স্তেফান মালার্মে
(প্রতীকিবাদী কবি)
শংকর ব্রহ্ম
স্তেফান মালার্মে,এমন একজন কবি যার কবিতা সম্বন্ধে কমবেশি ধারণা না-থাকলে আধুনিক কবিতা সম্বন্ধে ধারণাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মালার্মে বলেছিলেন: Poetry is the language of a state of crisis! (সঙ্কটের ভাষা কবিতা!) তাঁর এই যুগান্তকারী উক্তির সঙ্গে সঙ্গেই আধুনিক কবিতার দিশেহারা আত্মার স্বরূপটি উদঘাটিত হয়েছিল সেই উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে।
স্তেফান মালার্মে সম্বন্ধে না জানা থাকলে ফ্রান্সের - বিশেষ করে প্যারিসের শিল্পসাহিত্যর ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য অনেকখানিই অজানা থেকে যায়।
স্তেফান মালার্মের জন্ম প্যারিসে- ১৮৪২ সালের ১৮ই মার্চ। তাঁর পিতা নুমা মালার্মের, যিনি প্রপার্টি (সম্পত্তি) প্রতিমন্ত্রী অফিস কাজ করতেন।তাঁর প্রকৃত নাম ছিল এতিয়েন মালার্মে। স্তেফান মালার্মে তাঁর Pen Name বা লেখক নাম।
স্তেফান পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মাকে হারান এবং তারপর তার বাবা তার শিক্ষার ভার নেন। তিনি ধর্মীয় বোর্ডিং স্কুল, Auteuil অবস্থিত (১৮৫৩ সালে) প্রথম ভর্তি হন, এবং তারপর, ১৮৫৩ সাল থেকে উচ্চ বিদ্যালয় Saëns যোগ দিয়েছিলেন। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা কবির কাছে বেদনাদায়ক ছিল।
তার তেরো বছর বয়সী বোন মারিয়ার ১৮৫৭ সালে মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গতা তাকে পেযে বসেছিল।১৮৬০ সালে তিনি স্নাতক হন। তাঁর পিতা চেয়েছিলেন সে একজন সরকারী কর্মকর্তা হবেন, কিন্তু মালার্মের এই কর্মজীবন পছন্দ হয়নি। এমনকি, তখন তিনি মনে করতেন তাকে একজন কবি হতে হবে। কবিতা- শৈশব থেকেই লিখতেন।
১৮৬২ সালে বেশ কয়েক মাস জন্য, স্তেফান লন্ডনে ছিলেন। সেখানে তিনি ইংরেজিতে চোস্ত হয়ে ওঠেন। ১৮৬৩ সালে ফ্রান্সে ফিরে এসে তিনি Tournon ইংরেজি শিক্ষক হয়ে ওঠেন। Tournon প্রথম, তারপর Besancon, মধ্যে Avignon সালে (১৮৭১ পর্যন্ত), প্যারিস (১৮৯৪ পর্যন্ত) - সে সামান্য আয়ের অনুরোধে জন্য শিক্ষা প্রদান করতে, এক পরিবারের জন্য বাধ্য হয়েছিলেন, তার জীবনের অন্য দিকে কবিতা ছিল তার প্রাণ। প্রথম প্রথম ফরাসি কবি বোদলেয়ারের প্রভাব ছিল তাঁর লেখায়।
ইংরেজির শিক্ষকতাই ছিল তাঁর জীবিকা এবং শিক্ষকহেতু জীবনভর অর্থনৈতিক দারিদ্র ছিল মালার্মের নিত্যসঙ্গী। তবে মালার্মের হৃদয়ের ঐশ্বর্যের অভাব ছিল না বলেই এই একুশ শতকেও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে কবিকে।
প্যারিসের রু দি রোম সড়কে ছিল কবির বাড়ি। সে বাড়িতেই বসত 'সালোন'। ফরাসি ভাষায় 'সলোন'-এর অর্থ, একটা ছাদের নীচে সমমনা সাহিত্যিকদের আড্ডা। ঐ সময়ে কে যায়নি স্তেফান মালার্মের 'সালোন'-য়ে? আইরিশ কবি ওয়াই বি ইয়েটস থেকে শুরু করে জার্মান কবি রিলকে- লেখক আদ্রে জিদ, কবি ও নিবন্ধকার পল ভালেরি, প্রতীকিবাদী কবি পল ভার্লেইন, জার্মান কবি ও অনুবাদক স্তেফান জর্জ, ফরাসি কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক ও সাহিত্য সমালোচক পিয়েরে জুল থিওফাইল গঁতিয়ে (যিনি বলেছিলেন, শিল্পের জন্য শিল্প ...) - অনেকেই যেতেন মালার্মের 'সালোন'-য়ে। ফরাসি কম্পোজার ক্লোদ দেবসিও যেতেন মালার্মের 'সালোন'-য়ে। প্রখ্যাত সব ছবি আঁকিয়েরাও যেতেন। বিশেষ করে মাশহুর ফরাসি চিত্রকর এদুয়ার্দ মানে। তাছাড়া ডব্লু.বি.ইয়েটস, রাইনার মারিয়া রিলকে, পল ভালেরি, স্তেফান জর্জ, পল ভার্লেইন সহ অনেকেই তাঁর বাড়ির আড্ডার নিয়মিত অংশগ্রহণকারী ছিলেন। ১৮৬৩ সালের ১০ই আগস্ট মালার্মে মারিয়া ক্রিস্টিনাকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা জেনেভিয়েভ মালার্মে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৪ সালের ১৯ নভেম্বর।
রু দি রোম সড়কের বাড়িটির সালোনের মধ্যমনি ছিলেন স্তেফান মালার্মে। তিনি অনর্গল কথা বলে যেতেন ইতিহাস, শিল্পসাহিত্য কবিতা ও দর্শন নিয়ে। সবাই শুনত। কথা অন্যরাও বলত,তবে কম।'সালোন' বসত প্রতি মঙ্গলবার। ফরাসিতে মঙ্গলবার কে বলে- 'মারদি'। এই কারণে প্যারিসের রু দি রোম সড়কের মালার্মের বাড়ির সালোনে যারা যারা নিয়মিত যেতেন তাদের নাম হয়েছিল- মারদিসতেস। বাড়িটি হয়ে উঠেছিল প্যারিসের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম কেন্দ্র।
স্তেফান মালার্মে ছিলেন ফরাসি দেশের প্রতীকবাদী শিল্প আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। সেই সময়টায় প্রতীকবাদ ছিল বাস্তববাদের বিরুদ্ধে প্রবল দ্রোহ। জার্মান দার্শনিক শোওপেনহাওয়ারের দর্শনে প্রতীকবাদের স্ফুরণ ঘটেছিল। বিক্ষুব্দ পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে শিল্পে পরম আশ্রয় নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল শোওপেনহাওয়ারের দর্শনে। আধ্যাত্বিক কিংবা অতিজাগতিক ...প্রতীকবাদীরা নিজস্ব ধারণাকে প্রকাশ করবার জন্য এ ধরণের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয় বেছে নেয়। এ ছাড়া ক্ষণিক জীবনের বিমর্ষতা, অতৃপ্ত যৌনবোধও প্রতীকবাদী কবিতায় প্রকাশ পায়। এ ধরণের বিষয়বস্তু মালার্মের কবিতাতেও রয়েছে।
৯ই সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ সালে প্যারিসে কবির মৃত্যু হয়।
(রুখসানা হক)
স্তেফান মালার্মে ফরাসি কবিতা রাজ্যে ভিন্ন ধরণের সুর আনয়নকারী। তিনি তাঁর জীবৎকালে খুব বেশি কবিতা লেখেননি। তাঁর সমসাময়িক ছিলেন ভেরলেন। আর দেড় দশক পরে ব্যাঁবো। ফরাসি কবিতায় ঝড় উঠল, নড়ে চড়ে বসেছে কাব্যবোদ্ধাদের জগৎ; কিন্তু মালার্মের কবিতা বিপরীতমুখী, বিপরীত ধারার। স্বভাবে অনেক শান্ত, ধীর আর স্থির। পাপ পুণ্য নিয়ে তাঁর মনোজগত। মালার্মের কবি স্বীকৃতির চেয়ে বেশি পছন্দ ছিল কবিতার দার্শনিক শব্দে। শেষজীবনে কবিতা লেখা ছেড়েছিলেন, মন দেন কাব্যতত্ত্ব লেখায়। আবার সেটিও ছেড়ে গানের লিরিক রচনায় মন দেবেন ভেবেছিলেন। গানের নগ্নতম ও শুদ্ধতম প্রতীকী ব্যঞ্জনার কথায় তাঁর ভাবটিকে চেয়েছিলেন ব্যক্ত করতে। এ জন্যই তাঁর কবিতা দুর্ভেদ্য এবং দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। বয়োজ্যেষ্ঠ পাঠকেরা মালার্মের কবিতাকে মেনে নিতে পারেননি, তবে তরুণ কবিদের জগতে তাঁর কবিতার প্রতি আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় সে সময়। ভেরলেন ও মালার্মের ভাবনার গতি ভিন্ন হলেও তৎকালীন শাশ্বত ভাবনা থেকে তারা আলাদা হয়ে কবিতার রূপ বদল করেন। বিদ্রোহ করেছিলেন তৎকালীন সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য ও চিন্তাধারাকে। মালার্মে চেয়েছিলেন পূর্বসূরি থেকে আলাদা হতে। যদিও তাঁর প্রথমদিকে লেখা কবিতায় শার্ল বোদলেয়ারের প্রভাব ছিল।
আর পল ভালেরি মালার্মেকে গুরু মেনেছিলেন। সে সময়ে চতুর্দিকে মালার্মের দুর্নাম। সেইসব দুর্নামকে মালার্মে তেমন আমলে নিতেন না। একবার পল ভালেরি মালার্মেকে বলেছিলেন- ‘একদল আপনাকে নিন্দে করে, বিদ্রুপ করে। আপনার নীরবতার কারণে সাংবাদিকরা মজা করে, ঠাট্টা করে। আপনার বন্ধুরা কীইবা করতে পারে? দুঃখে সহানুভূতিতে মাথা নাড়ে; কিন্তু আপনি জানেন ফ্রান্সের প্রতিটি শহরে আপনার কবিতার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত যুবকরা। ফ্রান্সের কবিতার গৌরব বলে মনে করে...।’ এর উত্তর কীইবা দেবেন মালার্মে। অন্যদিকে পল ভালেরি দেখেছেন- সর্ব শক্তিমান হিসেবে, তাঁর চিন্তায় সবসময় মালার্মে। তাঁকে মনীষী বলেও মানতেন। মালার্মে তাঁর কবিতায় কী গুরুত্ব পেয়েছে, তা বোঝা যায় এই স্বীকৃতিতে- ‘তা কতখানি ঠিক তাঁর নিজের ও কতখানি মালার্মের দান।’ তিনি মালার্মের প্রভাবে বিশ্বকে দিতে পেরেছেন এক সৌন্দর্য-তত্ত্ব। মালার্মে কবিতার পরিবর্তনই শুধু করেননি করেছেন রূপান্তরও। ভালেরি একে বলেছেন ‘মৌলিকত্ব’।
এ ছাড়া মালার্মে তাঁর কবিতায় কতগুলো গুণকে শৃঙ্খলিত করলেন যাকে বলা যায় ‘একতা’। তিনি পেলেন একটি ভঙ্গী, যা অকল্পনীয় ছিল তৎকালীন সাহিত্য জগতে। এতে তাঁর কবিতা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল, বলা যায় সমসাময়িক ও পূর্বসূরিদের থেকে ভিন্ন। তাঁর চেষ্টা ছিল নতুন তত্ত্ব গড়া। পরবর্তীতে মালার্মের `শতাব্দীর শেষ (fin de siècle)’ (Un coup de dés jamais n’abolira le hasard) আঙ্গিক মূলত: কবিতা ও শিল্পের অন্য নানা শাখার ভেতরে মিশ্রণ হিসেবে কাজ করবে। তাঁর শেষের দিকের অধিকাংশ কাজেই বিষয়বস্তÍ এবং আঙ্গিকের ভেতরকার সম্বন্ধকে অন্বেষণ করা হয়েছে, কবিতা লেখার পাতায় শব্দ ও পরিসরের ভেতর নানা বিন্যাসগত ক্রীড়া দেখা যায়। এই ক্রীড়ার চূড়ান্ততম প্রকাশ দেখা যায় `পাশার ঘূর্ণন কখনোই হারাবে না সুযোগ' কবিতায়। এই দীর্ঘ কবিতা বা কাব্য কবি রচনা করেন ১৮৯৭ সালে। অনেকেই মনে করেন যে ফরাসী কবিদের ভেতর মালার্মেকে অনুবাদ করা দু:সাধ্যতম কাজগুলোর একটি। শুধুই তাঁর কাজের জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট আঙ্গিকের জন্য নয়, বরঞ্চ কবিতায় তাঁর শব্দের ধ্বনির ক্রীড়াবিভঙ্গের কারণেও মালার্মের রচনাকে জটিল ও দূর্বোধ্য মনে করা হয়। বিশেষত: ফরাসীতে যখন তাঁর কবিতা পাঠ করা হয়, তখন ধ্বনিগত কারণেও প্রায়ই তাঁর কবিতার এক দ্ব্যর্থবোধক অর্থ দাঁড়ায় যার অনুবাদ করা আক্ষরিক অর্থেই প্রায় অসম্ভব।
মালার্মের কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একাধিক সঙ্গীতকার সৃষ্টি করেছেন কিছু কম্পোজিশন। এদের ভেতর ক্লঁদ দেব্যুসির `প্রেল্যুড আ লাপ্রেমিদি দ্যুন ফোন- ১৮৯৪’-এর কথা বলা যায়। এই সঙ্গীতকর্মটি মালার্মের ÔL’après-midi d’un faune (1896)- এক ছাগদেবতার অপরাহ্ন)’ দ্বারা অনুপ্রাণিত। মরিস রাভেল ÔTrois poèmes de Mallarmé– (Un coup de dés jamais n’abolira le hasard)Õ মালার্মের তিনটি কবিতা (১৯১৩)-য় সুরারোপ করেন। সঙ্গীত ব্যতীতও মালার্মের জীবনের সবচেয়ে বেশি নিরীক্ষাপ্রবণ ও শৈল্পিকভাবে সফল দীর্ঘ কবিতা `পাশার ঘূর্ণন কখনোই হারাবে না সুযোগ’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রকার ম্যান রে নির্মাণ করেছেন তাঁর `পাশার প্রাসাদের রহস্য (Les Mystères du Château de Dé)|’
ভালেরি মনে করেছিলেন, এই নতুন রীতিতে ছিল মালার্মের শৃঙ্খলা এবং সর্বগ্রাসী প্রেম।
তাঁর লেখায় কাঠামোবাদী এবং বিনির্মাণবাদীরা ভাষা-তাত্ত্বিক দ্যোতকের নানা পথ ও বিন্যাস লক্ষ্য করা যায়, নতুন করে মনোযোগ দিয়েছেন বাক্যগঠন, যতিগত পরিসর, অন্তর্পঠন, ধ্বনি, শব্দার্থবিদ্যা, ব্যকরণ এবং এমনকি ব্যক্তিগত চিঠি-পত্রেও। জাঁক দেরিদা, জুলিয়া ক্রিস্তেভাঁ, মরিস ব্লাঁশো এবং বিশেষত: জাঁক লাঁকা মালার্মের জটিল কবিতাগুচ্ছের কাছে নানাভাবেই দায়বদ্ধ।
কবিতা যেন নতজানু হয় একমাত্র কবির দয়ার কাছে। যা কবিকে দিয়েছে ঈপ্সিত ধন এবং শৃঙ্খলা। এতে ঘটে গেল সমস্ত কবিতার ঐতিহ্যের নাড়ির বিচ্ছেদ। শুধু তাই নয়, ঘটল সহজ প্রয়াসের অবসান, যেহেতু তা কবির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে ও আয়ত্তাধীন, ফলে কবির দুরূহ সাধনার ছায়াও যে ছায়া- তাকেও দুরূহ করে তোলে। এসব পাঠের জন্য কবি সবসময় দাবি করে পাঠকের শ্রম। একবার যে মালার্মের কবিতার স্বাদ নিতে পারবে তার কাছে অন্য কবিতা লাগবে পানসে, বিস্বাদ, দুর্বল। এই ভাবনা পল ভালেরি ওঁর কবিতা সম্পর্কে বলেছেন।
তিনি এ ব্যাপারে পাঠকের মনে প্রশ্ন তুলেছেন- কবিতা তো জন্ম নেয় মনে। সে ভাবনা মন থেকে যখন বেরোয় তা আকার পায় সাদা পৃষ্ঠায়, একরকম ছিটকে বেরোয়, ঝাঁকুনি লাগে অকস্মাৎ। এ যেন দুর্ঘটনার মতো, অদৃশ্য শূন্য হতে হঠাৎ কালের দৃষ্টিতে তরঙ্গিত প্রবাহে, প্রবাহিনীর মতো। মালার্মে যেন অমানুষিক শৃঙ্খলার স্রষ্টার প্রতিমূর্তি। মুক্তিদাতা ঋষি। পল ভালেরিকে মনেই হতে পারে আবেগে আচ্ছন্ন। সত্যি কী তাই! তাঁর কবিতায় দেখা যায় ত্যাগের দূরদর্শিতা, সস্তা প্রলোভন বর্জনের মত্ততায় তা প্রাণ পেতে চেয়েছে। বিস্ময়কর এই তাঁর পরিমিতিবোধ। ভালেরি মনে করেন, নীতির একটি অপরিমেয় মর্যাদাই হলো শ্রেষ্ঠ সাহিত্য। কারণ, এ নিয়ে অনিবার্য অন্তর্দ্বন্দ্বে সব স্রষ্টাকে ভুগতে হয়। ‘যদি লিখতেই হয়, বরং লিখব সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও নিজের স্বচ্ছ দৃষ্টিতে, প্রাণচঞ্চলতায়- হোক না সে লেখা দুর্বল, তুচ্ছ।’
যে কথা অবশ্যই মেনেছেন, তা হলো ধ্বনি যা মালার্মের সারাজীবনের সাধনা। শৃঙ্খলার দ্যোতনা। নতুন অর্থ দিলেন, শিল্প বিচিত্র বিশ্বের স্পন্দনে প্রাণ পেতে চাইছে। লেখা মানে, জাগরণ উত্থিত সাধনার শেষ সিদ্ধি হলো- সাদা কাগজের ওপর ফুঠে ওঠা মননের প্রতিচ্ছবি। মালার্মের সাহিত্যতত্ত্ব। যেমন করে খাল বিল নদীর জল শুনেছে বহুদূর সমুদ্রের আহ্বান, তেমনি মানুষের প্রয়াস পেতে চায় তার শেষ ও পরম প্রকাশ একটি ‘বই’-এ। তিনি পূজারি ছিলেন বইয়ের এবং কল্পনার। তিনি বইকে দেখতেন শুদ্ধতার প্রতীক, তাঁর কবিতাও যেন তাই। তিনি শিল্পের চর্চায় তা করেছেন আজীবন। শুধু তাই পবিত্রতা ও সুন্দরের চর্চায়- মালার্মে আজও অমর।
১৮৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর কবিতা এনটাইটেলমেন্টসহ "একটি রোমক পুরাণে বর্ণিত ছাগলের শিং ও লেজযুক্ত গ্রাম্য দেবতা এর দুপুর।"
মালার্মের অন্যতম কবিতা- 'দি আফটারনুন অভ আ ফাউন'। রোমান মিথ অনুযায়ী ফাউন হল জ্বিন বা কোনও নির্জন অরণ্যময় স্থানের অপদেবতা। মালার্মের 'দি আফটারনুন অভ আ ফাউন' কবিতায় এক বিকেলে ফাউনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে স্বগত সংলাপে নিমফদের (কামার্ত পরী) সঙ্গে যৌনসংলাপের বর্ননা দেয়। ফরাসি প্রতীকবাদী সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন এটি। পল ভেলেরির মতে ফরাসি সাহিত্যের ...
ফরাসি কম্পোজার ক্লোদ দেবসি দি আফটারনুন অভ আ ফাউন -এর ওপর তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কম্পোজিশনটি করেছেন।
মালার্মের শিল্পদর্শন পরবর্তী যুগের শিল্প আন্দোলনকেও প্রভাবিত করেছিলেন। যেমন-দাদাবাদ, সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্ততবাদ। বিশুদ্ধ কবিতা লিখতেন মালার্মে। প্রায়ই বলতেন-nothing lies beyond reality, but within this nothingness lies the essence of perfect forms and it is the task of the poet to reveal and crystallize these essences.(বাস্তবতার বাইরে কিছুই নেই, কিন্তু এই শূন্যতার মধ্যেই নিখুঁত রূপের সারমর্ম নিহিত রয়েছে এবং এই নির্যাসগুলিকে প্রকাশ করা এবং স্ফটিক করা কবির কাজ)।
তাঁর কয়কটি কবিতা
------------------------------------
[#অনুবাদে_ইমন_জুবায়ের]
সমুদ্র-বাতাস
------------------------------------
সে মাংস বিষন্ন, হায়!আর সব ছোট নদীগুলি লাল।
সংগ্রাম, কেবলি সংগ্রাম! মনে হয় পাখিরাও হয়ে উঠছে বন্য
অচেনা ফেনার শরীর, আকাশের দিকে ঝুঁকে-থাকা!
না, চোখে তো ভেসে উঠছে না প্রাচীন উদ্যান
যে স্নান করেছে আনন্দে- তার আত্মা স্থির থাক
হে, রাত্রি! আমার নির্ঘুম প্রদীপ-যার নিঃসঙ্গ আলো
খালি পৃষ্ঠার ছায়া, সাক্ষীর অশেষ ফল লাভ,
এমন কী বুকের ওপর শিশু দোলানো অল্প বয়েসী স্ত্রীটিও নয়
আমি বিদায় নেবো! হে স্টিমার, দোলানো রশির খুঁটি
দূরবর্তী আশ্চর্য দেশের অভিমূখে তোল নোঙর!
একটু অস্বস্তি, নিষ্ঠুর আশায় দিশেহারা, এখনও ধরে আছে
শেষ বিদায়ের শেষ রুমাল!
এবং এসব নয়, ঝড়কে ডাকছে মাস্তুল, এসবও নয়
এক সচেতন ঝড় বেঁকে যাচ্ছে বিধস্ত সমুদ্রে,
লুপ্ত, পাল নয়, একটি পাল, একটি পুষ্পিত দ্বীপ, অনেক আগের?
কিন্তু, হে আমার হৃদয়, তুমি শোন, তুমি নাবিকের গান শোন!
নবীকরণ
-----------------
এখন নিয়েছে বিদায় রুগ্ন বসন্ত
শীত, বিশুদ্ধ শিল্পের ঋতু, নির্মল শীত
আমার সত্তায় ঐ বিষন্ন রক্তের দাহ
দিনভর হাই তুলে জরুরি বিস্তার
কুয়াশার সাদা ভোর আমার করোটিতে কবোষ্ণ বাড়ে
সমাধির মতন লোহার আঙটিতে বন্দি
বিষন্ন আমি খুঁজি চমৎকার আবছা স্বপ্ন
মাঠে-যেখানে কুঁড়িরা শস্যের সবকিছু
তারপর গাছেদের ঘ্রানে সন্তষ্ট আমি
মুখ দিয়ে খুঁড়ি আমার কল্পনার কবর
যেখানে লাইলাকেরা বাড়ছে সেই উষ্ণ মৃত্তিকায় দিই কামড়
নিজেকে র্ভৎসনা করে অপেক্ষা করি বিষাদ অবসানের
এরই মধ্যে চকিত নীলের হাসি ঝোপের ওপর
পাখিদের কলকাকলী আর সূর্যের বাৎসরিক শপথ
সনেট
----------
বিস্মৃত অরণ্যে যখন বিষাদিত শীতেরা নেয় বিদায়
তোমার অভিযোগ নিঃসঙ্গ চৌকাঠে বন্দি
আমাদের অহংকারের এই নিবিড় সমাধিতে
নেই কবিতা ও ফুলের তোড়া
মধ্যরাত্রির অর্থহীন গননা শোনা ব্যাতিরেকেই
রাতের প্রহরী তোমাকে জাগিয়ে রাখবে
তারপর পুরনো আর্মচেয়ারের হাতলে
সর্বশেষ অগ্নিজ্যোতি আমার ছায়াকে দীপ্যমান করে
যার কাছে প্রায়শই অতিথিরা আসে তারা যেন
বহুবিধ ফুল নিয়ে সমাধিতে না আসে
আমার আঙুল নিঃশূন্য বিষন্নতাকে করে নির্দেশ
সার সার সমাধি দেখে কাঁপে আত্মা
এর প্রত্যয়ে বাঁচার জন্য আমি তোমার ঠোঁট থেকে নেব ঋন
দীর্ঘক্ষণ আমার নামের নিঃশ্বাস মর্মর করবে সন্ধ্যায়
স্বাগত-সম্ভাষণ
----------------------
কিছুই না- এই ফেনিল কুমারী কাব্য
পেয়ালাই সর্বাধিক গুরুত্ব পাবার যোগ্য
এভাবে, দুরে সৈন্যদলের পদধ্বনি
এলোমেলো শিঙার ধ্বনি
আমরা জলপথে চলেছি হে আমার বিচিত্র
বন্ধুরা! আমি এরই মধ্যে মাস্তুলে
তুমি শীত ও বিদ্যুত কেটে কেটে
অগ্রসর হওয়া মহার্ঘ গলুয়ে
এক চমৎকার নদী আমাকে ডাকছে
তার ঢেউয়ে ভীত না হয়ে
এই দৃঢ় স্বাস্থপানের জন্য
নিঃসঙ্গতা খাড়ি নক্ষত্র
যাই হোক না কেন
আমাদের পালের শ্বেত উদ্বেগ
একটি কবিতার উপহার
-----------------------------------
প্রাচীন রাত্রির শিশুটিকে আমি তোমার কাছে আনি
কালো, ডানায় রক্ত, ফ্যকাশে পালকহীন
কাচ এর ভিতরে পুড়ছিল স্বর্ণ ও আগর
জানালার কাচের ওপাশে জমাট তখনও বিষন্ন -হায়
দেবদূত প্রদীপে বিস্ফারিত হয় ভোর
করতল! এবং যখন এটি দেখায় ভগ্নাবশেষ
আবারও শক্রর হাসির জন্য চেষ্টা করছে
নীল অনুর্বর নিঃসঙ্গতার শিহরণ
ও ধাত্রি, তোমার নিষ্পাপ শিশু
তোমার শীতল পা, এই জন্মকে গ্রহন করে
তোমার স্বরে মনে পড়ে ক্লাভেচিনের বেহালা
তোমার ভাঁজ করা আঙুলে তুমি কি চাপ দেবে স্তনে
যখন শ্বেত পুরোহিত নারীরা হয় প্রবাহিত
নীল কুমারী বাতাসে ঠোঁটেরা হয়ে ওঠে ক্ষুধার্ত
(উৎসর্গ: নাজিম উদদীন। যাঁর ফরাসি ভাষাজ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করেছে। - ইমন জুবায়ের।)
[#অনুবাদে_আজফার_হোসেন]
প্রতিষঙ্গের প্রেতাত্মা
-----------------------------------
তোমার ঠোঁটে গেয়েছিল গান নাম-না-জানা শব্দরা? এক অসম্ভব বাকধারার অভিশপ্ত টুকরো?
ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে আসি, কোন এক বাদ্যযন্ত্রের তারের ওপর পিছলে-পড়া পালকের মতো অনুভব সঙ্গে নিয়ে, বিনম্র ও বহতা, যার স্থান করে নেয় একটি কণ্ঠস্বর, ধীরে ধীরে নেমে-যাওয়া ধ্বনিতরঙ্গায়িত শব্দের উচ্চারণে: “লা পেনালতিয়েম এ মখত্” এবং শব্দগুলো উচ্চারিত হয় এমনভাবে যেন পঙ্ক্তির অন্তে ঝুলে আছে ‘লা পেনালতিয়েম’, আর ‘এ মখত্’ সেই অদৃষ্টময় বর্ণমালা, অর্থের নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দ্যে। পরে কয়েক পা ফেলতেই ‘নাল’ ধ্বনিতে অনুভব করি বাদ্যযন্ত্রের একটি টানটান তীর। সে ছিল বিস্মরণে– মহীয়ান স্মৃতি নিশ্চিত তাকে ছুঁয়ে গেছে পালক কিংবা পত্র কিংবা তালু দিয়ে। রহস্যের নকসার ওপর আঙুল আমার, মৃদু হেসে আমি প্রার্থনা করলাম এক ভিন্ন অনুধ্যানের বিষয়ের জন্য, বুদ্ধিবৃত্তিক আকাঙ্খায়। ছিঁড়ে-যাওয়া পালক কিংবা পাতার প্রাক্তন পতন থেকে তখন ফিরে এলো বাকধারা, নিশ্চিত, আগের মতোই। এখন থেকে তাকে শোনা যাবে কণ্ঠস্বরের উচ্চারণে ততোক্ষণ ধরে যতোক্ষণ না সে অবশেষে নিজের উচ্চারণে জানান-দেয়া উপস্থিতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র একটি বোধে আর তৃপ্ত না থেকে আমি তাকে মনে মনে মিত্রাক্ষরের মতো পাঠ করতে থাকি। আর একবার পরখহেতু আমার বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে উচ্চারণ করি উঁচু গলায়। শীঘ্রি তাকে এমনভাবে উচ্চারণ করতে থাকি যে, ‘পেনালতিয়েম’-এর পর একটি যতির নৈঃশব্দ্য থেকে যায় : কী বিষণ্ন আনন্দ! ‘পেনালতিয়েম’ : বাদ্যযন্ত্রের তার, নাল ধ্বনির বিস্মরণে প্রসারিত ও তীব্র, ভেঙে পড়ল নিশ্চিত, আর আমি এক ধরনের প্রার্থনা জুড়ে দিলাম : ‘এ মখত’। আমার প্রিয় সব ভাবনায় ফিরে আসার চেষ্টা না থামিয়েই দাবি জানাই নিজেকে শান্ত করার, এই ভেবে যে, পেনালতিয়েম নিশ্চিতভাবে একটি আভিধানিক শব্দ যার অর্থ: একটি শব্দের অন্তিম অক্ষরের প্রাগাক্ষর। সেই আমার ভাষার কাজ শেষে খুব সাধারণভাবেই শব্দটি দিনের পর দিন আমার মহীয়ান কাব্যগুণের ওপর আছড়ে পড়ে, বাধা পেয়ে সে ফুঁপিয়ে কাঁদে প্রতিদিন। এমনকি থামতে-না-জানা হাঁ-জানান-দেওয়া ভঙ্গির ক্ষিপ্রতায় রূপ-নেয়া ধ্বনির জমাট ভার আর মিথ্যার প্রতিভাস হয়ে উঠেছিল যন্ত্রণার কারণ। দুশ্চিন্তায় আমি বাক্যাংশের ভেতর থেকে বিষণ্ন ধরনের শব্দগুলোকে আমার ঠোঁটের চারদিকে হেঁটে চলার সুযোগ দিলাম। আর আমি হাঁটতে লাগলাম। কণ্ঠে আমার সমবেদনা-জাগানিয়া গুঞ্জন: “উপাধাটি মৃত, সম্পূর্ণ মৃত, রে দুর্ভাগা উপাধা”। আর ভাবতে থাকলাম, আমার অস্তিত্বকে এভাবে আমি সান্ত¡না দিতে পারি, লুকিয়ে-থাকা প্রত্যাশাও ছিল তাকে দাফন করার। সাঙ্গীতিক বিস্তারে যখন কী এক আতঙ্কে, কী এক সহজিয়া কিন্তু অস্বস্তিকর সম্মোহনে অনুভব করলাম যে, দোকানের জানালায় ছায়া-ফেলা আমার হাতখানা কাউকে জড়িয়ে ধরবে বলে নিচে নেমে যাচ্ছে, তখনই অধিকারে এলো সেই কণ্ঠস্বর [যা শুনেছিলাম গোড়াতেই, নিশ্চিতভাবে যা ছিল এক ও একমাত্র।]
কিন্তু যে-মুহূর্তে পরাপ্রাকৃতের প্রতিকারহীন প্রবেশের ভেতর-পথ স্পষ্ট হল এবং যন্ত্রণার কুচকাওয়াজ শুরু হল, যার নিচে কষ্টে মোচড় খেতো আমার এক সময়ের রাজকীয় সংবেদন, সেই সময় চোখ তুলে দেখলাম আমি হাঁটছিলাম প্রাচীন দ্রব্য-ব্যবসায়ীদের রাস্তা ধরে; দাঁড়িয়েছিলাম এক বেহালানির্মাতার দোকানের সামনে। বিক্রির জন্য সেখানে ছিল দেয়ালে ঝুলে-থাকা পুরনো বাদ্যযন্ত্র এবং মেঝেতে পড়ে-থাকা কিছু হলুদ তালপত্র এবং ছায়ার ভেতরে লুকিয়ে-থাকা প্রাচিন পাখিদের পালক। অপ্রকৃতিস্থের মতো আমি পালিয়ে গেলাম। সম্ভবত দুর্জ্ঞেয় ‘পেনালতিয়েম’-এর জন্য আমার এই অদৃষ্টময় বিলাপ।
[“লা পেনালতিয়েম এ মখত্” একটি ফরাসি বাক্য, বাংলায় যার ভাষান্তরিত রূপ হতে পারে এমন: উপধাটি মৃত।]
ভবিষ্যের দিকে
------------------------------------
বুড়িয়ে যাওয়ায় মরে-যাচ্ছে-যাচ্ছে এমন এক পৃথিবীর ঊর্ধ্বে মেঘেদের সাথে হয়তো বিদায় নেবে ফ্যাকাশে আকাশ এক। সূর্যের কিরণ আর জল দিয়ে ঢেকে-রাখা দিগন্তের ওপর ঘুমিয়ে-পড়া নদীর ভেতর সূর্যাস্তগুলোর ছেঁড়া-ছেঁড়া গোলাপী ক্ষয়ের চিহ্ন সব মিলিয়ে যায়। একঘেঁয়ে সময়ের ভারে গাছগাছালি সব অবসন্ন। আর তাদের শাদা-হয়ে-যাওয়া পাতাগুলোর নিচে পথের নয় বরঞ্চ সময়ের ধুলোবালিতে ক্যাম্বিস তাঁবু নিয়ে জেগে ওঠে অতীত সব চিহ্নের সঙঃ গোধূলির অপেক্ষায় থাকে অনেক গ্যাসবাতি। তারা আবারও জাগিয়ে তোলে অসুখী ভিড়ের সেই সব মুখ। আর অবিনাশী রুগ্নতা এবং বহু শতকের জমা পাপ তাদের জয় করে নেয়। তাদের কিনারে থাকে ভয়াবহ দুঃসঙ্গী সব, এক অমাঙ্গলিক ফলের ভারে ভারাক্রান্ত। পৃথিবী বিলীন হবে এই ফলের সঙ্গে। সমস্ত চোখের পীড়িত নৈঃশব্দে ডুবে থাকে স্থান, যে নৈঃশব্দ্য সূর্যের কাছে মিনতি জানায়, যে সূর্য একটি ধ্বনির হতাশায় ডুব দেয় জলে। সঙ কথা কয় নিচু স্বরে: ‘ভেতরে প্রদর্শনী দেখাবে বলে তোমাকে আমোদিত করার এমন কোনো চিহ্ন নেই। কারণ এখন এমন কোনো চিত্রকর নেই যে আঁকতে পারে তার ক্ষীণতম প্রতিচ্ছায়া। আমি তোমাদের কাছে নিয়ে আসি সেই কবেকার জীবন্ত এক নারীকে। (যাকে সার্বভৌম বিজ্ঞান বছরগুলোতে সংরক্ষণ করে রেখেছে।)’ কিছু পাগলামি, মৌলিক ও সরল, একটি সোনালি উল্লাস ও উন্মাদনা, আমি জানিনা কী তা! যাকে সে তার চুল বলে, বুননের বৈভবে যেন সে ছড়িয়ে থাকে তার ঠোঁটের রক্ত-লাল নগ্নতায় জ্বলে-ওঠা মুখের চারিদিক। শূন্যতার পোষাক খসে পড়ে। থাকে তার দেহ। অমূল্য হিরন্ময় পাথরের মতো তার চোখ সেই দৃষ্টির সমান নয়, যে দৃষ্টি উঠে আসে তার সুখময় মাংশের স্বরঃচ্ছন্দ থেকে: সেই
দৃষ্টি জেগে ওঠে তার স্তনযুগল থেকে যেন তারা অনন্ত দুধের ভরাট ভাণ্ড। তাদের চূড়া নিশানার মতো জেগে থাকে আকাশের দিকে, বিস্মরণময় পা দিয়ে এঁকে-যাওয়া দাগের দিকে, যার দেহে থেকে যায় আদিম সমুদ্রের নুন। তাদের অসহায়, ক্লান্তিকর, রুগ্ন ও আতঙ্কিত স্ত্রীদের কথা স্মরণ করে স্বামীরা একসাথে ভিড় জমায়। তাদের বিষণ্ন স্ত্রীরা দেখে নিতে চায় কৌতূহলে।
কোনো এক পূর্ব-অভিশপ্ত যুগ থেকে ছাড়া-পাওয়া সেই মহীয়ান প্রাণীটির দিকে যখন সকলেই নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে, তারা আবার একে অন্যের দিকেও তাকাবে, কেউ কেউ নিরঞ্জন ঔদাসীন্যে, কেননা কি হচ্ছে তা বোঝার ক্ষমতা নেই তাদের। কিন্তু অন্যরা তাকাবে বিষণ্নভাবে যখন তাদের চোখের পাতা ভিজে থাকবে সমর্পিত জলে; যখন এই সময়ের কবিদের ঘোলা চোখ উঠবে জ্বলে। তারা এগিয়ে যাবে তাদের বাতিগুলোর দিকে। মুহূর্তের জন্য হলেও একটি বিভ্রান্ত মহিমায় তাদের মস্তিষ্ক উত্তেজিত হবে উন্মাদনায়। তারা আক্রান্ত ও আলোকিত হবে ছন্দঃব্রহ্মে। আর তারা ভুলে যাবে যে, তাদের অস্তিত্ব এমন এক যুগে, যে-যুগ সৌন্দর্যের চেয়েও ঢের বয়সী।
[অনুবাদে_অদিতী_ফাল্গুনী]
এক ছাগ দেবতার অপরাহ্ন ÔL’après-midi d’un faune.
----------------------------------------------------------
রোমক পুরাণে বর্ণিত এক ছাগ দেবতা :
সেই পরীদের চির অমর দেখতে চাই আমি,
যারা এত স্বচ্ছ
যেনবা অতীব লঘু দেহ তাদের বাতাসে ভাসে,
বাতাসে চপল দেহবিভঙ্গ ওদের
নিয়ে আসে গাঢ়, পত্রপল্লবিত নিদ্রার ঘোর।
আমি কি ভালবেসেছিলাম এক স্বপ্ন?
আমার সন্দেহ, যেন প্রাচীন রাত্রির স্তপ, গোলকধাঁধাঁর মত
শাখা-প্রশাখায় খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই পরীদের।
হাতড়ে খুঁজে ফেরা সেই একই প্রকৃত অরণ্য
যা প্রকাশ করে
গোলাপের আদর্শ ভুল হিসেবে আমার বিজয়।
একবার বিবেচনা করো…
তোমার ভাবনায় সদা উদ্ভাসিত নারীরা
আসলে তোমারই কল্প-বাসনার প্রতিমা!
হে ছাগ দেবতা, পবিত্রতর পরীর তুষার শীতল নীল চোখ
থেকে তবু বিভ্রম ছড়ায় যেনবা ক্রন্দনশীল ঝর্ণা।
আর অন্য যা কিছু দীর্ঘশ্বাসে প্রোথিত,
তুমি বলতে চাও সেসবই
ভেড়ার পশমের মত তপ্ত দুপুরের হাওয়ার সাথে তূল্য?
না! তীব্র গরমের এই শ্বাসরোধী সকালের গতিহীণ,
ক্লান্ত মূর্ছার ভেতর দিয়ে,
আমার বাঁশী ব্যতীত উপবনের ভেতর দিয়ে
কলকল শব্দে প্রবাহিত নয় কোন জলধারা।
দিগন্তের একমাত্র বায়ুতে কোন লহরী নেই,
আমার যমজ পাইপ থেকে নি:সৃত এবং সহজে নিষ্কাশনক্ষম
সুরধারা বৃষ্টির শুষ্ক প্রবাহে যেন
সেই দৃশ্য, শান্ত ও অলীক প্রেরণাদায়ী বায়ু
যা জেগে উঠছে প্রার্থনার মত।
চেহারা Poème Apparition
-------------------------------------------
দু:খী হয়ে পড়ছিল চাঁদ। ক্রন্দনশীল দেবশিশুরা স্বপ্ন দেখছিল।
শান্ত ও বাষ্পীয় পুষ্পস্তবকে তাদের তীরবাহী আঙুল
যেন বা তাদের মরণাপন্ন বেহালার তার বাদিত হচ্ছিল
আর আকাশ-নীল ফুলের পাঁপড়িতে গড়িয়ে পড়ছিল শ্বেত অশ্রু।
সে ছিল তোমার প্রথম চুম্বনের আশীর্ব্বাদধন্য দিন,
এবং আমি শহীদ হলাম আমার স্বপ্নের কাছে,
বেঁচেছিল যা বিষাদের সুগন্ধীর উপর ভর করে,
যা এমনকি কোন পরিতাপ বা দূর্ঘটনা ব্যতীতই
একটি স্বপ্নকে সেই হৃদয়ের কাছে রেখে যায়
যে প্রথম স্বপ্নটি তুলেছিল।
এখানে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, পুরণো পাথর বাঁধাই সড়কে
আমার চোখ নাচছিল।
যখন তোমার চুলে সূর্যের উচ্ছাস নিয়ে, রাস্তায় এবং রাত্রিতে,
তুমি সহাস্যে আমার কাছে এসেছো,
এবং আমি ভাবলাম আমি দেখছি আলোর টুপি পরা এক পরীকে,
যে আমার শৈশব নিদ্রার স্বপ্নে দেখা দিত,
এবং যার অর্দ্ধমুষ্টি হাত থেকে
সুগন্ধী নক্ষত্ররাজিতে ঝরে পড়ছে পুঞ্জ পুঞ্জ তুষার।
বৃক্ষের সূক্ষ যত শাখায়।
জানালা Les fenêtres
----------------------------------
দু:খী হাসপাতালের পূতি গন্ধে ক্লান্ত
যে গন্ধ বেয়ে উঠছে আর বসে যাচ্ছে পর্দার
বস্তাপচা সাদায়,
শুণ্য দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর বিপুল অবসাদ,
অসুখী ওয়ার্ডে মৃতপ্রায় সেই বৃদ্ধ বসে আছেন প্রায়ান্ধকার ঘরে।
বৃদ্ধ শিরদাঁড়ায় কখনো কখনো ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন,
জানালার সামনের পাথররাজি দেখার ইচ্ছে তত নেই-
যারা যতটা না রোদে পোড়া ততটা নয় তপ্ত
আর ক্ষয় হতে পারে যখন তখন,
জানালার শার্সিতে তবু তাঁর সাদাটে চোয়াল
আর চোয়ালের হাড় আঠার মত সেঁটে থাকে-
যে শার্সি আহা মিষ্টি রোদ্দুরে বাদামী।
জ্বরগ্রস্থ মুখখানা তার নীলের জন্য বড্ড লোভী
যেমনটা বহু বহু আগে, এক কুমারী ত্বকে, নোনা চুমু দেবার আশায়,
তৃষার্ত হয়ে উঠতেন তিনি, আর দীর্ঘ আলিঙ্গন,
সোনালী, কবোষ্ণ বর্গক্ষেত্রে দীর্ঘ কর্ষণ।
আসবমত্ত তিনি বেঁচে থাকেন, পরিশোধিত যত ঔষধি ভুলে,
কফ, ঘড়ি, পবিত্র যত তেল, যে বিছানায় তাঁর মৃত্যু হয়;
আর সন্ধ্যা যখন রক্তক্ষরণ করছে তাঁর যাবতীয় প্রতিবন্ধকতার উপরে,
তাঁর চোখজোড়া, দিগন্তের আলোয় সেঁটে আছে।
বেগুণীবর্ণ ঢেউয়ের উপরে তিনি দেখতে পান স্পেনীয় অর্ণবপোত,
সুরভিত, যেন বা সমাধিগ্রস্থ রাজহংসের ঝাঁক সাঁতার কাটছে,
ঐশ্বর্যময় আলোর রেখার চমকে সাজাচ্ছে তারা সারিবদ্ধ রেখা
স্মরণে প্লাবিত এক পরম আলস্যে।
সুতরাং কঠোর হৃদয় পুরুষদের প্রতি বিরূপ হয়ে,
যাদের স্বাদের শেকড় শুধুই সুখের গোবরগাদায়,
জলাভূমিতে দৃঢ়, সেই নারীকেই তারা কিছু কিছু দান করে
যে স্তন্য পান করায় তার শিশুদের।
আমি উড়ে যাই, এবং প্রতিটি জানালার সাথে সেঁটে থেকে,
কাব্য করি, জীবনের দিকে ফিরে আমার কাঁধ পরিতাপ করে,
চিরায়ত শিশিরে ধোয়া গ্লাসে তাদের
অসীমের পবিত্র সকালের অপরাধবোধ।
দেবদূতের মত প্রতিসরিত আমি! এবং আমি মরছি,
আর প্রেম, শিল্পের জানালায় রহস্যের বিষন্ন হয়ে থাকা,
পুনরায় জন্ম নেয়া, স্বপ্ন-মুকুট পরা, আরো আগের আকাশে,
যেখানে রূপ প্রথম তার কুঁড়ি থেকে ফেটে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
কিন্ত নিচে এখানে ঈশ্বর আছেন এবং তিনি পরম দয়ালু, আহা!
ধিক্কার আমাকে এমনকি যখন আমি আমার গোলাপও শুঁকি,
মানুষের নিতম্বের নোংরা বমন
আকাশের সামনে আমাকে বাধ্য করে
চেপে ধরতে নাসারন্ধ্র আমার!
এমন কি উপায় নেই কোন যে তিক্ত যত প্রতিবন্ধকতা নিয়েই,
রূঢ়ভাবে কলুষিত
এই জানালার কাঁচ ভেঙে
উড়ে যেতে পারি নি:সীম নীলে উন্মুক্ত দুই পক্ষ বিস্তার করে?
— অনন্তের ভেতর পতিত হবার সম্ভাবনা নিয়েই?
-------------------------------------------------------------
[ঋণ ও কৃতজ্ঞতা ম্বীকার -
১). তথ্যসূত্র - অন্তর্জাল।
২). ইমন জুবায়ের।
৩). রুখসানা হক।
৪). আজফার হোসেন।
৫). অদিতী ফাল্গুনী।]
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
প্রেমেন্দ্র মিত্র
শুভ জন্মদিন! 🎈
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক প্রশংসার জন্য হৃদয...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক ভালো লাগার জন্য কৃ...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম