ছিনতাইকারী
ছিনতাইকারী
হাবীব

গল্প - ছিনতাইকারী

হাবীব
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ জীবনবাদী, ভ্রমণের

শীতের রাতে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে এক দম্পতি। স্টেশনের ব্রেঞ্চিতে বসে আছে তারা, তাদের সাথে সাত বছরের একটা ছেলে,নাম তোহা । শীতের প্রভাব বেশ ভালোই পড়েছে । সবার শরীরেই গরম পোশাক, তাই আশেপাশের মানুষদের দেখে শীতটা বেশি টের পাওয়া যাচ্ছে না….

তোহা চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে । এক জায়গায় কখনো স্থির থাকে না । হঠাৎ করে তার দৃষ্টি পড়লো,ব্রেঞ্চির পেছনে প্লাট ফর্মের এক কোনায় দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে থাকা তার বয়সী একটা শিশুর প্রতি, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ছেলেটার গায়ে একটি পাতলা ছেঁড়া গেঞ্জি ছাড়া আর কিছুই নেই । দুই হাত শরীরের মাঝে জড়িয়ে শীত নিবারণের বৃথা চেষ্টা করছে ছেলেটা । মা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তোহা ছেলেটার দিকে হেঁটে গেলো। গিয়ে দেখলো ছেলেটা থরথর করে কাঁপছে । তার ছোট্ট হৃদয়ে দৃশ্যটি সহ্য হলো না । নিজের শরীর থেকে জ্যাকেট খুলে ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিলো সে। ছেলেটা কম্পিত হাতে জ্যাকেটটা হাতে নিলো কিন্তু,তার চোখে মুখে সপ্তম আশ্চর্যের বিস্ময়! ছেলেটা কৃতজ্ঞতা জানাতে কি বলবে কিছু বুঝতে পারলো না । শুধু চোখে মুখে এক টুকরো উজ্জল মায়াবি হাসি ফুটে উঠলো।

ছেলেটা কে জ্যাকেট দিয়ে তোহার নিজেরই শীত করছে খুব,কিন্তু এ নিয়ে সে চিন্তিত নয়। কারন ব্যাগে আরো দুটো জ্যাকেট তোলা আছে তার জন্য ।
— আম্মু, একটা জ্যাকেট বের করে দাও তো…
–মানে! তোমার গায়ের জ্যাকেট কোথায় ?
তোহা ছেলেটাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো,
–আম্মু,ঐ ছেলেটার না কোন গরম জামা নেই,শীতে খুব কষ্ট করছিলো তাই দিয়ে দিয়েছি ।
–কানের নিচে দিবো একটা! দাতা হাতেম তাই হয়েছো নাহ্? কার কাছে জিজ্ঞেস করে ছেলেটাকে নিজের গায়ের জ্যাকেট খুলে দিয়েছো?
–আম্মু, ওরা খুব গরিব ।
–এগুলো ওদের ভং,সব চোর ছেঁচড়ার দল…
–জ্বী না ম্যাডাম,আমরা গরিব হইতে পারি কিন্তু চোর না ।(কথার মাঝে থেকেই স্টেশনের ছেলেটা উত্তর দেয়) সে দূর থেকে দেখছিলো ভদ্র ছেলেটার মা ছেলেটাকে ইচ্ছে মতো বকা দিচ্ছে,তাই দেখেই সে এগিয়ে এসেছে।
— এই নেন ম্যাডাম,ছোট সাহেবের জ্যাকেট। শীতে কষ্ট করি কোন সমস্যা নাই তবুও হ্যারে বকা দিয়েন না ।
এতোক্ষণ তোহার বাবা কোন কথা বলেছিলেন না, এখন সে বললেন,
— আহা থাকুক না,বাবু যখন ছেলেটাকে জ্যাকেটটি দিয়েছে আর নেওয়ার দরকার কি ? বাবুর তো আরো জ্যাকেট আছে ।
–এই তুমি কোন কথা বলবে না । কোনো কিছু কিনে দেওয়ার তো মুরোদ নাই । আবার বিলানোর বেলা ঠিকই আছে । দাতা কর্ণের বংশধর যেনো!

এই বলে ছেলেটার হাত থেকে চিলের মতো ছো মেরে জ্যাকেটটা নিয়ে নিলো। ছেলেটা আহত চোখে তাকিয়ে থাকলো, তারপর নিজের জায়গায় এসে আবার হাত জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। কিন্তু,তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে কষ্টের কান্না ।
ট্রেন এসেছে, সবাই ট্রেনে উঠেছে । তার সাথে ট্রেনে উঠলো সেই দম্পতি । ট্রেন চলছে তার নিজ গতিতে। কয়েকটা স্টেশন যাওয়ার পরেই কয়েকজন যুবক ট্রেনটিতে উঠেছে । দেখে মনে হয় সবাই শিক্ষিত । একটি ছেলের মুখে একটি দেশলাইয়ের কাঠি,যা জিহ্বা দিয়ে অনবরত নাড়াচ্ছে। তার কাছে সহ সবার কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র,যা শীতের কাপড়ের নিচে লুকানো।

বেশ কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো তান্দব লীলা । অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অনেকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলো তাদের স্বর্ণ,গহনা এবং টাকা-পয়সা । ঘটনার শিকার হয় সেই দম্পতিও । মহিলাটি নিজের গহনা দিতে চায়নি কিন্তু অস্ত্রের মুখে সে ছিলো অসহায় । বাধ্য হয়ে সখের গহনা গুলো সব খুলে দিতে হয়েছে।

কিছুদিন পরের কথা-
একটি বয়স্ক ছেলে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার মুখে একটি দেশলাইয়ের কাঠি,যা জিহ্বা দিয়ে অনবরত নাড়াচ্ছেন। হঠাৎ সে দেখতে পায় একটি বাচ্চা ছেলে দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে আছে। গায়ে সামান্য পাতলা গেঞ্জি, থর থর করে কাঁপছে। দেখে অনেক মায়া হলো কিন্তু,তার মায়া হওয়ার কথা না। কারন, তার মতো নিষ্ঠুর মানুষ খুব কমই আছে। অস্ত্র হাতে ছিনতাই করা মানুষগুলো সমাজের চোখে যে বড্ড নিষ্ঠুর!
ধির পায়ে সে ছেলেটার কাছে গেলো,
–কি রে, তোর শীত করে না? এভাবে কিছু গায়ে না দিয়ে শুয়ে আছিস কেনো?
–কই পামু স্যার,কে দিবো শীতের পোশাক!
বয়স্ক ছেলেটা তার নিজের গায়ের চাদরটিই দিতে চেয়েছিলো কিন্তু,দিলো না। চাদরটা পুরোনো,তাই এটা দিলে হয়তো নিজেরই কষ্ট করতে হবে।
–আচ্ছা,আমি যদি তোরে পোশাক কিনে দিই,তুই নিবি??
–হ স্যার নিমু…
তারপর তারা মার্কেটে গিয়ে সে ছেলেটাকে দুইটা গরম পোশাক আর একটা কম্বল কিনে দেয় । কিনে দিতে তো টাকার কোনো সমস্যা নেই। কারন,তার পকেট এখন ভারী। পকেট ভারী হয়েছে অকৃতজ্ঞ কিছু মানুষের টাকায় । টাকার কিছু অংশ আছে একটি মহিলার অনেক গুলো স্বর্ণের চেইন বিক্রির…….!!!
.
গল্প- ছিনতাইকারী
লেখা~হাবীব

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন