মেঘে ঢাকা তারা
মেঘে ঢাকা তারা
মানব মন্ডল

গল্প - মেঘে ঢাকা তারা

মানব মন্ডল
বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫ ভালোবাসা, ভৌতিক

অনেক দিন পর মামা বাড়িতে দিকে যাচ্ছি। আসলে আমার ” মেঘে ঢাক তারা সাথে দেখা হয়ে গেলো যে হঠাৎ করে। আমার মামা বাড়ি বৈদ্য পাড়া। বৈদ্য পাড়া নাম শুনে বুঝতে পারছেন ঘটি মানে এদেশীদের পাড়া। পশ্চিম বঙ্গের আদিবাসীন্দাদের ঘটি বলা হয় কেন?? “ঘটি” বলতে মূলত পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় বাঙালি সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়, বিশেষ করে যারা গঙ্গা-পারবর্তী এলাকার স্থানীয়।
“বাঙাল” শব্দটি পূর্ববঙ্গ (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে আসা অভিবাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
এই বিভাজনটি দেশভাগের সময় বা তার আগে থেকেই ছিল, যখন দেশভাগের ফলে প্রচুর মানুষ পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে চলে যায় এবং পূর্ববঙ্গের অনেক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে।
এই বিভাজনটি শুধু ভৌগোলিক নয়, এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং খাদ্য অভ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছিল।
দুই ধরনের মানুষই হয়তো বাংলায় কথা বলে, কিন্তু তাদের কথার টান হয়তো কিছুটা ভিন্ন। আবার খাবারের ক্ষেত্রে ঘটিরা চিংড়ি পছন্দ করে, অন্যদিকে বাঙালরা ইলিশ। এই পার্থক্যগুলোর রেশ ধরেই দ্বন্দ্ব শুরু, যার ফলাফল দাঁড়ায় ঘটিদের বাঙাল সহ্য করতে না পারা, বাঙালদের প্রতি একটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটে ওঠা আচরণে। ঘটিরা মনে করতো তারাই প্রকৃত বাঙালি আর বাঙালরা হলো উদ্বাস্তু, তাদের কোনো অধিকার নেই। হাটে-বাজারে কিংবা অফিসপাড়ায় – সব জায়গাতেই বাঙালরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো প্রতিনিয়ত।
ঘটি-বাঙালের দ্বন্দ্ব যে শুধু প্রাত্যহিক জীবনে সীমাবদ্ধ থেকেছে, তা নয়; ইস্ট বেঙ্গল এবং মোহনবাগানের হাত ধরে তা গুটি গুটি পায়ে চলে আসে ফুটবলেও। মোহনবাগান নাকি ইস্টবেঙ্গল? ইলিশ নাকি চিংড়ি? বাঙালির এই দ্বন্দ্ব মেটার নয়। যতদিন বাঙালি থাকবে, বাঙাল-ঘটির খুনসুটিও থাকবে। তবে ভুলে যদি বাঙাল বাড়ির মেয়ের সঙ্গে ঘটি বাড়ির ছেলের বা ঘটি বাড়ির মেয়ের সঙ্গে বাঙাল বাড়ির ছেলের বিয়ে হয়ে যায়, তা হলে আর কিছু নিয়ে ঝামেলা হোক না হোক, রান্না নিয়ে হবেই।
আমার মেঘে ঢাকা তারা বাঙল তাই ওর সাথে সম্পর্ক গড়তে দিতে রাজি হয়নি ওর বাড়ির লোকজন। আসলে এই সংস্কৃতির পার্থক্য হবার কারণটা অনেক পুরানা। বঙ্গদেশ এক সময় ছিল প্রাচুর্যে ভরা। খুব বিত্তবান ছিল গৌড় প্রদেশ।  তখন শশাঙ্ক সিংহাসনে। এই গৌড় প্রদেশের বাসিন্দাদের তখন বলা হতো গৌড়ীয়। গৌড়ীয়রাই হলো আজকের ঘটি। গৌড়ীয় থেকে অপভ্রংশ হয়ে গৌটীয়। সেখান থেকে হয়ে যায় গৌটি। তা থেকে আজকের ঘটি।
বাঙলদের রান্নায়  ঝাল ঘটিদের রান্না মিষ্টি কেন?
গৌড়ের নাম আসলে গৌড় হয়েছিল তার কারণ এখানে প্রচুর পরিমাণে আখ চাষ হতো।  আখের গুড় এর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল গৌড় সাম্রাজ্য। একই সঙ্গে নানা রকমের মিষ্টি দ্রব্য বা মিষ্টান্ন প্রস্তুত হতো কারণ অতিথি আপ্যায়নে মিষ্টি দেওয়া হতো। আবার এই কারণে গৌড় প্রদেশের বাসিন্দাদের রান্নাতেও গুড়ের ব্যবহার হতো যথেষ্ট। সেই থেকেই ঘটিদের রান্নায় মিষ্টি দেওয়ার চল।
আবার বঙ্গ দেশে সওদাগরের ব্যবসা চলত বেশি। যেমন মঙ্গল কাব্য দেখেছেন চাঁদ সদাগর। এদের  আমদানি করা মশলা বেশি পরিমাণে ব্যবহার হতে লাগলো রান্নায়। এরা বেশি ব্যবহার  করতো দারচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ইত্যাদি। ফলে রান্নায় বাড়ল ঝাঁঝালো ঝাল ।  পর্তুগীজদের হাত ধরে ভারতে এসে পৌঁছল লঙ্কা। ১৬০০ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তা বঙ্গ দেশের বহু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকেই বাঙালদের রান্নায় মিশে গেল লঙ্কার ব্যবহার বেশি করে।
বাঙাল শব্দটি কোথা থেকে এসেছে বলে দিই না হয়। প্রতিহার রাজ মিহির ভোজের সাগরতাল শিলালিপিতে বলা হচ্ছে ধর্মপালকে  বঙ্গপতি। তাঁর বাসিন্দা হলেন বঙ্গান। তাঁর সময় থেকে বঙ্গ দেশের বাসিন্দারা হলেন বঙ্গান । এই বঙ্গান শব্দটি অপভ্রংশ হয়ে বাঙাল। এই বঙ্গ দেশ  মানে কিন্তু সম্পূর্ণ বাংলাদেশ নয়। মূলত ঢাকা এবং বিক্রমপুরের কিছুটা অংশ নিয়ে ছিল তৎকালীন বঙ্গদেশ। এখানকার বাসিন্দারাই খাটি বাঙাল।

যাইহোক সঙ্গীতার নাম মেঘে ঢাকা তারা দিয়েছিলাম কেন? কৈ কেউ জানতে চাইলেন না তো। সঙ্গীতার প্রেমে পড়েছিলাম আমি ওর নাচ দেখে। ওর বাবা ছাপখানার ব্যাবসা ছিলো। ওদের বাড়িতে নাম করা সব সাহিত্যিক দের আসতে দেখতাম একটা সময়। ঝিলি পার ওর বাবা আমার দাদুর থেকেই অনেকটা জমি কিনে নিয়ে, একটা বাড়ি করেছিলো। আমাদের মামা বাড়িটা এ পাড়ার শেষ বাড়ি ছিলো। ফেলে ওদের বাড়িটা এ পাড়া থেকে বিছিন্ন ছিলো বরাবর।ওর বাবা সমাজ থেকে বিছিন্ন হয়ে থাকতে চাইতো। উনি সাহিত্য সাধনা করতে তাই ঝুট ঝামেলা হীন এই জমিটা কিনে ছিলেন।
প্রায় দশ – বারো বছর পর বোধহয় মামা বাড়ি এলাম। মামা বাড়ি সব জমি প্রোমোটিং হয়ে গেছে। কিন্তু মুল বাড়িটা ওরা প্রমোটিং দেয় নি। বোনেরা বিয়ে হয়ে শশুর বাড়ি। ভাইয়েরা মামাদের নিয়ে কেউ মুম্বাই, কেউ ব্যাঙালুর, কেউ আবার সাত সাগর পেরিয়ে মেলবোর্ন সেটেল। বাড়িটা এক প্রকার এখন ভুতের বাড়ির মতোই পরে রেয়েছে। ঐ বাড়ি পেরিয়ে মেঘে ঢাকা তারা জীবনের গল্পটায় এখন কি চলছে কেউ জানে না। কিন্তু মেঘে ঢাকা তারা কেমন আছে কি করছে এখন জানতে ইচ্ছা হয় মাঝে মাঝে।
ও সঙ্গীতার নাম মেঘে ঢাকা তারা নাম রেখেছি কেন জানতে চাইছেন বুঝি। ঋতিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা সিনামার মতোই ওদের গল্পটা। শুরু ওরা বাজার থেকে কোন দিন ধার দেনা করে নি।আমার বাড়ি থেকে সঙ্গীতাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যখন তখনও ওদের অবস্থা ভালোই ছিলো। সুশীল বাবুর প্রেসে আগুন ধরলো। প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতি হলো। হার্ট অ্যাটাকে পঙ্গু হয়ে পরে রইলেন উনি বিছানায় ওর দুই দাদাই তখন চাকরি করে একজন বেনারসে একজন পাটনায়  কেউ এ বাড়িতে ফিরবে না, তাই সুশীল বাবুকে সাহায্য করবে না জানিয়ে দিয়েছিলো। তখন ওর দুইটো বোন অবিবাহিত। ও ধর্মতলা একটা বারে গান গাওয়া চাকরি নিলো। পাড়া থেকে ভদ্র মেয়ের মতো শাড়ি পরে বেড়াতো। কিন্তু শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় নাকি। কোন ভালো ছেলে ওদের বিয়ে করবেন ভেবে ওর বোন মধুমিতা একটা মুসলিম ছেলে বিয়ে করে নিয়ে। ও বাড়ির থেকে চিরকালের মতো সম্পর্ক ছিন্ন করলো। দশ বছর আগে ওকে আমি পুনরায় বিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ও বলেছিলো ভাই বোন আর বাবা মাকে দেখতে হবে ওকে। ওর নাম দিয়ে ছিলাম মেঘে ঢাকা তারা। কারণ ও বলেছিলো ভালোবাসলে অপেক্ষা করতে হবে।

আপনারা জানেন বোধহয় আজকে যে   প্রিন্স আনোয়ার সাহ রোডটা যাদবপুর থানার পরে বীজ  পেরিয়ে বাইপাসের দিকে ছুটে চলেছে সেটা আসলে একটি খাল ছিলো। ঐ খালটা সাপুই পাড়া কিছুটা  আগে বেঁকে গেছিলো গরফার দিকে। খালটা সে সময় শহিদ নগর মানে বাঙাল পাড়া থেকে বৈদ্যপাড়াকে আলাদা করে রেখেছিল। আজ হঠাৎ করে প্রিন্স আনোয়ার সাহ রোডটা সব কিছু বদলে দিয়ে এই অঞ্চলটা, নয়তো বাঙাল রা আমাদের পাড়া দিয়ে আসতো এদিকে। যাই হোক অঞ্চলের এতো পরিবর্তন হলেও, আমাদের মামা বাড়ি আর ওদের বাড়িটা  আজ অন্ধকারে ঢাকা কারণ বাড়ি দুটো পড়ে আছে এই জন ব্যাস্ততার এক কোনে।
আমি স্কুটি করে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ করেই দেখলাম শহিদ নগর ক্রসিং সঙ্গীতাকে। সঙ্গীতা একা শহিদ নগর রাস্তায় ঢুকলো। ও যদি বাড়ি যায় তাহলে প্রিন্স আনোয়ার সাহ রোডটার সমান্তরাল ভাবে যাওয়া পাড়াতুতো রাস্তা দিয়ে যাবে। শীতকালের রাত্রি রাস্তাটি এখন ফাঁকা থাকবে। আমি ঠিক করলাম ওর সাথে আজ কথা বলবো আবার তাই খুব আসতে আসতে স্কুটি নিয়ে ওর পিছু নিলাম অনেক টা পথ গেলাম। কিন্তু কথা বলতে পারলাম না। শহিদ নগর শেষ। খালের কালভার্ট পেড়ালেই অন্ধকার ওকে ডাকলাম। ও কালভার্ট ওপরে পা রেখেছে। আমার ডাক শুনে দেখলাম ওর মাথাটা 360° ঘুরে গেলো। ও একটা রঙীন শাড়ি পরে ছিল। সেটা সাদা হয়ে শাড়ি হয়ে গেলে যেনো কোনো শশ্মান থেকে ফিরে এসেছে।ও খুব মিষ্টি করে ডাকলো আমায় আমার নাম ধরে। বললো ওর সাথে যেতে। ওর ডাক অস্বীকার করা যায় না।
ওকি তাহলে নিশি। না না ও নিশি নয়। ও গুইসিন । কোরিয়ার লোককাহিনীতে দেখবেন গুইসিনকে । এ এমন একটি আত্মা যারা অসম্পূর্ণ কাজ নিয়ে মারা যায়,অকালমৃত্যুর মাধ্যমে পর নিজেদেরকে পৃথিবীর মধ্যে আটকা রাখে । সঙ্গীতার মতোই প্লম্বা কালো চুলের, প্রবাহমান সাদা শেষকৃত্যের পোশাক পরা। গুইসিনদের নির্জন স্থানে পরিত্যক্ত ভবন থেকে শুরু করে নির্জন পাহাড়ি পথ এবং জনশূন্য শহরের রাস্তা, যেকোনো জায়গায় দেখা যায়। শীতের মাসগুলিতে তারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, যখন ঠান্ডা বাতাস এবং দীর্ঘ রাত তাদের পৃথিবীতে হাঁটার জন্য আরও বেশি শক্তি দেয় বলে বলা হয়।সব জেনে বুঝতে পেরেও আমি ওর ডাককে অস্বীকার করতে পারলাম না।

পরে পড়বো
১৯২
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন