পিউর ঠাকুরমার আলমারি
পিউর ঠাকুরমার আলমারি
মানব মন্ডল

গল্প - পিউর ঠাকুরমার আলমারি

মানব মন্ডল
সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ জীবনবাদী, ভালোবাসা

পিউর একটা লেখায় পড়েছিলাম, ও ছোট বেলায় ও কান্না কাটি করলে। ওর ঠাকুর মা তাঁর  আলমারি থেকে পুতুল বের করে দিতো। ও ওর দুঃখ ভুলে যেতো।  পিউ ঠাকুরমার আলমারিটা খুব ভালো বাসতো, ভাবতো
ওটার মধ্যে যাদু আছে সব দুঃখ ভুলিয়ে দেবার।
আসলে ওর ঠাকুর মা ওকে স্বপ্ন দেখাতো তাঁর আলামারীতে একটা রাজপুত্র থাকে। যে ও বড় হলে বেড়িয়ে আসবে একদিন ঠিক, ওকে বিয়ে করে ওর দুঃখ ভুলিয়ে দেবে।
আলামারি (Almirah) শব্দটি পর্তুগিজ ‘armário’ থেকে এসেছে, যা ভারতে পর্তুগিজদের মাধ্যমে প্রবেশ করে এবং সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় ভাষাগুলিতে হিন্দি, তামিল ইত্যাদি অভিযোজিত হয়, যা মূলত কাপড় বা অন্যান্য জিনিসপত্র রাখার জন্য ব্যবহৃত একটি ক্যাবিনেট বা আলমারি। আমার দেশের বাড়িতে কোন আলমরী ছিলো না।
তাছাড়া রূপ কথা বলা ঠাকুর মা ছিলো না। মনে আছে ঠাকুর মা মুড়ি ভেজে ওনা দিন যাপন করতেন। ছুটিতে গ্রামের বাড়ি তে গেলে,মুড়ি গুড়ো দিয়ে নাড়ু , ছাতু  বানিয়ে দিতো সেটা পেয়ে খুশি থাকতাম আমি।
পিউ আমার জীবনের শৈলী মধ্যে পার্থক্য অনেক।  ও ছোট বেলায় থেকে আবদার করতে পারতো, বায়না করতে পারতো, বাবা মা ঠাকুর মার কাছে। ওর ঠাকুর মা আলমারি টা স্বপ্ন দেখাতো ওকে। ও কিছু খাবার না খেলেই, ওকে ছেলে ভুলিয়ে খাওয়ানোর জন্য ঠাকুর মা তার আলমারি থেকে বের করে দিতো না মজার উপহার। কিংবা মেলায় ঘুরতে যাওয়ার টাকা।

আমর কেউ ছিলোনা আবদার মেটানোর। আমাদের খাবার কেনার পয়সা থাকতো না। খেলনা দিয়ে তাই ছেলে ভুলানোর ব্যপারটা ছিলো না। আমি ছোট বেলা থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম পৃথিবীর সব জিনিস চাইলে আমি পেয়ে যাবো বা দিয়ে দেবে এমন নয়। কোন কিছু পচ্ছন্দ হলে অর্জন করে নিতে হবে।

নীলাঞ্জনা প্রদীপের ব্রেক আপ পর। দীপকের সাথে বন্ধুত্ব হলো। এদিকে আমার ভাইপোর মুখে ভাত হলো তখনই। আমি তখন বিদেশেই। আমি  নীলাঞ্জনা বাড়িতে মাকে পাঠালাম ওকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু ও এলো না। ও দীপক বিয়ে করবে সিদ্ধান্ত নিলো।
আমিও  চাকরি ছাড়া সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ আমি বৃন্দাবন থাকাতে চাইতাম সব সময় সব মোহ মায়া কাটিয়ে । কিন্তু আমার বাবা একটা গোপন ইচ্ছা পুরণের ইচ্ছা আমার মনে আলমারিতে যত্ন করে রাখা ছিলো।
  আমার বাবা  আজ অচেনা অজানা মানুষ, কেউ চেনে না। মাঝে মাঝে পাড়ায় উনাকে খুজতে কেউ কেউ বলে সাদা চুলো বুড়োটা কি আপানার  বাবা।
কিন্তু জানেন ছয়ের দশকে আগে  চালুয়ারী গ্রামে কথায় কথায় আমার এই সাদা চুলো বুড়োটার তুলনা দিতো সবাই। ভালো ছেলে হিসেবে সে ছিলো উদাহরণ।দরিদ্র ঘরে জন্ম হয় নি তাঁর। হঠাৎ করে বাবা মারা যায়। বড় ভাই যাত্রায় অভিনয় করতো, অর্থ উপার্জন করলেও নেশা ভান ফুর্তি করে পয়সা নষ্ট করতো। দিনে দিনে সঞ্চয় শেষ হলো। ছোট ছেলেটি দাদার সাথে যাত্রা দলে যোগ দিলো। ভালো বাঁশি বাজায়, গান গায়। ছেলেটার নাম হয়ে যায় বাঁশী।
কিন্তু ছেলেটা শিল্পী হতে চায় নি। তাঁর দরকার ছিলো একটা চাকরির। কেউ বলেছিলো অষ্টম শ্রেণী  পাশ করলেই চাকুরী দেবে। তারকাছে বড় চাহিদা তখন অষ্টম শ্রেণী পাশ করা।একটা প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় সে যদি স্কুল নাম উজ্জ্বল করতে সপ্তম শ্রেণীতে তাঁকে অষ্টম শ্রেণী পাশ সার্টিফিকেট দেওয়া হবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কঠিন লাড়াই ছিল। কাছে বই ছিলো না। বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতে হতো তাকে তাই স্কুল যেতে পারতো না। কিন্তু তবুও সে শ্রেষ্ঠ হলো ঐ প্রতিযোগিতায়। স্কুল ছাড়তে না করেছিলো তাকে অনেকেই। একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বলেছিলো পড়ার খরচ সাথে ওর খাবার খরচ দেবে। কিন্তু ওর দুই টো বোন আর ভাই ছিলো। ওর  চেয়েছিলো তাদের পড়াশোনা করতে।
ছেলেটার শহরে পৌঁছালো। চাকুরী হলো না অফিসে। আঠোর বছর হতে তখনতো বছর পাঁচেক বাকি। মিষ্টির দোকানে কাজ নিলো। শহরের ভিড় হারিয়ে যাচ্ছিলো সে কিন্তু চেষ্টা ছাড়ে নি। তাই বছর কুড়ি পরে সরকার চাকুরী জুটলো। ছেলেটা এখন ছাপোষা ভদ্রলোক।দুই টো ছেলে বৌ, ছাড়াও ভাইবোন টানতে হতো তাঁকে । সখ বলতে বছরের কয়েকটি নাটক অভিনয় করতো। কয়েকটি বছর সেরা অভিনেতা হয়েছেন। কিন্তু শিল্পী হওয়া হলো না তাঁর, কারণ তাঁর বড়ো ছেলে একবার পরীক্ষায় খারাপ নম্বর পেলো। স্ত্রী অশিক্ষিত। তাই পুরো দায়টাই তার। তাঁর অপরাধ শেষ নেই চিরকাল নিজের কথা কোন দিন ভাবে নি। করে নি নেশা ভান। করে নি ঘোরাঘুরি।
সে ভালো দাদা হতে চেয়েছিলো, ভালো বাবা হতে চেয়েছিলেন। কিন্ত শিল্পী হতে চান নি। হতে চাইলে সংখ্যা হয়তো ভিড়ে হারিয়ে যেতো না সে।
সবার চোখে সাদা চুলো বুড়োটা হয়তো সে ভাবে সফল নয়  তবু আমার চোখে এখনো হিরো।
আমি ওনা গোপন ইচ্ছাটা পুরন করতে জীবনের কিছুটা সময় ব্যায় করেছিলাম টলিপাড়ায় ছবি তৈরির অভিজ্ঞতা ছিলো আমার। বৃন্দাবন  যাবার আগে কিছু দিন অভিনয় করতে চেয়েছিলাম। কারণ অসুস্থ বাবা অন্তত দেখে যাক আমি উনার অসম্পূর্ণ  স্বপ্ন পূরণ করেছি।
এদিকে পিউ ইউটিউব হতে চায়। ওর জীবন রাজপুত্র এসে হাজির তখন। ধননারয়ণের পুত্র দেব। উনি গায়ক আবার পেশায় চোখের ডাক্তার। পিউ অপটোমেট্রিস্ট ।
আমি মজা করে বলি। ও চোখের হাফ ডাক্তার। আসলে ও প্রাথমিক চক্ষু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, ও চোখের পরীক্ষা করে, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করে, চশমা ও কন্টাক্ট লেন্সের প্রেসক্রিপশন করে, এবং চোখের সাধারণ রোগ ও সমস্যা (যেমন গ্লুকোমা, ক্যাটারেক্ট) নির্ণয় ও চিকিৎসা করে; ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ (Ophthalmologist) নয় বরং চোখের যত্ন ও দৃষ্টি সংশোধনের উপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার, ও প্রয়োজনে রোগীদের চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করে।
ওর সাথে দেবের পেশাদার কারণে বন্ধুত্ব  ।  পিউ জানতে পারে ওর রাজপুত্রের এক প্রাক্তন ছিলো। সে সোসাইটি গ্লেমার কুইন হিসাবে পরিচিত। ছোট খাটো ইউটিউবার। দেবের ঘর বাধার স্বপ্ন ভেঙে, অনেক আঘাত দিয়ে সে চলে যায়, হঠাৎ করেই। মাঝে মাঝে সেই মেয়েটার দুঃখে অন্যমনস্ক হয়ে থাকতো দেবে।
পিউ যথেষ্ট সুন্দরী ও। ও নাচতে জানে। ও ইউটিউব হতে চাইলো। দুই একটা ভিডিও বানালো। আমি ও প্রস্তাব দিলাম আমার গল্প কবিতা নিয়ে ছবি আর ভিডিও এ্যালবাম বানানোর। এই ভাবে বন্ধুত্ব আমাদের। পিউ অনুরোধে আমি চাকরি ছাড়ালাম না। জীবন একটা নতুন আশা আলো হলো ও আমার।

হঠাৎ দেব জানিয়ে দিলো ও পিউ কে বিয়ে করবে না। আসলে ধননারয়ণের পুত্র বধূ কোন নাচনী ওয়ালী হতে পারে না। অথচ পিউ ওর জন্য নাচনীবালী হয়েছে সেটা বলবার মতো কেউ ছিলো না। ওদের সম্পর্ক ভেঙে যেতে। দেবের শুন্য স্থান পুরণ করতে চাইলাম আমি।
দেব ছিলো পিউর ঠাকুর মায়ের আলমারিতে লুকিয়ে রাখা রাজপুত্র। আমি রূপকথার গল্প শুনি নি কোন দিন। রাজপুত্র হতে কি করতে হয় জানি না। আমি তাই পিউ ঠাকুর মায়ের আলমারি হতে চাইলাম। যে ওর ছোট ছোট আবদার গুলো মিটিয়ে দেবে।

পরে পড়বো
১৪৭
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন