মোসলেমের বিয়ে
মোসলেমের বিয়ে
হাবীব

গল্প - মোসলেমের বিয়ে

হাবীব
শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ রম্য, হাসির

আমাদের মোসলেম আধপাগলা ধরণের মানুষ। তার পাগলামো স্বভাব আমাদের সবাইকে দাঁত কেলিয়ে খিলখিলিয়ে হাসার সুযোগ করে দেয়। এজন্য মোসলেম আমাদের সবার প্রিয়। যে মোসলেম আমাদের সবাইকে হাসি আনন্দে রাখে,ইদানিং তার জীবনে নেমে এলো হতাশায় ভরা এক জটিল সমস্যা। মোসলেমের বয়স হয়েছে,মানে বিয়ের বয়স!
কিন্তু ঐ যে আধপাগলা খেতাব তার কপালে জুটেছে এবং এটা সমাজের অলিতে গলিতে অতি সুপরিচিত লাভ করেছে তাই মোসলেমের বিয়ের প্রস্তাব এলে পাত্রীপক্ষ যখন মোসলেমের বায়োডাটা শোনে তখন আর এগোয় না। এ কারণেই আধাপাগলা মোসলেমের কপালে বউ জুটছে না। তার ছোট ভাই দুটো বিয়ে করে একে একে দু দুটো তরতাজা বউ ঘরে আনলো তখন কি মোসলেমের আর সহ্য হয়?? নাকি সহ্য করা যায়!!
মোসলেম তখন পাড়ায় পাড়ায় প্রচার করতে নেমে পড়লো,
-আজকাল আদপ কাইদা সব উঠে যাচ্ছে সমাজ থেকে। বিবাহযোগ্য বড় ভাইকে ঘরে রেখে নিজেরাই হুড়মুড় করে নিজেদের বিয়ে সাদি সেরে নিচ্ছে। কারো কিচ্ছু বলার নেই? সমাজে মুরব্বিরা কি কানা বোবা হয়ে গেছে। আমি মোসলেম তাদের চোখের সামনে পড়ি না!! গাধার মতো খেটে আইবুড়ো হয়ে যাচ্ছি,মুরব্বিদের এটা চোখে পড়ে না?? রাস্তায় বের হলে তো মুরব্বিদের ঠেলায় পা ফেলার জো নেই। মুরব্বিদের তো ছালাম কালাম কম দিচ্ছি না,তবুও তাদের সু-নজরে পড়ছি না!! যখন আকাম কুকাম কেলেংকারি করে কোনো মেয়েকে ঘরে তুলবো তখন দেখা যাবে মুরব্বিরা দল বেঁধে আমার বিচার আচার নিয়ে মত্ত হয়ে পড়বে…
মোসলেমের এ কথাটা সত্য। যেহেতু মোসলেম আমাদের সবার প্রিয়,তার বিয়ে হচ্ছেনা এ নিয়ে আমরা সবাই মানে যারা তার হিতাকাংখী তারা চিন্তায় আছি। দুই দুই বার তার ঠিক হওয়া বিয়ে ভেঙ্গে গেছে।
*প্রথম বিয়ে ভাঙ্গার কারণঃ
সে বার মোসলেম মুরব্বিদের সাথে নিয়ে পাত্রী দেখতে গেছে। পাত্রী দেখা অনুষ্ঠানে পাত্রপক্ষ মানে মোসলেম এবং তার চাচা স্থানীয় মুরব্বি চার জন অতি সু সজ্জিত হয়ে ভদ্রভাবে বসে আছে। যথা সময়ে পাত্রীকে নিয়ে সেখানে পাত্রীপক্ষ হাজির হলো। পাত্রী দেখে আমাদের মোসলেম খুশিতে গদগদ। রেওয়াজ অনুযায়ী পাত্র পক্ষের লোকেরা পাত্রীকে হালকা পাতলা ছোট খাটো প্রশ্ন করে থাকে। মোসলেমের চাচা পাত্রীকে প্রশ্ন করছে,
-মা,তোমার নাম কি?
-মোছাঃমরজিনা খাতুন
-তোমরা কয় ভাই বোন?
-দুই ভাই,তিন বোন।
-মা,তুমি রান্না বান্না করতে পারো?
-জ্বী, পারি
-মা,তুমি কি কি রান্না করতে পারো?
-ভাত,তরকারি,পোলাও,মাংস……সব পারি।
-মা গো তুমি রুপে লক্ষ্মি,গুণে স্বরশ্বতী…
মোসলেমের অন্য এক চাচা এবার মেয়েকে কিছু প্রশ্ন করলেন,
-মা,তুমি পড়ালেখা কিছু করেছো?
-জ্বী,কেলাস ফাইব পর্যন্ত পড়েছি।
-মা,তুমি কোরান শরীফ পড়তে পারো?
-জ্বী,পারি।
-মা,তুমি নামাজ পড়তে পারো তো!?
-জ্বী,পারি।
আরো কিছু প্রশ্ন করলো অন্য মুরব্বিরা। মেয়েটি সুন্দর গুছিয়ে গুছিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দিলো। মোসলেম তো মহাখুশি,সে ভাবছে তার ও তো কিছু প্রশ্ন করা উচিৎ,তা না হলে মেয়েপক্ষ হয়তো ভাবতে পারে ছেলে তো কোনো কথা বললো না,ছেলে বোবা নাকি?
যেই ভাবনা সেই কাজ। তবে মোসলেম খেয়াল করেছে পাত্রীকে কিভাবে প্রশ্ন করতে হয়। কারোর কাছ থেকে বুদ্ধি পরামর্শ না নিয়েই মোসলেম পাত্রীকে প্রশ্ন করে বসলো,
-মা,তুমি গীত গাইতে জানো??
মোসলেমের এ রকম আচমকা প্রশ্ন শুনে সবাই হতবাক! ছেলে যে পাগল টাইপের,মেয়েপক্ষ স্পষ্টই বুঝতে পারলো। যে ছেলে কনে দেখা অনুষ্ঠানে কনে কে মা বলে সম্বোধন করে সে তো পাগল ছাড়া কিছুই না। কাজেই মেয়েপক্ষ কোনো মতেই রাজি হলো না বিয়েতে।
*দ্বিতীয় বিয়ে ভাঙ্গার কারণঃ
কনে দেখা অনুষ্ঠানে সব কিছু ঠিক ঠাক হয়ে গেছে এবং বিয়ের দিনক্ষণ পাকা। উক্ত অনুষ্ঠানে মেয়েটি মোসলেমের চাচাদেরকে একে একে পা ছুঁয়ে ছালাম করতে লাগলো। মেয়ের ছালামপর্ব শেষ হলে মোসলেমের এক চাচা মোসলেমকে নির্দেশ দিলো,
-বাবা মোসলেম,ইনি তোমার হবু শশুড়,ইনাকে ছালাম করো। ইনি তোমার শাশুড়িমা ইনাকেও ছালাম করো। ইনি তোমার দাদিশাশুড়ি ইনাকে সালাম করো…
মোসলেম যথারীতি হবু শশুড় শাশুড়ি কে সালাম করে শেষে হবু বউয়ের ও পা ছুয়ে ছালাম করে বসলো। মহা কেলেংকারির এক অকাম করে বসলো সে। বিয়ে ভাঙ্গার জন্য এটায় যথেষ্ট ছিলো…
যাইহোক,শেষ পর্যন্ত মোসলেমের কপালে কিভাবে বউ জুটলো সে কথায় এবার আপনাদেরকে বলবো…
সে বিয়েতে আমি ছিলাম এবং আমার সাথে তিয়াশ ও ছিলো।
তিয়াশ আমার চাচাত ভাই। আমি তখন সবে কলেজে পড়ি আর তিয়াশ একটা কোম্পানিতে ঢুকেছে। মোসলেম আমাদের প্রতিবেশি ভাই। সহজ সরল স্বভাবের কারণে মোসলেম আমাদের সবার কাছেই প্রিয়। তার বিয়েতে বেশ মজা করেই আমরা গেলাম। মোসলেম আমাদের দুজনকেই খুব বিশ্বাস করে। রং ঢং করে ব্যান্ড পার্টির বাজনা সহকারে বিয়ের যাত্রা শুরু হলো। যাত্রার শুরুতে বর সেজে মোসলেম আমাদের দুজনকে কান্নাজরিত কন্ঠে বললো,
-ভাইগো,তোমরা দুজন আমার নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশি। আমার বিয়েটা যেনো এবার ভেঙ্গে না যায়…
তিয়াশ তাকে বললো,
-বিয়ে তো আমরা অবশ্যই ঘটাবো তবে মোসলেম,তোমার পাগলামি কান্ড কারখানা কিন্তু বন্ধ রাখতে হবে।
যাইহোক,আমরা বিয়ে বাড়িতে পৌছলাম। এক সময় কাজী সাহেব এলেন মোসলেমের কাছে বিয়ের রিজাব কবুল নিতে। কাজী সাহেব মোসলেমের মুখোমুখি বসে বলতে শুরু করলেন,
-খুদিপুর নিবাসী ছলিমুদ্দিনের কনিষ্ঠা কন্যা মোছাঃআলিছা বেগমের…
কাজীর কথা শেষ হবার সাথেই আমাদের অতি সু-পাত্র মোসলেম,কাজীর কথা রিপিট করে বলতে শুরু করলো,
-খুদিপুর নিবাসী ছলিমুদ্দিনের কনিষ্ঠা কন্যা মোছাঃআলিছা বেগমের…
কাজী সাহেব চমকে উঠলেও সামলে নিয়ে বরের কানে কানে বললেন,
-আপনে কেনো বলছেন?
সাথে সাথে মোসলেম ও রিপিট করলো,
-আপনে কেনো বলছেন?
কাজী বললেন,
-মহা মুশকিলে পড়লাম তো!
মোসলেম ও বললো,
-মহা মুশকিলে পড়লাম তো!
কাজী-আরে ভাই,আপনে চুপ থাকেন…
মোসলেম-আরে ভাই,আপনে চুপ থাকেন।
কাজী সাহেব রাগ করে উঠে দাড়িয়ে রেজিঃখাতা ছুড়ে ফেলে বললেন,
-ধুর ছাই,এ বিয়েই পড়াবো না…
সাথে সাথেই মোসলেম রেজিঃখাতাটা হাতে তুলে নিয়ে কাজীর অনুকরণে তা আবার ছুড়ে ফেলেদিয়ে বললো,
-ধুর ছাই এ বিয়েই পড়াবো না।
বিয়ের আসরে একদিকে হাসির রোল পড়ে গেলো অন্য দিকে লজ্জায় আমাদের মাথা হিট হয়ে গেলো। মুহুর্তের মধ্যেই কান্ডটি ঘটে গেলো। মুহুত্বেই আমি আর তিয়াশ বরের মুখ চেপে ধরে তার কানে কানে বললাম,
-সর্বনাশ করেছো,এ সব বলা বন্ধ করো।
সাথে সাথে মোসলেম বলে উঠলো,
-কেনো? আমার মা তো আসার সময় আমারে কানে কানে কইয়া দিলো,”বাবা মোসলেম,তুই পাগলা ছাগলা মানুষ। বিয়ের আসরে কি কইতে কি কস তার তো ঠিক নাই,কাজী সাহেব যা যা কইবো তুই ও ঠিক ঠাক মতো তাই করিস।” আমি তো মায়ের কথা মতো তাই ই করেছি,ভুল কি করলাম??
আবার একটা হাসির রোল পড়ে গেলো। আমাদের অতি বুদ্ধিমান তিয়াশ বলে উঠলো,
-আমাদের মোসলেম খুবই সহজ সরল এবং অতি মাত্রায় মাতৃভক্ত ছেলে। তার প্রমাণ আপনারা একটু আগেই পেলেন,এ রকম মা ভক্ত ছেলে এ যুগে বিরল। একটু খেয়াল করুন আপনারা,মা যা বলেছে মোসলেম তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছে। ভুলটা হয়েছে,তার মায়ের নির্দেশের সঠিক অর্থটা সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু মায়ের আদেশ পালনের ক্ষেত্রে সে একশভাগ সঠিক। তার মতো মাতৃভক্ত ছেলেকে জামায় হিসেবে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। হতে পারে এটা হাসির বিষয় কিন্তু অন্তরের ভক্তিটা তার কতো বড়…
তিয়াশ এই বলে থামলো। মেয়েপক্ষ বিষয়টি বড় করে আর দেখলোনা। কাজেই মোসলেমের কপালে শেষমেষ একটা বউ জুটলো…
বিয়ে শেষে তিয়াশ আমার কানে কানে বললো,
-জোরাতালিটা কেমন দিলাম অর্নব ভাই??

🌸
~ হা বী ব

পরে পড়বো
৫৪
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন