প্রবাসী জীবন মানেই খুব সুখের এমনটা নয়। প্রবাসী জীবন মানে আত্মীয়হীন একটা যান্ত্রিক জীবন। ফলে এখানে আমরা সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভার্চুয়াল প্রেম পড়ে যাই।
যদিও দীর্ঘ সময় ধরে আমার ওপর এই সোস্যাল মিডিয়া প্রভাব ফেলতে পারে নি। আর ফেলবে কি করে আমার জীবনের গল্পটা আলাদা। আমি বাবা মায়ের সাথে শহরে থাকতাম। ছোট বেলা থেকেই আমার বাবা মা বলতেন পল্টু দার মতো পাড়া শোনা করতে।
আমি আবার অভাবের কারণে পল্টু দার কাছেই পড়ালেখা শিখতাম। ও অনেক কিছুই জানতো। এমে পড়া শেষ করে লোক সংস্কৃতির নিয়ে আট বছর ধরে পড়াশোনা করলো। আমিও ইঞ্জিনিয়ারিং চান্স পেলাম ওর তত্ত্বাবধানে সব কিছুই ভালোছিলো।
কিন্ত ভীষণ ধাক্কা খেলাম আমি যখন ভোকাশ্যানাল ট্রেনিংএর জন্য আদিত্য বিল্ডিং কোঃ কাজে গেলাম। ওখানে আবিষ্কার করলাম একজন লেবার অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দিচ্ছে । উৎসাহিত হয়ে লোকটা কে দেখতে গিয়ে আমার মাথায় বাজ পড়লো।
লোকটা আর কেউ না পল্টু দা। খুব কাচু মাচু করে বললো।” অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের চাকুরীটা ওর কবে হবে জানে না। সামনে পূজা। মায়ের একটাও শাড়ি নেই, মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে লেবার কাজ নিলাম। ”
খুব ছোট ঘটনা। কিন্ত প্রভাবিত হলেন অনেক। খাদুর ছেলে টোটন এখন ইস্কুল মাস্টার। পেটে ল্যাথ মারলে। অ আ ক খ বেড়ায় না। এইট ফেল ছেলে। পয়সা দিয়ে সার্টিফিকেট কিনে স্কুল মাষ্টার হলো। এক চরম বৈষম্যের ছবি হতাশ করলো আমাকেও। ইঞ্জিনিয়ার হাবার স্বপ্ন ভেঙে দিলো আমার। বাংলায় তো চাকুরীর নেই। পল্টু দার যখন হলো না আমাদের হবে কি করে। স্কুল ছুট হয়ে , গুজরাট, মুম্বই, চেন্নাই, ছুটল, রাজু, বিজুরা। আমি হোইট কলার জব আশা ছেড়ে। ব্লু কলার জব নিয়ে সৌদি আরবে চলে এলাম। এই অবস্থায় সোস্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব করার মানসিকতা ছিলো না আমার।
চাকুরীটা পেয়ে কিছু দিনের মধ্যেই দালাল ঘর তুললাম। নিমন্ত্রণ করলাম সব বন্ধু বান্ধব, চেনা জানাদের। পল্টু দাও বাদ যায় নি। সবাই বেশ খুশি। পল্টু দা প্রশ্ন করলো ” তুই সত্যি সত্যিই খুশি তো।”
না আমি খুশি কোথায়। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলাম আমি চাকুরীর জন্য নয়। সঠিক ইরিগ্রেশন অভাবে, মানে অপরিকল্পিত ভাবে খাল বিল কাটার ফলে, কত নদী আজ মরে গেছে। কখনও খড়া, কখনও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা ওদের জন্য আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলাম।
পড়ার খরচ চালাতে পার্টটাইম কাজ করতে বুঝে ছিলাম , কাজটা সহজ নয় , কারণ সমাজের সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে টাকা যাদের তারা। আমরা পুতুল । ওর সুতো টেনে কাজ নাচায় আমাদের।
আমার দোষ কত গুলো ছেলে স্কুল ছুট হলো। আমার আরও একটা প্রিয় বিষয় ছিলো সাইকোলজি। অফসোরে চাকুরীর করায় আমাদের ম্যানটেল হেলথের দিকটা বিশেষ করে লক্ষ্য রাখতেন কর্তৃপক্ষ। ফলে অনেক আলোচনা সভা ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করা হতো। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে আমার সোস্যাল মিডিয়াতে অনুপ্রবেশ।
প্রিয়াংশুর গ্রুপ আমি বেশি আকটিভ হয়ে গিয়েছিলাম। ও পেশায় ফটোগ্রাফার। ফলে অনেক তরুণ প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের সগাম ওর গ্রুপে। আমি লাই
ডে এসে ওদের হতাশ গুলো দূর করে , মটিভেট করতাম সকলকে। বেশ খানিকটা জনপ্রিয় হয়েছিলাম।
এই জেনারেশন অনেক আধুনিক। কিন্ত এদের হৃদয়টা এখনো। এরা খুব সহজেই বন্ধু হয়ে যায়। হৃদয় বিনময় করে। জীবন এদের কাছে বিনোদনের। তাই চট জলদি অনেক সিদ্ধান্ত নেন। আর হৃদয় ভাঙে এদের তাই সহজেই।
হঠাৎই সেইদিন রাত বারোটা নাগাদ প্রিয়াংশু ফোন এলো।বললো what app link ta খুলতে।লিঙ্ক খুলতেই দেখি পিউ দেবী লাইভে এসেছেন। বিয়ের পোশাকে। সিলিং ফ্যানে কাপর ঝুলনো। গলায় দড়ি দেবেন। তবে তাঁর মৃত্যুর জন্য তাঁর বাড়ির লোক জন দায়ী নয় সে কথা বলতেই লাইভে এসেছেন।
পিউ দেবীর সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিলো না। তবে উনি আমার লেখার ফ্যান ছিলেন। আমার সাথে আলাপ করতে চেয়েছিলেন। তাই উনাকে আমি কমেন্ট করে অনুরোধ করেছিলাম আমার সাথে একটু ফোন কথা বলতে।
সেইদিন সারারাত কথা বলেছিলাম। পিউ দেবী টা কখন তুমিতে পরিনত হয়েছিল জানি না। তবে সেইদিন আমার শুন্য জীবনটা হয়ে গেল ওর দখলে। ওর মা বাবার সাথেও ওর সম্পর্কটা ঠিক হয়ে গেলো।
সেইদিন আমার একটা ভুল হয়েছিল ও কার জন্য আত্ম হত্যা করতে যাচ্ছিলো আমার জানা হয়নি। খুব তারাতারি আমাদের মধ্যে সম্পর্ক হয়ে গেলো। আমাদের মধ্যে ভার্চুয়াল যৌন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মধু বলবে ওটা টাকার বিনিময়। কথা সঠিক নয়। ওর বাবা তো অনেক বড় লোক।
ও নিজের একটা পরিচিত তৈরি করতে চাইছিলো। ওরা ওদের দেশের বাড়িতে একটা প্রভাবশালী পরিবার। প্রচুর নাম ডাক। তাই সিনামাতে নায়িকা হবার স্বপ্নটা মেনে নিতে পারে নি। কিন্ত ও নাছর বান্দা। শহরে একা থাকতো স্বপ্ন পুরন জন্য। ও নিজেই একটা প্রোডাকশন হাউস খুললো। তার জন্য কিছু টাকা ধার নিয়েছিলো আমার থেকে।
এদিকে আসতে আমার ও একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছিলো। আমি ওকে বিয়ে করতে চাইলাম। ফ্লাট কিনলাম। বিয়েটা ও গোপন রাখাতে চেয়েছিল এটাই বাঁচোয়া। রেজিস্ট্রেশন অফিসে ও এলো না।
রাতে যখন কথা হলো। একটা রাম শ্যাম টাকা দাবি করলো , না দিলে ওকে করা ভিডিও কল গুলোও ভাইরাল করা হুমকি দিলো। টাকাটা পেতেই ও আমাকে ব্লক করলো। সোস্যাল মিডিয়ার বন্ধুত্বের এটাই সুবিধা ব্লক করলেই সম্পর্ক শেষ।
প্রায় দুই বছর কাটালো। মধু একটা লিঙ্ক পাঠালো। লিঙ্ক খুলতেই দেখি ওটা প্রিয়াংশুর প্রোফাইল। বুঝতে পারলাম সেইদিন প্রিয়াংশুর সাথেই পিউ বিয়ের হবার কথা ছিলো। কিন্ত কোন কারণ বিয়ে করাটা ওদের কাছে ঝুঁকি ছিলো। ওরা দক্ষ ফ্লিম মেকার। তাই নিখুঁত স্কিপট আর অভিনয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই আমাকে মুরগী করতে পারলো।
তবে আমি খুশী পিউর ডালোবাসার নিষ্ঠা দেখে। প্রিয়াংশু এখন ওয়েডিং ফটোগ্রাফার, পিউ ওর এডিটর।
সোস্যাল মিডিয়ার বন্ধুত্বের কথা প্রসঙ্গ এলেই আমার গৌতম বুদ্ধের কথা মনে পরে। গল্পের শেষ করার আগে সেটাই বলি।
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। সিদ্ধার্থের জন্মের পরই ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল— এই ছেলে বড় হয়ে হয় পুরো পৃথিবী শাসন করবে (চক্রবর্তী সম্রাট), আর না হয় সব ছেড়ে এক মহান সন্ন্যাসীতে পরিণত হবে।
বাবা রাজা শুদ্ধোধন চরম ভয় পেয়ে গেলেন। ছেলের মন যাতে কোনোভাবেই বৈরাগ্যের দিকে না যায়, তার জন্য তিনি এক মাস্টারপ্ল্যান করলেন। সিদ্ধার্থের জন্য তৈরি হলো তিনটি আলাদা বিলাসবহুল প্রাসাদ— গ্রীষ্মকালের জন্য ‘সুরম্য’, বর্ষার জন্য ‘শুভ’ এবং শীতকালের জন্য ‘রম্য’।
শুধু তাই নয়, এই প্রাসাদগুলো ভরিয়ে দেওয়া হলো শত শত রূপসী নর্তকী, গায়িকা এবং সেবিকাদের দিয়ে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সিদ্ধার্থকে পার্থিব সুখ, মদ এবং রূপের নেশায় পাগল করে রাখাই ছিল এদের একমাত্র কাজ। প্রাসাদের বাইরে পৃথিবীটা কেমন, দুঃখ-কষ্ট কাকে বলে, তা সিদ্ধার্থের ধারণাতেই ছিল না।
মনকে কি চিরকাল খাঁচায় বন্দি রাখা যায়? রাজকুমারের সিদ্ধার্থের মন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যান। যাকে ইতিহাসে বলা হয় ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’।
কিন্ত আমরা সিদ্ধার্থ না।তাই প্রকৃত মুক্তি পথ পেলাম না। ওরা আমাদের জন্য নীল ছবি বানিয়েছে, লাল জল বানিয়েছে, তা নিয়ে আমরা মেতে থাকবো, সোস্যাল মিডিয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছরিয়ে গেলেও ঘর মধ্যে থাকবো একটা দ্বীপ হয়ে।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন