পাকনা হাওরের আজারি
পাকনা হাওরের আজারি
রিয়াজ খান-হৃদয়

গল্প - পাকনা হাওরের আজারি

রিয়াজ খান-হৃদয়
শুক্রবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৫ জীবনবাদী, দেশের

“পাকনা হাওরের আহাজারি”

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণে বিস্তৃত পাকনা হাওর বহু যুগ ধরে মানুষের হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা, জোয়ার-ভাটার গল্প বুকে নিয়ে বেঁচে আছে। বর্ষা এলে হাওর যেন নতুন প্রাণ পায়। জলে ভরে ওঠে মাঠঘাট, মাছেরা লুকোচুরি খেলে, গ্রামের ছেলেরা নৌকায় করে মাছ ধরে, গান গায়, হাসে। শীত এলে শুকিয়ে ওঠা মাঠে আবার শুরু হয় চাষাবাদ। সব মিলিয়ে হাওরটা যেন গ্রামের বুকের ওপর রাখা এক শান্তির বিস্তৃত উঠোন।

কিন্তু ২০১১ সালের বৈশাখ ছিল ভিন্ন।

চৈত্রের শেষ দিকেই অস্বাভাবিকভাবে পানি বাড়তে শুরু করে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, সামান্য বৃষ্টি আর কিছু নয়। কিন্তু টানা তিনদিন ঝড়-বৃষ্টি হাওরের মুখ বিকিয়ে দিল। পানি ফোলে উঠল, স্রোত বেপরোয়া হয়ে বাঁধের দিকে ধেয়ে এলো। বৈশাখের প্রথম প্রহরেই, বাঁধ ভাঙার খবর ছড়াতেই পুরো হাওর বাসী, মুহূর্তে নির্জন হয়ে গেল। কৃষকেরা ছুটে গেল হাওরের দিকে, চোখে আতঙ্ক, মনে অজানা ভয়।

সবচেয়ে আগে পৌঁছাল বুড়ো আকন চাচা। স্রোতের তীব্র শব্দের মাঝে দাঁড়িয়ে সে দেখল, সোনালি ধানের গুচ্ছগুলো থইথই পানিতে ভাসছে। বছরের পর বছর ধরে ঘাম ঝরিয়ে তোলা স্বপ্নগুলো এক রাতে ডুবে যাচ্ছে। চাচার কাঁধ নুয়ে গেল। ঠোঁট থরথর করে কেঁপে উঠল।

“হায় আল্লাহ… আমাদের কী হবে এখন?”

পাশেই ছিল তরুণ যুবক এপ্রোল । হাতে ধানের মুঠ, মানে ছোট ছোট গোছা করে বাঁধা ধান, আর সামনে লম্বাবিলের দিকে ছুটে চলা ভয়ংকর স্রোত। নৌকা ঠেলে শক্ত স্রোতের ব্যারিকেড পার হওয়ার চেষ্টা করতে করতে তার চোখেও একই আতঙ্ক।

“চাচা… যদি আর দুদিন বাঁধ টিকত, আমরা সব ধান কাটতে পারতাম। ঘরেও তো আর কিছু রইল না…”

হাওরের বাতাস যেন সেই কথাটা শুনে নিজেরাই কেঁপে উঠল। বিশাল বিস্তৃত হাওরটা এমন নিরব কোনোদিন ছিল না। পাখিরা যেন হঠাৎ গান ভুলে গেল। মাছেরা ছটফট করে স্রোতের আড়ালে গিয়ে লুকোল, যেন তারাও আতঙ্কিত।

রাতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলো, “যারা পারেন, সবাই হাওরে যান। যতটুকু ধান বাঁচানো যায়, বাঁচাই।”

পুরো গ্রাম ছুটে গেল। পুরুষ, নারী, তরুণ, বৃদ্ধ। কেউ ঘুমালো না। কেউ ঠিকমতো খেতে পারেনি। ভেজা শরীর, ঠান্ডা বাতাস, আর বুকের ভিতরে দুরুদুরু কাঁপুনি নিয়ে তারা সারারাত পানিতে দাঁড়িয়ে ধান টেনে তুলতে লাগল।

তারপরও সব বাঁচানো গেল না।

ভোরের আলো উঠতেই যেন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়াল এক মর্মান্তিক দৃশ্য। “পাকনা হাওর” নিজের বুক চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছে। পানি নোনতা নয়, কিন্তু সেই পানির ভেতর মিশে আছে শত মানুষের ঘাম আর চোখের জল।

গ্রামে এখনো সবাই বলে, “পাকনা হাওরের” সেদিনের আহাজারি… মানুষ ভুলতে পারে? হাওরও পারে না।

আজও যখন বাতাস হাওরের গায়ে একটু দোলা দেয়, মনে হয় যেন ফিসফিস করে কেউ বলছে, “আমাদের ধান বাঁচাও… আমাদের স্বপ্ন বাঁচাও…”

আর সেই বছরের শেষ কান্নার ঢেউ থেমে যাওয়ার পরও মানুষ থামতে পারেনি। অনেকের ঘর-বাড়ি, ফসল, জীবন সব ভেসে গিয়েছিল। স্বপ্ন ভেঙে চূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেল দূর শহরে, কেউ আবার পাড়ি জমাল বিদেশে। শুধু জীবিকার তাগিদে, নতুন করে বাঁচার আশায়।

“পাকনা হাওরের” সেই ক্ষত আজও শুকোয়নি।

“রিয়াজ খান হৃদয়”
07/11/25

পরে পড়বো
৬৯
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন