মোঃ রাশেদুল ইসলাম (অরণ্য)

আলোচনা - কস্ট অফ ক্লিক

মোঃ রাশেদুল ইসলাম (অরণ্য)
মঙ্গলবার, ০৮ জুলাই ২০২৫

একটি ক্লিক করলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই পেয়ে গেলেন খুব সুন্দর একটি ছবি। ওয়াও! আপনি মোবাইলে যখন একটা ছবি বানান, AI দিয়ে মজা করে কাউকে ফ্যান্টাসি দুনিয়ার কোন কিছু দেখান, তখন কি বুঝতে পারেন এর জন্য অন্য প্রান্তে কতটুকু শক্তি খরচ হচ্ছে? যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা AI ( Artificial Intelligence) আজকের দুনিয়া বদলে দিচ্ছে, তার জ্বালানি শুধু টাকা বা সময় না বরং বিদ্যুৎ, পানি। প্রকৃতির দিক থেকেও বিশাল এক মূল্য দিতে হচ্ছে। তবে তা আমরা অনুধাবন করছু না। বা সেবিষয়ে ভাবার সময় বা ইচ্ছে কিছুই আমাদের নেই। আমাদের সমস্যা হলো আমরা অনেকেই জানিনা বুঝিও না যে এই চমকপ্রদ প্রযুক্তি পৃথিবীর পিঠে কতটা ভার ফেলে দিচ্ছে এই AI ।

ধরুন আপনি একটি AI ভিডিও বানালেন। মজা করেই বানালেন। কিন্তু সেই ভিডিও সম্পূর্ণভাবে তৈরি হতে ভিডিও এর ডেটা গেল হাজার মাইল দূরবর্তী সার্ভারে। সেখানে Artificial Intelligence প্রক্রিয়া চালিয়ে রিটার্ন হলো ভিডিওর এক নতুন ভার্সন। এবং তা ফেরত এলো আপনার কাছে এক নতুন রূপে। আপনি মনে মনে আহ্লাদিত হতে থাকলেন এই ভেবে যে, “আমিও এমন কিছু বানাতে পারি, বাহ।” মনে মনে নিজেকেই নিজে সাবাসি দিলেন। তবে আপনি জানতেও পারলেন না এই কয়েক সেকেন্ডের একটি অকেজো (যা কেন তৈরি করা হচ্ছে, আদতে নির্মাতা নিজেও জানেন না) এক্সপেরিমেন্টাল ভিডিও বানাতে গিয়ে সেই সার্ভারে হয়তো কয়েক লিটার পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে উবে গেছে। কি ভাবছেন? এখানে পানি আবার কোত্থেকে এলো? চিন্তা করবেন না। বিষয়টি ক্লিয়ার করছি।

যখন একটি AI ছবি জেনারেট করা হয়, আপনাদের দৃষ্টিতে তা হয়তো এক ক্লিকে শেষ। কিন্তু সেই এক ক্লিকের পেছনেই কাজ করে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা বিশাল ডেটা সেন্টার। যেখানে প্রতি সেকেন্ডে শোঁ শোঁ করে চলে হাজারো প্রসেসর। যাদের কাজ আপনার কমান্ড বুঝে বিশাল এই কল্পনার জগৎ সৃষ্টি করা। এই বিশাল কম্পিউটিং প্রসেস চালাতে লাগে গিগাওয়াটের পর গিগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন আর সার্ভার ঠান্ডা রাখতে প্রয়োজন প্রচুর পরিমানে পানি।

আপনি হয়তো শুনলে অবাক হবেন, চ্যাট-জিপিটির মত একটি বড় মডেল ট্রেনিংয়ে ঘন্টায় গড়ে প্রায় একশো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় হয়। যা দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় 1.6 মিলিয়ন গ্রামীণ পরিবার একদিন চলতে পারত। গুগল এর ডেটা সেন্টারগুলো দিনে প্রায় 21 লাখ লিটার পানি ব্যবহার করে তার কুলিং সিস্টেম এর কাজে, প্রায় 30000/ 35000 মানুষের একদিনের পানির সমান।

সবাই জানি পৃথিবীর প্রায় 75 ভাগই পানি। তবে তার সামান্যই সুপেয় পানি। যার কিনা বেশিরভাগই আবার বরফে বন্দি। সহযে বলতে গেলে পৃথিবীর মোট পানির মাত্র 0. 5 শতাংশ পানি আমাদের ব্যবহারের জন্য সহজলভ্য। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৮.১ বিলিয়ন (জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত) মানুষের বসবাস। সে-তুলনায় 0.5 শতাংশ পানি মানে বুঝুন পৃথিবীতে আসলে পানির কতটা সংকট।

AI প্রযুক্তির অদম্য বিস্তার সেই পানির সংকট আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শুধুই প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? মোটেও তা নয়। এমন এমন কাজে এই Ai ব্যাবহৃত হচ্ছে যেগুলো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক। ইদানিক সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে Ai দিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের মুখ বসিয়ে হাস্যকর ভিডিও বানানো হচ্ছে, কাউকে ইচ্ছেমতো কাউকে কাঁদানো বা হাসানো হচ্ছে কিংবা মৃত ব্যক্তিদেরও জীবিতর মত দেখানো হচ্ছে। কেউ কেউ আবার প্রতিদিন মিড-জার্নি বা ডেল ব্যবহার করে শুধু মজার জন্য 50 থেকে 60 টা ছবি বানিয়ে ফেলছেন। কখনো ক্যাট সামুরায় আবার কখনো ডিজিটাল ঈদ জামা বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা কিরছেন এই গতিতে চলতে থাকলে 2030 এর মধ্যে Ai হতে পারে পৃথিবীর অন্যতম বড় কার্বন ও পানি নিষ্কাশনকারী প্রযুক্তি। AI ব্যবহারের মাধ্যমে 2027 সালের মধ্যে পানির ব্যবহার বছরে 6.6 বিলিয়ন ঘনমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেটা ডেনমার্ক বা স্লোভাকিয়া এর মত দেশের বার্ষিক পানি ব্যবহারেরও চার থেকে ছয় গুণ বেশি।

তবে কি আমাদের পুরোপুরি Ai বাদ দিতে হবে? না, একদমই না। বরং প্রয়োজন ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের বড় বড় টেক কোম্পানি যেমন Hugging Face, OpenAI, Google, Microsoft — এখন green AI নিয়ে কাজ করছে। যার মূল লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব Ai মডেল তৈরি। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং স্বচ্ছ পানি ব্যবস্থাপনা। কিছু কোম্পানি পুরোপুরি সৌরবিদ্যুৎ বাতাস চালিত টারবাইনের মাধ্যমে তাদের সার্ভার চালানোর দিকে যাচ্ছে।

আরেকটা বড় দিক হল, কি কাজে আমরা AI ব্যবহার করছি তা নিজেকে জিজ্ঞেস করা। কিদরকার প্রতিদিন 20 বার মজা করে কুকুরের ছবি বানানোর। আদৌ কি দরকার আছে চ্যাটবটকে প্রেমীক কিংবা প্রেমীকা বানিয়ে কথা বলা বা নিজের সময় নষ্ট করা। বরং যেসব কাজে সমাজ, শিক্ষা বা পরিবেশের উপকার হতে পারে সেসব দিকে মনোযোগ দিলেই এর সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত জরা সম্ভব।

Ai দিয়ে কৃষকের জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া, রাস্তার জ্যাম এড়ানোর জন্য ট্রাফিক ডেটা বিশ্লেষণ কিংবা চিকিৎসকের হাতে দ্রুত রিপোর্ট পৌঁছে দেয়ার মত কাজে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করাটাই হবে সবচেয়ে কার্যকরী ও বুদ্ধিমানের কাজ। প্রযুক্তি আমাদের বন্ধু, আবার প্রযুক্তিই আমাদের শত্রু। যেমন বিষ মানুষকে বাঁচানোর কাজেও লাগানো যায়, আবার মারার কাজেও। তাই একটু দায়িত্ব নিয়ে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যবহার করলেই AI হতেপারে আমাদের ভবিষ্যতের দিশারী। অন্যথায় এই AI হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসের বাহক।

©_অরণ্য
#অনুকেত_কান্তা

পরে পড়বো
২১৬
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন