সন্দেহ
সন্দেহ
হাবীব

গল্প - সন্দেহ

হাবীব
রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অন্যান, রহস্য

কবির তার স্ত্রী’র ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো।
তার স্ত্রী রুমির কড়া আদেশ ছিলো”সিগারেট খাওয়া চলবেনা।”
আজ রুমি কবিরকে এই অবস্থায় দেখলে অনেক রেগে যেতো। কিন্তু,সেই অবকাশ আর নেই।
আকাশে ঘন মেঘ করেছে,মাঝে মাঝেই গর্জন করে উঠছে বজ্রসহ। একটা থমথমে ভাব সারা ঘর জুড়ে আর একটা গুমোট পরিস্থিতি।
কবির বার বার তার স্ত্রী’র ছবির দিকে তাকিয়ে বোঝবার চেষ্টা করছিলো সে তার স্ত্রীকে মিস করছে কিনা! কিন্তু কই,তার কষ্ট হচ্ছে নাতো?
সে সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে মনে মনে বললো,
-রুমি,তুমি তো বলতে তুমি অনেক দুরে চলে গেলেও আমার পাশে থাকবে, কিন্তু কই?? তোমার ছবিটাও আজ তোমার মতই মৃত।
কবির তার বেডরুমে গিয়ে খাটে বসলো। রুমির মৃত নিথর দেহটার পাশে বসে তার হাতটি চেপে ধরলো।
নিথর ঠান্ডা হাত!
কবির মৃত রুমির কানের কাছে গিয়ে বললো,
-কই,তুমিতো বলেছিলে আমায় কোনোদিন ছেড়ে যাবেনা,আজ কি হলো? আমি তো আজ থেকে মুক্ত!
সে রুমির মৃতদেহের পাশে শুয়ে নিজের ফোনটা তুলে একটা মেয়ের ছবি তার স্ত্রী’র নিথর মুখটির সামনে তুলে ধরলো।
-দেখো,এই মেয়েটার নাম নীলা। এ কিন্তু আজও বেঁচে রয়েছে,আর তোমায় দেখো…যার জন্য এতো ঝগড়া করলে এতো অশান্তি করলে সে আজ জলজ্যান্ত আর তোমায় দেখো…..
তোমাকে পরিবারের সকলের অমতে বিয়ে করেছিলাম,তুমি যে অসম্ভব সন্দেহবাতিক এটা জেনেও। তবে তখন তোমায় একটা কথা বলা হয়নি যে,আমি তাদেরকে সহ্য করতে পারিনা যারা মানুষকে সন্দেহ করে।
সজোরে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। হঠাৎ বাইরের গুমোট পরিবেশ ভেঙ্গে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নেমে এলো।
খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির জল এসে পড়লো খাটে,ঝড়ো হাওয়ায় টেবিলের উপরে রাখা একটা ছবির ফ্রেম মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে গেলো।
কবির জানালাটা বন্ধ করে দিলো,তার চোখ গেলো রুমির মুখের দিকে। বৃষ্টির জলে তার মুখটা কেমন জীবন্ত লাগছে।
হঠাৎ’ই কবিরের বুকটা ধড়াস করে ওঠে,সে তার হাতটি রুমির নাকের কাছে ধরে। নাহ! সে সারাজীবনের মতো ঘুমিয়েছে।
দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঠিক বারোটা এক বাজে। না, আর দেরি করে লাভ নেই,বাহিরে যা পরিবেশ তাতে এখন কেউ দেখতে আসবেনা কে কোথায় যাচ্ছে। এই ভেবে কবির রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।
খাবারগুলো এখনো গরম রয়েছে,ভাত,মাছের মাথা দিয়ে ঝোল,আর আলুর তরকারি।
বিকেল থেকে কিচ্ছু পেটে পড়েনি,খাবারগুলো দেখতেই তার পেটটা চোঁ চোঁ করে উঠলো,কিন্তু না।
আগে কাজটা সম্পন্ন করতে হবে,এই ভেবে সে আবার লেগে পড়লো ধাঁরালো কিছু খোঁজার জন্য,তবে একটা ছুরি ছাড়া কিছুই পেলোনা সে। তাই ওটা নিয়েই বেডরুমে ফিরে এলো কবির।
মাটিতে একটা প্লাস্টিকের পলিথিন পেতে তার উপর রুমির দেহটাকে শুইয়ে দিলো। এরপর….???
কাটতে হবে রুমির সারাটা শরীর টুকরো টুকরো করে। প্লাস্টিকে মুড়ে প্যাকেট করে ফেলে আসতে হবে গঙ্গায়।
আবার একটি সিগারেট ধরালো সে।
মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মারা পর্যন্ত ঠিক ছিলো,কিন্তু এখন? এতসব কি আদৌ হবে তার দ্বারা??
ছুরিটা রুমির হাতের কব্জিতে কয়েকবার ফেসিয়েও তার হাত কাটতে পারলো না,কবির ভাবে কি করা যায়!
এ তো মহা ঝামেলা হলো!
তবে,যার কেউ নাই তার গুগল ইউটিউব আছে। তৎক্ষনাৎ,ফোনটা তুলে সার্চবারে লিখলো,”How to cut a Human Body easyly”
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকশো পন্থা সামনে হাজির।
এক এক করে ভিডিওগুলো দেখতে আরম্ভ করলো কবির। কতো রকমের পন্থা,রিতিমত এক একটা করে পন্থাগুলো গিলছে সে,এমন সময় দরজায় কড়া পড়তেই কানগুলো খাঁড়া হয়ে গেলো তার। সামনের আয়নাতে তার মুখটি নজরে এলো,তার মুখে যেনো এক শিকারীর ছাপ স্পষ্ট।
বেডরুমের দরজাটা বাহিরে থেকে বন্ধ করে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজার আই গ্লাসে চোখ লাগাতেই দেখতে পেলো বাইরে তার ফ্ল্যাট এর সিকিউরিটি গার্ড দাড়িয়ে আছে। দরজা খুলে কবির বললো,
-কি চাই?
-স্যার,আপনার সাথে একজন ম্যাডাম দেখা করতে এসেছেন।
-আমার সাথে এ সময়ে কে দেখা করবে?
একটা ভেজা ছাতা নিয়ে একটা মেয়ে এসে হাজির হলো দরজার সামনে। কবির তার মুখটা দেখে চিনতে পারলো।
মেয়েটা তার অফিসের সহকর্মী নীলা।
নিরবতা কাটিয়ে নীলা বললো,
-আসলে অসম্ভব বৃষ্টি পড়ছে,আমি এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম,মনে পড়লো আপনি থাকেন তাই আপনার বাড়িতে বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করি।
কবির চায়নি নীলাকে ঘরে এনে বসাতে,কিন্ত সিকিউরিটি গার্ডটা এমনভাবে তাকিয়েছিলো আর একটু হলেই রুমির কথা জিজ্ঞেস করতো।
নীলা ডাইনিং রুমের সোফাটিতে বসে চারিদিক দেখতে লাগলো,
-আমি এরকম হঠাৎ করে চলে এলাম,আপনাকে বিরক্ত করলাম না তো!?
-বিরক্তবোধ করছিই তো,একটা খুন অর্ধেক হয়ে রয়েছে ওটা পুরো করতে হবে।
-আপনি অফিসেও যেমন,বাড়িতেও তেমনই দেখছি,ভাবীকে কোথাও দেখছিনা!
-ও আসলে একটা বন্ধুর বাড়ি গেছে আজ ও সেখানেই থাকবে।
-মানে আপনি আজ রাতে একা!???
এ পর্যায়ে বাইরে সজোরে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো…
নীলার ফোনে বেশ কয়েকবার কল এলো। নীলা বার বারই কলটা কেটে দিলো। কবির বললো,
-কলটা ধরছো না যে!
-কলটা আমার Husband এর,এখনই হাজার একটা প্রশ্ন করবে আর এখন এতো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমি এই রাতটা খারাপ করতে চাইনা…
-মানে!
-বলছিলাম যে আমার প্রমোশন এর ব্যাপারে আপনি কি ভাবলেন?
নীলা তার চুড়িদার এর ওড়না সোফার একপাশে রেখে সামনে এগিয়ে এসে বসলো।
-সে বিষয়ে আমি তোমাকে অফিসেই বলেছি,এখন অফিসের কথা কি না বললেই নয়?
-তাহলে কিসের কথা বলবো বলুন!
এই বলে নীলা তার পায়ের উপর আরেকটা পা তুলে সোফায় হেলান দিয়ে বসলো।
নীলার স্কীনফিট পাজামাতে বার বার কবিরের চোখ আটকে যাচ্ছিলো।
-আপনি চা বা কফি কিছু খাবেন?
-না,আপাতত আপনি বসুন পাশে
কবির নীলার সামনের সোফাটিতে বসলো। সে অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে মেয়েটির নিশ্চয় কোনো মতলব আছে। আর যতটা সরল সে মেয়েটিকে ভাবছে সেরকম সরল নয় মেয়েটি।
-আপনি জানেন আপনার জন্য আমার বাড়িতে কত অশান্তি হয়েছে? আপনি আমার স্ত্রী কে একদিন ফোন করে বলেছেন আমি নাকি আপনার সাথে আলাদা করে দেখা করতে চাই!ঘুরতে চাই! রেস্টোরাতে খেতে চাই কই আমিতো আপনাকে এমন কিছুই বলিনি কোনোদিন।
-আপনি সত্যি বলুন তো,আপনি আমার সাথে আলাদা করে দেখা করতে চান না!?
-কখনোই না…
-তাহলে আমার দিকে অফিসে ও রকম ভাবে তাকিয়ে থাকেন কেনো? আমি কি কিছুই বুঝিনা নাকি!
-কেনো চেয়ে থাকি জানো? তোমার চামড়াটা আমার বড্ড পছন্দের, দেখলেই ছিনিয়ে নিতে ইচ্ছা করে। বাঘ হরিণের দিকে তাকিয়ে থাকে তার সুস্বাদু নরম মাংসের কথা ভেবে,তার সাথে ঘুরতে যাবে ভেবে নয়।
নীলা তার জায়গা থেকে উঠে কবিরের সামনে দাড়িয়ে একটু ঝুঁকে মুখোমুখি হয়ে বললো,
-বাঘ শুধু চেয়ে থাকেনা,ছিনিয়ে নিতে জানে…
-সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছি,ছিনিয়ে এবার নেবই।
এই বলে কবির উঠে দাঁড়ায়,নীলার গালে একবার নিজের হাতটা ছুঁয়ে নীলাকে বসতে বলে নিজের বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায়। দরজাটা খুলে ভেতর থেকে ছুরিটা হাতে তুলে নিয়ে সে আবার ডাইনিং এ ফিরে আসে। কিন্তু নীলাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে সে যেই রান্নাঘরের দিকে এগুতে যাবে ঠিক তখনই হঠাৎ তার মাথায় নীলা একটি হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতেই কবির মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কপালের একটা দিক থেঁতো হয়ে যায় এবং খানিকটা রক্ত চুঁইয়ে পরে খানিকটা জমে যায়।
নীলা দেহটার সামনে বসে পরে এবং কবিরের মুখটির দিকে তাকিয়ে বললো,
-যতদিন তুই আছিস অফিসে,ততদিন আমার প্রমোশন তুই হতে দিবিনা,সালা এবার দেখি কে আটকায়!
এই বলে সে বেরিয়ে যাচ্ছিলো এমন সময় সে দেখতে পায় বেডরুমের দরজাটা খোলা,তার কি মনে হলো! সে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায়,এবং ঘরে ঢুকতেই নীলার বুকটা ধড়াস্ করে ওঠে।
সে দেখতে পায় কবিরের স্ত্রী মাটিতে চিতপটাং হয়ে পড়ে রয়েছে। ভয়ে তার সমস্ত গা ঠান্ডা হয়ে যায়,তক্ষুনি দরজায় আরেকবার কড়া পরে। বুকটা আবার ধড়াস্ করে ওঠে নীলার। সে আস্তে আস্তে দরজার দিকে গিয়ে আই গ্লাসে চোখ রাখতেই দেখতে পায় বাহিরে কেউ নেই। ভয়ে তার সমস্ত হাত পা কাঁপতে থাকে,সে তার ব্যাগটি আর ছাতাটি তুলে হাতে ফোনটি নিয়ে দরজা খুলে বেরোতে যায় এমন সময় আবারো তার স্বামির ফোন আসে। সে দেখতে পায় সিঁড়ির কাছে একটি লোক মুখে মুখোশ পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ফোন।
লোকটি পকেট থেকে একটি বন্দুক বের করে গুলি চালায় নীলার বুকে। সাইলেন্সার লাগানোর ফলে আওয়াজ হলো না। মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
লোকটি এগিয় এসে নীলার হাত থেকে তার ফোনটি নিয়ে নিজের কাছে রাখে এবং বলে,
-তাদের এ রকমটায় হয় যারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তুমি আমার বউ হবার যোগ্য না।
এই বলে লোকটি হাঁটতে হাঁটতে নিচে নেমে আসে। সিকিউরিটি গার্ডটা দাঁড়িয়ে আছে,তার হাতে বেশ কিছু টাকা ধরিয়ে দেয় সে এবং জিজ্ঞেস করে,
-এখন বল,আমি কে??
-আপনি! আপনি কে বলুন তো!???
-আজ রাতে কোথায় ছিলি??
-সাড়ে এগারোটার পর বৃষ্টি হচ্ছিলো,আমি পাশের হোটেলে খেতে গিয়ে আটকে পড়েছিলাম।
-Good,বৃষ্টি থামলে পুলিশে খবর দিয়ে দিস…
-ওকে বস্
.
সে রাতে বৃষ্টি থামেনি…

🌸🌸🌸
গল্পঃ সন্দেহ
~ হা বী ব

পরে পড়বো
৫৩
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন