প্রসূন গোস্বামী

গল্প - রক্তাক্ত ঢাকা: সায়মন ড্রিং-এর চোখে পঁচিশে মার্চের সেই কালরাত

প্রসূন গোস্বামী
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ অন্যান

(১)
একাত্তরের পঁচিশে মার্চ। বসন্তের রাত হলেও ঢাকার বাতাস সেদিন গুমোট, ভারী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পঁচিশ দিনের অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল এই জনপদকে স্তব্ধ করে দিতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ধেয়ে আসছে যমদূত। বিদেশি সাংবাদিকদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বন্দি করে রাখা হয়েছে, যেন বাইরের পৃথিবী জানতে না পারে ভেতরে কী বীভৎস উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। ছাব্বিশ বছরের তরুণ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং কিন্তু দমবার পাত্র নন। তিনি জানতেন, ইতিহাসকে তার সাক্ষ্য দিতে হবে। কৌশলে হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থেকে তিনি এড়িয়ে গেলেন বহিষ্কারের নির্দেশ। তার সাথে যোগ দিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আলোকচিত্রী মিশেল লরেন্ট।
রাত তখন ১০টা। সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এল জল্লাদ বাহিনী। ১১টার মধ্যেই শহরের মোড়ে মোড়ে আর্তনাদ আর আগুনের হলকা। সাধারণ মানুষ রাস্তায় উলটে রাখা গাড়ি, গাছের গুঁড়ি আর আসবাবপত্র দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল সেই দানবীয় যান্ত্রিক বাহিনীকে। কিন্তু ট্যাংকের গোলার সামনে মানুষের তৈরি সেই প্রতিবন্ধকতা খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। শেখ মুজিবুর রহমানকে ফোনে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি ঘর ছাড়লেন না। তার এক সহকারীর কাছে শেষ বিদায় নিয়ে বললেন, “আমি আত্মগোপন করলে ওরা আমাকে খুঁজতে পুরো ঢাকা জ্বালিয়ে দেবে।”
রাত ১টা ১০ মিনিটে ধানমন্ডির সেই ৩২ নম্বর বাড়িতে হানা দিল ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান। বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমি প্রস্তুত, গুলি করার তো দরকার ছিল না। তোমরা ফোন করলেই তো আমি যেতাম।” কোনো কথা না শুনেই তাকে আর তার অনুসারীদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হলো। যাবার সময় পাকি বাহিনী ধুলোয় মিশিয়ে দিল স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজ পতাকা, বুট দিয়ে মাড়িয়ে দিল সমস্ত স্বপ্ন।
এদিকে নীলক্ষেত আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে তখন নরক নেমে এসেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিকে করা হয়েছে ফায়ারিং বেস। ইকবাল হলের ছাত্ররা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝাঁক ঝাঁক গুলি আর গোলার মুখে লুটিয়ে পড়ল। সেখানে প্রায় ২০০ ছাত্রের প্রাণহীন শরীর পড়ে রইল। জগন্নাথ হলের ছাত্রদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও নৃশংসতা; তাদের দিয়ে গর্ত খুঁড়িয়ে সেখানেই লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মাটিচাপা দেওয়া হলো। পাকি সৈন্যরা যখন চলে গেল, দেখা গেল করিডোরে রক্তের বন্যা, আর্ট কলেজের এক ছাত্র পড়ে আছে তার ইজেলের ওপর। সাতজন শিক্ষক তাদের কোয়ার্টারেই প্রাণ হারালেন, আর একটি হতভাগ্য পরিবারের ১২ জন সদস্যকে একটি খুপরির ভেতরেই ব্রাশফায়ার করে মারা হলো। পাকি জল্লাদেরা যখন ফিরে যাচ্ছিল, তাদের কণ্ঠে তখন ‘নারায়ে তকবীর’—যেন নিরপরাধ ছাত্র আর সাধারণ মানুষকে হত্যা করে তারা এক মহান যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে।
(২)
শহরের আকাশে তখনো ধোঁয়া, কিন্তু বৃষ্টির মতো ঝরছে আগুনের গোল্লা। ২৬শে মার্চ দুপুর গড়াতেই শুরু হলো আসল তাণ্ডব। ঢাকা শহরের পুরোনো অংশের সেই সরু গলিগুলো, যেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই, সেখানে হানা দিল পাকিস্তানি ঘাতক দল। ইংলিশ রোড, ফ্রেঞ্চ রোড, নয়াবাজার আর সিটি বাজার— নামগুলো হয়তো অনেকের কাছে কেবল ম্যাপের দাগ, কিন্তু সেখানে বাস করত হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। ঘাতক সৈন্যরা হঠাৎ রাস্তার মোড়ে আবির্ভূত হয়েই কোনো উসকানি ছাড়াই শুরু করল বৃষ্টির মতো গুলি।
তাদের পেছনে আসছিল পেট্রোলের ক্যান হাতে আরও কিছু জানোয়ার। যারা প্রাণভয়ে ঘর থেকে বের হতে চাইল, তাদের বুক লক্ষ্য করে চলল মেশিনগান। আর যারা ভেতরে রয়ে গেল, তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হলো ঘরবাড়ির সাথে। দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যে সেই ঘিঞ্জি গলিতেই ঝরে গেল অন্তত ৭০০ নারী, শিশু আর পুরুষের প্রাণ। প্রায় আধা বর্গমাইল এলাকা জুড়ে চলল এই একই বীভৎসতার মহড়া। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পুরোনো শহরের পুলিশ স্টেশনগুলোও রেহাই পেল না। একজন পুলিশ পরিদর্শক পাগলের মতো ধ্বংসস্তূপের মাঝে তার সহকর্মীদের খুঁজছিলেন; তার অধীনে থাকা ২৪০ জন কনস্টেবলের মধ্যে ৩০ জনের মৃতদেহ তিনি ততক্ষণে খুঁজে পেয়েছেন, বাকিরা কোথায় কেউ জানে না।
সবচেয়ে বড়ো হত্যাকাণ্ডটি ঘটল শাঁখারীবাজারের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়। সেখানে মানুষদের ঘর থেকে টেনে বের করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হলো। এরপর সেই পুরো এলাকাটি আগুনে জ্বালিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হলো। রাত ১১টা পর্যন্ত ঘাতক দল সেখানে স্থানীয় কিছু দালালের সহায়তায় তাণ্ডব চালাল। সৈন্যরা আকাশে ফ্লেয়ার ছুড়ত আর সেই দালালরা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়ি। পরমুহূর্তেই সেই বাড়িতে সরাসরি ট্যাংক বা রিকোয়েললেস রাইফেল দিয়ে গোলাবর্ষণ করা হতো, নতুবা পেট্টোল ঢেলে লাগানো হতো আগুন।
রাত বাড়ার সাথে সাথে সৈন্যরা শিল্প এলাকা টঙ্গি আর নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হলো। সেখানে চলল শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার নিধনযজ্ঞ। ২৬শে মার্চ বিকেলের একটি বীভৎস স্মৃতি হয়ে রইল দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ অফিস। যুদ্ধের ভয়ে প্রায় ৪০০ মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। বিকেল ৪টায় চারটা ট্যাংক এসে দাঁড়াল অফিসের সামনে, আর আধঘণ্টার মধ্যেই পুরো ভবনটি হয়ে উঠল একটি জ্বলন্ত চিতা। পরদিন সকালে সেখানে কেবল পড়ে ছিল মানুষের পোড়া হাড় আর কয়লা হয়ে যাওয়া মৃতদেহ। ঢাকা তখন এক মৃত শহর, যেখানে কেবল কাকের ডাক আর পাকি সেনাদের বুটের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
(৩)
শনিবার সকালে রেডিয়োতে ঘোষণা এল, সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। সেই সাথে মার্শাল ল-এর কঠোর বিধিনিষেধের কথা বারবার আওড়ানো হচ্ছিল— সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আর সরকারি কর্মচারীদের কাজে ফেরার কড়া নির্দেশ। কিন্তু মানুষ তখন নির্দেশ শোনার অবস্থায় নেই। সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই আকাশজুড়ে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া ছাপিয়ে রাজপথে নামল মানুষের ঢল।
কেউ গাড়িতে, কেউ রিকশায়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই সেরেফ হেঁটে ঢাকা ছাড়তে শুরু করল। যে যা পেরেছে সাথে নিয়েছে, কিন্তু সবার চোখে মুখে কেবল এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক। হাজারে হাজারে, লাখে লাখে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটছে। বাতাসে কেবল হাহাকার—”আমাকে একটু তুলে নাও বাবা, আমি বুড়ো মানুষ”, “আল্লাহ সাহায্য করো”, “আমার বাচ্চাদের অন্তত সাথে নাও”। মুখ বুজে নিঃশব্দে তারা পার হয়ে যাচ্ছিল সেসব রাস্তা, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের ‘দক্ষ’ হাতে নিখুঁতভাবে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে।
শহরের সরকারি অফিসগুলো প্রায় জনশূন্য। যারা পালাতে পারেনি, তারা নিজেদের ভস্মীভূত ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মাঝে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। জমানো ছাইয়ের নিচ থেকে যদি টুকরো কোনো স্মৃতি বা ব্যবহার্য জিনিস উদ্ধার করা যায়, সেই আশায় তারা উলটেপালটে দেখছিল দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিনের চালগুলো। রাস্তায় তখন কেবল দুই ধরনের দৃশ্য—হয় পলায়নপর মানুষের ভিড়, নয়তো রেড ক্রস লাগানো গাড়িতে করে বয়ে নেওয়া হচ্ছে মৃত আর আহতদের স্তূপ।
এরই মাঝে মাঝে টহল দিচ্ছিল পাকিস্তানি সেনাদের কনভয়। বন্দুকের নলের ওপর হাত রেখে তারা হিমশীতল চোখে তাকিয়ে ছিল এই দিশেহারা ভিড়ের দিকে। শুক্রবার রাতে ব্যারাকে ফেরার সময় তারা জয়োল্লাসে চিৎকার করেছিল “নারায়ে তকবির” বলে, আর শনিবার তাদের মুখে ছিল “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগান। সাধারণ মানুষ সেই সংকেত বুঝে নিয়েছিল। তাই কারফিউ শুরু হওয়ার আগে বাজারের সবচেয়ে দামি বা কাঙ্ক্ষিত বস্তু হয়ে দাঁড়াল পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা। নিজের স্থাবর সম্পদটুকু রক্ষা করার শেষ চেষ্টা হিসেবে মানুষ তখন তাদের বাড়ির ছাদে তুলছিল সেই পতাকা, যেন ঘাতক বাহিনী ওটা দেখে অন্তত ঘরটা পুড়িয়ে না দেয়। ৪টা বাজার সাথে সাথে জাদুর মতো রাস্তাগুলো আবার ফাঁকা হয়ে গেল, শহর ঢাকা পড়ল এক মৃত্যু শীতল নিস্তব্ধতায়।
(৪)
বিকেল চারটা বাজার ঠিক দুই মিনিট পরের কথা। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে দিয়ে এক ছোট ছেলে দৌড়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। অমনি এক পাকিস্তানি অফিসার তাকে থামিয়ে সজোরে চার-চারটি থাপ্পড় কষাল। তারপর হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে তুলল জিপে। ঠিক একই সময়ে ঢাকা ক্লাবের গেট বন্ধ করতে গিয়ে এক হতভাগ্য নৈশপ্রহরীও রেহাই পেল না; তাকে সরাসরি গুলি করে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। রেডিয়োতে তখন ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হচ্ছে— বিকেল চারটার পর বাইরে পা রাখলেই গুলি!
রেসকোর্সের মাঝখানে একটি মন্দিরের আশেপাশে থাকা একদল হিন্দু পাকিস্তানি নাগরিককেও কোনো কারণ ছাড়াই নির্বিচারে হত্যা করা হলো। তারা তো কেবল খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল! যারা শহর ছাড়তে গিয়ে সেনার বাধার মুখে ফিরে এসেছিল, তারা শোনাল আরও ভয়াবহ গল্প। লোকালয় ছেড়ে ঝোপঝাড় আর মাঠের ওপর দিয়ে যারা পালানোর চেষ্টা করছিল, তাদের অনেককেই পাকিস্তানি সৈন্যরা খুঁজে খুঁজে মেরে ফেলেছে। শহরের বাইরের সেই এলাকাগুলো তখন এক বিভীষিকাময় ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এমনকি নদীর পাড়ে যারা নৌকার আশায় বসে ছিল, তাদেরও নিস্তার মেলেনি; পরদিন সকালে সেখানে কেবল চাপ চাপ তাজা রক্তের দাগ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
পুরো ঢাকা শহর জুড়ে কোথাও তখন সংগঠিত প্রতিরোধের ছিটেফোঁটা চিহ্নও নেই। এই নিরস্ত্র মানুষের অসহায়ত্ব দেখে পাঞ্জাবি লেফট্যানেন্টরা বিদ্রুপের হাসি হাসত। এক অফিসার দম্ভভরে বলছিল, “পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। কেউ এখন টুঁ শব্দ করতে পারবে না, বের হতে পারবে না। বের হলেই আমরা তাদের মেরে ফেলব।” তাদের চোখে এই নিরস্ত্র শান্তিকামী মানুষগুলো ছিল কেবলই ‘গাদ্দার’ বা দেশদ্রোহী। ঈশ্বর আর অখণ্ড পাকিস্তানের নামে তারা এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে এক পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে প্রমাণের নির্লজ্জ চেষ্টা চালাচ্ছিল। জেনারেল টিক্কা খানের সুপরিকল্পিত এই অপারেশন যেন বাঙালির মন থেকে প্রতিরোধের শেষ ইচ্ছাটুকুও মুছে ফেলার এক বীভৎস আয়োজন।
(৫)
শহরজুড়ে তখন এক থমথমে নীরবতা, যেন কোনো এক দানব তার শিকার শেষ করে আয়েশ করে বসে আছে। পাকিস্তানি মেজর আর লেফটেন্যান্টদের মুখে তখন বিজয়ের চওড়া হাসি। তারা ভাবছিল, কামানের গোলা আর মেশিনগানের গুলিতে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে কবর দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, রক্ত দিয়ে লেখা এই ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। ডাব্লিউ ডাব্লিউ টু-র সেই আমেরিকান এম-২৪ ট্যাংকগুলো দিয়ে তারা হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজারবাগের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের মনের জেদ ভাঙতে পারেনি।
জেনারেল টিক্কা খানের সুপরিকল্পিত এই ‘অপারেশন’ ছিল এক বীভৎস নিষ্ঠুরতা, যার লক্ষ্য ছিল পুরো একটা জাতিকে ভয়ের খাঁচায় বন্দি করা। পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসাররা দম্ভভরে বলছিল, “এই লোকগুলো আমাদের মারার চেষ্টা করলেও পারত না।” তারা নিজেদের ‘খোদার সৈনিক’ আর বাঙালিদের ‘গাদ্দার’ বলে গালি দিচ্ছিল। কিন্তু সায়মন ড্রিং তার নোটবইয়ে ঠিকই লিখে রেখেছিলেন এক চরম সত্য— ইয়াহিয়া খান যতবারই গণতন্ত্র আর ক্ষমতা হস্তান্তরের মিষ্টি কথা বলুন না কেন, আসলে তারা কখনোই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে চায়নি। বন্দুকের নলই ছিল তাদের একমাত্র ভাষা।
ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গার তট— সবখানেই তখন কেবল মৃত্যু আর ধ্বংসের চিহ্ন। পঁচিশে মার্চের সেই কালো রাত থেকে শুরু করে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার তাণ্ডবে অন্তত ৭,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আর পুরো প্রদেশে সেই সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ১৫,০০০-এ। শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে হয়তো তারা ভেবেছিল সব শেষ, কিন্তু বাংলার আকাশ-বাতাসে তখনো এক গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে বেজে উঠছিল “বাংলাদেশ” নাম।
শহর থেকে পালিয়ে যাওয়া সেই লাখো মানুষের চোখে ছিল আগুনের স্ফুলিঙ্গ। তারা দেখেছিল কীভাবে তাদের ভাইদের ছাত্রাবাসে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কীভাবে বাজারের কসাইকে তার দোকানের পেছনেই গুলি করা হয়েছে। সায়মন ড্রিং যখন ব্যাংকক থেকে এই প্রতিবেদনটি পাঠাচ্ছিলেন, তিনি জানতেন এই ক্ষত সহজে শুকোবার নয়। এক প্রজন্মের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এই ট্র্যাজেডি আর গণহত্যার ভয় মানুষের মন থেকে মুছবে না। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিন যে হাহাকার শুরু হয়েছিল, তা-ই একদিন রূপ নিয়েছিল এক অজেয় শক্তিতে, যা পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন এক দেশের নাম লিখে দিয়েছিল— বাংলাদেশ।

পরে পড়বো
১৪
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন