সমুদ্রের কিনারা দিয়ে ভেসে আসা ছোট ছোট ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে ভিজিয়ে ছপ ছপ পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে নয় অথবা দশ বছরের একটা মেয়ে।
হলুদ ফ্রকের নিচের অংশ খানিকটা ভেজা আর তাতে লেপ্টে রয়েছে সমুদ্রের বালি,হয়তো উচু নিচু জায়গায় পা পড়ে ঢেউয়ের পানিতে ফ্রকের নিচের অংশটা এভাবে ভিজে গেছে।
মেয়েটা ভয় আর বিষ্ময় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,তার চাহনি যেনো কাউকে খুঁজছে…
বিচের এদিকটাতে টুরিষ্টরা আসে না। বলতে গেলে একদম শেষ প্রান্ত। জেলেদের বস্তি ছাড়িয়ে ঝাউয়ের বন লম্বা হাইওয়ের কাছে বেশ ঘন হয়েছে।
ভিজে বালি থেকে এবার পা পড়লো শুকনো চিকচিকে সাদা বালির ওপর। ভিজে পায়ে শুকনো বালিগুলো আঠার মতোই আটকে গেলো…
ডানদিকে তাকিয়ে মেয়েটা দেখলো ঝাউবনের পিছনে সূর্য ডুবে গেছে। আকাশ ক্রমশ ওপরের দিকে লাল থেকে ঘন বেগুনি হতে শুরু করেছে। বামদিকে তাকিয়ে দেখলো অনেক অনেক দুরে যেখানে সমুদ্রটা বাঁক নিয়েছে সেখানে বিচের ধারে দোকানগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে।
এতো দূর থেকে অন্ধকারে সেগুলোকে একঝাঁক জোনাকীর মতো লাগছে। মেয়েটা পাথরের রাস্তায় উঠে টলতে টলতে ডান দিকের জংগলের দিকে হাঁটতে শুরু করলো…
ঝাঁউবনের ধারে একটা ভাঙ্গা নৌকার ওপর বসে অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটাকে লক্ষ্য করছিলো একটা লোক। মেয়েটার ফর্সা গোলগাল চেহারা দেখে ভাবে নিশ্চয় বড়লোকের মেয়ে। কয়েক বোতল মদ গিলে ভাঙ্গা নৌকাটাতে শুয়ে গাছের ছায়ায় জবরদস্ত ঘুম ঘুমিয়েছিলো দুপুরে। উঠে বসেই চোখ মেলে দেখে একটা বাচ্চা মেয়ে একটু দুরে সমুদ্রের পাড় থেকে উঠে আসছে। গাছের আড়াল থেকে ভালো করে দেখে লোকটা বুঝলো,ধারে কাছে কেউ নেই।
মেয়েটা তারমানে একা,কোনো রকমে হয়তো রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। শালা মাসখানেক হয়ে গেছে কোনো শরীরের স্বাদ নেয়নি,শেষের বারেও পেয়েছিলো হানিমুনে ঘুরতে আসা একটা নতুন বউকে। এ জায়গাটার খুব বদনাম। এখানকার লোকজন বিকেল থেকেই আর এই জংগলের ধার মারায় না।
জঙ্গলে নাকি অপশক্তি আছে। তার মতো লোকদের ওসব ভয় করলে চলে না।
লোকজন যেখানে আসেনা সেখানেই তাদের মতো লোকজনদের কাজের অনেক সুবিধা। এদিকে বড় দল ছাড়া টুরিষ্টরাও আসে না খুব একটা। আহা! এমন কচি মেয়ে শিকার করে লালসা মেটানোর তৃপ্তিই অন্যরকম,মনে মনে হাসলো সে।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে দিগন্তে যেখানে সমুদ্র আকাশে মিশেছে বলে মনে হয় সেখানে কয়েকটা আলোর বিন্দু ভাসছে। যাই হোক আজ তার ঈদের দিন,লুঙ্গির ভেতর থেকে হাতটি বের করে ঝাউবনের দিকে মেয়েটা যেদিকে গেলো সে দিকে দ্রুতই পা বাড়ালো লোকটা
ঝাঁউবনের মধ্য দিয়ে টলতে টলতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। গাছের উপরদিয়ে ঘরে ফেরা পাখিগুলো কিচিরমিচির করছে। এই জায়গাটা বেশি ঝোঁপে ভর্তি। সন্ধ্যে প্রায় নেমে এসেছে। মেয়েটা কাঁপা কাঁপা গলায় ডাক দিলো
-“ভাই…,ওই ভাই…তুই কোথায়??
লোকটা এগিয়ে এসেই হাত রাখলো মেয়েটির কাধে। ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। তার এই কাপুনি দেখে লোকটা কালো ছোপ ধরা দাঁত বের করে হেসে বললো,
-ভয় নাই মামণি,আমি খুব ভালো লোক। তোমার বাবা মা কোথায়?
দুদিকে মাথা নেড়ে মেয়েটা বললো,”জানিনা”…
-সন্ধ্যেবেলা একা একা জঙ্গলে কি করছো তুমি??
-আমি আমার ভাই কে খুঁজছি,কোথাও দেখতে পাচ্ছিনা। আমার ভাইটার খুব ক্ষিদে পেয়েছে জানো?? খুব ছোটো তো তাই খিদে পায়…
অন্ধকারে লোকটার লোলুপ দৃষ্টিদুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে নিচু হয়ে মেয়েটার মুখের কাছে মুখ এনে সাপের মতো ফিসফিসিয়ে বললো,
-আমার সাথে যাবে?? অনেক খাবার দেবো,চকলেট দেবো,খুব খুব আদর করবো…
-ভাই কে না নিয়ে যাবো না,ওকে আগে খুঁজি। তারপর দুজনে একসাথে খাবো আমারো যে বড্ড খিদে পেয়েছে…
এক মুহুর্ত কি যেন চিন্তা করে লোকটা বললো,
-আচ্ছা চলো…
জঙ্গলের ভিতর দিকে লোকটার হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো মেয়েটা। মাঝে মাঝে চিকন কন্ঠে “ভাই…ভাই…” বলে ডাকতে লাগলো। আকাশে পুর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে অদ্ভুত আলোছায়ার খেলা শুরু করেছে। বেশ কিছুক্ষণ পর আর সহ্য করতে পারলো না লোকটা। চোখের সামনে একটা কচি মেয়ের শরীরের স্বাদ না নিয়ে তারপক্ষে এমন ধৈর্য্য রাখা কঠিন,সে বিরক্ত হয়ে বললো,
-তোর ভাই এখানে নেই,তুই আমার সাথে চল…
মুখটা মেয়ের কানের কাছে এনে লোকটা আবারো ফিসফিসিয়ে বললো,
-এই জঙ্গলে সন্ধ্যেবেলা বাচ্চাদের আসতে নেই। এখানে এলে আর কেউ ফেরে না বুঝলি! চল চল তাড়াতাড়ি পালিয়ে চল,নইলে তোকেও তোর ভাইয়ের মতো আর কেউ খুঁজে পাবে না…
মেয়েটা বললো,
-তুমি কি করে জানলে??
মাথায় রক্ত উঠে গেলো লোকটার,আর এমন ভালোমানুষির মুখোস পড়ে থাকা সম্ভব নয়। মেয়েটার চুলের মুঠি চেপে ধরলো এবার। মেয়েটা ককিয়ে উঠলো…
দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়িয়ে লোকটা বললো,
-আমি সব জানি,আজ তোকেও নতুন কিছু জানাবো…
কথা বলতে বলতে হঠাৎ বিকট চিৎকার দিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো লোকটা। কি যেনো একটা সাংঘাতিক কামড় বসিয়ে দিয়েছে লোকটার পায়ের পেছনের গোড়ালির ওপরের শিরাটায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। হাঁপাতে হাঁপাতে আর গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে লোকটা পা চেঁপে ধরে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।
মেয়েটা হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে বললো,
-দেখ ভাই,তোর জন্য কত্তো বড় একটা খাবার এনেছি,দু জনে একসাথে বসে খাবো কত্ত মজা হবে…
গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো তেরছা হয়ে এসে পড়েছে। লোকটা চোখ বড় বড় করে পেছনে তাকালো,দেখলো হাঁত পাঁচেক দূরে বন্য জন্তুর মতো লাফানোর আগের মুহুর্তের ভঙ্গীতে চার হাতে পায়ে হামা দিয়ে বসে আছে একটা পাঁচ ছয় বছরের বাচ্চা।
তার চোখগুলো আর যাই হোক,মানুষের মতো না।
আর হাঁ করা ক্ষুদার্থ মুখের দুদিকে দুটো দাঁত আকারে অনেকটা বড় আর ছুরির ফলার মতো চিকচিক করছে চাঁদের আলোতে…
লোকটা খুব ভয় পেয়ে অস্পষ্ট আর্তনাদ করে উঠলো। তার সারা শরীরের লোম দারিয়ে গেলো যেনো শীতের ঠান্ডা শ্রোত শির বেয়ে নেমে গেলো নিচে। ঘাড়ের কাছে গরম নিশ্বাস পড়তেই চমকে উঠে আবার বামদিকে ঘুরে মেয়েটার দিকে তাকালো। চাঁদের আলোতে দেখা গেলো মেয়েটার মুখেও ওমন তিক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো দাঁত চকচক করছে সেই সাথে মেয়েটা হিংস্র একটা অপার্থিব চাপা গর্জন দিয়ে সজোরে দাঁত দুটো বসিয়ে দিলো লোকটার গলার শিরা লক্ষ্য করে…
ছটফটানি থামতে বেশিক্ষণ লাগলো না। হলুদ দুটো চোখ লোকটার চোখে রেখে মেয়েটা এবার লোকটাকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
-তুই ঠিকই বলেছিস…সন্ধ্যা রাত্রে এই জঙ্গলে এলে কেউ ফিরে যায় না…আয় ভাই রাত অনেক হলো,গরম গরম কাঁচা মাংসের স্বাদ সামনে রেখে ধৈর্য্য নিয়ে বসে থাকাটা বিরক্তিকর…বড়ই বিরক্তিকর…
চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুটো বাচ্চা ছেলে মেয়ে খুবলে খুবলে তৃপ্তি সহকারে নিচ্ছে কাঁচা শরীরের স্বাদ!!
ছোটগল্পঃ শিকার
লেখা ~হাবীব

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন