নিঃশব্দ
নিঃশব্দ
হাবীব

গল্প - নিঃশব্দ

হাবীব
শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ অন্যান, ভালোবাসা

কলেজ থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। কলেজ শেষে পড়ালেখার জন্য বাড়িছারা হয়ে তারা রাজধানীতে এসেছে।
মাঝে মাঝে ওরা একে অপরের খবর নেয়। এ দুরের শহরে দুজন একলা ছেলেমেয়ে নিজেদের আনন্দ,দুঃখ একে অপরের সাথে শেয়ার করে। গল্পটা শুধুই বন্ধুত্বের।
আজ আদিব এর নখ কেটেছে,কোনো মতে তাতে মলম লাগিয়ে রিতাকে মেসেজ দেয় “জানিস আমার নখটা কেটে গেছে”
-কেমনে কাটলো?
-একটা তেলাপোকা(আরশোলা) উড়ে এসে হাতে পড়েছে আর আমি হাত ঝটকা দিছি জানালার গ্রীলে লেগে নখ থেতো হয়ে গেছে
-উফ্! কি যে করিস তুই,তেলাপোকা কি তোকে খেয়ে ফেলতো? কতোটা কেটেছে? বেশি ব্যাথা পাইছিস? পানি দে হাতে,আর মলম টলম আছে? না থাকলে ডাক্তারের দোকানে যা।
-দরকার নাই রে,ততটাও ভংগুর শরীর না যে এত অল্প কাটা নখের জন্য ডাক্তার দেখাবো,এমনিতেই সেরে যাবে,একটু খানি ব্যাথা করতেছে শুধু।
-হারামি! রক্ত জমাট বাধতে পারে,ডাক্তার দেখা এক্ষুনি। বেশি সমস্যা হলে শুয়ে থাক। কি করবি এখানে আর কে আছে বল,নিজেদের ভালোমন্দ নিজেদেরকেই দেখতে হবে।
-আচ্ছা…
এতটুকু মেসেজ করেই আদিব ঘুমিয়ে পড়লো,একটু পর আবার এশার আজানে জেগে উঠলো,তারাবি পড়তে হবে। অজু করে এসে পাঞ্জাবি টা গায়ে দিলো, নাহ মসজিদে আজ যাবেনা সে,বড্ড আলসে লাগছে। কাচা ঘুম আচমকা ভেঙ্গে গেলে যেমনটা হয় আরকি! এছাড়াও করোনা কালীন লক ডাউন চলছে, মসজিদে সাস্থ্যবিধি মেনে বসলে বাকী অনেকেরই জায়গা হয়না, রুমেই ফিরে আসতে হয় তখন।
নামাজ শেষে ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলো,যতই ক্লান্তি থাক আবিদের বিনোদনের একমাত্র সঙ্গী তার এই ফোন এবং ফেসবুক। এগারোটা থেকে যে কখন একটা বেজেছে তার খেয়াল নেই। প্রতিদিন তিনটায় জেগে সে তাহাজ্জুদ পড়ে,তারপর সেহরি করে ফজরের নামাজ পড়ে সকাল হওয়া পর্যন্ত কোরান তিলাওয়াত করে।
সে ভাবলো,এখন ঘুমালে তিনটায় আর জাগা পাবেনা,মাত্র দুই ঘন্টাই তো। একার জন্য হলে ঘুমানো যাইতো কিন্তু রিতাকে জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব টাও তার কাঁধে,রিতার ইউনিটের মেয়েরা খুব একটা রোজা নামাজ কালাম পড়ে না,কেউ ডাকেনা শেষ রাতে,এ জন্য সে আবিদকে বলে রেখেছে প্রতিদিন তিনটায় উঠে তাহাজ্জুদ পড়বে এবং সেহরি করবে তাকে যেন কল করে জাগিয়ে দেয়। এ রকম ভাবেই পার করেছে এগারোটা রোজা।
ঠিক তিনটায় আবিদ রিতাকে কল দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে নিজেও অজু করে এসে তাহাজ্জুদ পরে যথারিতি সেহরি ও ফজর পড়ে কোরান তেলাওয়াত করলো। আর এ ভাবেই সারা রাতে তার এক ফোটাও ঘুম হলোনা। সকালের দিকে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা শুরু হলো,ঘুমোতে চেষ্টা করেও ব্যার্থ হলো মশার অত্যাচার আর রোদের গরমে। শরীর রিতিমতো জ্বালা করতে শুরু করেছে,রিতাকে মেসেজে তা জানালো। রিতা আবিদকে গোসল করে ঘুমাইতে বললো। আবিদ গিয়ে দেখলো ট্যাপের পানি যথেষ্ট গরম হয়ে আছে। কোনো রকমে ফ্যানের নিচে পড়ে থেকে কাতরাতে শুরু করলো,রোজা থাকার জন্য ঔষধ কিনতে যেতেও প্রয়োজন বোধ করলো না। কি মনে করে আবিদ মাক্স পড়ে বাহিরে বের হলো,ফাপর করলে সে বাহিরে গিয়ে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে। আর আজ ঘুরতে গেলো রিতাদের মেসের দিকেই,মেসের কাছে গিয়ে আবিদ রিতাকে কল করলো নিচে আসার জন্য। একটু পর রিতা এলো
-কি রে,এখন শরীর কেমন? ডাক্তার দেখাইছিলি?
-আমার প্রচন্দ মাথাব্যাথা,অসস্থি হচ্ছে খুব। কোথাও শান্তি পাচ্ছিনা।
-আঘাত পাইছিস তো তার উপর আবার সারারাত জেগে ছিলি এ জন্য এ অবস্থা
এ কথা বলতে বলতেই রিতা আবিদের কপালে হাত দিয়ে রিতিমত চমকে উঠলো
-এ কি রে! তোর শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। এ শরীর নিয়ে বাহিরে বের হইছিস? এখনকার জ্বর হওয়া মানে বিরাট কিছু,চারিদিকে করোনার উপদ্রব। একটা কথা যদি শুনিস আমার! পই পই করে বললাম ডাক্তার দেখা শুনলি না।
আবিদ কোনো উত্তর দিলোনা,অপলক তাকিয়ে থাকলো রিতার দিকে,রিতা বকাঝকা করেই যাচ্ছে।
-কি রে? এ ভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? যা জিজ্ঞেস করছি জবাব দে,নিজেকে খুব শক্তিশালী ভাবিস তাইনাহ যে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন মনে করিস না। ভালো,চল নিজের মর্জি মতো…
এ বলে রিতা মেসে ফেরত গেলো। আবিদ বুঝে উঠতে পারলোনা মেয়েটা এতো রিয়্যাক্ট করলো কেন? সে এখন কি করবে? এ ভাবেই দারিয়ে থাকবে নাকি নিজের মেসে ফেরত যাবে? রিতা তো তাকে দারাতে বা যেতেও বলে গেলো না। শরীরের যা খারাপ অবস্থা, লোক লজ্জার ভয় না থাকলে আবিদ ওখানেই শুয়ে পড়লে কিছুটা আরাম পেতো। একটু পর রিতা ফিরে এলো। বোরখা পড়েছে সাথে ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়েছে। এসেই আবিদকে বললো
-চল আমার সাথে…
-কোথায়?
-জান্নাতের দস্তরখানায়! যেখানে নিয়ে যাই মুখ বন্ধ করে সাথে যাবি…বেশি কথা বলবি না।
-আমার হাটতে ইচ্ছা করছে না…
-এক মাইর দিবো চল আমার সাথে।
রিতা আবিদকে নিয়ে কাছেরই একটা ফার্মেসির দোকানে গেলো
-আংকেল দেখেন তো ওকে কি ঔষধ দেওয়া যায়,ওই হারামি তোর কি কি সমস্যা বল এখন…
ডাক্তারও কথা কেড়ে নিয়ে বললো,
-বলো কি সমস্যা?
আবিদ বললো- শুধু মাথা ব্যাথা,নাপা এক্সট্রা খেলেই ঠিক হয়ে যাবো।
রিতা- এক উষ্টা মারবো,তুই ডাক্তার হয়েগেছিস নাহ? নাপা খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। জ্বরের কথা কে বলবে শুনি? তারপর হাতটাও দেখা…
ডাক্তার ওদের ঝগড়া দেখে মুচকি হেসে বললো,
-বাহ্! দারুন জুটি তো তোমাদের,বেশ টক-মিষ্টি সম্পর্ক।
ডাক্তার থার্মোমিটার দিয়ে চেক করলেন,কয়েকটা ঔষধ দিয়ে বললেন,
-জ্বর হওয়ার সাথে সাথেই ঔষধ খেতে নেই,দুই চার ঘন্টা পার হোক তারপর থেকে ঔষধগুলো খাওয়ায়ে দিয়ো,গ্যাষ্টিকের ঔষধটা খালি পেটে খাবে আর বাকিগুলো খাবারের পর। আর মলমটা কাটা জায়গায় লাগানোর জন্য…
ওরা ঔষধ নিয়ে ফিরে এলো,রিতার মেসের কাছে এসে বললো,
-কি রে মেসে যেতে পারবি তো?
-হুম
-বেশি শরীর খারাপ?
-হুম।
রিতা ঔষধগুলো আবিদের হাতে দিয়ে মেসে ঢুকলো,কি মনে করে আবার ফিরে এসে আবিদকে ডাক দিলো,
-আবিদ শোন…
-হ্যাঁ…
-এখানে একটু রেষ্ট নে,৫টার দিকে মেসে ফেরত যাস্।
-তোর এটা তো মেয়েদের মেস,আমি গেলে প্রবলেম হবেনা?
-হবে,তবে আমি সামলে নিতে পারবো আয়।
রিতা রুমে নিয়ে গিয়ে আবিদের মাথায় পানি দিয়ে দিলো,
-কি রে,তোর যে এমন শরীর খারাপ এটা আংকেল আন্টিকে জানাইছিস?
-না…
-কল দে,আমি কথা বলছি…
-দরকার নাই,কয়েকদিন হলো তারা আমার কোনে খোঁজ খবর নেয়না। এখন জানানোর দরকার নাই,আমি মরে গেলে তাদেরকে খবর দিস্
-চুপ সয়তান! এ সব কথা মুখেও আনবিনা। এমনিতেই শহরের অবস্থা খারাপ চারিদিকে লক ডাউন। অনেক পড়া বাকি আছে এখনো,তোর ফালতু বক বক শোনার ইচ্ছে নাই। চুপ করে শুয়ে থাক এখন,আমি পড়তে বসবো। একটু পর এসে তোকে তোর মেস পর্যন্ত আগায়ে দিয়ে আসবোনি।
-আচ্ছা…
পড়তে বসবো বলার পরেও রিতা পড়তে বসলো না,আবিদের পাশে বসে রইলো। একটু পর পর মাথায় হাত দিয়ে তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা করলো।
-কি রে,এখন কেমন ফিল করছিস? রোজা ভাংবি কি? বেশি খারাপ লাগলে ঔষধ খেয়ে নে,আমি পানি এনে দিচ্ছি।
-না,বেশি খারাপ লাগছেনা,আমি এখন মেসে ফেরত যেতে পারবো…
-ঠিক তো?
-হ্যাঁ…
-আচ্ছা,যা…
আবিদ বেরিয়ে যেতেই মেসের মেয়েরা রিতার উপর হামলে পড়লো
-ছেলেটা কে রে রিতা? পারমিশন না নিয়ে হুট করে একটা ছেলেকে মেসে ঢুকালি,মেসে তো তুই একা না আরও মেয়ে আছে? কে কি মাইন্ড করলো কে জানে! বয়ফ্রেন্ড নাকি!
-ছেলেটা আমার কলেজ ফ্রেন্ড,অসুস্থ ছিলো তাই কিছু সময়ের জন্য রেষ্ট নিতে আনছিলাম। তোমরা তো দেখলেই ওর কতটা শরীর খারাপ।
-হুম দেখলাম,আর এটাও দেখলাম যে তুই তাকে কত্ত ভালোবাসিস। ভালোবাসা লুকানোর জিনিস না,ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
-না জেনে শুনে কিছু বলোনা প্লিজ…সে এসেছিলো এখন চলে গেছে ব্যাপারটা মিটে গেছে,এ বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে কি লাভ?

সন্ধ্যাবেলা রিতার মেসেজ
-কি রে,এখন শরীরের অবস্থা কেমন? ইফতার করছিস?
-হুম…
-ইফতার করে ঔষধগুলো খেয়ে রেষ্ট নে,এশা আরো ঘন্টাখানেক সময় আছে।
-আচ্ছা…

এশার পর প্রায় ১০টা ৮মিনিটে আবারও রিতার কল
-নামাজ হলো?
-আট রাকাত তারাবি পড়ছি,শরীর খারাপ পড়তে পারিনি।
-ঔষধ খাসনি?
-খাইছি তো…
-ওকে,এমনিই ঠিক হয়ে যাবি। টেনশান নিস না…
-আমি তো টেনশান মুক্তই আছি,আমার মনে হয় তুই টেনশান করতেছিস। আর কারণটা সম্ভবত আমি…
-সর্বজান্তা হয়ে গেছিস তাইনা?
-হুম,আর আমি জানি তোর মনে এখন কি চলছে,বলবো? শুনবি?
-থাক,দরকার নাই বলার।
এটুকু বলেই রিতা কলটা কেটে দিলো।

একটু পর আবার মেসেজ দিলো
-সাদে ওঠ…
-কেন?
-ওঠনা,গেলেই বুঝতে পারবি…
-যেতে ইচ্ছা করছে না,এ শরীর নিয়ে চার তলায় ওঠা কষ্টকর।
-বেশি বকবক করলে উষ্টা মারবো।
-আচ্ছা যাচ্ছি।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর আবার রিতার কল
-কি রে কোথায় তুই?
-ছাদে
-দেখতে পাচ্ছিস?
-হুম,আজকের চাঁদটা খুব সুন্দর।
-এ জন্যই তো জোর করে ছাদে উঠালাম তোকে,এখন কেমন লাগছে?
-সব কিছুই ভালো লাগতেছে,চাঁদ ভালো লাগতেছে,দুরের আলোময় বিল্ডিংগুলোও ভালো লাগতেছে,এই ঠান্ডা বাতাস ভাল্লাগতেছে,আর জ্বরটাও এখন ভালো লাগতেছে। মাথাব্যাথাটাকে এখন মিউজিক বাজানোর মতো মনে হচ্ছে। বাতাসগুলোকে মনে হচ্ছে ডাকপিয়ন,তোর শরীর ছুয়ে এই মাত্রই যেনো আমার কাছে ছুটে আসতেছে তোর সংবাদ দেবার জন্য।
-কি যা তা বলছিস,বেশি বেশি…
-একটুও বেশি বলছিনা,তোর মন এর চেয়েও বেশি শুনতে চায়,মুখে প্রকাশ না করলেও ভালোবাসা টের পাওয়া যায়।
-তুই টের পাস?
-হুম…
-আকাশে তাকিয়ে দেখ চাঁদেরও কিন্তু কলঙ্ক আছে…
-কই কলঙ্ক? আমার তো মনে হয় ওটা চাঁদের অলংকার,আর শুধু অলংকার না, তার পছন্দের অলংকার যেটা ও মাঝে মাঝেই গলায় পরে পৃথিবীর মানুষদেরকে জানিয়ে দেয় দেখো এটায় আমার পছন্দের দামি অলংকার।
রিতার চোখ জলে ভিজে উঠলো,হয়তো আনন্দে নয়তো অজানা কোনো কষ্টে…

~ হা বী ব

পরে পড়বো
৫৯
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন