আমাদের ইদ নেই।
এটা আমি বুঝেছি সেদিন, যেদিন সবার ঘরে সেমাইয়ের গন্ধ উঠেছিল আর আমাদের ঘরে উঠেছিল আতরের সাথে মিশে থাকা কান্নার গন্ধ।

বাবা ইদের দিন মারা গেছেন।
মানুষ বলে, ইদের দিন নাকি আকাশ খুশি থাকে। আমার কাছে সেদিন আকাশটা খুব নির্দয় লাগছিল।

সকালবেলা বাবা সাদা পাঞ্জাবি পরেছিলেন। আমি তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, মানুষটা আজ খুব সুন্দর।

বাবা হাসছিলেন। সেই চেনা হাসি।
যে হাসিতে অভাব ঢেকে যেত,
কষ্ট লুকিয়ে যেত,
আমার সব ভয় ছোট হয়ে যেত।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম
“বাবা, নামাজ পড়ে তাড়াতাড়ি আসবা তো?”

বাবা মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন
“আসবো।”

কিছু কিছু মানুষ কথা রাখে না।
ইচ্ছে করে না,
সময় তাদের কথা রাখতে দেয় না।

মসজিদ থেকে মানুষ ফিরেছিল।
কারও হাতে জিলাপি,
কারও হাতে বাচ্চার হাত।
আমার বাবাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল চারজন মানুষের কাঁধে।

আমি তখনও বুঝিনি মৃত্যু কী।
শুধু দেখলাম, মা হঠাৎ খুব চুপ হয়ে গেছে।
যে মানুষটা সারাজীবন বাবার অপেক্ষা করেছে,
সে মানুষটা সেদিন বাবাকে পেয়েও হারিয়ে ফেললো।

বাড়ির উঠানে মানুষ ভিড় করছিল।
কেউ কাঁদছিল,
কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছিল,
কেউ বলছিল
“ইদের দিন মারা গেছে, অনেক ভাগ্যবান মানুষ ছিল।”

আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম,
ভাগ্যবান মানুষ চলে গেলে এতো কষ্ট কেন হয়?

আমার নতুন জামা ছিল সেদিন।
নীল রঙের।
আমি আর কখনো জামাটা পরিনি।
আলমারির এক কোণায় রেখে দিয়েছি।
কারণ ওই জামার ভাঁজে এখনও বাবার শেষ সকালের গন্ধ লেগে আছে।

তারপর অনেক ইদ গেছে।
চাঁদ উঠেছে।
মানুষ কোলাকুলি করেছে।
বাচ্চারা সালামি নিয়েছে।

শুধু আমি প্রতি ইদে একটা মানুষকে খুঁজি।

নামাজ শেষে যে মানুষটা এসে বলতো
“কিরে বাবা, কিছু খাবি?”

এখন ইদের সকালে শুধু কবরস্থানে যাই।
বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়
মানুষ আসলে মারা যায় না,
শুধু বাড়ি বদলায়।

তবুও আমাদের ইদ হয় না।

কারণ
বাবা ছাড়া ঘর থাকে,
সংসার থাকে,
মানুষও থাকে…
শুধু ইদ থাকে না।