🌸
শীতের সকালের মিষ্টি রোদে সবার মন ফুরফুরে থাকলেও তবিবুরের প্রতিদিনের শুরু হয় বকা-ঝকা আর গাল-মন্দ করে।
–হাড় গোড় ভাঙ্গে না কেনো? হারামির বাচ্চারা মরে না কেনো ? এতো মানুষ মরে এই দুনিয়ার বজ্জাতগুলোরে আল্লাহ চোখে দেখে দেখে না কেনো ??
এ সব বলতে বলতেই তবিবুর সকাল পার করে।
তবিবুর গ্রামের খেজুর গাছ গুলো পত্তন নিয়েছেন গেরস্থিদের কাছ থেকে। কিন্তু,প্রতিদিন যে কোনো একটা গাছের খেজুরের রসের পাতিল শূন্য হয়ে যায় । কোন এক অদৃশ্য চোর এই কৃত কার্যটা করে তার জানা নাই । আর তাই তো প্রতিদিন সকাল সকাল তবিবুরের মুখ থেকে নিঃসৃত হয় এমন শান্তির বানী।
কিন্তু,আজ সব পাতিলের রসই ঠিক আছে কোনটাই চুরি হয় নি ।
তবিবুর মনে মনে একটু খুশি হয়,যাক্ তাহলে আজ কোনো রসই চুরি হয় নি ।গ্রামের দুরন্ত বালক নাজমুল । তার জ্বালায় গাছের রস,কচি ডাব,ফল ফলাদি কিছুই আস্ত থাকতো না । চুরি করে কারো গাছের কিছু না খেলে তার যেনো পেটের ভাত হজম হয় না । আর এই নাজমুল আজ মরণ ব্যাধি নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি । অবস্থা খুবই আশংকা জনক । এই নাজমুলই তবিবুরেে গাছের রস চুরি করে খেতো। ডাক্তার তাকে বলেছে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার ফলেই তার এই রোগ হয়েছে । বাদুরের মাধ্যমে নাকি এই রোগ ছড়ায় ।
তাই তো নাজমুল আজ খুব অনুতপ্ত । মৃত্যু তার খুবই সন্নিকটে । কেনো সে তবিবুরের গাছ থেকে রস চুরি করে খেতে গেলো । তার কাছে মনে হচ্ছে তবিবুরের কাছে মাফ চাওয়া দরকার । মাপ পাওয়া না গেলে তো সে যে মরেও শান্তি পাবেনা ।
তবিবুরকে হাসপাতালে খবর দেওয়া হয়েছে মৃত্যু পথ যাত্রী নাজমুলকে দেখে আসার জন্য। কিন্তু,তাকে কেনো খবর দেওয়া হয়েছে সে বুঝতে পারছে না।কারণ,গ্রামের নাজমুল ছেলেটি তার কোন আত্মীয় স্বজন নয়।
তবিবুর বসে আছে নাজমুলের হাত ধরে । ছেলেটি শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে । নাজমুলের চোখে ছল ছল জল, আর করুণ চেহারা একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায় । কান্না জড়িয়ে নাজমুল,তবিবুর কে বলতে থাকে,
–চাচা আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দেন। আমি প্রতিদিন আপনার গাছের রস চুরি করে খেতাম । তাই তো আল্লাহ আমাকে এই শাস্তি দিলো। আপনি মাফ না করলে তো আমি মরেও শান্তি পাব না ।
তবিবুর কি বলবে ভেবে পায় না । সে নিজেই তো দোষি তার কাছে, কারণ তার অভিশাপেই তো নাজমুল আজ মৃত্যু সজ্জায় । নিজেকে খুব দোষি আর অপরাধী মনে হয় তবিবুরের ।
নাজমুলের করুন চাহনি করুন আবেদন তবিবুরের হৃদয়ের আকাশ এবারের লন্ড ভন্ড করে দেয় । তবিবুর হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে,
–বাপরে… বরংচ তুই আমারে মাপ করে দে, আমি তোরে অভিশাপ দিছি তোর মৃত্যু কামনা করছি । আমি তোরে হত্যা করছি বাপজান, আমারে মাপ করে দে ।
তবিবুর নিচু হয়ে নাজমুলকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে । সেই কাঁদায় নেই কোন অভিশাপ আছে শুধু একরাশ ভালোবাসা ।
তবিবুর এক পাতিল রস নিয়ে জ্বাল দিচ্ছে । উদ্দেশ্য নাজমুলের জন্য নিয়ে যাবে হাসপাতালে । পরম মমতায় নাড়া দিচ্ছে রস গুলো আর মনে মনে বলছে আল্লাহ নাজমুলকে তুমি ভালো করে দেও, আল্লাহ ভালো করে দেও ।
পরের দিন…
তবিবুরের হাতে এক পাতিল রস। সে এসেছে নাজমুল কে দেখতে,কিন্তু একি! নাজমুলের কেবিনে এতো ভিড় কেনো ?
কাছাকাছি আসতেই কান্নার আওয়াজ আসলো তার কানে । যা বোঝার বুঝে গেলো সে । নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না । হাত থেকে রসের পাতিল ফসকে গেলো । রস গুলো সব ছড়িয়ে গেলো হাসপাতালের ফ্লোরে । কিন্তু নাজমুলের কাছ অব্দি পৌঁছালো না সেই রস। কিন্তু,পৌঁছানো উচিত ছিলো কারণ,এই রস ভালোবাসার রস অভিশাপের না।
তবিবুরের আর নাজমুলের মরা মুখটা দেখার সাহস হলো না । ক্লান্ত পায়ে বেড়িয়ে আসলো হাসপাতালের করিডোর থেকে। আর পেছনে রেখে আসলো অভিশপ্ত নাজমুল কে । নিজেকে ধিক্কার ছাড়া আর কিছুই দিতে পারছে না সে । হায় হায় কি করলো সে একটা তাজা প্রাণ কে নিঃশেষ করে দিলো!
বিঃদ্র- অন্যের গাছের ফল বা রস কিছুই চুরি করে খেতে নেই এমন কি কারোর কোনো প্রকার ক্ষতি করতে নেই কারণ, অভিশাপ খুব খারাপ একটা জিনিস । আর কাউকে অভিশাপও দিতে নেই কারণ, অনেক সময় সেই অভিশাপ রেডিয়েসনের মতো কিভাবে অপরকে আঘাত হানবে সেটা আমরা কেউ বলতে পারিনা। কারণ,দোয়া যদি কাজে লাগে তাহলে,অভিশাপ ও লেগে যায়,কারণ,প্রকৃতি কারোর প্রতি অবিচার করেন না।
অনুগল্প-রস চুরি
লেখা~হাবীব

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন