মোহাম্মদ সিয়াম হোসেন

গল্প - পথের ধারে

মোহাম্মদ সিয়াম হোসেন
রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ছোটদের, ভালোবাসা


লিমা প্রচণ্ড রাগ করে আছে। শফি আড়চোখে কয়েকবার লিমার দিকে তাকিয়ে দেখল মেজাজের উন্নতি হয়েছে নাকি অবনতি। ফোনটা চার্জে বসিয়ে লিমার পাশে গিয়ে বসল শফি। মুচকি হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু রাগ দমন হলো না লিমার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শফি বলল, ‘দেখো লিমা, চাহিদা আর বিলাসিতা এক নয়।’
‘তুমি দুটোর মধ্যে পার্থক্য বোঝো না।’
‘আমি না বলিনি, সময় চেয়েছি।’
লিমা কোনো উত্তর দিল না। শফি পুনরায় বলতে লাগল, ‘আহ্! কিছু তো বলো। তুমি মুখ ভার করে থাকলে আমার কি ভালো লাগে?’

লিমা বলল, ‘আমার আজ লজ্জায় নাক নয়, মাথা কাটা গেছে। তুমি এমন কেন? কোনো দায়িত্ববোধ নেই?’
শফি মুচকি হেসে বলল, ‘লজ্জা এত সস্তা হলো কবে? যখন-তখন চলে আসে? নাক কাটে, আবার মাথাও কাটে?’
লিমা কথাগুলো শুনে আরও রেগে গেল। লিমা রাগ করলে দেখতে ভারী সুন্দরী লাগে। রাগ, বায়না—এগুলো মেয়েদেরই মানায়। লিমা প্রায়ই খুঁটিনাটি বিষয়ে রাগ করে; কিন্তু তা স্বল্প সময়ের জন্য। তবে আজ ভীষণ রেগে আছে দীর্ঘ সময়।

মূলত বেশ কয়েক মাস ধরে লিমা চাইছে সোফা সেট কিনতে। নতুন বাসা নিয়েছে। যেখানটায় বাসা নিয়েছে, সেখানে পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী ও আত্মীয়স্বজনরাও বসবাস করে। প্রায়ই লিমার সাথে তারা দেখা করতে আসে। ঘরে বসতে দেওয়ার ভালো ব্যবস্থা নেই; তাই সোফা সেট জরুরি। শফি সামান্য একটি চাকরি করে। নতুন বাসা নিয়েছে, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিয়ে ওঠা তার জন্য কষ্টকর। তাই লিমা চাইলেও শফির পক্ষে সোফা সেট কেনা এখন সম্ভব নয়।

যদিও এতদিন তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। লিমা শুধু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করেছে। কিন্তু আজ সকালে লিমার সাথে তার বান্ধবী দেখা করতে এসেছিল। শফি তখন অফিসে ছিল। তার বান্ধবীর নাম প্রিয়াঙ্কা বড়ুয়া। শফি প্রিয়াঙ্কা বড়ুয়াকে খুব ভালো করে জানে। প্রচণ্ড ঠোঁটকাটা মেয়ে। কোথায় কী বলতে হবে, সেই বাছবিচার নেই। কোথাও বেড়াতে গেলে ভারী গহনা পরে। লিমার বিয়েতে এসেছিল। লিমার চেয়েও বেশি সেজেগুজে এসেছিল সে।
শফি লিমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘সকালে কেউ এসেছিল?’
লিমা রাগী গলায় উত্তর দিল, ‘এসেছিল, এসে আমার মাথায় বসেছিল। ঘরে বসার কোনো কিছু আছে?’
শফি: ‘কে এসেছিল?’

লিমা কোনো উত্তর দিল না। লিমার চুপ থাকায় শফি বুঝতে পারল প্রিয়াঙ্কাই এসেছিল। শুধু এসেই চলে যায়নি, লিমার কান ভারী করে দিয়ে গেছে।


শফির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় সোফা সেট তো দূরের কথা, বসার জন্য মাদুর কেনাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। সামান্য বেতনের চাকরি। বাড়িতে মা-বাবার খরচ শফিকে বহন করতে হয়।
শফির বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। গ্রামে তাঁদের বংশগত সুনাম আছে। এখন অর্থসম্পদ না থাকলেও একটা সময় শফির দাদা ছিলেন ধনী। সমাজের প্রভাবশালীদের একজন ছিলেন তিনি। দাদার প্রভাব বংশগতভাবে এখনো বিদ্যমান আছে, কিন্তু ধনসম্পদ নেই। অর্থকষ্ট থাকলেও সমাজের মানুষের কাছে শফিদের সেই দাদার প্রভাব বজায় রেখেই চলতে হয়। শফির বাবা যে কয়টা টাকা পেনশন পান, তা সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে ব্যয় করেন। তাই সংসার চালানোর জন্য প্রতি মাসে শফির কাছ থেকে তাঁদের খরচ নিতে হয়। ছোট ভাই-বোনের লেখাপড়া থেকে শুরু করে ঘরের বাজারসদাই পর্যন্ত শফির টাকায় কেনা হয়। শফি তাই একত্রে দুটি সংসারের কর্তা। দুই সংসারের খরচ বহন করতে শফির কলিজায় পানি চলে আসে। নিজে কখনো ভালো পোশাক-আশাক পরে না। সেই পুরনো রঙ জ্বলে যাওয়া জামাকাপড় পরে অফিস করে। অফিসের সহকর্মীরা শফির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। কিন্তু শফি চরম বাস্তবতার কাছে পরাজিত। অন্যের তীক্ষ্ণ চোখ তাকে বিচলিত করে না। এই মুহূর্তে লিমার কোনো চাওয়া-পাওয়া পূরণ করা শফির পক্ষে মোটেও সম্ভব নয়।
রাতে লিমার মেজাজ স্বাভাবিক হয়েছে। শফি ভাত খাওয়ার সময় বলল, ‘কাল অফিস নেই। যাবে? নতুন একটি সেতু তৈরি হয়েছে বড় নদীর ওপর।’
লিমা কোনো উত্তর দিল না।
শফি পুনরায় বলল, ‘নদীর পাশে ঘুরে বেড়ানোর মতো সুন্দর জায়গা আছে। ছোটখাটো বাজারও তৈরি হয়েছে।’
লিমা মৃদু হেসে বলল, ‘মিল দিতে এসেছ? ঠিক আছে, যাব।’
শফি: ‘ঝগড়াটা কখন হলো?’
লিমা কোনো উত্তর দিল না।


বিকেলে শফি লিমাকে সেতু ঘোরাতে নিয়ে গেল। নতুন সেতু তৈরি হয়েছে—শহরের সব থেকে বড় সেতু। মানুষজন তাই বিকেলবেলা এখানে ঘুরতে আসে। সেতুর নিচে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ফাস্টফুডের দোকান। শফি লিমাকে সেখানে নিয়ে গেল। বদলি হয়ে এই শহরে আসার পর শফি প্রায়ই এই নদীর পাড়ের বাজারে এসে চা পান করে। চায়ের দোকানদার শফিকে চেহারায় চেনে। লিমা শফিকে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে কেন এসেছ? আমরা কি চা খাব?’
শফি বলল, ‘বোসো, আগে চা খাই।’
লিমা: ‘মেয়েরা বাজারে চা খায় না।’
শফি: ‘খাবে কেন? পান করবে।’
লিমা: ‘পার্থক্য কী?’
শফি লিমার সাথে কথা বলার ফাঁকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগল। চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই পথের ধারে দুজন ভিখারি বসে না স্বামী-স্ত্রী?’
দোকানদার: ‘হয় ভাই, আইজ বয় নাই (বসেনি)।’
শফি: ‘বোধ হয় আজ আসবে না।’

দোকানদার: ‘আইবে, তয় দেরি হইবে। অরা কত জাগায় বয় হ্যার ঠিক আছে।’
দোকানদারের সাথে শফির এই কথাবার্তায় লিমা বিরক্ত হলো। জানতে চাইল, ঘুরতে এসে ভিখারির খোঁজ কেন করছে। শফি কিছু বলল না। চায়ের কাপটি লিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে খাওয়ার জন্য ইশারা করল। শফি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পুনরায় আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল ভিখারি স্বামী-স্ত্রী দুজন এসেছে কি না।
কিছুক্ষণ পর শফি দেখতে পেল ভিখারি দুজন এসেছে। রাস্তার উঁচু ফুটপাতে মাদুর পেতে তারা প্রতিদিন বসে। সিমেন্টের বস্তা কেটে মাদুর তৈরি করে নিয়েছে ভিখারি দম্পতি। শফি তাড়াহুড়ো করে চায়ের বিল পরিশোধ করল। লিমাকে বলল, ‘চলো ওখানে।’ এই বাজারে আসা-যাওয়ার কারণে শফি ভিখারি দম্পতিকে আগে থেকেই চেনে। মাঝে মাঝে তাদের সাথে কথা বলে, তাদের সুখ-দুঃখের খবর নেয়। ভিখারির স্বামীর একটি পা ও একটি হাত নেই। বৈদ্যুতিক শক খেয়ে হাত-পা হারিয়েছে সে। কম করে হলেও দুই যুগ আগের কথা। তখন গ্রামে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছিল। বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে তার স্বামী বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর চড়েছিল। এরপর যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। তখন তাদের দাম্পত্য জীবনের বয়স মাত্র ছয় মাস। এমন কঠিন মুহূর্তে ভিখারি নারী তার স্বামীকে ছেড়ে যায়নি। আজ অবধি স্বামীর সাথে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। শুরুতে তারা ভিক্ষা করেনি। চিকিৎসার জন্য স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তির সবটুকু বিক্রি করে দিতে হয়েছে। চরম অর্থসংকট তাদের পথে নামিয়ে এনেছে। শফি তাদের এসব দুঃখ-সুখের কথা জানে। জীবনবোধের শিক্ষার জন্য এমন সংগ্রামী মানুষের জীবনী জানা জরুরি। তারা বিখ্যাত কিংবদন্তি নয়, কিন্তু জীবন-সংগ্রামে তাদের ইতিহাস কিংবদন্তিকেও হার মানাবে।

শফি এসে ভিখারি দুজনের পাশে বসল। লিমা শফির এমন কর্মকাণ্ড দেখে রীতিমতো অবাক হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত। শফি লিমাকে বলল, ‘বোসো এখানে।’ লিমা বিরক্ত স্বরে বলল, ‘রাস্তার সমস্ত ময়লা লেগে আছে ওখানে। তুমি ওখানে বসে আছ কেন?’ শফি লিমার প্রশ্নের উত্তর দিল না।
ভিখারি নারীকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আজ পুনরায় আপনাদের সুখ-দুঃখের কথা জানতে আসলাম।’ লিমার দিকে বড় চোখ করে তাকিয়ে ওই নারীকে শফি প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, আমাকে একটা কথা বলবেন? রাস্তা দিয়ে কত বড়লোক মানুষ আসা-যাওয়া করে। তাঁদের প্রাইভেট কার থাকে। আপনি আপনার স্বামীকে নিয়ে তাঁদের গাড়ির সামনে গিয়ে দু-একটা টাকা ভিক্ষা চান। আপনার কি কখনো মনে হয় না আপনার স্বামীর কেন গাড়ি নেই? আপনি তো বড়লোক বেটার স্ত্রীর মতো একজন নারী। আপনার কি মনে হয় না আপনারও এমন জীবন হতে পারত?’
ভিখারি নারী শফির এ ধরনের প্রশ্নে মোটেও অবাক হলো না। সে জানে না কোন প্রশ্নে অবাক হতে হয়, কোন প্রশ্নে রাগ করতে হয়। নিজের মাদুরের ময়লা পরিষ্কার করতে করতে সে জবাব দেয়, ‘এহানেই মুই ভালো আছি। মানসের কি আছে ওডা মোর কি দরকার?’
শফি পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘কখনো কি মনে হয়নি এই পঙ্গু স্বামীকে তালাক দিয়ে অন্য কোথাও বিয়ে বসবেন?’
ভিখারি নারী উত্তরে বলল, ‘কৈ যামু? যেহানে যামু অহানে কি শান্তি পামু?’
ভিখারি নারীর সাথে শফির এ ধরনের কথাবার্তায় লিমা রাগান্বিত হলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে শফিকে বলল, ‘তুমি থাকো, আমি চললাম। আর হ্যাঁ, মোটেও আমার পথ আটকাবে না।’
শফি বুঝতে পারল, এখানে এনে লিমাকে শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে নিজেরই এবার শিক্ষা হতে যাচ্ছে। তাই একটু মৃদু হেসে লিমার পেছনে পেছনে ছুটল। মৃদু কণ্ঠে লিমাকে ডাকতে লাগল, ‘দাঁড়াও।’ কিন্তু লিমা যতটা না রাগ করেছে, তার থেকেও বেশি দ্রুত ব্রিজের নিচ থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। এর মধ্যেই শফি দ্রুত পায়ে হেঁটে তাকে ধরে ফেলল; হাত ধরে আলতো টান দিয়ে থামাল।

শফি বলল, ‘আমিও তো বাসায় যাব, একত্রে যাই।’ লিমা কোনো কথা বলল না, নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য জোরে একটা ঝাড়া মারল। লিমার হাতে কাচের চুড়ি পরা ছিল; চুড়িগুলো মড়মড় করে ভেঙে শফির হাতের মধ্যে কাচের টুকরো ঢুকে গেল। এবার শফি কিছুটা বিরক্ত হলো, দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘থামো, আমার হাত কেটে গেছে।’ লিমা এবার থামল। হাত ধরে দেখল সত্যিই চুড়ির আঁচড়ে হাত কেটে গেছে। এরপরও লিমা কিছু বলল না। শফি নিজের হাতের রক্তক্ষরণ থামানোর জন্য অন্য হাত দিয়ে কাটা জায়গাটি চেপে ধরল। এরপর ইশারায় একটি রিকশা ডাকল এবং বাসার ঠিকানা বলে চটপট উঠে পড়ল। লিমাও কোনো কথা না বলে রিকশায় চড়ে বসল। দুজন দুই দিকে তাকিয়ে আছে, আর রিকশা ছুটে চলছে তাদের গন্তব্যের দিকে।

সমাপ্ত

পরে পড়বো
১৫
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন