কিছু বলেনি।
কারণ কিছু সত্য উচ্চারণ করতে গেলে রাজ্য কেঁপে ওঠে।
কিন্তু প্রাসাদের দেয়াল কেবল পাথরের নয়—
সেগুলো বিশ্বাসঘাতকও।
রুদ্রদেব সব জেনে ফেললেন।
দরবারে তিনি শুধু বললেন,
“একজন যুবরাজের হৃদয় ব্যক্তিগত হতে পারে না।”
ইরাকে বন্দি করা হলো।
কেল্লার দক্ষিণ প্রান্তে একটি অসম্পূর্ণ দেয়ালের ভেতর—
যেখানে মানুষ ঢোকে, কিন্তু গল্প বেরোয়।
শেষবার দেখা করতে এলো অরিন।
দেয়াল তোলার আগের মুহূর্ত।
অরিন কাঁপা গলায় বলল,
“আমি সিংহাসন ছেড়ে দেব, রাজ্য ছেড়ে দেব—শুধু তোমাকে বাঁচতে দাও।”
ইরা শান্তভাবে মাথা নেড়ে বলল—
“ভালোবাসা বাঁচাতে গেলে মানুষ নয়, স্মৃতি বাঁচাতে হয়।”
পাথরের পর পাথর বসতে শুরু করল।
সময় যেন ইচ্ছা করে ধীরে চলছিল।
শেষ ইট বসানোর ঠিক আগে ইরা ফিসফিস করে বলল—
“আমাকে মারছ না, রাজা… তুমি শুধু প্রমাণ করছ, ভালোবাসা তোমার রাজ্যের চেয়েও শক্ত।”
দেয়াল সম্পূর্ণ হলো।
রাষ্ট্র টিকে গেল।
রাজাও।
কিন্তু সেদিনই যুবরাজ অরিন রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করল।
সে আর কোনোদিন সিংহাসনে বসেনি।
সে হয়ে উঠেছিল এক ভ্রাম্যমাণ গায়ক—
যে গান গাইত হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার জন্য।
বছর কেটে গেল।
রুদ্রদেব মারা গেলেন।
কেল্লা দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে লাগল এক গল্প—
একটি মেয়ের, যে দেয়ালের ভেতর বন্দি হয়নি,
বরং রাজ্যের ইতিহাসে গেঁথে গেছে।
লোকেরা বলে,
আজও রুদ্রকেল্লার দক্ষিণ দেয়ালে কান পাতলে
একটা নিঃশ্বাস শোনা যায়—
যা প্রমাণ করে—
ভালোবাসাকে হত্যা করা যায়,
কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন