প্রসূন গোস্বামী

গল্প - জগন্নাথ হল গণহত্যা : ২৫শে মার্চের কালরাত ও প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি

প্রসূন গোস্বামী
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ অন্যান

(১)
রাতটা আর দশটা সাধারণ রাতের মতো হতে পারত। চৈত্র মাসের শেষে ফুরফুরে বাতাস থাকার কথা ছিল, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের স্টাফ কোয়ার্টারে বাতাসের বদলে বইছিল এক অদ্ভুত থমথমে আতঙ্ক। রবীন্দ্র মোহন দাশের বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ। সে বয়সের কিশোরদের চোখে রঙিন স্বপ্ন থাকার কথা, কিন্তু রবীন্দ্রর মাথায় তখন ঘুরছে কেবল একটা ‘টোকেন’-এর কথা। দেশের জন্য লড়তে যাবে সে, পরদিন সেই গোপন টোকেনটা পাওয়ার কথা ছিল। রবীন্দ্র জানত না, পরদিন আসার আগেই তার শৈশবটা বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে যাবে।
রাত ঠিক সাড়ে এগারোটা। হঠাৎ করেই আকাশটা যেন ভেঙে পড়ল। না, মেঘ নয়, বৃষ্টির মতো ঝরতে শুরু করল তপ্ত বুলেট। রবীন্দ্রর মনে হলো, টিনের চালে কেউ বুঝি মুঠো মুঠো পাথর ছুড়ছে— ‘সাঁই সাঁই, ঠাস ঠাস’ শব্দে কান পাতা দায়। বড়ো ভাই ফণিদা চিৎকার করে উঠলেন, “সবাই খাটের নিচে ঢোক! জলদি!”
রবীন্দ্রর পরিবারের সবাই যখন খাটের নিচে ধুলো আর আতঙ্কে কুঁকড়ে আছে, তখন বাইরে শোনা গেল বুটের শব্দ আর ভারী কোনো বস্তুর আঘাতে মানুষের আর্তনাদ। ঘরের ঠিক পাশেই কাউকে নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে পাকসেনারা। যন্ত্রণায় কাতর সেই লোকটা চিৎকার করে ডাকছে, “ফণিদা! ফণিদা!”
মুহূর্তের মধ্যে লাথিতে ভেঙে পড়ল রবীন্দ্রদের ঘরের দরজা। অন্ধকার ঘরে টর্চের আলো ফেলে যমদূতের মতো ঢুকে পড়ল কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য। তারা ফণিদাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে গেল। রবীন্দ্র তখন খাটের নিচ থেকে দেখছে তার ভাইয়ের অসহায় পা দুটো মাটির ওপর দিয়ে ঘষটে যাচ্ছে। বড়ো ভাই নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় ‘সুইপার’ পরিচয় দিয়েছিলেন, কিন্তু দানবদের তাতে মন গলেনি।
প্রায় এক ঘণ্টা পর যখন ফণিদা ঘরে ফিরলেন, তার বুক বেয়ে রক্ত ঝরছে। রবীন্দ্র নিজের কাঁপা কাঁপা হাতে কাপড় দিয়ে ভাইয়ের ক্ষতস্থান বেঁধে দিল। কিন্তু বিভীষিকা কেবল শুরু হয়েছে মাত্র।
রাত ঠিক বারোটা। একটা বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। কামানের গোলা এসে সরাসরি আঘাত করল উত্তর বাড়ির সামনের শহিদ মিনারে। নিমেষেই ধুলোয় মিশে গেল বাঙালির আবেগের সেই মিনার। সেই আগুনের গোল্লায় উত্তর গেটের দুইজন দারোয়ান মুহূর্তেই ঝলসে গিয়ে প্রাণ হারালেন। রবীন্দ্র জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল, তার চিরচেনা হল প্রাঙ্গণ এখন নরককুণ্ড। পাকসেনারা প্রতিটি ভবনের টয়লেট, পানির ট্যাংক আর রুমের ভেতরে তন্নতন্ন করে খুঁজছে— শিকারি যেমন করে বনের পশু খোঁজে। লক্ষ্য একটাই : ছাত্র। যেখানেই কাউকে পাচ্ছে, সেখানেই স্তব্ধ করে দিচ্ছে জীবনের স্পন্দন।
আযানের ঠিক আগ মুহূর্তে পাকসেনারা আবার হানা দিল স্টাফ কোয়ার্টারে। তারা বেছে বেছে রবীন্দ্রসহ ৩১ জন তাগড়া যুবককে ধরে নিয়ে আটকে রাখল একটা অন্ধকার গোয়াল ঘরে। কিশোর রবীন্দ্রর শরীর তখন ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু আসল দৃশ্য দেখা তখনও বাকি ছিল।
(২)
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি, চারদিকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। কিন্তু জগন্নাথ হলের আকাশে তখন কেবল বারুদের গন্ধ আর পোড়া লাশের স্তূপ। সেই অন্ধকার গোয়াল ঘরে আটকে রাখা ৩১ জন ছেলের মধ্যে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কিশোর রবীন্দ্র দেখল, খান সেনারা এসে তাদের মধ্যে থেকে প্রথম ১৫ জনকে টেনে বের করে নিয়ে গেল।
তাদের কাজ কী ছিল জানো? তাদের কাজ ছিল নিজের শিক্ষক আর ভাইদের লাশ কাঁধে করে বয়ে আনা। রবীন্দ্রর চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে আসা হলো শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জি সি দেব (গোবিন্দ চন্দ্র দেব) স্যারের নিথর দেহ। নিয়ে আসা হলো মধুর ক্যান্টিনের প্রাণভোমরা মধুদার (মধুসূদন দে) রক্তাক্ত শরীর। যে ছাত্রদের এই শিক্ষকেরা পরম মমতায় পড়াতেন, সেই ছাত্রদের দিয়েই তাদের লাশগুলো টেনে আনা হলো বর্তমানের গণকবরের ঐ বিশাল গর্তের কাছে।
যখন লাশ টানা শেষ হলো, তখন নেমে এল সেই চরম মুহূর্ত। পিশাচের দল সেই ১৫ জন ছেলেকে এক জায়গায় গোল করে দাঁড় করিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই ব্রাশফায়ার করে দিল। এক নিমেষেই সব শেষ! রবীন্দ্রদের বাকি ১৬ জনের তখন বাঁচার আশা ছিল না। একটু পরেই পাকসেনারা এসে তাদের নিয়ে যেতে চাইল। রবীন্দ্রর বুকের ভেতর তখন ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে। হঠাৎ করেই এক নরপশু বিনা কারণে রবীন্দ্রকে সজোরে মারতে শুরু করল। মারের চোটে রবীন্দ্র ছিটকে পাশে থাকা একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেল। হয়তো যমদূত তাকে দেখতে পায়নি কিংবা গুরুত্ব দেয়নি। তাকে ঐ গর্তে ফেলে রেখেই বাকি ১৫ জনকে নিয়ে গিয়ে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করল সেনারা।
রবীন্দ্র তখন গর্তের কাদা আর মৃত্যুর হিমশীতল আতঙ্কে কুঁকড়ে আছে। এক মুহূর্ত আগে যারা পাশে ছিল, একমুহূর্ত পরেই তারা একেকটা নিথর দেহ।
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে যখন পাকিস্তানি হায়েনারা আপাতত মাঠ ছেড়ে চলে গেল, রবীন্দ্র ধীর পায়ে মাঠের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে কেবল রক্তের নদী আর লাশের পাহাড়। হঠাৎ তার নজরে এল, লাশের ঐ স্তূপের ভেতর থেকে কেউ একজন হাত নেড়ে ইশারা করছেন! রবীন্দ্রর বুকটা কেঁপে উঠল। সে কাছে যেতেই ঐ মুমূর্ষু মানুষটি ক্ষীণ স্বরে বললেন, “একটু… একটু জল দাও…”
রবীন্দ্র পাগলের মতো হলের পুকুরের দিকে দৌড়ে গেল। হাতের মুঠোয় করে পানি আনার চেষ্টা করল সে, কিন্তু আঙুলের ফাঁক দিয়ে সব জল পড়ে যাচ্ছে। সে দমে গেল না। একটা পুরোনো কৌটা খুঁজে পেয়ে তাতে পানি ভরে দ্রুত ফিরে এল মানুষটির কাছে। কিন্তু নিয়তি ছিল বড়ো নিষ্ঠুর। রবীন্দ্র যেই না পানির কৌটাটি তার মুখে ধরল, অমনি লোকটির মাথাটা একপাশে হেলে পড়ল। তৃষ্ণার্ত মানুষটি পানিটুকু আর পান করে যেতে পারলেন না।
রবীন্দ্র দেখল, হলের ঐ মাঠেই প্রায় আড়াইশ জনের লাশ পড়ে আছে। পরে যখন সে সদরঘাটের দিকে পালাচ্ছিল, তখন দেখল রাস্তার দুপাশে শুধু মানুষের দেহ— যেন এক অন্তহীন লাশের মিছিল। পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞানে হয়তো এই নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যা নেই, কিন্তু কিশোর রবীন্দ্রর চোখে তখন কেবলই এক রক্তাক্ত মানচিত্র।
(৩)
২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতে কেবল রবীন্দ্র মোহনের মতো কিশোররাই নয়, একুশ-বাইশ বছরের তরুণী বকুল রাণী দাশের আকাশটাও হুট করে ভেঙে পড়েছিল। বকুল ছিলেন হলের প্রহরী সুশীল চন্দ্র দাশের স্ত্রী। তার কোলে তখন মাত্র তিন মাসের শিশু দীলিপ, আর আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটি।
রাত যখন সাড়ে এগারোটা, সেই পরিচিত চত্বরটা হঠাৎ করেই এক অচেনা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। গুলির বিকট শব্দে বকুল জানালার পাশে কুঁকড়ে গেলেন। পাশের ঘরের মানুষজন চিৎকার করে ডাকছিল, “বেরিয়ে এসো! পালিয়ে বাঁচো!” কিন্তু সুশীলদের ঘরটা বাইরে থেকে তালা লাগানো। ভেতরে বকুল তার দুই সন্তানকে বুকে চেপে পাথর হয়ে বসে আছেন। ঠিক বারোটার দিকে সুশীল ছুটে এলেন। ত্রস্ত হাতে গেট খুলে সবাইকে নিয়ে ছুটলেন প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের দিকে।
অন্ধকার ভবনটির ভেতর একটা প্রতিমা ছিল। সেই প্রতিমার পেছনে অন্ধকারে চারজন নারী আর তাদের শিশুরা নিশ্বাস চেপে লুকিয়ে রইলেন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, মাঝে মাঝে সার্চলাইটের তীব্র আলো দেয়াল চিরে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই ঘটে গেল সেই সর্বনাশ! দলের একটি শিশু ভয়ে বা ব্যথায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
সেই কান্নার শব্দ মুহূর্তেই হায়েনাদের টেনে নিয়ে এল। বড়ো বড়ো টর্চ আর সার্চলাইটের আলোয় প্রতিমার আড়ালটা নগ্ন হয়ে পড়ল। বকুল দেখলেন, তার স্বামী সুশীল চন্দ্র দাশ ছাড়া সেখানে আর কোনো পুরুষ নেই। পাকসেনারা কোনো কথা না বলে সুশীলকে হ্যাঁচকা টানে ধরে ফেলল।
বকুল তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তিনি সুশীলের হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন, যেন ছাড়বেন না। কিন্তু বন্দুকের কুঁদো আর বুটের লাথির সামনে একজন নিরস্ত্র নারীর জোর কতটুকু? একটা প্রচণ্ড লাথি এসে লাগল বকুলের বুকে, তিনি ছিটকে পড়ে গেলেন দূরে। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে তার চোখের সামনে পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে এল— তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।
অনেকক্ষণ পর যখন বকুলের জ্ঞান ফিরল, চারপাশে এক ভুতুড়ে নীরবতা। তিনি টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন। কিছু দূরে একটা গাছের নিচে তাকাতেই তার বুক চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোলো না। বকুল দেখলেন, ঐ গাছের নিচে স্থির হয়ে শুয়ে আছেন সুশীল। তিন মাসের দীলিপের বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। জগন্নাথ হলের প্রতিটি ঘাসের ডগায় তখন সুশীলের মতো অসংখ্য মানুষের তাজা রক্ত লেপ্টে আছে।
(৪)
জগন্নাথ হলের ধ্বংসযজ্ঞ যখন বাইরের পৃথিবীতে কেবল একটি বীভৎস খবর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ি আবাসিক এলাকায় তখন এক ছোট কিশোরের পৃথিবীটা চিরতরে বদলে যাচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র অরুণ দে। সাধারণ কোনো শিশু নয় সে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দের ছোট ছেলে। ২৫শে মার্চের সেই প্রলয়ংকরী রাতটি সে কাটিয়েছিল জেগে। গুলির কান ফাটানো শব্দ, বোমা আর ট্যাংকের গর্জনে তার ছোট বুকটা কেঁপে কাঁপছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে শুনেছিল সেই বুকফাটা আর্তনাদ— “বাঁচাও! আমাদের বাঁচাও!”
২৬শে মার্চ সকাল। সূর্যের আলো ফুটলেও চারপাশটা ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন আর নিস্তব্ধ। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে একদল পিশাচ হানা দিল তাদের বাড়িতে। তাদের লক্ষ্য মধুসূদন দে। কিন্তু বাবার আগে হায়েনাদের নজরে পড়লেন অরুণের বৌদি। অরুণের চোখের সামনেই প্রথম গুলিটা লাগল তার বৌদির শরীরে। তারপর তার বড়ো ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। মেঝের ওপর তখন রক্তের নদী বইছে। বোন রানুর আর্তনাদ থামিয়ে দিতে তার মুখে ও বুকে গুলি চালাল পাক সেনারা।
অরুণ দেখল, তার মা— এক অসীম সাহসী নারী— বাবাকে বাঁচাতে মরণপণ লড়াই করছেন। খান সেনারা যখন মধু দাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, মা তখন বাবাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বাধা দিচ্ছেন। পিশাচরা দয়া দেখাল না। গর্জে উঠল তাদের বন্দুক। অরুণের মা-র দুই হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল গুলিতে, শরীরের মাংস ছিটকে গিয়ে লাগল ঘরের দেয়ালে। বাবার পায়েও দুটো গুলি লাগল। অরুণ দেখল, তার রক্তাক্ত বাবার কোলে মাথা রেখে মা নিথর হয়ে পড়ে আছেন।
পাক সেনারা চলে গিয়ে আবার ফিরে এল। এবার তাদের সাথে হলের দুই কর্মচারী, শ্যামলাল আর মোহন রায়। তারা মধু দাকে ধরে নিয়ে চলল হলের মাঠের দিকে। অরুণের হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি তখন মায়ের আর ভাইয়ের রক্তে ভিজে সপসপে। পানির তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে তার। পাশের বাসার রান্নাঘরে একটু পানির জন্য গিয়ে সে জানলা দিয়ে দেখল, তার বাবাকে আর অধ্যাপক জিসি দেবকে একই সাথে হলের সেই বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অরুণ জানত না, সেদিনই তার বাবার জীবনের শেষ সূর্যাস্ত। পরে শ্যামলাল আর মোহন রায়ের কাছে সে শুনেছিল, সেই মাঠেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল তার বাবাকে। একটা ছোট শিশুর চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস জ্যামিতি সেদিন রক্তের কালিতে লেখা হয়েছিল।
(৫)
জগন্নাথ হলের গণহত্যার পর পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। ক্যামপাসের ঘাসগুলো এখন হয়তো সতেজ, কিন্তু সেই ঘাসের নিচে যে হাড়গুলো মিশে আছে, তাদের গল্পগুলো আজও গুমরে কাঁদে। এখন যদি কেউ হলের সেই শান্ত গণকবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তবে একটি স্মৃতিফলক দেখতে পাবে। সেখানে চারজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকসহ ৬৬ জন ছাত্র ও কর্মচারীর নাম খোদাই করা আছে। জহরুল হক হলের স্মৃতিফলকেও আছে আটটি নাম।
কিন্তু সংখ্যাটা কি কেবল এটুকুই?
না। সেদিন যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের প্রকৃত সংখ্যা এই তালিকার চেয়েও বহুগুণ বেশি। রবীন্দ্র মোহন একাই দেখেছিলেন মাঠে আড়াইশ’র বেশি লাশ। তবে কেন সেই মানুষগুলোর নাম ইতিহাসে ঠিকভাবে লেখা থাকল না? এর পেছনে ছিল এক ভয়াবহ এবং সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।
জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক অসীম কুমার এই নির্মম সত্যটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পাকিস্তানি সেনারা কেবল মানুষ মারেনি, তারা চেয়েছিল সেই হত্যার কোনো চিহ্নই যেন না থাকে। তাই হলের প্রতিটি কক্ষে কক্ষে হানা দিয়ে ছাত্রদের নির্বিচারে হত্যা করার পর তারা পুরো ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল ছাত্রদের ব্যক্তিগত নথিপত্র, পরিচয়পত্র আর খাতা-কলম। উদ্দেশ্য ছিল একটাই— নিহতদের সম্পর্কে যাতে কোনো প্রকার নথিপত্র বা ‘ডকুমেন্ট’ খুঁজে পাওয়া না যায়। মানুষগুলো যাতে সেরেফ ধুলোর মতো বাতাসে মিশে যায়।
মধুসূদন দের ছেলে অরুণ দে যখন বড়ো হলেন, তখন তিনি শ্যামলাল আর মোহন রায়ের কাছে তার বাবার শেষ মুহূর্তের কথা শুনেছিলেন। সেই একই মাঠে, যেখানে হাজারো নক্ষত্র খসে পড়েছিল, সেখানেই মধুদাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
আজ আমরা যখন হল প্রাঙ্গণ দিয়ে হেঁটে যাই, তখন হয়তো মনে রাখা কঠিন যে এই মাটির প্রতিটি কণা একদিন রক্তে ভিজে সপসপে হয়ে গিয়েছিল। বকুল রাণীর সেই তিন মাসের শিশু দীলিপ আজ বড়ো হয়েছে, অরুণ দের স্মৃতিতে আজও তাঁর মায়ের বিচ্ছিন্ন হাত দুটো ভেসে ওঠে। ইতিহাস হয়তো অনেক তথ্য পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এই প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে সেই কালরাতটি আজও জীবন্ত হয়ে আছে।
জগন্নাথ হলের সেই গণকবরটি কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— অস্ত্র দিয়ে মানুষকে মারা যায়, কিন্তু সত্যকে পুড়িয়ে ছাই করা যায় না।

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন