আলোচনা - ছোট ছোট দর্শন-৮

মোঃ আব্দুল মজিদ এনডিসি
মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

ছোট ছোট দর্শন-৮

সব মানুষ সব সময় কান দিয়ে শোনে না। চোখ দিয়ে দেখে না। কিছু মানুষ আছে, যারা চোখ দিয়ে শোনে আর মন দিয়ে দেখে। আবার সব মানুষ শুধু দেখার জিনিস দেখে না। শুধু শোনার জিনিস শোনে না। যা দেখা যায় না তাও দেখে, যা শোনা যায় না তাও শোনে। কী ভাবে? সেই তৃতীয় কান দিয়ে, সেই তৃতীয় চোখ দিয়ে, যাকে আমরা বলি মন। প্রশ্ন হলো-এমন মন কি সবার থাকে? অবশ্যই না। যে মনের কাছে কারণ-অকারণ একাকার হয়ে যায়, সেই মনই তো আসল মন। শুধু এমন মনের মানুষগুলোই তো পৃথিবীতে ব্যতিক্রম। যা সাধারণ মানুষের কাছে কোন অর্থ বহন করে না, তা ব্যতিক্রমী মানুষের কাছে ভারী অর্থবহ। যা ব্যতিক্রমী মানুষের কাছে ঈঙ্গিতবাহী, তা সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই নগণ্য। এই ব্যতিক্রমী সৃষ্টিগুলি সেই বিশ্ব-বিধাতার।
কবি যখন বলেন- “তোমার অশোকে কিংশুকে/অলক্ষ্য রং লাগলো আমার অকারণের সুখে”- তখন ভাবুন তো একবার- অকারণের সুখ কয়জন ব্যক্তি ভোগ করতে পারে। একে তো অকারণের সুখ, আবার সেখানে অশোক-পলাশের অদৃশ্য রং লাগা। এমন অনুভবের মন কয়জনের আছে? যার আছে সেই তো ব্যতিক্রম। সে-ইতো তৃতীয় চোখ, তৃতীয় কানের অধিকারি। সে-ইতো পারে এমনি করে বলতে-যখন শরৎ কাঁপে শিউলী ফুলের হরষে/ নয়ন ভরে সেই গোপন গানের পরশে। ভাবুনতো একবার গোপন গান! তার আবার পরশ! আর সেই পরশে ভরে চোখ। আর এক ধাপ পিছে যেয়ে ভাবুনতো গোপন গান কোথা থেকে আসলো। শরতের মৃদু-মন্দ বাতাসে যখন শিউলী ফুল দুলতে থাকে তখন সে আনন্দে উদ্বেলিত হয়, আর তাতে কম্পন লাগে শরতে। এই হরষ, এই কম্পন-জাত গোপন গান, যা কানে শোনা যায় না, শুধু চোখে দেখা যায়, তাতেই চোখ ভরে যাওয়া। আহা! কী চোখ! এমন চোখ কার থাকতে পারে। শুধুই সেই ব্যতিক্রমী মানুষদেরই থাকতে পারে, আর কারো নয়। অমরা যা দেখি, তা তারা দেখে না। আমরা যা শুনি, তা তারা শোনে না। তারা ভিন্ন কিছু দেখে, ভিন্ন কিছু শোনে। যা সাধারণের কাছে কোন অর্থ বহন করে না, তা ব্যতিক্রমী মানুষের কাছে ভারী অর্থবহ। যা ব্যতিক্রমীর কাছে ইঙ্গিতবাহী, তা সাধারণের কাছে কেবলই নগণ্য। কবি আবার যখন বলেন-“ শায়ন্তনের ক্লান্ত ফুলের গন্ধ হাওয়ার পরে/ অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরে”-একবার ভাবুনতো- কী ব্যক্রিমী চোখ , কী ব্যতিক্রমী মন, কী ব্যতিক্রমী অনুভূতির কথা বলতে চেয়েছেন এখানে। অঙ্গবিহীন আলিঙ্গন কে দেখেছে কবে? আবার যে অলিঙ্গনে কোনও অঙ্গের কোন যোগাযোগ নেই, অথচ তার সুখে সকল অঙ্গ ভরে যাচ্ছে! এমন সুখ এমনভাবে কে অনুভব করেছে কবে? শুধু সেই পারে, যার আছে তৃতীয় চোখ, তৃতীয় কান, আছে ব্যতিক্রমী একটা মন, যে ব্যতিক্রমী মানুষ।
আবার কবি যখন বলেন- “Heard melodies are sweet, those unheard, are sweeter” –একবার ভাবুনতো এ গান কি কান দিয়ে শোনা যায়? শুধু চোখ দিয়ে শোনা যায়, আর মন দিয়ে অনুভব করা যায়। কবি হয়তো সেভাবেই শুনেছেন, তাইতো তার কাছে সে গান মিষ্টিতর। এমন ব্যতিক্রমী মনের, ব্যতিক্রমী চোখের ব্যতিক্রমী মানুষেরা শুধু নিজের মধ্যে থাকে না। সে ক্রমান্বয়ে প্রকৃতির একজন হয়ে যায়। তার অবাধ গতিবিধি নিজের ও জগতের সাথে একাকার করে ফেলে। সেটিই তার স্বভাব। সেখানেই তার সুখ, সেখানেই তার অনন্দ। এই একাকার হওয়ার জন্য তার কোন মিডিয়াম লাগে না, কোন পরিপ্রেক্ষিত লাগে না, লাগে না কোন অজুহাতও। তার সেই ব্যতিক্রমী মন, তৃতীয় কান, তৃতীয় চোখই তাকে বিশ্বময়, প্রকৃতিময় করে তোলে। মন তাকে দূরের যাত্রী করে।
কবি যখন বলেন- “Away! Away! For I will fly to thee/ Not charioted by bacchus and his pards/ But on the viewless wings of poesy”-ভাবুনতো একবার –গানের পাখির কাছে যাওয়া, একাকার হওয়ার তার সাথে, তাও আবার কবিতার অদৃশ্য পাখায় ভর করে। এমন বিচরণ, এমন মুগ্ধতা, এমন আনন্দ, এমন অনুভূতি কার দ্বরা সম্ভব? একমাত্র সেই ব্যতিক্রমী মনের ব্যতিক্রমী মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আমি সেই ব্যতিক্রমী কোটি-কোটি মন চাই, কোটি-কোটি তৃতীয় চোখ চাই, কোটি-কোটি তৃতীয় কান চাই। আমি চাই কোটি-কোটি ব্যতিক্রমী মানুষ। তাইতো কবির চেতনায় একটা লেখায় বলতে চেয়েছিলাম-
‌‌‍‌‌‘অপার্থিব এক হাওয়া লেগে যদি আজ এমনই হতো-
এক নিমিষেই ১৭ কোটি মানুষ হয়ে যেত
লুইপা, বড়ুচন্ডি দাস কিংবা এ কালের মুজাহিদী…

জলের গালিচায় যাযাবর পাখির মতো এমনও হতো যদি-
বসতো এক নীল চাঁদোয়ার নীচে একাকার সকলে
বাংলা একাডেমি কিংবা রমনার বটমূলে
আবৃতির এক মহাযজ্ঞে, হয়তো
আকাশটা কিছুটা ঈশ্বরহীন হয়ে যেত
শেলী কিংবা আরজ আলী মাতব্বরের মতন…

তবে স্বপ্নের এ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ হতো সেই স্বপন-
পলল-ভূমি, যেখানে ফিরে ফিরে আর
কখনো জন্মাতনা কোন এরশাদ শিকদার,
বাংলা ভাই কিংবা বন-খাদকেরা
জন্মাতনা কোন ইয়াবা-সম্রাজ্ঞীর মতো বিষ-বৃক্ষরা…

এ মাটিতে কোন কেড়ে নেয়া রক্তের দাগ পড়তো না
জানি, আর আকালিক ব‍্যাঙের ছাতার মতো স্বপ্ন-সৌধ গড়তো না
কেউ কখনো অন্যের স্বপ্নকে খুন করে করে- এ আমার কবিতার নিশ্চিত বিশ্বাস…

যদিও আজ কবিরাও করে সন্ত্রাস…
করে কেবলই নীরবে-নিভৃতে
যত অপদেবতার সকল নক্সাল-বাড়িতে
মারণ-কবিতার ককটেইলে…

শুধু সেই কবিতার সন্ত্রাস চাই আমি একালে,
আমি চাই আজ সেই সোচ্চার সন্ত্রাসী কবিবর,
আমি চাই সেই দুর্দান্ত বাজিকরী চিত্রকর,
তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে যিনি জীবন্ত স্বপ্ন দেখান
আর পরিপূর্ণ জোছনার মতো যিনি ভাবতে শেখান…

আমি চাই আজ ১৭ কোটি জয়নুল, এসএম সুলতান
আমি চাই আজ ১৭ কোটি শামসুর রাহমান’

-এটি আমার জ্ঞান, এটি আমার ধ্যান, এটি আমার প্রার্থনা। জানি না সব প্রার্থনা কবুল হয় কিনা।

পরে পড়বো
১৬৭
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন