—
দ্বীনের প্রতি প্রতিশ্রুতি
রোমান হোসাইন
মারুফ জন্মগ্রহণ করে একটি গাঢ় ইসলামী পরিবারের মধ্যে, যেখানে ইসলামের আদর্শ এবং মূল্যবোধের উপর প্রবল গুরুত্ব দেওয়া হতো। তার বাবা, আলহাজ্ব মাওলানা শফিউল আলম, একজন সুপরিচিত ইসলামিক স্কলার এবং ইসলামী তত্ত্বের শিক্ষক ছিলেন, যিনি তার ছাত্রদের শুধু বই পড়াই না, জীবনধারণের সঠিক উপায়ও শেখাতেন। তার মা, আমিনুন্নেসা, ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী গৃহিণী, যিনি প্রতিদিনের কাজে ইসলামী নীতি ও শিক্ষা অনুসরণ করতেন।
মারুফের শৈশব কেটেছে এসব আদর্শের মধ্যে। তার মনোজগত ছিল পূর্ণতা ও শান্তিতে ভরা, কিন্তু একদিন এক প্রশ্ন তার মনে উঁকি দিলো। “আমি যদি বড় হতে চাই, যদি আমি ক্যারিয়ার তৈরি করতে চাই, তবে কীভাবে আমি ইসলামী শিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় করব?”
তার বাবা প্রতিদিনই তাকে বলতেন, “ইসলাম কখনো তোমাকে দুনিয়ার কাজ থেকে বিচ্যুত হতে বলবে না। তবে, তোমাকে সততার পথে চলতে হবে।”
এটি ছিল মারুফের জীবনের মূল ভিত্তি, যে কোনো পরিস্থিতিতেই তাকে তার দ্বীনি বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরে মারুফ নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
—
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করার পর, মারুফ অনুভব করল যে, তার সহপাঠীরা অধিকাংশই জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রথমে সে ধারণা করেছিল। তাদের মধ্যে কেউ ছিল ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠা পেতে, কেউ কেউ নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য যেকোনো ধরনের আপোষ করতে প্রস্তুত ছিল। মারুফ অনুভব করল যে, এখানেই তার পথ আলাদা।
একদিন, তার বন্ধু রাশেদ তাকে বলল, “মারুফ, তুমি তো সব সময় ইসলামই চিন্তা করো, কিন্তু আধুনিক জীবনের সঙ্গে চলতে গেলে কিছু আপোষ তো করতে হবে। তুমি যদি এইভাবে চলতে থাকো, তাহলে তোমার ক্যারিয়ার কখনো তৈরি হবে না।”
মারুফ শান্তভাবে উত্তর দিল, “রাশেদ, আমি জানি না তুমি ঠিক কী বলছো, তবে আমি জানি যে ইসলাম আমাকে সৎ পথে চলতে শিখিয়েছে, এবং আমি আমার জীবনের পথে সেটাই অনুসরণ করবো।”
তবে, মারুফ জানত, এই বিশ্বাসের মাঝে তাকে কখনোই একা হতে হবে না। তার বাবা-মায়ের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা তাকে দৃঢ় রাখবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরেই মারুফ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। সে জানত, তার ক্যারিয়ার গড়তে গেলে তাকে যে কোনো ধরনের আপোষ করতে হবে না, বরং ইসলামের মূল দিকগুলো মাথায় রেখেই সে জীবনযাপন করবে। একদিন তার বাবা তাকে বললেন, “মারুফ, তুমি যখন সৎ পথে চলতে থাকবে, আল্লাহ তোমাকে তার সাহায্য দিয়ে পথ দেখাবে। ইসলাম কোনো সময়ই তোমাকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বলবে না।”
এ কথা শুনে মারুফের মনে নতুন শক্তি তৈরি হলো। সে সিদ্ধান্ত নিল, যে কোনো পরিস্থিতিতে সে ইসলামের আদর্শে চলবে, কিন্তু নিজের কর্মজীবনেও সফল হবে।
তবে, বাস্তবতা ছিল অনেকটা ভিন্ন। একদিন, এক বড় কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ আসে। মারুফ জানত, এই সুযোগ তাকে ভালো ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তার মন খারাপ হয়ে যায় যখন সে জানতে পারে, সেখানে কিছু কাজের নিয়ম নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
মারুফ তার মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনুভব করতে থাকে। সে নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করে, “আমি যদি এই চাকরিটি গ্রহণ করি, তাহলে আমি কি ইসলামের আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছি?”
এরপর, মারুফ দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়, সে কোনোভাবেই ইসলামের নীতির সাথে আপোষ করবে না। সে চাকরি নেয় না, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পরবর্তীতে একটি নতুন পথ খুঁজে পায়।
অবশেষে, মারুফ একটি নতুন কোম্পানিতে কাজ শুরু করল। সে জানত যে, কাজের পরিবেশে তাকে যে কোনো সময় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমদিনেই তার বস তাকে কিছু ‘অতিরিক্ত’ কাজ করার নির্দেশ দেয় যা নৈতিকভাবে সঠিক ছিল না। মারুফ সোজাসাপ্টা বলল, “বস, আমি এই কাজটি করতে পারব না। আমি বিশ্বাস করি, কাজ করার সময় আমাদের নৈতিকতা এবং ইসলামী মূল্যবোধ বজায় রাখতে হবে।”
বস অবাক হয়ে গেলেন, কিন্তু তারপর মারুফকে সঠিকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিলেন। সে তার বসকে বুঝিয়ে বলে, “আমরা যে কাজ করি, তা যদি সৎ পথে না হয়, তাহলে আমাদের লাভের কোনো মূল্য নেই। আমি বিশ্বাস করি যে, সৎ কাজের মাধ্যমে সত্যিকার সফলতা আসে।”
এটা ছিল মারুফের কর্মজীবনের একটি বড় মুহূর্ত। বস তার সততা প্রশংসা করে এবং তাকে আরও দায়িত্ব প্রদান করে। মারুফ বুঝতে পারে, সততার পথে চললে আল্লাহ তার সাহায্য প্রদান করেন এবং তার পরিশ্রমের ফল মেলে।
–
মারুফ তার কর্মজীবনে বেশ কিছু সফলতার পর একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়—সে নিজের একটি ব্যবসা শুরু করবে, যেখানে সে তার ইসলামী আদর্শ মেনে চলবে। প্রথমে অনেকেই তাকে বিরোধিতা করেছিল, তবে মারুফ জানত যে, ইসলাম তাকে কখনো হারাতে দেয় না। সে একটি প্রতিষ্ঠানে একযোগীভাবে সৎ উপার্জন এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছিল।
তবে ব্যবসা শুরু করতে গিয়েও মারুফের সামনে নানা বাধা ছিল। কেউ কেউ তার উদ্দেশ্য নিয়ে হাস্যরস করেছিল, কেউ বলেছিল যে, ইসলামী আদর্শ দিয়ে ব্যবসা সফল করা সম্ভব নয়। কিন্তু মারুফ অনড় ছিল, সে জানত, আল্লাহ তাকে সফলতায় পৌঁছাবেন যদি সে সততার সাথে কাজ করে।
প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে সফল হতে শুরু করল। তার ব্যবসায়িক নীতি ছিল সততা, ন্যায়, এবং মানুষের উপকারে কাজ করা। কর্মীরা জানত, এখানে কাজ করতে গেলে তাদের নৈতিকতার কোনো আপোষ হবে না। মারুফ প্রতিষ্ঠানে এই নীতি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল এবং তার প্রতিষ্ঠানে সৎ উপার্জন ও ইসলামী শিক্ষা একে অপরকে সমর্থন করছিল।
—
মারুফ এখন সফল একজন উদ্যোক্তা। তার প্রতিষ্ঠানের নাম প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিটি কর্মচারী জানে যে, তারা এমন একটি পরিবেশে কাজ করছে যেখানে ইসলামী আদর্শ এবং সৎ উপার্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখন মারুফের দায়িত্ব ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যাতে তারা দ্বীনের সাথে সঙ্গতি রেখে দুনিয়ার কাজ করতে পারে।
এখন, মারুফ তার সন্তানের কাছে জীবনের মূল্যবান শিক্ষা দেয়। সে বলেছিল, “যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে আল্লাহর সাহায্য চাও এবং সততার পথে চল। তবেই তুমি সফল হবে।”
মারুফ জানত, তার জীবনের সাফল্য শুধু তার প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং তার নৈতিকতাতেও বিরাজ করছে। এখন সে বুঝতে পারে, দ্বীনের আদর্শের সাথে আধুনিক ক্যারিয়ার একত্রিত করা সম্ভব, এবং তা সবার জন্য একটি মডেল হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন