মানব মন্ডল

গল্প - চিলেকোঠার ঘর

মানব মন্ডল
বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬ জীবনবাদী, ভালোবাসা

প্রায় দুই  আরাই বছর  পর বাড়ি ফিরছি কাল রাতে। ঢোকার সময় মনটা একটু  খারাপ  হয়ে গিয়েছিলো।
এ বাড়ির  উঠান আর নেই।  আমার একটা চাকরির  জন্য  ঘুষের টাকা জোগান  দিতে বাড়ির  সামনের  অংশটা কুড়ি বছর আগেই বেচে দিয়েছিলেন।  নেতার  জেলে  হয়েছিল  বছর দুয়েক ঠিকই।  কিন্ত  কারো চাকুরীর  হয়ে নি। টাকা ফিরত হয়ে নি। মাঝখান  থেকে আমার  সাধের  ফুল বাগান।  আমার  হাতে পোতা  আম , কাঁঠাল গাছের  বদলে এক অভিজাত  অট্টালিকা  দাড়িয়ে আছে। তারপাশে দিয়ে আছে  আমাদের  বাড়ির  ঢোকার  নতুন  পথ।

ওই বাড়ির  পাশের  বড়  বেমানান  লাগে আমাদের  গলিটা। অন্ধকার, ভাঙা চোরা। সেই সৌদি আরব  কাজ  করে টাকা পাঠিয়েছিলাম , তখন গলির রাস্তাটা ঠিক  করেছিলো ওরা। তাও ভাইএর  বিয়ে ছিলো বলে। তারপর  আর কাজ হয়েনি। এমন কি দোফলা পোস্ট  থেকে ঝুলে পরছে লাইট  গুলো দেখে না ওরা। আসলে সত্যিই তো মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষদের কাছে  ল্যান্ডস্কেপিং Landscaping,Garden Design,প্ল্যান্টিং ,ওয়াকওয়ে বা পাথ বিষয় গুলোর গুরুত্ব নেই।
তবে জানেন  আমি কিন্ত গাছপালা, ফুল, পাথর  ব্যবহার করে বাড়ির গলি পথটা , বাড়ির বাইরের পরিবেশকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে রেখেছিলাম।  ওরা ওটাকে বাজে  খরচ  ভাবে। লাইটিং  স্টিট  লাইটের  ভরসায়  গলিটা আজ  পরে আছে  অন্ধকারে।

সকালে উঠে মনটা ভালো হয়ে গেলো। ঘর গুলোতে নতুন করে কোনও আসবাবপত্র হয়তো কেনা হয়ে নি কিন্ত  ঘর গুলো খুব  সাজানো গোছানো  হয়েছে নতুন করে পুরাতন  আসবাবপত্র,  জিনিস পত্রকে সড়িয়ে  দিয়ে। কলড্রিংসের বাতিল বোতল গুলোও  ব্যবহার করে ছাদ বাগান  করা হয়েছে।

আমাদের ঘরের  সংখ্যা একটু কম  ।বাজার দর  অনুপাতে মাইনে  বাড়ে নি। নীচের তলা ভাড়া দিতে  বাধ্য  হয়েছি। ভাইপো সাধ্যের বাইরের গিয়ে একটা দামী স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। আসলে ভাইএর স্কুলিংটা ভালো হয়ে নি, শুধুমাত্র ইংরাজিটা একটু কাঁচা বলে প্রোমশান হয় না। তাই  ভাইপোর পড়াশোনা নিয়ে  মা একটু  বেশিই  সতর্ক। তাই  ঠাকুর ঘরটাই আজ চলে গেছে চিলে  কোঠায়।
চিলে  কোঠায় মানেই নির্জনতা বা স্মৃতিকাতরতার প্রতীক ।এটি চিলের কোঠা নয় চিলের বাসা নয়, বরং এক চিলতে ঘর।বোঝাই  কিন্ত  এই এক চিলতে ঘরে অনেক  ঘর গড়ার স্বপ্ন  দেখে।
শ্রাবণ মাসের  প্রথম  সোমবার।  ওদের  বাড়ি  আমাদের  বাড়ির সবাই  চলে গেছে  তারকেশ্বর  পূজা দিতে।  আমার  সার্ভের ক্লাস  আছে কলেজ  কামাই চলবে না। শ্রাবন্তী ভোরের  বেলা থেকেই  এসে রান্না বান্না করতে। আমি ক্যাম্পাস  ইন্টার ভিউতে  চাকুরী জুটিয়ে  নিয়েছি। কলেজ  শেষ  হলেই  চাকুরী। ওর পড়া শেষ  হলে আমাদের  বিয়ে। বাবা রাজী  হয়ে গেছে।  ওদের  বাড়ির  থেকে তো  আপত্তিছিলোনা  কোনদিনই।  তাই আজ এক সাথে পূজা দিতে গেছে সবাই। ও ভীষণ  খুশী।
এ বছর  বর্ষা নেমেছে  দেরীতে। আজ কিন্ত  সকাল  থেকেই  বৃষ্টি হচ্ছিল  । ও আবদার  করলো । এক সাথে বৃষ্টি ভিজবো।  রাজী হয়ে গেলাম। ওর শরীর  আমার  অচেনা নয়।বৃষ্টি ভেজা  শরীর আমাকে লোভী করে দিলে। বিশেষ  করে  ওর  পাতলা পেট নাভীর  গভীরতা , বুকের  বিভাজিকার রহস্যময়  হাতছানি  আমাকে বন্য করে তুলেছিল  সেইদিন।
ও প্রাথমিক  ভাবে বাধা দিলেও। পরে সমুদ্রের মতো ঝাপিয়ে  পড়ল  আমার  ওপর।  চিলেকোঠার  ঘরটা  সেইদিন  ভেসে  গেলো  ভালোবাসার বন্যায়। পরদিন  সকালেও খুশির রেশটা ছিলো।  যখন  ফোন  বলল ” ছয় সাত মাস অপেক্ষা করা যাবে  না। এ মাসেই বিয়ে  করতে হবেই রেজাল্ট  পজেটিভ। আমাদের  ভালোবাসার পূর্ণতা প্রথম চিহ্ন  আমি নষ্ট  করবো না।”
সন্ধায়  ওর  বাড়িতে গেলাম।  কিন্ত  দরজা তলা বন্ধ। ওর ফোন  বন্ধ। ঐ তলা খুলো না কোন দিন।  আমার  জীবনটা তচনচ  হয়ে গেলো। একদিন  ওর  চিঠি এলো। ” নিজেকে সামলাও।  আমি খুব  সুখে আছি। আমি এখন  এক মেয়ের  মা। তুমি তো  সব জালতে। আমার  মামার  ব্যবসার জন্য  মামা বাড়িটা বন্ধক  রাখা ছিল। শহর থেকে মামা দিদাকে একটা পয়সা পাঠাইনি।  বাড়িটা ওরা দখল  নেবে  বলছিলো। তাই  ভিটা  বাঁচাতে  বিয়েটা করতে বাধ্য  হলাম।  তুমি আবার  নতুন  করে জীবন শুরু করো। আমি ভীষণ  সুখে আছি। দীপঙ্কর  আমাকে  অনেক  ভালোবাসে।  ও আমাকে অনেক  সুখে রেখেছে। আসলেই  ওর  অনেক  টাকা। তুমি আমাকে এতো  সুখে  রাখতে পরতে না। আমার তোমার প্রিয় উপন্যাস দেবদাস । কিন্ত  এ সমাজ দেবদাসকে ভালোবাসার মূল্য দেয় না কিন্ত পার্বতীকে দোষী সাজাতে ছাড়ে না। তুমি কি চাও তোমার শ্রাবন্তীর নামে  খারাপ খারাপ কথা বলুক। বরং এমন কিছু করো যাতে  তোমার  মা ভালো বৌ পেয়ে লোক বলতে পারে শ্রাবন্তীর  থেকে লাখ গুন ভালো বৌমা  পেয়েছি।”

ওর কথা রেখেছি। বিদেশ  চাকুরী নিলাম  বিদেশ চাকুরী নিলাম।  অনেকেই টাকা আয় করলাম কিন্ত   ওর মতো সুখী হতে পারলাম  না।চিলেকোঠার ঘরটাই  এর সমাধান  হলো।
আমি বন্ধনহীন বেপোয়া  জীবন  যাপন  শুরু করেছিলাম।  আমার কাছে বাড়িটা তখন  হয়ে গেছিলো  রেস্টরুমের  মতো। ছুটিতে  বাড়ি ফিরে ঘুরতে ষেতাম  অচেনা পাহাড়, নদী, সমুদ্রের  মত। পাহাড়ের  মতো কঠিন হতে চাইতাম।  নদীর  কাছে শিখতে চাইতাম  কিভাবে পিছনে না তাকিয়ে, এগিয়ে  যাওয়া যায়। সমুদ্র কাছে গিয়ে অনুভব  করতাম  একটা মানুষের  একা থাকাটা কোন অসম্ভব  কাজ  নয়।
চিলে কোঠার  ঘরে সেইদিন  সবার অগোচরে  মা আমার হাত ধরে বললো ” বাবা , তুই  যখন  বিয়ে করবি না তখন আমাকে বৃন্দাবনে নিয়ে চল । গোবর্ধন  পর্বত পরিক্রমা করবো, রাধাকুন্ড  শ্যাম কুন্ড  স্নান  করে পাপ মোচন  করবো। শ্রাবন্তীর  কোন  দোষ  ছিলো না। ওর হাপনী  অসুখটা তো বংশগত।  আমি আমার  বংশে ও অভিশাপ কিভাবে  ঢোকাই।”
মাকে  বৃন্দাবনে মাসির কাছে ঘুরতে  নিয়ে  এলাম ।কিন্ত  আমি বাড়িতে ফিরলাম  না। বিদেশ  গেলাম না। আসলে  সোস্যাল মিডিয়া ছবি দেখে  একটা অচেনা নম্বর  থেকে চেনা মানুষটার  মেসেজ  এলো।  বলল ” মাসি মাকে  আমার  প্রণাম  দিও।  যেনো সেইদিন  মা দিদারা যখন   দেশের বাড়ি ফিরে যাওয়ার  সিদ্ধান্ত  নিয়েছিল।  তখন  যেনো  মাসীমা আমাকে বৃন্দাবনে চলে আসতে বলছিলো। কিন্ত  আমার  ভুল  হয়েছিল  ।আসলে আমি তো একা ছিলাম না তখন। তাই মা দিদির কথাই মেনে নিলাম।   আমার  মেয়ের  ছবি পাঠালাম।  মাসি খুশি হবে। মদিও এতোদিন  পরের দীপঙ্কর  ওকে দুচোক্ষে দেখতে পারে না । সেই দিনে মাসীর কাছে চলে গেলেই হয়তো  ভালো করতাম । কিন্ত রাধা রানী হয়তো চাইনি তাই যেতে পারে নি।”
রাধারাণীর  কি ইচ্ছা সতিই  জানি না।কিন্ত  বৃন্দাবনে আমি থেকে গেলাম।  আমার রাধার  অপেক্ষায়।
,,,

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন