প্রসূন গোস্বামী

গল্প - রক্তভেজা সেই কালরাত : বিভীষিকার শুরু

প্রসূন গোস্বামী
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬ অন্যান

(১)
পঁচিশে মার্চের সেই রাতটি ছিল তপ্ত, গুমোট আর এক অশুভ নিস্তব্ধতায় ঘেরা। আকাশটা মেঘলা ছিল কি না আজ আর মনে পড়ে না, কিন্তু মানুষের মনের কোণে যে একটা আসন্ন প্রলয়ের মেঘ জমেছিল, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক যেমন ১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর মার্কিনিরা চিরকাল মনে রাখবে ‘কলঙ্কিত দিন’ হিসেবে, আমাদের এই পূর্ব বাংলার ইতিহাসে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের রাতটিও ঠিক তেমনি এক কালিমালিপ্ত বিভীষিকার রাত হয়ে ইতিহাসে খোদাই হয়ে রইল।
সেই সন্ধ্যায় ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেলের বাড়িতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের খেলা চলছিল। বাইরে যখন রাজনৈতিক সংকটের পারদ তুঙ্গে, ভেতরে তখন এক অদ্ভুত ‘স্বাভাবিকতা’ বজায় রাখার চেষ্টা। মোট ষোলো জন অতিথির জন্য নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। ডিনারের পর ড্রয়িংরুমে সবাই মিলে দেখতে বসেছিলেন স্পেন্সার ট্র্যাসি আর লানা টার্নার অভিনীত ‘ক্যাস টিম্বারলেন’ নামের একটি ছবি। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাবখানা ছিল এমন— সবকিছু তো ঠিকই আছে, দুশ্চিন্তার কী কারণ? কিন্তু ছবিটা ছিল বড্ড বেশি বিষণ্ণ, ঠিক যেমন বাইরের থমথমে পরিবেশটা।
হঠাৎ সেই শান্ত পরিবেশে একটা ছন্দপতন ঘটল। বেজে উঠল জরুরি ফিল্ড ফোনটি। ওপাশ থেকে হিউ হাইটের উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে এল। তিনি জানালেন, ঢাকার রাজপথে ছাত্ররা গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করছে যাতে সেনাবাহিনীর গাড়ি ঢুকতে না পারে। তার চেয়েও বড়ো খবর— ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য নেতারা নাকি হঠাৎ করেই ঢাকা ছেড়ে করাচির পথে উড়াল দিয়েছেন। হাইট সাহেব কোনোমতে তার অফিসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
খবরটা শোনার সাথে সাথেই অতিথিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। ডিনারের সেই কৃত্রিম আভিজাত্য এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আমন্ত্রিত বাঙালিদের মধ্যে ছিলেন হাইকোর্টের দুই বিচারপতি আর তাঁদের স্ত্রীরা। তাঁরা দ্রুত নিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। এক আমেরিকান দম্পতি তাঁদের সন্তানদের কথা ভেবে বের হওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয়ে নীল হয়ে ফিরে এলেন তাঁরা। তারা জানালেন, মাত্র এক ব্লক দূরেই রাস্তার ওপর একটা মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে।
বাইরে তখন মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। যুগোস্লাভ কনসাল জেনারেল আর তাঁর স্ত্রী, সাথে ডেপুটি বব কার্ল ও তাঁর স্ত্রী সুজি— সবাই বুঝলেন আজ আর কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। মেগ তড়িঘড়ি করে সবার জন্য শোয়ার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। সেই রাতে এক নিমেষে বারোজন মানুষ সেই বাড়িতে অপ্রত্যাশিতভাবে আটকা পড়ে গেলেন। বাইরে তখন অন্ধকার ফুঁড়ে ভেসে আসছিল আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন আর মানুষের আর্তনাদ। ইতিহাসের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, কিন্তু তা রক্তের গলি বেয়ে।
(২)
রাত তখন দশটা বেজেছে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিন্তু সেই অন্ধকার চিরে হঠাৎ হঠাৎ আকাশে আগুনের লকলকে রেখা দেখা যাচ্ছে। কনসাল জেনারেলের কাছে আবার ফোন এল হিউ হাইটের। হাইট আর তার এক সঙ্গী ম্যাকডারমট তখন কোনোমতে তাদের অফিসে পৌঁছেছেন। সেখান থেকে আসা রিপোর্টগুলো ছিল ভাঙা ভাঙা, কিন্তু সেগুলোতে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্যের ইঙ্গিত— শুরু হয়ে গেছে সামরিক অভিযান।
হাইট আর ম্যাকডারমট যে সেই রাতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যোগাযোগের লাইন সচল রেখেছিলেন, তার জন্য পরে তাদের বিশেষ প্রশংসা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা বেশ কয়েকবার তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েছিল, কিন্তু দমে যাননি তাঁরা। সেই রাতে কনসুলেট অফিসের ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে কনসাল জেনারেল আর তাঁর অতিথিরা এক অদ্ভুত ও বীভৎস দৃশ্য দেখলেন।
পুরো আকাশটা যেন ট্রেসার বুলেটের আলোয় রাঙিয়ে উঠছে। দূরে কোথাও ভারী মেশিনগানের ‘খট্ খট্’ শব্দ, আর তার সাথে যোগ হয়েছে ট্যাংকের গোলার বুক কাঁপানো গর্জন। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, মূল লড়াইটা চলছে পুলিশ লাইন আর ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (EPR) ব্যারাকে। চোখের সামনে দেখা যাচ্ছিল দাউ দাউ করে জ্বলছে শহর। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার দিকটা যেন আগুনের কুণ্ডলী হয়ে আছে। বাড়ির প্রধান বেয়ারা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন; তিনি খবর পেয়েছেন একটি বিশাল আগুন জ্বলছে সেই বস্তি এলাকায়, যেখানে তার নিজের পরিবার থাকে।
২৬শে মার্চের সূর্য যখন উঠল, ঢাকা শহরটা তখন যেন এক রক্তাক্ত শ্মশান। সবখানে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু কোনো গোলাগুলির শব্দ নেই। পুরো শহরে জারি করা হয়েছে দিনভর কারফিউ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জিপ টহল দিচ্ছে। সেদিনই সন্ধ্যা সাতটায় করাচি থেকে রেডিয়োতে ভেসে এল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার গলা। তিনি হুংকার ছাড়লেন— পূর্ব পাকিস্তানে শৃঙ্খলা ফেরাতে সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। শেখ মুজিবকে তিনি ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করলেন এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে দিলেন।
সেই থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে একটু সুযোগ মিলল ২৭শে মার্চ সকাল সাতটায়, যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তোলা হলো। কনসাল জেনারেল তড়িঘড়ি করে বের হলেন আমেরিকান কমিউনিটির খোঁজ নিতে। সেই ফাঁকেই তিনি দেখা করতে গেলেন সিভিল অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর জেনারেল ফরমান আলির সাথে। লম্বাটে, কিছুটা গম্ভীর চেহারার এই মানুষটি আগে পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করে গেছেন, এমনকি বাংলাও জানতেন। তার কন্যারাও পড়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফরমান আলির মুখে তখন এক বিচিত্র অভিব্যক্তি— সবার মনে যে আতঙ্ক, তার লেশমাত্র নেই সেখানে।
(৩)
জেনারেল ফরমান আলির সামনে যখন কনসাল জেনারেল গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন মানুষটির চেহারায় ছিল এক আশ্চর্য শীতলতা। ফরমান আলিকে সবাই চিনত লম্বা, কিছুটা উদাসীন ধরনের মানুষ হিসেবে। তিনি বেশ গুছিয়ে কথা বলতেন, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথেও তার এক ধরনের মেলামেশা ছিল। কিন্তু সেই দিন তার প্রতিটি কথার পেছনে যেন লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত রহস্য।
কনসাল জেনারেল যখন উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইলেন কোনো আমেরিকান বা বিদেশি নাগরিকের ক্ষতি হয়েছে কি না, ফরমান আলি খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। তিনি জানালেন, কোনো আহতের খবর তাদের কাছে নেই। তবে আগের রাতে কারফিউর মধ্যে দুজন আমেরিকান গাড়ি নিয়ে ঘুরছিলেন, তাঁদের শুধু ধমক দিয়ে ঘরে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফরমান আলির দাবি অনুযায়ী, পুরো ঢাকা শহর তখন সেনাবাহিনীর ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণে’। চট্টগ্রাম নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি জানালেন, সেখানেও বেশ গন্ডগোল হয়েছে, তাই আপাতত পুরো প্রদেশে যাতায়াত করাটা বড্ড অনিরাপদ।
এরপর ফরমান আলি পঁচিশে মার্চের সেই রাতের সামরিক সংস্করণ বা ‘MLA ভার্শন’ শোনানো শুরু করলেন। তার দাবি অনুযায়ী, পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যা সাতটায় যখন ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে উড়াল দিলেন, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগ নেতারা রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া শুরু করেন। ফরমান আলির মতে, পরিকল্পনাটা ছিল এমন যে পুলিশ আর ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (EPR) একজোট হয়ে সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে ফেলবে এবং পুরো ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নেবে।
তিনি আরও বললেন যে, পুলিশ আর ইপিআর সদস্যরা নাকি সত্যিই আওয়ামী লীগের পক্ষে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। কিন্তু মাত্র আধ ঘণ্টার এক ‘ভয়ংকর লড়াই’ নাকি সেনাবাহিনী তাঁদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে! সবচেয়ে অদ্ভুত আর গা শিউরে ওঠা বিষয় ছিল ফরমান আলির সেই ‘স্ট্রেট ফেস’ বা ভাবলেশহীন মুখ। তিনি একদম সিরিয়াস মুখে দাবি করলেন, পঁচিশে মার্চ রাত সাড়ে বারোটায় টেলিফোন লাইনগুলো নাকি আওয়ামী লীগ নেতারাই কেটে দিয়েছিলেন!
কনসাল জেনারেল মনে মনে হাসলেন। তার বুঝতে বাকি রইল না যে ফরমান আলি ডাহা মিথ্যে বলছেন। সেনাবাহিনী যখন চারপাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, তখন আওয়ামী লীগ নেতারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে দিগ্‌বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছিলেন— সেটা আর কারও অজানা ছিল না। ফরমান আলি এটাও নিশ্চিত করলেন যে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
২৭শে মার্চ বিকেলের দিকে মার্কিন কনসুলেট থেকে তাদের প্রথম ‘সিচুয়েশন রিপোর্ট’ পাঠানো হলো। রিপোর্টে পরিষ্কার করে লেখা হলো : সেনাবাহিনী এখন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সব আমেরিকান নিরাপদ আছেন। কিন্তু নোয়াখালীতে কেয়ার (CARE) প্রতিনিধির কাছ থেকে আসা খবরগুলো ছিল ভয়াবহ। গ্রামবাংলা তখন এক চরম উত্তেজনা আর আতঙ্কের চাদরে ঢাকা। সেই রিপোর্টেই প্রথমবার সরকারিভাবে জানানো হলো— ঢাকার রাজপথে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের দমনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে অভিযান চালিয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত দ্রুত, দক্ষ এবং একই সাথে ‘নির্মম পাশবিকতায়’ ভরা।
(৪)
২৭শে মার্চের সেই গুমোট দুপুরে কনসুলেটের দপ্তরে যখন প্রথম পরিস্থিতি রিপোর্টটি চূড়ান্ত হচ্ছিল, তখন চারপাশ থেকে আসা তথ্যের টুকরোগুলো এক ভয়ংকর ছবির জন্ম দিচ্ছিল। সেনাবাহিনী দাবি করেছিল তারা ‘দক্ষতার সাথে’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের খবর বলছিল অন্য কথা। সেই বর্ণনায় কোনো বীরত্ব ছিল না, ছিল কেবল ‘নির্মম পাশবিকতা’।
সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছিল— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? পঁচিশে মার্চের সেই কালরাতের ঠিক আগের মুহূর্তের একটি রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এল রাজ্জাক সাহেবের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন এমপিএ-ইলেক্ট এবং আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান। এক নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে জানা গেল, পঁচিশে মার্চ রাত ১১টা থেকে ১১টা ২০-এর দিকে রাজ্জাক সাহেব সশরীরে গিয়েছিলেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অনুনয় করেছিলেন বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ কোথাও চলে যেতে। কিন্তু সেই মানুষটি ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, “পাকিস্তানিরা যদি রক্ত চায়, তবে তারা আমার রক্তই নিক। আমি পালিয়ে গেলে আমার দেশের মানুষের ওপর ওরা আরও বেশি অত্যাচার চালাবে। আমি এখানেই থাকব।” রাজ্জাক সাহেব যখন সেখান থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখনো বঙ্গবন্ধু নিজের সিদ্ধান্তে অনড়।
ঠিক সেই সময়টার কাছাকাছি, অর্থাৎ রাত সাড়ে নয়টা থেকে দশটার দিকে কনসুলেটের এক স্থানীয় কর্মী খবর পাঠান যে স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যারিকেড দিচ্ছে। কারণ একটাই—খবর ছড়িয়ে পড়েছে, ‘মিলিটারি আসছে’। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের অবিরাম গর্জন। আজিমপুর গোরস্তানের দিক থেকে ভেসে আসছিল ভয়ংকর আর্তনাদ। পিলখানা থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা ইপিআর (EPR) সদস্যরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁদের পিছু ছাড়েনি। সেই গোরস্তানেই অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটির খুব কাছেই থাকতেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তিনি জানিয়েছিলেন, রাত ঠিক বারোটার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির চারপাশ থেকে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। তারপর রাত দেড়টার দিকে শুরু হয় ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গর্জন। বৃষ্টির মতো গুলি ধেয়ে আসছিল সেই বাড়িটি লক্ষ্য করে। ভোরের আলো যখন ফুটল, দেখা গেল সেই চিরচেনা বাড়িটির ওপর থেকে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা আর কালো পতাকা—দুটোই গায়েব হয়ে গেছে। বাড়িটা এখন নিথর, স্তব্ধ।
পুরোনো ঢাকার অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁতীবাজার আর শাঁখারীবাজার এলাকা সামরিক বাহিনী চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছিল। সেখানে প্রায় ১০,০০০ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বাস। খবর আসছিল, একের পর এক বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর সাধারণ মানুষকে পশুর মতো জবাই করা হচ্ছে। হতাহতের সংখ্যা কত, তা তখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছিল না। যারা প্রাণে বেঁচেছিলেন, তারা পাগলের মতো শহর ছেড়ে পালাচ্ছিলেন।
আর সেই রাতে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থানরত সব বিদেশি সাংবাদিকদের এক জায়গায় জড়ো করল সেনাবাহিনী। তাঁদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো বিমানবন্দরে। উদ্দেশ্য একটাই— বাইরের পৃথিবী যেন এই বীভৎসতার কোনো খবর না পায়। তাঁদের করাচি পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা জানত না, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে একজন সাহসী সাংবাদিক তখনো ঢাকার বুকেই রয়ে গেছেন।
(৫)
২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন ভেবেছিল তারা বিশ্ববিবেকের চোখ পুরোপুরি বেঁধে ফেলেছে, তখনই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে যখন সব বিদেশি সাংবাদিককে ধরে ধরে বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন ২৭ বছর বয়সি এক তরুণ সাংবাদিক অদ্ভুত সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। তিনি লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিনিধি সাইমন ড্রিং।
সাইমন জানতেন, হোটেলের লবিতে ধরা পড়লে তাকেও নির্বাসনে যেতে হবে। তাই তিনি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেলের ছাদে গিয়ে লুকিয়ে রইলেন। সারা রাত ওপর থেকে দেখলেন ঢাকার বুকে আগুনের লেলিহান শিখা আর শুনলেন কামানের গর্জন। পরদিন তিনি হোটেলের ছাদ থেকে নেমে শহরের অলিগলি ঘুরে দেখলেন সেনাবাহিনীর সেই নারকীয় তাণ্ডবের চিহ্ন। দুই দিন পর যখন তিনি করাচি হয়ে দেশ ছাড়লেন, তখন তার মোজার ভেতর লুকানো ছিল সেই ঐতিহাসিক নোটগুলো। পাকিস্তানি সেনারা তাকে দুইবার নগ্ন করে তল্লাশি চালিয়েও সেই মহামূল্যবান তথ্যগুলো খুঁজে পায়নি। সাইমন ড্রিং আর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আর্নল্ড জাইটলিন এবং মাইকেল লরেন্টের পাঠানো রিপোর্টগুলোই ছিল বাইরের পৃথিবীর জন্য প্রথম সত্যের জানালা।
এদিকে ৩১শে মার্চে ঢাকার সাব-এমএলএ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এক পাকিস্তানি লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবার সেই পুরোনো নাটক শুরু করলেন। তিনি কনসাল জেনারেলকে একদম ‘সিরিয়াস’ মুখে বললেন যে, বিদেশি সাংবাদিকদের নাকি তাদের নিজেদের অনুরোধেই করাচি পাঠানো হয়েছে! কারণ সাংবাদিকরা নাকি ভয় পাচ্ছিলেন এবং যেহেতু প্রেস সেন্সরশিপ চলছে, তাই তারা কোনো রিপোর্ট পাঠাতে পারছিলেন না। এই ডাহা মিথ্যে কথা শুনে কনসাল জেনারেলের মনে হলো এক বিকট অট্টহাসি দেন, কিন্তু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের খাতিরে তাকে কেবল একটি ফিকে হাসি দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। একজন সত্যিকারের সাংবাদিক কি কখনো ব্রেকিং নিউজের ওপর বসে থেকে ভয়ে পালিয়ে যেতে চাইবেন? এটি ছিল সেরেফ এক কাণ্ডজ্ঞানহীন অজুহাত।
২৭শে মার্চ ছিল এক ব্যস্ততম দিন। পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অফিসার ব্রায়ান বেল একজন বাঙালি সংবাদকর্মীকে সাথে নিয়ে সারা শহর ঘুরলেন। যা দেখলেন, তা ছিল বর্ণনাতীত। আওয়ামী লীগ সমর্থক পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’-এর অফিসটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে তখনো নিউজপ্রিন্ট কাগজগুলো ধিকিধিকি জ্বলছিল। ইত্তেফাকের কর্মীরা জানালেন, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যখন প্রোডাকশন স্টাফরা কাজ করছিলেন, তখন হঠাৎ করে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই ট্যাংক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনারা। ব্রায়ান বেল নিজ চোখে আসফাল্টের ওপর ট্যাংকের চেইনের দাগ আর একটি পোড়া কয়লা হয়ে যাওয়া লাশ দেখতে পেলেন। ভবনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ভেতরে মৃতের সংখ্যা অনেক।
রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। ভারী অস্ত্রের গোলার আঘাতে পুরো ব্যারাক মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে অসম যুদ্ধ চলেছিল। পুলিশের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা ছিল আকাশচুম্বী। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ছিল যেন এক ধ্বংসস্তূপ। পাকিস্তানিরা গুজব ছড়িয়েছিল যে সেখানে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র জমা করা হয়েছে। মর্টার শেলের আঘাতে ভবনটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। হলের প্রবেশপথের মাত্র দশ ফুট দূরে পড়ে ছিল একটি নিথর দেহ। ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল অনেক জায়গায়।
(৬)
ব্রায়ান বেলের ডায়েরিতে সেই দিনের স্মৃতিগুলো যখন জমা হচ্ছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি কোনো উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র নয়, বরং একটি পরিকল্পিত কসাইখানা বলে মনে হচ্ছিল। ইকবাল হলের সেই পোড়া গন্ধ আর ধ্বংসস্তূপ পার হয়ে তারা যখন একটু সামনে এগোলেন, তখন শুনতে পেলেন ছাত্রদের আর্তনাদ মেশানো বয়ান। তারা জানাল, শুধু ইকবাল হলের ভেতরেই আটজন ছাত্রের নিথর দেহ পড়ে আছে।
কিন্তু এর চেয়েও বড়ো বিভীষিকা অপেক্ষা করছিল জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্রদের হোস্টেলে। সেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল পঁচিশ। মর্টার আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলার আঘাতে দেয়ালগুলো যেন বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্রায়ান বেল প্রভোস্টের অফিসের ভেতরে গিয়েও আগুনের তাণ্ডবের চিহ্ন দেখতে পেলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি অংশটা তখনো মোটামুটি অক্ষত ছিল—তার মানে সেনাবাহিনী বেছে বেছে শুধু নির্দিষ্ট কিছু জায়গা লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছিল।
রপর তারা পা রাখলেন পুরোনো ঢাকার উপকণ্ঠে। সেখানে দৃশ্যটা ছিল আরও নরকতুল্য। একটি বিশাল এলাকা পুরোপুরি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। বাজার, দোকানপাট, সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি— সবই এখন কয়লার স্তূপ। এমনকি রেলওয়ে শ্রমিকদের ডরমিটরি ভবনটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে ঘরগুলো কাঁচা বা টিনের তৈরি ছিল, সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। ব্রায়ান বেলের হিসেব মতে, প্রায় দুই ডজন মার্কিন সিটি ব্লকের সমান এলাকা সেরেফ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা কাঁপতে কাঁপতে জানালেন, সেনাবাহিনী নাকি বুক ফুলিয়ে বলেছে তারা এই এলাকাটি ‘ব্লাস্ট’ বা উড়িয়ে দিয়েছে কারণ এখানেই নাকি পুরোনো ঢাকার সব ‘গন্ডগোল পাকানো’ লোকজন বাস করত!
ইউএসআইএস (USIS)-এর ঠিক উলটো পাশে ছিল প্রেস ক্লাব। সেখানে গিয়ে দেখা গেল দোতলার দেয়ালে তিনটি বিশাল গর্ত—মর্টার শেল ছোঁড়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর সাফ কথা হলো, এই সংবাদকর্মীরাই নাকি যত নষ্টের গোড়া, তারাই যত ‘ঝামেলা’ উসকে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত বারোটার দিকে যখন সেখানে হামলা হয়, ভেতরে ছিলেন শুধু একজন নাইট গার্ড। সেই হতভাগ্য লোকটিও স্প্লিন্টারের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সমর্থক পত্রিকা ‘দ্য পিপল’, যারা সামরিক জান্তার কট্টর সমালোচক ছিল, তাদের অফিসটিও বাদ যায়নি। বাইরে থেকে সবটা বোঝা না গেলেও ভেতরে থাকা লোকজন জানাল, অফিসটির ভেতরটা পুড়িয়ে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। অদ্ভুত এক বৈপরীত্য দেখা গেল ঠিক পাশেই—ইউএসআইএস ভবনটি কিন্তু একদম অক্ষত রয়ে গেছে।
২৭শে মার্চের সেই পড়ন্ত বিকেলে ব্রায়ান বেল আর তার সঙ্গী যখন ফিরে আসছিলেন, তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখলেন। হাজার হাজার বাঙালি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন। কারো মাথায় পুঁটলি, কারো হাতে ছোট সুটকেস বা অতি প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। মানুষের এই স্রোতটি শহরের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে ছুটছে। তাদের চোখে মুখে কোনো ক্ষোভ নয়, ছিল কেবল এক আদিম আতঙ্ক। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, এই শহর আর তাদের জন্য নিরাপদ নয়। ঢাকা শহরটা যেন বুক চিরে রক্ত ঝরিয়ে এক নিঃশব্দ হাহাকারে পরিণত হয়েছে।
(৭)
শহরটা হঠাৎ করেই বড়ো অদ্ভুত হয়ে গেল। সাতাশে মার্চ সকালে যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তোলা হলো, তখন দেখা গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য। ঢাকা শহর যেন এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। চারদিকে কেবল মানুষের স্রোত— সবাই পালাচ্ছে। কারো মাথায় একটা টিনের বাক্স, কারো হাতে ধরা ছোট বাচ্চার হাত, কেউ বা বৃদ্ধা মাকে পিঠে নিয়ে হাঁটছে। গন্তব্য একটাই— শহর থেকে দূরে, অনেকটা দূরে কোনো গ্রাম। পাকিস্তানি সেনারা তখনো মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল এই পলায়নপর মানুষের মিছিল, তাদের চোখে ছিল এক পৈশাচিক তৃপ্তি।
২৮শে মার্চ আবার কারফিউ জারি করা হলো। পুরো শহরটা যেন এক প্রেতপুরী। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার সুযোগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের ধ্বংসযজ্ঞের পরবর্তী ধাপ শুরু করল। মার্কিন কনসুলেটের কর্মীরা লক্ষ্য করলেন, এবার তাদের টার্গেট কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক। খবর এল, চকবাজারের বিশাল এলাকাটি দাউ দাউ করে জ্বলছে। সেখানকার ব্যবসায়ীরা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের। শুধু আগুন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি তারা, বুলডোজার দিয়ে দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। কনসুলেটের রিপোর্ট অনুযায়ী, পুরো এলাকায় অন্তত কয়েক হাজার মানুষ সেই রাতে গৃহহীন হয়ে পড়ে।
শহরে তখন গুজব আর বাস্তব একাকার হয়ে গেছে। শোনা গেল, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কিছু শিক্ষককে তাদের পরিবারসহ হত্যা করা হয়েছে। ডক্টর ফজলুর রহমান, ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব— এমন বড়ো বড়ো সব নাম সেই মৃত্যুমিছিলে যোগ হয়েছে। সেনারা যখন অধ্যাপকদের বাসভবনে ঢুকেছে, তখন তারা একবারও ভাবেনি যে তারা সভ্যতার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। তাদের কাছে নির্দেশ ছিল পরিষ্কার—যাদের মাথা উঁচু, তাদেরই মাথা নিচু করে দিতে হবে।
এরই মধ্যে খবর এল চট্টগ্রামের। চট্টগ্রাম ছিল তখন প্রতিরোধের দুর্গ। ইপিআর এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাহসী বাঙালি সদস্যরা সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লিপ্ত। ২৮শে মার্চের সিচুয়েশন রিপোর্টে বলা হলো, চট্টগ্রামে তখনো তুমুল যুদ্ধ চলছে। শহরের কিছু অংশ বাঙালিদের দখলে থাকলেও পাকিস্তানি নৌবাহিনী সমুদ্র থেকে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করছিল। তারা জানত, চট্টগ্রাম বন্দর দখল করতে না পারলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রসদ আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এদিকে ঢাকার পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে পাকিস্তানি প্রশাসন এক নতুন চাল চালল। তারা ঘোষণা করল যে জীবন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তব ছিল ঠিক উলটো। কোনো সরকারি কর্মকর্তা অফিসে যাচ্ছিলেন না, ব্যাংকগুলো ছিল তালাবদ্ধ। কনসুলেটের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার অন্তত ৮০ শতাংশ দোকানপাট তখনো বন্ধ। রাস্তায় কোনো রিকশা বা যানবাহন নেই। এই গুমোট নিস্তব্ধতা আসলে কোনো শান্তি ছিল না, এ ছিল ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। মানুষ তখন রেডিয়োর নব ঘোরাচ্ছিল যদি কোথাও থেকে আশার কোনো বাণী শোনা যায়। আর সেই আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠেছিল চট্টগ্রামের এক গোপন বেতার কেন্দ্র, যেখান থেকে ভেসে আসছিল স্বাধীনতার অস্ফুট কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
(৮)
ঢাকার বাইরে তখন কী ঘটছে, সেটা জানার জন্য সারা বিশ্বের মানুষ তখন ছটফট করছিল। খবর আসছিল ধীরগতিতে, কিন্তু যা আসছিল তা ছিল রোমহর্ষক। পহেলা এপ্রিলের সেই তপ্ত দুপুরে মার্কিন কনসুলেটের দপ্তরে যখন চট্টগ্রামের সর্বশেষ খবরটি এসে পৌঁছাল, তখন সবার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। ঢাকা হয়তো শান্ত হয়ে গেছে অস্ত্রের মুখে, কিন্তু চট্টগ্রাম তখন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।
সেখানকার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের (EBR) সাহসী বাঙালি জওয়ান আর ইপিআর (EPR) সদস্যরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সমুদ্র থেকে বিরামহীন গোলাবর্ষণ করছিল শহরটি লক্ষ্য করে। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো সেই কামানের শব্দে থরথর করে কাঁপছিল। পাকিস্তানি সেনারা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছিল মরিয়া হয়ে, কারণ বন্দরটি তাদের জন্য ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। কিন্তু বাঙালি যোদ্ধারা তখন মরণপণ যুদ্ধে নেমেছেন। ৩০শে মার্চের সিচুয়েশন রিপোর্টে পরিষ্কার লেখা হলো— চট্টগ্রামে এখনো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সেখানে ‘সিভিল ওয়ার’ বা গৃহযুদ্ধ এখন এক অনিবার্য বাস্তব।
একদিকে যখন এই বীরত্বগাথা চলছিল, অন্যদিকে তখন ঢাকা শহরকে এক অদ্ভুত ‘স্বাভাবিকতার’ চাদরে ঢাকার চেষ্টা করছিল সামরিক সরকার। তারা প্রচার করছিল যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত। কিন্তু আমেরিকান কনসুলেটের কর্মীরা যখনই বাইরে বের হচ্ছিলেন, তারা দেখছিলেন অন্য এক দৃশ্য। রাস্তায় মানুষের কোনো চিহ্ন নেই, কেবল ক্ষুধার্ত কুকুর আর টহলরত জিপের শব্দ। কনসুলেটের এক বিশ্বস্ত বাঙালি কর্মী চুপি চুপি খবর দিলেন, কুষ্টিয়া আর ময়মনসিংহেও নাকি বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ইপিআর সদস্যরা নাকি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক পুরো কোম্পানিকে হটিয়ে দিয়েছেন! খবরটা শুনে কনসুলেটের কর্মকর্তাদের মনে হলো, একদল নিরস্ত্র মানুষের এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছে।
ঠিক এই সময়, ৩১শে মার্চ তারিখে ওয়াশিংটনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন তারবার্তা পাঠানো হলো। এটি ছিল স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন্য এক কঠোর হুঁশিয়ারি। রিপোর্টে লেখা হলো— পাকিস্তানিরা দাবি করছে তারা শান্তি ফিরিয়ে এনেছে, কিন্তু আসলে তারা এক বিশাল লাশের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কনসুলেটের হিসেবে, শুধু ঢাকাতেই নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হলো, সেনাবাহিনী অত্যন্ত সচেতনভাবে হিন্দু এলাকাগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং শিক্ষক-ছাত্রদের হত্যা করছে।
সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি ছিল সাধারণ মানুষের মনে সেই গভীর ক্ষত। যে মানুষগুলো প্রাণভয়ে শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল, তাদের চোখে যে ঘৃণা ছিল, তা মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনো বন্দুকের নলের নেই। পাকিস্তানি শাসকরা ভেবেছিল কয়েক দিনের এই ‘শকিং ট্রিটমেন্ট’ দিয়ে বাঙালিদের ঠান্ডা করে দেবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, এই রক্ত আর অশ্রু এক অজেয় শক্তির জন্ম দিচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় তখন রক্ত দিয়ে লেখা হচ্ছিল একটি নতুন দেশের নাম।
(৯)
পহেলা এপ্রিলের পর থেকে ঢাকার মার্কিন কনসুলেটের ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল। বাইরের পৃথিবী তখনো ঠিকমতো জানত না এই বদ্বীপের বুকে কী ভয়াবহ গণহত্যা ঘটে গেছে। ওয়াশিংটন থেকে আসা বার্তাগুলো ছিল বড্ড শীতল, যেন সেখানে বসে থাকা নীতিনির্ধারকরা কেবল সংখ্যা আর ভূ-রাজনীতি নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু কনসুলেটের ভেতরে যারা ছিলেন, তারা প্রতিদিন দেখছিলেন মানুষের হাহাকার আর পোড়া লাশের গন্ধ।
এই সময়টায় মার্কিন কনসুলেটের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি তারবার্তা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখানে কোনো সাধারণ বিদ্রোহ দমন করছে না, তারা করছে ‘Selective Genocide’ বা নির্বাচিত গণহত্যা। রিপোর্টে পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হলো, কীভাবে হিন্দু এলাকাগুলো— বিশেষ করে শাঁখারীবাজার আর তাঁতীবাজার— একেবারে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। রিপোর্টে বলা হলো, সেনাবাহিনী কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বরং হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করার একটি নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে।
কনসুলেটের কর্মকর্তারা লক্ষ্য করলেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তখনো ধোঁয়াশার মধ্যে। করাচি থেকে আসা সরকারি সেন্সর করা খবরগুলোতে বলা হচ্ছিল— সবকিছু ‘স্বাভাবিক’। কিন্তু কনসুলেটের রিপোর্ট জানাচ্ছিল যে, অন্তত ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষকে শুধু ঢাকাতেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হত্যা করা হয়েছে। এটি ছিল কেবল একটি রক্ষণশীল অনুমান; প্রকৃত সংখ্যা যে এর চেয়ে অনেক বেশি, তা বাতাসে ভাসমান লাশের গন্ধই বলে দিচ্ছিল।
এদিকে সারা দেশ তখন এক অন্যরকম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খবর আসছিল যে, প্রায় ১,০০০-এর বেশি বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য এবং ইপিআর জওয়ানরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন এবং সেখান থেকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো বলছিল, এটি কেবল কয়েক দিনের গন্ডগোল নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শুরু।
ওয়াশিংটনে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে এই ‘অস্বস্তিকর’ সত্যগুলো পৌঁছালেও তারা অনেকটা না দেখার ভান করছিলেন। কিন্তু কনসুলেটের সেই নির্ভীক কূটনীতিকরা দমে যাননি। তারা তাদের রিপোর্টে লিখলেন—”আমাদের নীরবতা মানে এই অন্যায়ের প্রতি সমর্থন।” ইতিহাসে এই প্রতিবাদটিই ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে অমর হয়ে থাকল। একদল মানুষের কলম তখন হয়ে উঠেছিল কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী, যা বিশ্ববিবেককে প্রথমবার ধাক্কা দিয়েছিল এই সত্য বলে যে— পূর্ব পাকিস্তান এখন আর পাকিস্তানের অংশ নেই, তা এখন এক স্বাধীন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রক্তাক্ত জনপদ।
(১০)
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চলল। ঢাকার আকাশটা এখন কেমন যেন ফ্যাকাশে আর বিষণ্ন। শহরের বুক চিরে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা নদীটি এখন আর শান্ত নেই; তার জলে ভাসছে অগণিত নিথর দেহ। মার্কিন কনসুলেটের রিপোর্টগুলোতে তখন যে ভয়াবহ পরিসংখ্যান উঠে আসছিল, তা পড়ার সাহস হয়তো কোনো সুস্থ মানুষের ছিল না। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে কেবল ঢাকাতেই মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দশ হাজারে। অথচ সরকারি রেডিয়োতে তখনো বেজে চলেছে দেশাত্মবোধক পাকিস্তানি গান, যেন কিছুই হয়নি।
পহেলা এপ্রিলের সেই বিশেষ রিপোর্টে কনসাল জেনারেল এক চরম সত্য উচ্চারণ করলেন। তিনি লিখলেন, “পাকিস্তানের এই অংশটি এখন আর আগের মতো নেই। পঁচিশে মার্চের সেই কালরাত বাঙালি জাতির হৃদয়ে এমন এক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, যা আর কোনোদিন জোড়া লাগবে না।” তিনি আরও যোগ করলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হয়তো বন্দুকের জোরে শহরগুলো দখলে রেখেছে, কিন্তু বাংলার মানুষের মন থেকে তারা চিরতরে বিদায় নিয়েছে।
সেই শেষ দিনগুলোতে কনসুলেটের কর্মীরা অবাক হয়ে দেখছিলেন বাঙালির প্রতিরোধ। খবর এল, টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ছাত্র-জনতা রুখে দাঁড়িয়েছে। সিলেট আর ময়মনসিংহেও প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তোলা হয়েছে। সারা দেশে প্রায় ১০,০০০ ইপিআর সদস্য এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩,০০০ নিয়মিত সেনা ভারতের সীমান্তে গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা সেখান থেকেই পালটা আক্রমণের ছক কষছেন। এটি এখন আর কোনো সাধারণ আন্দোলন নয়; এটি একটি মরণপণ লড়াই— বাঁচামরার যুদ্ধ।
কনসুলেটের রিপোর্টে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি এখন এই গণহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে ইতিহাসে তা এক বিশাল কলঙ্ক হিসেবে থেকে যাবে। যদিও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা তখনো ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু ঢাকার সেই নিভৃত কোণে বসে একদল মানুষ ঠিকই বুঝেছিলেন— বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম আজ সময়ের ব্যাপার মাত্র।
১০ই এপ্রিল যখন প্রবাসী সরকার গঠিত হলো, তখন সেই খবরের অনুরণন ঢাকার অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছে গেল। মানুষের চোখে তখন আর কেবল ভয় ছিল না, সেখানে ছিল প্রতিশোধের আগুন। এই দশটি দিনে একটি দেশের ইতিহাস বদলে গেছে। সাত কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কয়েক লাখ মানুষের রক্ত যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। সেই রক্তভেজা পিচঢালা রাস্তা আর ভস্মীভূত বস্তিগুলো সাক্ষী হয়ে রইল— অস্ত্র দিয়ে হয়তো শরীরকে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু একটি জাতির স্বাধীনতার ইচ্ছাকে কখনোই শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। রক্তমূল্যে কেনা সেই নতুন মানচিত্রের সূর্য তখন দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে।

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন