শাহ্ আলম আল মুজাহিদ

কবিতা - বিদীর্ণ নিলিমার হিয়া

শাহ্ আলম আল মুজাহিদ

এ কোন সভ্যতার প্রহসন, বলো,
রক্তে রাঙা রাস্তা ধরে
দিনের পরে দিন চলে মানুষের মিছিল;
মুখে স্লোগান, হাতে পতাকা,
অন্তরে শূন্যতার শীতল নিষ্ঠুরতা।

আকাশের বুকে আজ কিসের দাগ,
বিদীর্ণ নিলিমার হিয়া!
নীল গম্বুজে কালো মেঘ ঝুলে থাকে
বিচারের অসমাপ্ত রায়ের মতো;
তারারাও যেন মুখ লুকিয়ে ফেলে
রাত্রির আঁচলের আড়ালে।

যে হাতে ধরা ছিল ভোরের আলো,
সে হাতে আজ ধোঁয়া ওঠে গুলির,
যে কণ্ঠ গাইত মানুষের গান,
সে কণ্ঠে এখন হাহাকার,
সত্যের নাম নিয়ে মিথ্যারই জয়ধ্বনি।

শহরের প্রান্তে, উঁচু দেয়ালের ছায়ায়
একটি শিশু বসে থাকে নির্নিমেষ;
তার চোখে প্রশ্ন—
মানুষ কে?
কোন বইয়ে তার পাঠ?
বাবার ক্লান্ত কাঁধে ভাঙা ঝুড়ি,
মায়ের হাতে শুকনো অন্নের বাটি,
তাদের কণ্ঠে কোনো ভাষণ নেই,
কোনো সভ্যতার বড়াই নেই,
শুধু নীরব হাঁটার শব্দ
ধুলো জমা গলির গা বেয়ে নামে।

সমস্ত পৃথিবীর বাজারে আজ
বিকোচ্ছে মানুষের বিবেক,
দামে খুব কম,
আড়ালে লুকোনো লোভের সোনার গহনা;
যে ধর্ম মানুষের বুক জুড়ে
দয়া আর মমতার বাঁশি বাজাত,
সেই ধর্মের নামেই আজ
ঘরে ঘরে আগুন লাগে,
দিগন্তজোড়া ধোঁয়ায় ঢেকে যায়
সহনশীলতার সরু পথ।

এই সব দেখে আকাশও কি নীরব থাকে?
না, তারও বুক ভেঙে যায়,
বিদীর্ণ নিলিমার হিয়া—
বজ্রের গর্জনে সে যেন বলে ওঠে,
“তোমরা মানুষ, না কেবল মুখোশ-পরা ছায়া?
কোথায় তোমাদের অন্তরপুরের সত্য?”

শালবনের শীতল ছায়ায়
একটা বাতাস হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়;
গাছের পাতায় কাঁপতে থাকে নিরুত্তর প্রশ্ন—
যে জাতি গান হারায়,
যে মনুষ্য তার করুণা ফেলে দেয়
অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মতো,
সে জাতি কিসের গর্বে
নিজেকে বলে ‘সভ্য’?

তবু কোথাও কোথাও,
শহরের উপান্তে, নদীর ধারে,
কোনো অচেনা কিশোর
চুপি চুপি গেয়ে ওঠে ভোরের গান;
কোনো কিশোরী দরিদ্রতার অন্ধ কুঁড়েঘরে
মুড়ি আর চিঁড়ার গন্ধের ভেতরেও
খুঁজে পায় স্বপ্নের ছোট্ট আলোকছটা।
মায়ের শূন্য হাঁড়িতে পানি টুংটাং শব্দ তোলে,
কিন্তু তার চোখ দুটোয়
প্রার্থনার দিগন্ত খোলা থাকে এখনো।

এই সব নীরব মানুষদের দিকে তাকিয়ে
আমি ভাবি,
যদি কখনো সত্যিই জাগে
মানুষের ভেতরের মানুষ,
তবে কি আজকের এই নিষ্ঠুরতার ওপর দিয়ে
নতুন কোনো সূর্য উঠবে?
যে সূর্যের আলোয়
বুকে বয়ে চলা ঘৃণার নদী শুকিয়ে যাবে,
আর করুণার জলভরা মেঘেরা
বর্ষণ করবে সমান ছায়া
ধনী আর গরিবের মাথার ওপর?

ওগো অশেষ আকাশ,
তোমার বিদীর্ণ নিলিমার হিয়া জুড়ে
আজ যে ব্যথার রঙ দেখছি,
তা কি কেবল মেঘের ছায়া,
না আমাদের অন্তরের অন্ধকার?
তুমি তো যুগে যুগে দেখেছো
রাজাদের পতন, গরিবের কান্না,
মঠ-মসজিদ-মন্দিরের গম্বুজের নীচে
কত উৎসব, কত ছলনা;
তবু তুমি নীরব ছিলে,
নক্ষত্রের গোপন ভাষায়
শুধু লিখে গেছ সত্যের ইতিহাস।

আমরা কি তোমার সেই লেখা পড়তে শিখব?
একদিন কি আসবে,
যেদিন কোনো শিশু আঙুল তুলে
ছেদ করা আকাশের দিকে চেয়ে বলবে—
“এখন আর নিলিমার হিয়া বিদীর্ণ নয়;
মানুষ শিখেছে মানুষকে ভালবাসতে,
শিখেছে অন্যের অশ্রুতে
নিজ চোখের পানি খুঁজে নিতে”?

সেদিন হয়তো
তোমার গায়ে আর থাকবে না
রক্তাক্ত সভ্যতার আঁচড়,
শুধু শান্ত আলোয় ভরা সন্ধ্যারম্ভে
বাজবে মানুষের মিলনের গান;
নদী মিশবে সাগরের বুকে,
ধর্ম মিশবে মানবতায়,
স্বপ্নেরা মিশে যাবে
ভোরের সোনালি রোদ্দুরে।

আমি সেই দিনের আশায়
আজও লিখে যাই নিঃশব্দ শব্দের গান—
যেন কোনো অদৃশ্য করুণার হাত
স্পর্শ করে যায় ক্লান্ত পৃথিবীর কপাল,
আর বলুক ধীরে, মৃদু সুরে—
“মানুষ,
তুমি সত্যিই মানুষ হোও।”

ততদিন পর্যন্ত
এই বিদীর্ণ নিলিমার হিয়া
আমাদের অপরাধের আয়না হয়ে থাকবে—
আকাশের নীল বুকের ভেতর
জমা হবে আমাদের সকল অমানবিকতা,
আর আমরা বারবার মাথা নিচু করে
নিজেকেই চিনে নেব
তার ফেটে যাওয়া রঙের ভেতরে।

পরে পড়বো
৫২
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন