পৃথিবীতে সবচেয়ে অদ্ভুত বস্তুটির নাম হলো কবিতা,
আর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী হলো কবিরা।
কাগজ ও কলমের মিলনে যে কবিতা লেখা হয়,
তাও কবিতা, তবে কবিতার সবটা নয়—
একাংশ মাত্র।
বাকিটা আছে ছড়ানো—
দিগন্তব্যাপী, জীবন ও জগতের প্রতিটি পরতে জড়ানো।
কবিতার ছন্দ মিশে আছে কৃষকের হালে,
কবিতার গন্ধ মিশে আছে জেলের জালে,
কবিতার সুর বাজে নৌকার পালে।
কবিতার বাকি সব,
নদী-ঢেউয়ের কলরব—
এর ন্যায় আছে জগতজুড়ে।
গভীর রাতে, যখন ক্ষুধার্ত কুকুর আর্তনাদ করে ওঠে,
তখন সেই আর্তনাদই হলো কবিতা।
ন্যায়ের লড়াইয়ে বীর যুবারা যখন
নির্ভয়ে বুক পেতে দেয় রাজপথে,
তখন সেই বুক পাতার নামই কবিতা।
কাঁথা সেলাইরত বধূ যখন
অশ্রুসিক্ত চক্ষুরসে কাঁথা ভিজিয়ে ফেলে,
তখন সেই ভেজা কাঁথার নামই কবিতা।
ছেলে হারাবার বেদনায় মা যখন
আঁচলে চোখ লুকিয়ে বুকে পাথর চাপা দেয়,
তখন সেই পাথর চাপার নামই কবিতা।
আর এরা সবাই সেই কবিরা।
কবিতা নয় কেবল ওয়াইনের গ্লাস,
কিবা সোনার থালা।
কবিতা নয় শুধু পান্না-মুকুট,
কিবা মার্বেল মোড়ানো অট্টালিকা।
বিলাসিতার নাম নয় কবিতা।
কবিতা নয় ধর্মের নামে পাপে রত
জনতার; মিছে প্রার্থনা শত।
কবিতা নয় শুধু ছন্দবদ্ধ কাব্যের খেলা,
কবিতা নয় কেবল বড়লোকের বইমেলা।
কবিতা নয় শুধু বসন্ত-গাঁথা,
সাথে কালবৈশাখীও কবিতা।
কবিতা হল কারখানা-শ্রমিকের ক্লান্ত, ঘুমকাতর চোখ।
কবিতা হল অসভ্য পথশিশুর ক্ষুধাতুর শুকনো মুখ।
কবিতা হল পতিতা নারীর গোপন আর্তনাদ,
কবিতা হল অবহেলিত বৃদ্ধার গভীর বিষাদ।
কবিতা হল দুধের শিশুর মুখে তুলে দেওয়া বিষ,
কবিতা হল খরা-কবলিত মাঠে জরাজীর্ণ শিশ।
কামারের ঝলসানো হাতের প্রতিটি ঠকঠকই কবিতা,
কুলির চোয়াল বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়া
প্রতিটি ঘাম ফোটার নামই কবিতা।
আর এরা সবাই সেই কবিরা।
কবিতা হল ছেঁড়া চাদরে কাঁপতে থাকা শীতার্ত রাত,
কবিতা হল অনাহারে মায়ের মুখ লুকিয়ে রাখা হাঁড়ির ভাত।
কবিতা হল ক্ষুধার শহরে শিশুদের মুখে আধপেটা আশা,
কবিতা হল কলের ধোয়ায় ধুয়ে যাওয়া বস্ত্রহীনের ভাষা।
কবিতা হল ধর্ষিতা নারীর ছটফটানো হাত,
কবিতা হল বখাটের অত্যাচারে থমকে যাওয়া স্কুল-মাঠ।
কবিতা হল ভুখা পেটের নিঃশব্দ হাহাকার,
কবিতা হল পরাজয়-মুখে অবিনত জাতির অহংকার।
কবিতা হল বারুদের আঘাতে তামা হয়ে যাওয়া মাটি,
কবিতা হল রক্তমাখা পকেটে কারো চিরবিদায়ের চিঠি।
কবিতা হল আয়না-ঘরের ভয়ংকর রজনী,
কবিতা হল ২৪-এর দুর্বার প্রতিবাদী ধ্বনি।
রাজপথে ঝরে পড়া প্রতিটি রক্ত ফোটার নামই কবিতা,
আর এরা সবাই সেই কবিরা।
কবিতা হল প্রেয়সীনীর চোখে না বলা কথা,
কবিতা হল বিদায়লগ্নে বেদনার মালা গাঁথা।
কবিতা হল আজানের সুরে জাগ্রত সুমধুর প্রভাত,
কবিতা হল দিবসব্যাপী উপবাসীর অশ্রুমাখা হাত।
কবিতা হল সেজদায় লুটিয়ে পড়া শ্রান্ত প্রাণ,
সত্যের পথে ডেকে ফেরা আত্মার আহ্বান।
কবিতা হল গীতা—
বাইবেল-কোরআনের প্রতিটি কথা।
কবিতা হল পাপ-পুণ্যের মাঝে দাঁড়ানো এক প্রশ্ন,
কবিতা হল ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠ।
কবিতা হল বিপ্লবীর চোখে জ্বলন্ত আগুন,
কবিতা হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী গর্জন।
কবিতায় নেই ভেদ—
সাদা কিবা কালো, কিবা ভালো-মন্দ,
সবার তরে কবিতার দ্বার চির উন্মুক্ত।
জীবন সংগ্রামের লড়াকু প্রতিটি সৈনিকই কবি,
আর তার সংগ্রামের নামই কবিতা

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন