আলোচনা - ছোট ছোট দর্শন-৭

মোঃ আব্দুল মজিদ এনডিসি
সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬

যখন বাঙলা ভাষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তখন আমার চন্ডীদাসের নাম মনে পড়ে। তার উল্লাসে আমার মনে পড়ে মধুসূদনের মুখ। তার থরোথরো ভালবাসার নাম আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ। তার বিজন অশ্রুবিন্দুর নাম জীবনানন্দ। তার বিদ্রোহের নাম নজরুল। বাঙলা আমার ভাষা। এ ভাষা ছাড়া আমি নেই। বাঙলা ভাষা সম্পর্কে এগুলি ড: হুমায়ূন আজাদের নিজস্ব গভীর অনুভূতি ও অভিব্যক্তি। ড: হুমায়ূন আজাদের কতো নদী সরোবর অর্থাৎ বাঙলা ভাষার জীবনী সংক্রান্ত বইয়ে বাংলা ভাষার জন্মের ইতিবৃত্ত সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা নিম্নে তুলে ধরা হলো:-

ড: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ পন্ডিতদের মতানুসারে বাঙলা ভাষার জন্মের একটা বিবর্তনমূলক ডায়াগ্রাম নিম্নরূপ-

প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা – নব্য ভারতীয় আর্যভাষা (আর্য-অনার্য-মিশেল) – সংস্কৃত ভাষা – প্রাকৃত ভাষা – (পূর্ব) মাগধী প্রাকৃত – অপভ্রংশ – বাঙলা/অহমিয়া/ওড়িয়া (৬৫০/৯৫০ খ্রীস্টাব্দ)।

বাঙলা ভাষা মানুষ বা তরুর মতো জন্ম নেয়নি। বা কোন কল্পিত স্বর্গ থেকে আসেনি। এখন আমরা যে বাঙলা ভাষা বলি এক হাজার বছর আগে তা ঠিক তেমন ছিল না। এক হাজার পরও তা তেমন থাকবে না। বাঙলা ভাষার আগেও এদেশে ভাষা ছিল। সেভাষায় এদেশের মানুষ কথা বলতো, গান গাইতো, কবিতা বলতো। ভাষার ধর্মই বদলে যাওয়া। বদলে যায় ধ্বনি, শব্দ ও অর্থ। তাই বলা যায় অন্য ভাষা বদলে বাঙলা ভাষা তৈরি হয়েছে।

জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের মতে বহু প্রাকৃতের একটির নাম মাগধী প্রাকৃত। মাগধী প্রাকৃতের কোন পূর্বাঞ্চলীয় রূপ থেকে জন্ম নেয় বাঙলা ভাষা। বাঙলা ভাষার বড় ইতিহাসবিদ ড: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মতে-ইউরোপ ও ভারতবর্ষের ভাষাসমূহ একই ভাষা-বংশের সদস্য, যার নাম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-বংশ। এগুলোকে আর্যভাষা নামেও ডাকা হতো। এই ভাষা-বংশের অনেকগুলি ভাষা-শাখার মধ্যে একটি হলো ভারতীয় আর্যভাষা। এগুলির প্রাচীন ভাষাগুলিকে বলা হয় বলা হয় প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলোতে। এগুলো সম্ভবত লিখিত হয়েছিল ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এ সময় অন্যান্য বেদও রচিত হয়। বেদের শ্লোকগুলো পবিত্র তাই সকলে এগুলো মুখস্ত রাখত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখের ভাষা বদলে যেতে থাকে। তাই বেদের ভাষা মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। এভাষাকে এখন আমরা বলি বৈদিক ভাষা।

সে সময় ব্যাকরণবিদেরা (বিশেষ করে পাণিনি) নানা নিয়ম বিধিবদ্ধ করে একটি ভাষা সৃষ্টি করেন, যার নাম সংস্কৃত ভাষা অর্থাৎ বিধিবদ্ধ, পরিশীলিত, শুদ্ধ ভাষা। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের আগেই এ ভাষা লিখিত হয়েছিল। সংস্কৃত ছিল লেখা ও পড়ার ভাষা। ইহা কথ্য ভাষা ছিল না। তখন ভারতবর্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন কথ্য ভাষা প্রচলিত ছিল। এটাকে বলা হতো প্রাকৃত ভাষা অর্থাৎ প্রাকৃত জন বা গণমানুষের ভাষা। খ্রিস্টের জন্মের আগেই আর্যভাষার তিনটি স্তর পাওয়া যায়, যা নিম্নরূপ:-

১ম- বৈদিক/বৈদিক সংস্কৃতি – খ্রিস্টপূর্ব ১২০০-৮০০ – প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা
২য়- সংস্কৃত (পাণিনি) – খ্রিস্টপূর্ব ৮০০-৪০০ – প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা
৩য়- প্রাকৃত ভাষা – খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ – মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা

৪র্থ বা শেষ স্তর- অপভ্রংশ/অবহট্ট (প্রাচীন ভাষাগুলির বিকৃত রূপ) – ৭০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ – এর থেকে বিভিন্ন ভারতীয় আধুনিক ভাষা বাঙলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, অহমিয়া, ওড়িয়া, পঞ্জাবী ভাষা তৈরি হয়। পূর্বাঞ্চলীয় একটি প্রাকৃত ভাষা ছিল মাগধী প্রাকৃত ভাষা। এর অপভ্রংশ থেকে বাঙলা, অহমিয়া, ওড়িয়া ভাষার জন্ম। তাই বাঙলার সাথে আসামি ও ওড়িয়া ভাষার মিল আছে।

ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাঙলা ভাষার জন্ম হয় গৌড়ীয় প্রাকৃত অপভ্রংশ থেকে। প্রথম নিদর্শন চর্যাপদ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চর্যাপদের ভাষা আদি বাঙলাভাষা নয়। এটি মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশ। তাই চর্যাপদের ভাষার সাথে যেমন-বাঙলা ভাষার মিল আছে তেমনি অসামিয়া ও ওড়িয়া ভাষার মিল আছে। তাই এটিকে কেবল বাঙলা ভাষার আদি নিদর্শন বলা যায় না। ড: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাঙলা ভাষার জন্ম হয়। মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশ থেকে বাঙলা ভাষার জন্ম হয়।

এই ভূ-খন্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের মাগধী অপভ্রংশ থেকে যে সকল ভাষার উৎপত্তি হয়েছে তার বিবরণ নিম্নরূপঃ

পূর্ব মাগধী অপভ্রংশ – বাঙলা ভাষা, অহমিয়া, ওড়িয়া
মধ্য মাগধী অপভ্রংশ – মৈথিলী, ভোজপুরিয়া
পশ্চিম মাগধী অপভ্রংশ – মগহি ইত্যাদি।

বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের যুগপর্বঃ
৯৫০- ১২০০ = আদি বাঙলা ভাষা – চর্যাপদ (৪০-৫০% বুঝা যায়)।
১২০০-১৩৫০ = আঁধার যুগের/ ক্রন্তিকালের বাঙলা ভাষা। তেমন কোন নিদর্শন নাই।
১৩৫০- ১৮০০ = মধ্যযুগীয় বাঙলা ভাষা – বিদ্যাপতি-জয়দেবের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন (৮০-৯০% বুঝা যায়)।
১৮০০-১৯৩০ = আধুনিক যুগ- ১ম পর্ব = বিহারীলাল, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ
১৯৩০-১৯৭০ = আধুনিক যুগ -২য় পর্ব = নজরুল, কবিতার পঞ্চ পান্ডব।
১৯৭০- চলমান = আধুনিক যুগ -৩য় পর্ব= উত্তর আধুনিক যুগের সাহিত্য

চর্যাপদঃ গঙ্গা জউনা মাঝেঁরে বহই নাঈ – গঙ্গা যমুনা মাঝে বয় নৌকা (ডোম্বীপাদ)। এগুলি গানের কলি। প্রাচীন বাংলায় লেখা। বৌদ্ধ দোহা গান। এগুলি হারিয়ে যায়। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থশালায় আবিষ্কার করেন ৪টি পুঁথি। তিনি এগুলি ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশ করেন। নাম দেন- ১।চর্যাচর্য বিনিশ্চয় ২। সরোজবজের দোহাকোষ ৩। কৃষ্ণাচার্যের দোহাকোষ ৪। ডাকার্ণব

চর্যাপদ- গীতবিতান। বৌদ্ধ দোহা গান। ৪৬টি পূর্ণ ও ১টি খন্ডিত পদ। এখন সংকলনে পাওয়া যায় ৫০টি পদ (বাকিগুলি মূলত প্রবোধচন্দ্রের তিব্বতী অনুবাদের ৫১টি থেকে আসছে)।পদগুলি লিখেছিল বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকেরা। অর্থাৎ সিদ্ধার্থেরা। তাদের সংখ্যা ২৩ জন। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন – কাহ্নপা/লুইপা/কুক্কুরীপা/বিরুপা/ গুন্ডুরীপা/শবরপা/ভুসুকুপা/সরহপা/ঢেন্ডণপা। চর্যা মানে আচরণ। আচরণগত বিধিনিষেধ আছে গানগুলিতে।

চর্যাপদের ভাষা:
গঙ্গা জউনা মাঝেঁরে বহই নাঈ
সোনে ভরিলী করুণা নাবী
নিসি অন্ধারি মুসার চারা
কাআ তরুবর পাঞ্চবী ডাআল
চঞ্চল চিএ পইঠা কাআল
ঢেন্ঢণ পাএর গীত বিরলে বুঝই

পরে পড়বো
১২৫
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন