প্রচ্ছদ শিল্পীর নামটা দেখে সনু খুব খুশি। ও বললো ” দিদির সাথে তাহলে তোমার সাথে যোগাযোগ আছে। আমার ইচ্ছা করে দিদির সাথে কথা বলতে..”
আমি বললাম ” ও তো তোর সাথে কথা বলতে চায়। ”
সনু বিশ্বাস করলো না। ও বললো ” না না ও আমার কথা ভুলেই গেছে। ”
অগত্যা ওকে ফোনটা আমার দিলাম। চ্যাটটা পরে সনু বললো ” কাকা তার মানে, তোমার আর দিদির একটা রিলিসান আছে? বাবা জানে। ”
আমি কিছু বলার আগে, ও বললো ” তোমার কথাবার্তা গুলো হয় খুব নর্মাল। কিন্তু সুক্ষ্ম দূর্বলতা আছে তোমার বোঝা যাচ্ছে। আসলে বাবা জানলে অশান্তি হবে না হয়তো কিন্তু তোমার বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। ”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম ” তুই কবে এতো বড় হয়ে গেলি। তবে চিন্তা করিস না তোর বাবা জানে তবে তোর দিদি জানে না।”
সনু বললো “মানে এটা আবার কি কথা। বাবা জেনেও তোমার সাথে সম্পর্ক রেখেছে আমি মানতে পারলাম না..”
আমি বললাম ” কিছু ভালোবাসা প্রকাশ্যে আসে না। থেকে যায় নিঃশব্দে, চোখের ভাষায়। নীরব অভ্যাসে কিংবা দীর্ঘদিনের চেনা উপস্থিতিতে। তারা নিঃশব্দে হৃদয়ের অন্ধকার কোণে ঢুকে বসে, কিছু অনুভূতিরা ভাষা খুজে পায় না আসলে।
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা, ছাদের একরাশ নীরবতা আর গাজরার ভিজে থাকা সুবাস, সবকিছুর ভেতর দিয়েই মৈনাক ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার হৃদয়ের অদৃশ্য ঠিকানা। কিন্তু সেই ভালোবাসার পথ অবরোধ করে দাঁড়ায় সামাজিক নৈতিকতা, দায়িত্ব আর আত্মসংযমের কঠিন দেয়াল। কিছু সত্য মনের গভীরে লুকিয়ে রাখতে হয়। তাই ওকে কিছু বলার আগে তোর বাবা সবকিছু বুঝতে পরেছিলো। ”
সনু বললো ” কাকা তুমি এতো বোকা কেন?? দিদিকে বলতে পারতে মনের কথা। বাবা থেকে তুমি বিশেষ কিছু পাও না। ও তোমার জীবনে এলো তোমার জীবনটা গুছিয়ে দিতো। ”
আমি বললাম ” সেটা জানি, ও যখন আমার সাথে নিয়মিত কথা বলতো। তখন আমার জীবনের সাহিত্য চর্চা সবচেয়ে সেরা সময় ছিলো। আমার চাকরিতে পদন্নতি হবার কথা চলছিল। ইউরোপ যাবার কথা হচ্ছিলো। কিন্তু কিছু হলো না। ”
সনু বললো ” তুমি সাহস করে তোমার মনের কথা বলতে পারতে। ”
আমি দীর্ঘশ্বাসের সুরে বললাম ” জানিস ক্রিকেট টাইমিং বলে একটা কথা আছে। ঠিক মতো টামিং না হলে তুমি আউট হয়ে যাবে। আমি ভেবেছিলাম ইউরোপ চাকরিটা পেলেই ওকে প্রোপজ করবো কিন্তু তার আগেই শুনলাম ও বিয়ে করে নিয়েছে। তাই আমি ইউরোপ গেলাম না। ”
সনু ও নিচু গলায় বললো ” কি জানি কি হলো। দিদির মতো অত ট্যালেন্টেড মেয়ে। কিভাবে একটা গুন্ডাকে বিয়ে করলো। ওর জন্য তো আরো আমাদের সাথে ওর সম্পর্ক নেই। ”
আমি বললাম ” জানিস আমার মামাতো বোন একসময় স্কুলের সেরা ছাত্রী ছিলো। হঠাৎ কলেজে পড়তে পড়তে একটা অশিক্ষিত ছেলে অটোরিক্সা চালককে বিয়ে করে নিলো। কতো লোকে খারাপ ইঙ্গিত দিয়ে কথা বললো। কেউ বললো লটর পটর করে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছে বলেই বিয়েটা হঠাৎই করে নিয়েছে ওরা।
কিন্তু আসল কারণ কি জানিস। আমার মামার একটা কারখানা ছিলো সেটা বন্ধ হয়ে গেলো হঠাৎই। সব দোষ ননদ ঘোষ। কারখানার অনেক কাজ করতো মামীমা। কারখানা বন্ধ হবার পর মামা নিজের ব্যার্থতার গল্প ঢাকতে মামীমারা সাথে ম্যানেজারের পরকীয়া প্রেমের গল্প ফেদে সেটাকেই কারখানা বন্ধ হবার কারণ হিসেবে দেখালো। এ নিয়ে অশান্তি হতো রোজ বাড়িতে। বোনেদী বাড়ি অভাব অনটন থাকলেও মেয়েকে নজর রাখতে মামা মামিমা। ফলে কোন ছেলে বন্ধু ছিলো না ওর। ওই অটো রিক্সা চালক ওর একমাত্র বন্ধু ছিলো তাই ওকে বিয়ে করে নিয়েছিলো ও। ”
সনু বললো ” হ্যাঁ গো আমার মাঝে মাঝে খুব নিজেকে খুব এক লাগে। তখন কাউকে আকড়ে ধরে বাঁচাতে ইচ্ছা করে। জীবন লড়াইটা খুব কঠিন কাউকে পাশে চাই তাই সব সময়। কিন্তু তুমি কি সুন্দর একা হাসি খুশি থাকো। ”
আমি হেসে বললাম ” কিছু সম্পর্ক ক্ষত
আমাদের নদী মতো
একা চলতে শেখায়।
কিছু সম্পর্ক ভোকাট্ট ঘুড়ি মতো
ভেসে বেড়ায় , অচেনা ঠিকানায়
সুতোর মতো গুটিয়ে নেয় জীবন তখন
অচেনা এক মায়ায় ”
সনু বললো ” আমি অতো কাব্য বুঝতে পারি না। ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। এবার তুমি একটা বিয়ে করে নাও। ”
আমি বললাম ” তোর দিদি জানিস একটা নামহীন ফুল। কিছু মুহুর্তে জন্য জীবনে একটা অচেনা খুশি এনে দিয়েছিলো। কিন্তু নামহীন ফুল তো বাজারে পাওয়া যাবে না। তাই অচেনা সেই খুশিটা আর পাবো না। তাই বিয়ে করা আমার হবে না।
আসলে বিয়ে যে কারো জীবনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিয়ে করার আগে বিভিন্ন পরিবর্তনশীল বিষয়গুলো যাচাই করা আবশ্যক। বিয়ে একটি সমন্বয়। উভয় পক্ষকে অবশ্যই একে অপরকে সমর্থন খোলামেলা কথা এবং উদ্ভূত যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হবে।বিবাহ ব্যক্তিগত বিকাশ এবং অগ্রগতির একটি প্রক্রিয়া। সংসারে একে অপরের ব্যক্তিগত বৃদ্ধি এবং বিকাশের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এর মধ্যে জড়িত থাকে তাদের স্বপ্ন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনের জন্য একে অপরকে সমর্থন। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে চায়, তবে অন্য সদস্যকেও সেটিতে সম্মত হতে হবে।
প্রতিটি বিয়েতেই মানসিক সামঞ্জস্য অত্যাবশ্যক। জীবনে উত্থান পতনের প্রতিটি মুহূর্তেই একে অপরের পাশে থাকা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন একটি কঠিন সময় পার করতে থাকেন, তবে অপরজনকে মানসিক সমর্থন দিয়ে পাশে থাকা উচিত।
ওর সাথে আমার বিয়ে হয় নি ঠিক কিন্তু ও আমার থেকে আমি সব সময় মানষিক সমর্থন, আর প্রেরণা পেয়েছি। তাই ও আমার জীবনে সেই নামহীন ফুল যাকে আমি পেয়েও হারিয়ে ফেলেছি।”
নামহীন ফুল
১২০

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন