শ্রীকান্তের অপবাদ ( পর্ব: ২ )।
লেখক:– সোহন ঘোষ।
লেখকের কথা:–
“শ্রীকান্তের অপবাদ” একটি সামাজিক ছোটগল্প, যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।
গল্পটির বিষয়বস্তু এখানে আলাদা করে উল্লেখ করলাম না। আমার বিশ্বাস, লেখকের ব্যাখ্যার চেয়ে পাঠকের নিজস্ব পাঠ-অভিজ্ঞতাই বেশি মূল্যবান। গল্পটি মন দিয়ে পড়লে তার অন্তর্নিহিত ভাব ও বক্তব্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা দেবে।
────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────
এপ্রিল মাসে আমাদের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন পরীক্ষা হলো। সেই পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন আমাদের মধ্যে বেশ একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। আমি, রাজ আর অরিজিৎ আগের দিনই ঠিক করেছিলাম—তাড়াতাড়ি গিয়ে একেবারে পেছনের বেঞ্চটা দখল করব। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল; ক্লাসে ঢুকতেই আমরা দেখি পেছনের সব জায়গা দখল হয়ে গেছে। যদিও সেদিন আমাদের ক্লাসে খুব বেশি ছাত্রছাত্রী আসেনি।
অগত্যা শ্রীকান্তকে প্রথম বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে আমরা তার ঠিক পেছনের বেঞ্চটাতেই বসলাম।
টিফিনের আগের ক্লাসে সুমন স্যার হাতে একটা খাতা নিয়ে আমাদের ক্লাসে প্রবেশ করলেন। স্যারের হাতের ওই খাতার দিকেই সবার নজর যেন আটকে রইল। স্যার খাতাটি টেবিলের ওপর রেখে একবার পুরো ক্লাসের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর খাতাটি হাতে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “এবারের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায়…”
স্যার একটু থামলেন। ক্লাসে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। স্যারের পরের বাক্যগুলি শোনার জন্য ক্লাসে উপস্থিত সবাই স্যারের মুখের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর স্যার আবার একই গম্ভীর সুরে, “পুরো ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে…”
আবারও সেই দীর্ঘ বিরতি। এই সময় রাজ আমার কানে ফিসফিস করে বলল, “প্রতিবারের মতো এবারেও ঝিলিকই প্রথম হবে দেখিস।”
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, স্যার ফলাফলপত্রের দিকে একবার তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে ঘোষণা করলেন—
“শ্রীকান্ত বিশ্বাস।”
শ্রীকান্তর নাম কানে যেতেই আমরা সবাই বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। যারা তাকে এতদিন ‘খেপা’, ‘শ্রীক্যাবলাকান্ত’ বলে বিদ্রূপ করে এসেছে , তারাই এখন চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। শ্রীকান্ত অবশ্য পেছন ফিরে তাকাল না; সে শান্তভাবে স্যারের দিকেই মুখ করে বসে রইল।
স্যার একে একে সবার নম্বর বলে চলে যাওয়ার সময় ঝিলিকের সামনে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী রে, আজকাল পড়াশোনায় ফাঁকি দিচ্ছিস নাকি?”
ঝিলিক কিছু না বলে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইল।
স্যার বেরিয়ে যেতেই ঝিলিক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মুখে দু’হাত চাপা দিয়ে সে ক্লাসের মধ্যেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর সেই কান্না দেখে সারা ক্লাসে এক অদ্ভুত, অস্বস্তিকর স্তব্ধতা নেমে এল। যদিও কয়েকজন সেদিকে নজর না দিয়ে নিজেদের কোনো একটা বিষয় নিয়ে বেশ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল
শ্রীকান্তও বেশ চুপচাপ বসেছিল, যার আজ সবচেয়ে বেশি আনন্দ করার কথা ছিল, সেও ঝিলিকের কান্না দেখে একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।
কিছুক্ষণ কাঁদার পর ঝিলিক হঠাৎ অদ্ভুত এক স্থিরতায় উঠে দাঁড়াল। চোখের জল না মুছেই, কাউকে কিছু না বলে সে ঝড়ের বেগে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল। আমরা ভাবলাম হয়তো নিজেকে সামলাতে সে বাইরে কোথাও একটু সময় কাটাতে যাচ্ছে।
কিন্তু একটু পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে আবার যখন ক্লাসে ফিরে এল, তার হাতে তখন একগুচ্ছ খাতার পাতা। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি সেগুলো কীসের পাতা। পরে লাল কালির দাগ আর স্কুলের স্ট্যাম্প দেখে বুঝতে দেরি হলো না। স্কুলের অফিস রুম থেকে সে নিজের সমস্ত বিষয়ের উত্তরপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখার জন্য চেয়ে এনেছে।
বেশ কিছুক্ষণ নম্বর মেলানোর পর সে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল।
এরপর টানা কয়েকদিন ঝিলিক স্কুলই এল না।
এদিকে শ্রীকান্ত যেন সবার কাছে দুর্লভ রত্ন হয়ে উঠল।মাঝে মাঝে কয়েকজন মজা করে তাকে ‘ভাই’ কিংবা ‘দাদা’ বলে ডাকত। খাতা দেখানোর অনুরোধ তো ছিলই, কেউ কেউ আবার আধা-মজা আধা-গম্ভীর ভঙ্গিতে বলত,
“ পরীক্ষায় দেখালে কিন্তু বিরিয়ানি খাওয়াব, ঠিক আছে!?”
একদিন সুদীপ এসে তার কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল,
“কী রে শ্রীকান্ত, এখন তো তোর বিশাল ব্যাপার! সামনের পরীক্ষায় দয়া করে একটু দেখাস। যতই হোক আমি তো তোর দাদা হয় বল!”
শ্রীকান্ত শুধু হালকা হেসে মাথা নাড়ল; কিছু বলল না।
বেশ কিছুদিন পর ঝিলিক যেদিন স্কুলে এল, সেদিন তাকে যেন আগের সেই ঝিলিক বলে মনে হলো না। ওর চোখে আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি ছিল না। ভেতরে ভেতরে যেন ভীষণ ভেঙে পড়েছে সেটা মুখে না বললেও তার চালচলন দেখলেই বোঝা যায়। তবে সব থেকে বড় অদ্ভুত লাগলো—
টিফিনের সময় কিংবা স্যারের অনুপস্থিতিতে আগে সে একটা বই বের করে গাল ফুলিয়ে পড়াশোনা করতো আর এখন বইটা সামনে খোলা থাকলেও সে জানলার বাইরে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। খাতার পাতায় কলম দিয়ে হিজিবিজি কী সব আঁকিবুকি কাটে। তার যে কী হয়েছিল তা জিজ্ঞাসা করার সাহস আমাদের কারোর ছিল না।
আমাদের স্কুলে ঝিলিকের খুব ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু ছিল না। ও একটু অহংকারী স্বভাবের ছিল বলেই হয়তো কেউ ওর সঙ্গে খুব একটা মিশত না। তাই ক্লাসে সে বেশিরভাগ সময় একাই বসত। আগে সেই একা বসাটার মধ্যে একটা গর্ব ছিল—যেন সে কারও ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই একাকীত্ব সত্যিকারের নিঃসঙ্গতায় বদলে গেল।
আগে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর ঝিলিক নির্ভয়ে দিত। এখন প্রশ্ন করা হলে সে একটু থেমে যেত, গলা কেঁপে উঠত। উত্তর জানলেও ঠিকভাবে বলতে পারত না। আত্মবিশ্বাসের অভাবে যেমন জড়তা আসে, ওর অবস্থাও ঠিক তেমনই হয়ে গিয়েছিল। যেন ভুল হওয়ার ভয়টা তাকে আগে থেকেই হার মানিয়ে দিত। ফলে ক্রমশ স্যারদের দৃষ্টিও যেন ধীরে ধীরে বদলে গেল। স্যারেরা শ্রীকান্তের খাতা বেশি দেখতেন, তার প্রশংসা করতেন।
ঝিলিকের এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে কৌতূহলবশত আমরা টিনাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। টিনাদি সম্পর্কে ঝিলিকের জ্যাঠতুতো দিদি হয়।
“প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়নে ঝিলিক কিছু নম্বর কম পেয়েছে শুনে তার বাবা তাকে ভীষণ বকাঝকা করেন। তার বাবা পেশায় একজন ডাক্তার, অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের মানুষ। তিনি চান মেয়েও ভবিষ্যতে তাঁর মতো ডাক্তার হোক, তাই পড়াশোনায় সামান্য ব্যত্যয়ও তাঁর কাছে অগ্রহণযোগ্য।”
টিনাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানিস,
ঝিলিকের বাবা রাগের মাথায় ঝিলিককে স্টিলের স্কেল দিয়ে এতটাই বেধড়ক মারধর করেছিলেন যে, ওর সারা শরীরে লালচে কালশিটে দাগ পড়ে গিয়েছিল।”
টিনাদি একটু থেমে বলল,
“শুধু ওর বাবা নন, ওর মা, এমনকি প্রাইভেটের শিক্ষকরাও ওকে এই নম্বর কম পাওয়া নিয়ে প্রচণ্ড বকাবকি করেছিল।”
আমরা টিনাদির কাছ থেকে আরও জানতে পারি যে ঝিলিক নাকি একদিন চুপচাপ তার কাছে গিয়ে বলেছিল,
“আমি কি সবার চোখে খারাপ হয়ে গেলাম, দিদি?
আমাকে আর কেউ আগের মতো ভালোবাসে না?”
টিনাদি ঝিলিককে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নাকি ঝিলিক কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাই টিনাদি আর প্রশ্ন না করে শুধু সান্ত্বনা দিয়েছিল।
টিনাদি একটু ভেবে অনুমান করে বলল, “নার্সারি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি বছরই ঝিলিক সবার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে এসেছে। কোনোদিন কারোর চেয়ে এক নম্বর কম পায়নি। স্কুলের পরীক্ষা হোক বা টিউশনের কোনো পরীক্ষা, সব জায়গাতেই প্রথম স্থানটি বরাবর ওরই দখলে ছিল। এই প্রথম ও কারও চেয়ে কম নম্বর পেল। হঠাৎ এই সামান্য পরিবর্তনটুকু না মেনে নিতে পেরেই হয়তো সে এতটা ভেঙে পড়েছে।”
(**ক্রমশ**)

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন