গল্প — নিষিদ্ধ দাহ:অন্তিম লিপি

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিরহ, ভালোবাসা

সে –
যেন এক চিরনিখিল, সর্বসত্তায় পূর্ণ পুরুষাত্মা…
যাহার অন্তঃকোষে বিরাজমান ঈশ্বরচেতনার অনির্বাণ প্রদীপ,যাহার বক্ষ জুড়িয়া নিত্য বহিয়া চলে শ্রদ্ধাপূর্ণ স্তবসঙ্গীত,যাহার কণ্ঠস্বর কাব্যিক আর্তিতে ঘোষণা করিয়াছে শুভ্রতায় মোড়ানো পবিত্রতার মন্ত্র,যাহার চরণধ্বনি শিরীষপাতার মৃদুমন্দ স্বরে জগতের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করিয়া প্রবাহিত হয় অদৃশ্য দৃষ্টিপথে! সে অর্ধাঙ্গিনীর সহিত অগ্রসরমান নন্দনকাননে! স্বর্গ অরবিন্দু-কুসুমে বিকশিত, ঈশ্বরকৃপায় স্নিগ্ধ, অতিপবিত্র উদ্যান,যাহার ভূমি পুলকিত নবপ্রভাতের মত কোমল,যেথায় নহরধারা স্বচ্ছতা লইয়া তাহার পদপ্রান্তে বিছাইয়া পড়ে,আর বকুল-অশোক খেজুরশাখা ফলভারে অবনত হইয়া অচঞ্চল ধ্যানমগ্নতায় ব্যাকুল রহিয়াছে…!

সেই ত্রাণপ্রদ স্বর্গসুখ,যাহাতে নাই প্রাণত্যাগ,নাই বিরহ, নাই বিষাদ;যাহাতে মিলন ধ্রুব,বিচ্ছেদ অপ্রাপ্য,প্রণয় চিরন্তন,পরিণয় সার্থক -সেইখানে তাহারা ঈশ্বরপ্রদত্ত পরমসুখে বিভোর থাকিবে; প্রেম হইবে পূজ্য, সান্নিধ্য হইবে সাধনার সমাপ্তি…!

কিন্তু আমি? আমি তো এক অন্তর্গত জ্বালায় দগ্ধা,যে নারী আত্মচেতনাহীন প্রবৃত্তির বিষপাত্রে নিঃশব্দে নিমগ্ন হইয়াছিল। আমার হৃদয়ের গহ্বর কবে লালন করিয়াছিল সেই অজ্ঞাত, অবৈধ, অনুচিত আকর্ষণবীজ!আমি আজো ভাবিয়া ইহার সঠিক উত্তর পাইতে ব্যর্থ।ধারণা করিয়াছি শুধু এই যে,সেই ক্ষণিক দৃষ্টিপাত,সেই আলস্যে মোড়ানো চাহনি,আমার চিরন্তন নিয়তির সংকেতপত্র রচনা করিয়াছে…!

পরনারীর স্বামীসত্তার প্রতি এক তুচ্ছ আকর্ষণও যদি পাপ হয়,তবে আমি হইয়াছি সর্বাপেক্ষা গম্ভীর পাপিনী…আমি লঙ্ঘন করিয়াছি ধর্মশাস্ত্র,সমাজবিধান ও ঈশ্বরনির্ধারিত সীমারেখা।যাহা কখনো আমার ছিল না,যাহা কখনো হইবারও নহে,তাহার প্রতি আমার অন্তর আকৃষ্ট হইয়াছে এক অভিশপ্ত মোহে…!

আর সে – যাহার মুখমণ্ডলে শোভা পায় দেবদ্যুতি, যাহার পদচারণায় নাকি ধ্বনিত হয় ঐশ্বরিক প্রশান্তি, যাহার নয়ন জ্যোতির্ময় বলিয়া প্রতীয়মান – সে তো এক ভ্রান্তিপূর্ণ ছদ্মরূপী। বাহ্যদৃষ্টে যেন এক পবিত্র দেবতা, অন্তরসত্তায় নিপুণ এক প্রলোভনপ্রিয় অসুর;যাহার ভাষায় উচ্চারিত হয় ঈশ্বরনাম,অথচ তাহার হৃদয়ে লালিত হয় কলুষ, কাম, ও বিষবৃক্ষের মূঢ় মূল…!

শাস্ত্র বর্ণনা করে – সত্য কদাচ বাহ্যরূপে উপলব্ধি করিতে নাই। প্রকৃত ধর্ম অন্তঃস্থলে লুক্কায়িত থাকে,বাহ্য আচরণে নয়। আমি সেই দীক্ষায় বিস্মৃত হইয়াছিলাম, আমি তার বিভায় মোহগ্রস্ত হইয়া তাহাকে পরম ভক্তি-অনুরাগ নিবেদন করিয়াছিলাম…যদিও সে আমার ছিল না,তাহাকে আপন করিবার অধিকারও আমার ছিল না কভু…!

আমার সেই একটি দৃষ্টিপাতই হইয়াছে সর্বনাশের মূলাধার।সেই চক্ষুর সামান্য স্পর্শই আজ আমাকে টানিয়া লইয়া যাইতেছে জাহান্নামের অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ডে।সেইখানে দাহ কেবল দেহের নয়, আত্মারও। সেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস হইবে প্রগাঢ় অনুশোচনার ধারালো তরবারি,প্রতিটি স্মৃতি হইবে বিষাদবাহী করাল ছুরি।

তাহার তথাকথিত অর্ধাঙ্গিনীসহ সে দ্যুলোকগামী হইবে – সমাজের বন্দনায় অভিষিক্ত হইয়া। আমি থাকিব নিক্ষিপ্ত এক অনন্ত অনলে, যেথায় পাপের প্রতিটি শ্বাস প্রতিফলিত হইবে অশ্রাব্য ধ্বনিতে!

আমি অবশেষে বুঝিতে পারিলাম – যে প্রেম সীমালঙ্ঘন করিয়া আত্নার নি:শেষ ঘটিয়েছে ,তাহা ঈশ্বরের সাথে রচনা করিয়াছে শত্রুতা, যে আকাঙ্ক্ষা চোরাগোপ্তা,তাহা আত্মঘাত। আমি প্রেম করিয়াছিলাম ঈশ্বরবিরোধী স্পন্দনে,আকর্ষণে আমি ভাঙিয়াছি বিশ্বাসের মর্মমূলে বিদ্ধ শপথ…!

এখন ঈশ্বরের দয়াদৃষ্টিপথ হইতে আমি পতিত,থাকিব এক মৌন আর্তির অন্তঃঅন্ধকারে,যেথায় পাপে জর্জরিত হইয়া হৃদয় আর মস্তিষ্ক নিত্যদিনই পুনর্বার মৃত্যুবরণ করে।আমার সেই দৃষ্টি,আকাঙ্ক্ষা,সেই অবিবেচনাপ্রসূত প্রেম – ইহাই হইয়াছে আমার আত্মার মৃত্যুদণ্ডের অক্ষয় দলিল!

এমনই রহস্যবহ, কঠোর, অথচ ঈশ্বরীয় ন্যায়সঙ্গত বিচার – যাহা বাহ্যরূপে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, অন্তরজ্যোতি ব্যতীত যাহা কখনো অনুধাবনযোগ্য নহে…!

৯৩ বার পঠিত রিপোর্ট

মন্তব্য করুন

লেখকের অন্যান্য প্রকাশনা