বহু কষ্টে শিখেছি সাঁতার ;
অন্তত স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়া শক্ত নয় আর |
নদীতেও নানা বাঁক আছে ;
সেগুলোর কোনোটাতে ঠেকে গিয়ে বাঁচে
এমন লোকেও যারা সাঁতারের স-টুকু জানে না |
সমুদ্র তো তাদের টানে না |
শরে বা শৈবালে
কিংবা মত্স্যনারীদের সবুজ চুলের ঊর্ণাজালে
জড়ায় না তারা কানামাছির মতন ||
বরঞ্চ ঘূর্ণির উন্মথন
তাদের নিক্ষেপ করে শরণসৈকতে |
বিষম দ্বৈরথে
জাগ্রত দৈত্যকে মেরে, অর্ধরাজ্য রাজকন্যাসহ
তারাই কুড়িয়ে পায় ; প্ররোহী আবহ
বাড়ায় তাদের বংশ ; অবশেষে ঘুমিয়ে এখানে,
স্বর্গের স্বাগত শোনে সচকিত কানে ||
আমগ্ন তরণী ছেড়ে, ঝাঁপাতে পারি না তবু জলে |
বিফল কৌশলে
ভাঙা হাল ধ’রে থাকি ; ছেঁড়া পাল সযত্নে খাটাই ;
লুপ্তপ্রায় মানচিত্রে চাই |
ভুলে যাই একা আমি ; সঙ্গে ছিল যারা,
প্রলুব্ধ বন্দরে কিংবা পথকষ্টে আজ আত্মহারা,
কে কোথায় প’ড়ে আছে, জানি না ঠিকানা |
শূন্য মনে ভূতে দেয় হানা ;
প্রকীর্তির ছায়াচ্ছবি নিরাশ্রয় চোখে ফুটে ওঠে ||
ফের এসে জোটে
উচ্ছল অর্ণবপোতে স্বদেশের শ্রেষ্ঠ বীর যত ;
গুরুদীক্ষা, বাহুবল, সহায় দৈবত
তরায় সমূহ বিঘ্ন, নিরুদ্দেশে গন্তব্য চেনায় |
পুনরায়
স্বয়ংবরা পণ্ড করে মায়াবীর চক্রান্ত, চাতুরী ;
হাহাকারে ভরে রাজপুরী
তার উগ্র রিরংসায় ; অভিসারী ঝড়ে
সবিতার বলি লুটে, পলাতক তরীতে সে চড়ে ||
স্বৈরিণীর অনুকম্পা চোকে নি তাতেও |
অযাচিত সন্তানে সে দিয়েছিল আমাকে পাথেয় ;
অপহৃত উত্তরাধিকার,
আমি নয়, সেই নিজে করেছিল নির্দয়ে উদ্ধার |
তবু তার গভীর মায়ায়
পারি নি তলিয়ে যেতে ; কৃষ্ণপক্ষ চোখের ছায়ায়
সিন্ধুর ঊষর জ্বালা চাই নি জুড়োতে |
বিপরীত স্রোতে
সর্বনাশ নিশ্চিত জেনেও ,
ভুলি নি শান্তির চেয়ে স্বধর্মই শ্রেয় |
ফলত নিরবলম্ব, নিঃসন্তান, নিঃস্ব আজ আমি ;
অন্তর্যামী
সাধ ও সাধ্যের ভেদ গোলায় কেবলই |
ঘটে অন্তর্জলি
শতচ্ছিদ্র তরণীতে ; কিন্তু ভাবি অকূল পাথারে
স্বেচ্ছায় চলেছি ছুটে ; বস্তুত জোয়ারে
ততটাই ফিরে আসি , যতখানি এগোই ভাঁটাতে |
অপ্সরীরা, ব’সে আঘাটাতে,
নিশ্চেষ্ট কৌতুক দেখে ; স্তব্ধপাখা
সাগরবলাকা
অধীর চিত্কার হানে সন্ধ্যার আকাশে ||
তবে কি বিশ্বাসে
ভাঙা হাল ধরে থাকি, ছেঁড়া পাল সংযত্নে খাটাই ,
লুপ্তপ্রায় মানচিত্রে চাই,
মনে ভাবি
এ-কখানা জীর্ণ কাঠে অস্মিতার অসম্ভব দাবি
আবার প্রতিষ্ঠা পাবে সপ্তসিন্ধুপারে ?
তার চেয়ে নিঃশঙ্ক সাঁতারে
ব্যয় ক’রে নিশ্বাসের অন্তিম সঞ্চয়,
অগাধে সংকল্পসিদ্ধি একাধারে নিশ্চিন্ত, নিশ্চয় ||
স্বপ্ন আজ ব্যর্থ বিড়ম্বণা ;
জরাবিগলিত দেহে আত্মঘ্ন যন্ত্রণা
বিজিগীষা |
যে-প্রাক্তন তৃষা
মেটাতে পারে নি সিন্ধু, হয়তো বা নির্বাণ হবে তা
জোয়ার-ভাঁটার সন্ধি নদীবক্ষে, যেথা
মুকুরিত মহাশূন্য, সমুদ্রের পিতা ও প্রতীক,
দুরত্যয়, স্বস্থ, প্রগতিক ||

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন