গ্যাসের লাইন দিতে আসা ছেলেটা আতংকমাখা কণ্ঠে আমাকে বললো,
-আপনি এই বাড়িতে উঠেছেন!? কিন্তু কেন!? আর কোনো বাড়ি পান নাই নাকি থাকার জন্য?
আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষন চুপ করে থাকলাম। বললাম,
-কেন!? কি হয়েছে? এ বাড়িতে কোনো সমস্যা?
-সমস্যা মানে! এক বছর ধরে লোকজন ভয়ে এ বাড়ির আশপাশ দিয়েও হাটতে চায় না। আর আপনি কিনা এ বাড়িতেই উঠেছেন!
-বলেন কি! লোকজন এ বাড়িটাকে কেন ভয় পাবে!?
-একবছর আগে এ বাড়িটার মালিক বাড়িটা বানানোর পর এখানে থাকার এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই এক রাতে হার্টএটাকে মারা যায়। এরপর এ বাড়িটার মালিকের এক আত্মীয় বাড়িটার মালিকানা পেয়ে এটাকে ভাড়া দেয় অনেক ভাড়াটিয়ার কাছে। কিন্তু কোনো ভাড়াটিয়াই বেশিদিন টিকতে চায় না এ বাড়িতে। সবাই বলে প্রতি শুক্রবার রাতে নাকি এ বাড়িটাতে ভূত আসে। আজব ব্যাপার হলো শুক্রবার রাতেই এ বাড়ির মালিক মারা গিয়েছিলো। তাই অনেকদিন ধরে এ বাড়িতে কোনো ভাড়াটিয়া ওঠে না। আর তার উপর বাড়িটা হলো এই নির্জন জায়গায় তাই লোকজনও সহসা এ বাড়ির ধারে কাছে আসতে চায় না।
-এরকম ঘটনা অনেক শুনেছি। সব এলাকার লোকজনের মুখেই এরকম কিছু রূপকথা শোনা যায়। এই যুগেও যে লোক ভূতের ভয়ে বাড়ি ভাড়া নেয় না, সেটাই তো বড় অবাক করার বিষয়।
আমি হেসে কথাটা বললে ছেলেটির মুখ চুপসে যায়। ও আর কোনো কথা না বলে গ্যাস সংযোগ দেয়ার কাজ শুরু করে। ওর হাব-ভাব দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ও আমার কথায় বেশ রাগ করেছে। কিন্তু ওর রাগ করার বিষয়টা আমার কাছে অদ্ভূত লাগলো তাই সে বিষয়ে তেমন কোনো পাত্তা দিলাম না। নতুন চাকুরী নিয়ে দুই-তিন সপ্তাহের জন্য প্রজেক্টের কাজে এসে যে ওয়াল-টিনসেট বাড়িটায় ভাড়া উঠলাম সেটা দেখতে বেশ পুরোনো মনে হয়। জানালার ফাঁকে ফাঁকে মাকরশার জাল লেগে আছে। আমি আসার আগে যদিও বাড়িটা পরিষ্কার করা হয়েছিল কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় পরিষ্কার করার ধরন কতটা দায়ছাড়া। ফ্লোরের কোনে কোনে এখনো ময়লা লেগে আছে। আসলে সস্তায় বাড়িভাড়া পেলে যা হয় আরকি, সার্ভিসও হয় সেইরকম সন্তা।
বাড়ির সামনের খোলা বারান্দাটা বেশ বড় আর সেখানে রাখা একটা ঘুনে খাওয়া খাট যেটাকে চৌকি বলা যায়। দুই রুম আর সামনে একটা বারান্দা বিশিষ্ট বাড়িটায় প্রায়ই এদিক-ওদিক ইদুরের আনাগোনা চোখে পড়ে। খুব সস্তায় বাড়িটা ভাড়া পেয়েছি বিধায় বাড়ির বেহাল দশার প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে কাটিয়ে দিলাম কয়েকটা দিন।
একদিন রাতের বেলা বাতি নিভিয়ে খাটে শুয়ে ঘুমের অপেক্ষা করছি ঠিক এমন সময় আমার রুমের সামনে অর্থাৎ বড় বারান্দা থেকে একপ্রকার বাঁশির আওয়াজ শুনতে পেলাম। শব্দটা মূহুর্তের জন্য বেজেই থেমে গেল। এই নির্জন জায়গায় এরকম অদ্ভুত আওয়াজ শুনে খুব অবাক হলাম। তবে আওয়াজটা কিসের ছিল তা এখনো ঠাহর করতে পারছি না। কিছুক্ষন নীরবতার পর আমি আর গুরুত্ব না দিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিছু সময় যেতে না যেতে একটা উদ্ভট গন্ধ পেলাম নাকে। মনে হচ্ছে কোনো কিছুর পোড়াপোড়া গন্ধ তবে গন্ধটা খুবই বিশ্রী। ধীরে ধীরে গন্ধটা তীব্র হচ্ছে আর মনে হচ্ছে যেন গন্ধটা বারান্দা থেকেই আসছে। আবার \\\’পু..\\\’ করে সেই বাশির আওয়াজটা শুনতে পেলাম যেটা মূহুরতেই আবার নিশ্চুপ হয়ে গেল।
কিছুটা ভয় ভয় অনুভব করছি। ভাবছি, উদ্ভট গন্ধ আর বাঁশির মতো শব্দটা কিসের, আর কেনই বা সেটা বারান্দা থেকে আসছে। কিন্তু বহু চিন্তার পরেও কিছু ঠাহর করতে পারছি না। এদিকে আমার হৃদকম্পন ধীরে ধীরে বেরেই চলছে। হঠাৎ বারান্দা থেকে কাঠ নড়ার শব্দ শুনে মনে হলো কে যেনো বারান্দার চৌকিতে বসেছে। আমার বুকটা ধরফড়িয়ে উঠলো। রাতে এই নির্জন জায়গার বাড়িটায় কে আসতে পারে!? ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলাম আমার কপালের একপাশ দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পরছে। হঠাৎ মনে পড়লো ঐ ছেলেটার কথাগুলো। মোবাইলের স্ক্রিন অন করে দেখলাম আজ শুক্রবার! বুকের ভিতরটা যেন শুকিয়ে গেল আমার। তাহলে কি ওর কথা সত্যি! না না, এ হতে পারে না। এই যুগে আমি কিসব আবোল তাবোল বিষয় নিয়ে ভাবছি! হয়তো কোনো বিড়াল বা কুকুর চৌকির উপর উঠেছে আর সেটার জন্যই শব্দটা হয়েছে, নয়তো এতো রাতে কে আসবে এই নির্জন বাসায়?মনকে অনেক ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই মানাতে পারছি না কারন ঐ উদ্ভট পোড়া গন্ধটা এখনো নাকে আসছে আমার। ভাবলাম, রুমের দড়জাটা খুলে বারান্দাটা চেক করে আসলে কেমন হয়? কিন্তু আমার মন যেন বিছানা ছেড়ে উঠতেই চাইছে না।
কিছুসময় এভাবেই কেটে গেলো। খেয়াল করলাম গন্ধটার তীব্রতা ধীরে ধীরে কমছে। কমতে কমতে হঠাৎ বিলীন হয়ে গেল গন্ধটা।
চারিদিকে এখন নিস্তব্ধতা। আমি প্রখর মনোযোগের সাথে চারিদিকের পরিবেশটা আন্দাজ করতে চাইছি। নানা চিন্তা একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে মাথার ভিতর। ভাবছি, রুমের দরজাটা খুলে একবার দেখে আসবো নাকি বারান্দাটা? কিন্তু মন বলছে আজ রাতটা না হয় থাক, কাল সকালে দেখা যাবে। মনে ভয় নিয়ে আর মাথায় তুমুল চিন্তাযুদ্ধের মাঝে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি।
সকালে উঠে দেখি বেলা বারোটা বাজে। অন্যান্য দিন সকাল ছয়টার সময়ই বিছানা ছাড়তে হয় আমার, কিন্তু ছুটির দিন শুক্রবার কোনো কাজ থাকে না বিধায় মনের খায়েস মিটিয়ে ঘুমাই। রুমের দরজাটা খুলে বারান্দায় এসে দেখি সবকিছু ঠিক আগের মতোই। আশেপাশের পরিবেশেও কোনো পরিবর্তন নেই। অবাক হয়ে ভাবছি, তাহলে গতরাত উদ্ভট গন্ধটা কোথা থেকে আসছিলো!? অদ্ভুত বাশির আওয়াজ আর চৌকি নড়ার শব্দটার রহস্যও উদঘাটন করতে পারছি না।এর পরের কয়েকদিন ঘুমানোর সময় রাতের বেলা ওরকম কিছুই ঘটলো না। না কোনো পোড়া গন্ধ পেলাম, না শুনলাম চৌকি নড়ার শব্দ কিংবা বাঁশির আওয়াজ। ধীরে ধীরে আমার মনের ভয়টা কেটে যেতে থাকে। কিন্তু রাতের স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হলো না।
একরাতে আবার বাতি নিভিয়ে ঘুমানোর সময় উদ্ভট গন্ধটা নাকে আসলো। এরপর থেমে থেমে আসা অদ্ভুত বাশির শব্দটাও শুনতে পেলাম। তার সাথে শুনতে পেলাম বারান্দার চৌকিটা নড়ার শব্দ। ভয়ে বুকটা সেদিনের মতো আবার কেঁপে উঠলো। একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাঁপাকাঁপা হাতে মোবাইলের স্ক্রিন অন করে দেখি আজ শুক্রবার! সেদিনের মতো আবারো গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো আমার।উদ্ভট পোড়াপোড়া গন্ধটা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। ভয়ে আমার হাত এখনো কাপছে যা কোনো ভাবেই থামাতে পারছি না। মনে ভয় থাকা সত্ত্বেও ভাবছি, যেভাবেই হোক আজ এর রহস্য দেখেই ছাড়বো। কাঁপা কাঁপা শরীরে বিছানা থেকে উঠামাত্র খেয়াল করলাম গন্ধটার তীব্রতা ধীরে ধীরে কমে বিলীন হয়ে গেল। গন্ধটা আর না পেয়ে কিছুটা সাহস জোগার করে রুমের দরজার দিকে হাটা শুরু করলাম। রুমের দরজার সামনেই বারান্দা, আর আমি নিশ্চিত বারান্দাতেই রহস্যগুলো লুকানো।
ধীরে ধীরে পা চালিয়ে দরজাটার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই অদ্ভুত বাঁশির আওয়াজটা বিকটভাবে শুনতে পেলাম। একটা বিশ্রি গন্ধও নাকে আসতে লাগলো। মূহুর্তেই আমার শরীর যেনো ভয়ে অবশপ্রায়। কিছুক্ষন দরজাটার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে দৌড়ে বিছানায় ফিরে শুয়ে কাথা মুড়ে নিলাম।
ঘামে সমস্ত শরীর ভিজে গেছে আমার। ভয়ে কোনো কিছুই ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছি না। শুধু কোলবালিসটা জড়িয়ে ধরে কাঁপছি আর ভাবছি, রাতটা কোনো মতে কেটে যাক, কাল সকালেই বাড়িটা ছেড়ে চলে যাবো। আজ রাত ভয়ে ঘুম আসছে না। কিছুক্ষন পরপর বারান্দা থেকে সেই বাঁশির আওয়াজটা শুনছি আর কেঁপে উঠছি। কোনো ভাবেই রুমের দরজাটা খুলে বারান্দা চেক করার সাহস পাচ্ছি না।
মাঝ রাত অব্দি চোখ মেলে তাকিয়ে আছি। কোনো শব্দ পাচ্ছি না। এরপর সারাদিনের ক্লান্তিভাব চরম পর্যায়ে পৌঁছে চোখ লেগে আসায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি।পরের দিন বেলা এগারোটায় ঘুম ভাঙলো আমার। দ্রুতবেগে বিছানা থেকে উঠে দরজাটা খুলে বারান্দাটা এসে দেখি সবকিছু আগের মতোই। আশেপাশে কোনোকিছুর কোনো পরিবর্তন না থাকলেও খেয়াল করলাম বারান্দার চৌকির এককোণে ছাই জাতীয় কিছু লেগে আছে। কৌতুহলি দৃষ্টিতে আস্তে আস্তে হেঁটে চৌকির সামনে দাঁড়ালাম। ছাই জাতীয় দ্রব্যটির একচিমটি হাতে নিলাম। পরখ করে দেখতে লাগলাম দ্রব্যটিকে। কিন্তু এটা কি সত্যিই ছাই, নাকি বারুদ, নাকি অন্যকিছু তা অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকার পরেও আন্দাজ করতে পারলাম না। শেষমেশ নাকের কাছে নিয়ে শুকলাম। খুবই বিশ্রি একটা গন্ধ আসছে ওটা থেকে। গন্ধটা গতকাল রাতের মতো পোড়া পোড়া না তবে খুবই বিশ্রি। ভাবলাম, কোথা থেকে আর কিভাবে বারান্দার চৌকিতে ছাইয়ের মতো এই দ্রব্যটা এলো!?কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, সকালে আমার আর রাতের মতো ভয় একদমই লাগছে না। রাতের সব ঘটনাগুলো মনে করে এখন কোনো ভয় কাজ করছে না মনের ভেতর। সেগুলোকে অযৌক্তিক আর উদ্ভট রহস্য মনে হচ্ছে এখন। তাই গতরাতের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্লানটা ক্যান্সেল করে দিলাম। ভাবছি, আর মাত্র একটা সপ্তাহই তো আছি এখানে, শুধু শুধু কেন এই সস্তা ভাড়ার বাড়িটা ছেড়ে অন্য কোথাও থাকার জন্য পকেট খালি করবো। কিন্তু ঐ ছাই জাতীয় দ্রব্যটা আমার মনে দূঢ় রহস্য জাগিয়ে তুলেছে। কোনোভাবেই ওটার চিন্তা মাথা থেকে নামাতে পারছি না। সিদ্ধান্ত নিলাম, পরের শুক্রবার যেভাবেই হোক এই রহস্যের উদঘাটন করবোই। পরের কিছুদিন রাতের বেলা ওরকম কোনোকিছুই হলো না। আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম শুক্রবারের। দিন যেতে যেতে হাজির হলো শুক্রবার।
সন্ধ্যা হওয়া মাত্রই মনে এক প্রকার উত্তেজনা আর ভয় দুটোই কাজ করছে। আজ রাতই আমার এবাড়িতে কাটানো শেষ রাত। কারন প্রজেক্টের কাজ আজই সম্পূর্ন শেষ হয়েছে,তাই আগামীদিন সকালেই ব্যাগ গুছিয়ে বাসায় চলে যাওয়ার প্লান করেছি। মনে মনে সংকল্প করেছি আজ রাত রুমের দরজা খুলে বেড়িয়ে বারান্দার রহস্য বের করেই ছাড়বো।
ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে দশের ঘরে পৌছালো। আমার মনে বেড়েই চলেছে একপ্রকার উত্তেজনা আর তার সাথে বাড়ছে ভয়ও। বাতিটা নিভিয়ে কাঁথা মুড়ে শুয়ে পড়লাম। অপেক্ষায় আছি কখন সেদিনের মতো কিছু ঘটবে। প্রহর গুনতে গুনতে হঠাৎ নাকে আসলো সেই বিশ্রি পোড়া গন্ধটা। সাথে সাথে বিছানায় শোয়া থেকে উঠে বসে পরলাম। ভেবেছিলাম আজ রাত একদমই ভয় পাবো না কিন্তু এখন খেয়াল করলাম আমার বুক সেদিনের মতোই ভয়ে ধড়ফড় করছে। কিন্তু মনে জমে রয়েছে তীব্র উত্তেজনা।
গন্ধটা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। মনে মনে অনেক চিন্তাযুদ্ধ করার পর কিছুটা সাহস জুগিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। এরপর খুবই ধীরে ধীরে পা বাড়াতে থাকলাম রুমের দরজার দিকে। এরই মধ্যে হঠাৎ শুনতে পেলাম সেই অদ্ভুত বাঁশির আওয়াজটা। আওয়াজটা মূহুর্তেরমধ্যেই বিলীন হয়ে গেল। ভয়ে মাঝপথেই দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। এখন আমার হাত-পা সেদিনের মতোই কাঁপছে। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে শুনতে পেলাম বারান্দার চৌকিটা নড়ার আওয়াজ। বুকটা প্রবলভাবে ধরফড়িয়ে উঠলো। স্পষ্ট মনে হলো কিছু একটা ওটার উপর উঠেছে। ভয়ে আমার জিহ্বাসহ গলা শুকিয়ে গেছে। আমি তবুও বহু চেষ্টায় কিছুটা সাহস জুগিয়ে আবার পা বাড়াতে লাগলাম দরজার দিকে। যতই দরজার দিকে এগোচ্ছি, উদ্ভট পোড়া গন্ধটার তীব্রতা বেড়েই চলেছে।
রুমের দরজাটা কাঠের তৈরি আর সেটার একপাশে ছোট একটা ছিদ্র আছে। দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার হার্টবিট চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অনবরত ঘাম ঝড়েই যাচ্ছে কপাল থেকে। কাঁপাকাঁপা হাতটা সিটকিনির দিকে বারাতেই হাতটা থামিয়ে ভাবলাম, আগে দরজার ছিদ্রটা দিয়ে বারান্দাটা দেখে নিলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। দরজার ছিদ্রতে একচোখ তাক করে দেখতে লাগলাম। প্রথম দৃষ্টিতেই আমার শরীরটা ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। দেখি লাল গোলকের মতো কি যেন জ্বলজ্বল করছে। ওটা কোনোকিছুর চোখ নাকি অন্যকিছু তা ঠিকমতো বুঝতে পারছি না। এরই মধ্যে দেখলাম চোখের মতো লাল গোলকটা হঠাৎ আগুনের ফুলকির মতো জ্বলে উঠলো।
পরের দিন সকালে চোখ মেলে দেখি আমি দরজাটার
পাশে ফ্লোরে শুয়ে আছি। ভাবলাম,গতকাল রাতে ঐ জিনিসটা দেখার পর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম নাকি? তাড়াতাড়ি উঠে দরজাটা খুলে বারান্দায় তাকাতেই অবাক হয়ে গেলাম। দেখি বারান্দার চৌকিতে একটা লোক শুয়ে আছে। বয়স হয়তো ত্রিশ-পয়ত্রিশ হবে, খুব চিকন-চাকোন। চৌকিতে একটা কাঁথা বিছিয়ে বালিসের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। অবাক দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এই অচেনা লোকটা কাঁথা-বালিস নিয়ে আমার বাড়ির বারান্দার চৌকিতে শুয়ে আছে কেন!?
ধীরে ধীরে লোকটার কাছে গিয়ে কয়েকটা ডাক দিলাম। দেখি কোনো সাড়াশব্দ নেই। এরপর তার শরীরে কয়েকবার ঝাঁকা দেয়ার পর সে চোখ ডলতে ডলতে শোয়া থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসলো। লোকটা আস্তে আস্তে চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে হকচকিয়ে উঠলো। দেখি তার চোখদুটো একদম লাল। কৌতুহলি কন্ঠে লোকটাকে বললাম,
-আপনি কে? এখানে কি করছেন!? এভাবে আমার বাসার বারান্দায় শুয়ে আছেন কেন!?
লোকটা কাঁপাকাঁপা গলায় বললো,
-আপনি প্লিজ শান্ত হোন। আমি কোনো চোর-ডাকাত না। আমার বাসা একটু সামনেই। প্রায়ই রাতে আমি এই বাড়ির বারান্দায় ঘুমাতে আসি। আমার বাসায় মা আর বউয়ের ঝগড়া লেগেই থাকে সবসময়। ভোর হওয়া মাত্রই শুরু হয় ঝগড়া। ওনাদের ঝগড়ার চোটে ঠিক মতো ঘুমাতে পারি না আমি। তাই মাঝে মাঝে এই বাড়ির বারান্দায় আসি শান্ত পরিবেশে শান্তি মতো ঘুমাতে। আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না।
লোকটার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কিছুক্ষন লোকটার দিকে বড়বড় চোখে তাকিয়ে থেকে বললাম,
– বলেন কি! গতরাত কি আপনি এখানেই ছিলেন?
-হ্যাঁ।
-তার মানে চৌকিটা তাহলে আপনার কারনেই নড়েছিল! কিন্তু গতরাত বারান্দা থেকে খুব বাজে একটা পোঁড়াপোঁড়া গন্ধ নাকে আসছিল আমার। এমনকি অদ্ভুত বাঁশির মতো শব্দও আসছিলো বারান্দা থেকে। প্রতি শুক্রবার রাতেই এ রকমটা হয়। আর গতরাত দরজার ছিদ্র থেকে চোখের মতো কি যেন দেখলাম যেটা আগুনের ফুলকির মতো জ্বলজ্বল করছিলো। আপনি যেহেতু গতরাত বারান্দায় ছিলেন, আপনার তো এসব টের পাওয়ার কথা। কিছু জানেন এ ব্যাপারে?
লোকটা আমার দিকে কিছুক্ষন হা করে তাকিয়ে থেকে বললো,
-আপনি হয়তো ভুল ভাবছেন। শুক্রবার ছুটির দিন থাকে বলে প্রতি শুক্রবার মন ভরে শান্তিমতো ঘুমানোর জন্য মা আর বউয়ের ভোরবেলার ঝগড়া থেকে বাঁচতে এখানে এসে ঘুমাই আমি। আপনি এ বাড়িতে আসার পর আপনার যাতে ডিসটার্ব না হয় সে জন্য আপনি বাতি নিভিনোর কিছুক্ষন পর,আপনি ঘুমিয়ে গেছেন ভেবে আমি বারান্দায় কাঁথা বালিশ নিয়ে চলে আসতাম। আমি সকালে বেশিক্ষন ঘুমাই না তাই সবসময় এ বাড়ির গৃহস্থ্যের ঘুম ভাঙার আগেই আমি এখান থেকে কেটে পড়তে পারি। কিন্তু আজ এই প্রথম এ বাড়ির কোনো গৃহস্থ্যের চোখে পড়লাম। আর যে পোঁড়াপোঁড়া বাজে গন্ধের কথা বললেন সেটা আসলে…ইয়ে…মানে…যদিও বলতে চাচ্ছি না তবুও বলছি,আমার মাঝে মাঝে গাজা খাওয়ার বদ অভ্যাস আছে। তাই প্রতি শুক্রবার রাতে এখানে এসে ঘুমানোর আগে এক পোটলা গাজা ধরাই। দরজার ফাঁক দিয়ে হয়তো সেটাই দেখে আপনি কোনোকিছুর চোখ ভেবেছিলেন। কিন্তু গাজার গন্ধ দরজা ভেদ করে আপনার নাক পর্যন্ত যাবে সেটা কখনো ভাবিনি। আর যে বাঁশির শব্দের কথা বললেন সেটা…আপনি তো আমাকে লজ্জায় ফেলে দিলেন। আসলে আমার গ্যাস্ট্রিক আছে তো, রাতের বেলা গ্যাস্ট্রিকটা বেড়ে যায়, তাই কিছুক্ষন পরপর বায়ু সরে যায় আমার। আপনি হয়তো সেটাকেই বাঁশির শব্দ ভেবেছেন। আশা করি আপনার ভুল ভেঙেছে।
কথাটা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে লোকটার দিকে অনেকক্ষন যাবত তাকিয়ে থাকলাম। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে, আমার বোকার মতো ভয়ে রাত জাগা আর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারন ছিল এই ফালতু লোকটা। প্রচন্ড রাগে খুব থাপড়াতে ইচ্ছে করছে আমার। ভাবছি, কাকে আগে থাপড়াবো? ঐ হতচ্ছড়া গাজাখোরকে। নাকি নিজেকে?
(সমাপ্ত)
🌸🌸🌸
ছোটগল্প- শুক্রবারের ভুত
~ হা বী ব

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন