সুজয় গুরুদাসনগর স্টেশনে ট্রেন ধরার অপেক্ষায় বসে আছে। ফাঁকা প্লাটফর্ম। শীতের রাত। তখন দশটা বাজে। গরমের সময় রাত দশটা মানে কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু শীতকালে রাত দশটা মানে গভীর রাত। কারণ সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই গ্রামাঞ্চলে কাউকে আর বাইরে দেখতে পাওয়া যায় না। সবাই ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। তাই সুজয় বেশ ভয়ে ভয়ে আছে। কাউকে অন্তত প্লাটফর্মে দেখতে পেলে বিষয়টা অন্য হতে পারত। মন থেকে ভয় দূর করার জন্য সে ফোন বের করল। ফোনে ভিডিও দেখতে লাগলো। আশ্চর্যজনকভাবে তার ফোনে ভূতের ভিডিও আসতে লাগলো। সে অবাক হল এই ভেবে যে, সে কখনো ভূতের ভিডিও দেখে না, বা কখনো ভূতের ভিডিও সার্চও করে না। তাহলে ভূতের ভিডিও পর পর তার ফোনে আসার কারণ কি? সে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল — অন্যান্য ভিডিও যেমন সামনে আসে, সেইভাবেই হয়তো চলে এসেছে। তাই সে এই বিষয়টি এড়িয়ে গেল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার পিছন থেকে একটা হাত তার কাঁধ স্পর্শ করল। সুজয় চমকে উঠল। ঘুরে তাকিয়ে দেখে একজন খোঁড়া লোক স্ক্র্যাচের সাহায্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারাটি কি বিকট! তার চোখদুটো এতটাই বড়ো বড়ো যে, সুজয় তার সারাজীবনে এত বড়ো চোখ দেখেনি। স্বাভাবিক চোখের থেকে অনেকটাই বড়ো। চোখদুটো যেন তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তার ওপরে তার একটা হাত আগুনে পোড়া। এমনকি তার মাথায় একটাও চুল নেই। এমন নির্জন প্লাটফর্মে এমন বিভৎস চেহারা দেখলে যে কারো ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। সুজয় তাকে জিজ্ঞাসা করল — ‘কে তুমি? আমার কাছে কেন এসেছো? আমার গায়ে হাত দিয়ে তুমি ডাকছিলে কেন?’
রহস্যময় একটা হাসি হেসে বলল
— ‘আজ্ঞে আমি পদ্মলোচন মাল। লোকে আমাকে পদুমাল বলে ডাকে।’
— ‘আমি তোমার ঠিকুজি-কুষ্ঠি জানতে চেয়েছি? তুমি আমাকে ডাকছিলে কেন? আমার কাছে কি চাও?’
আবার সেই বিরক্তিকর হাসি হেসে বলল
— ‘আমি আর কি চাইব বলুন? আর আমি চাইলেই কি আপনি আমাকে দিতে পারবেন? সে কথা বাদ দিন। আসলে আপনি একা একা বসে ছিলেন, তাই ভাবলাম আপনাকে সঙ্গ দেওয়া আমার কর্তব্য। তাই আপনার কাছে আসলাম।’
বিরক্ত হয়ে সুজয় বলল
—’আমি কি তোমার সঙ্গ চেয়েছি? তুমি যাও। আমি একাই ঠিক আছি।’
এই কথা শুনে সে বলল
— ‘হতেই পারে না। আমি আপনাকে ফেলে চলে যেতে পারি না।’
এমন সময় ট্রেনের হুইসেল শুনতে পাওয়া গেল। ট্রেন ধীরেধীরে স্টেশনে প্রবেশ করল। ট্রেন থামল। সুজয় ট্রেনে উঠে পড়ল। তারপর পদুমালকে স্টেশনে রেখে সুজয় ট্রেনে উঠে পড়ল। ট্রেনে উঠে সুজয় অবাক হয়ে গেল। দেখল সেই কামরায় একটাও লোক নেই। পুরো খালি কামরা। ট্রেন চলতে শুরু করল। সুজয় একা বসে আছে জানালার ধারে। ফোন খুলতেই হঠাৎ সুজয়ের ফোনের ডিসপ্লেতে যে ছবিটা দেখা গেল, তা দেখে সুজয় ভীষণ আঁতকে উঠল।সুজয় তো এই ছবিটা ফোনের ওয়ালপেপার হিসেবে রাখেনি, আর কোনোভাবেই এই ছবি রাখার কথাও নয়। কারণ ওয়ালপেপারের ছবিটা ছিল সেই পদুমালের। যাকে আগে কোনোদিন দেখিনি, তার ছবি ওয়ালপেপারে রাখার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাই এটা কিভাবে সম্ভব হল, তা ভেবেই দরদর করে ঘাম আসতে লাগল। হঠাৎ পিছন থেকে এক অচেনা বিভৎস শব্দ শুনতে পেল। সেই শব্দটায় যেন বোঝা যাচ্ছে — ‘কি রে সুজয়, ভয় পেলি? আমার ছবি দেখে ভয় পেলি?’
সুজয় চঙমঙ করতে করতে পিছনে চোখ যেতেই সুজয় ‘বাবা গো’ বলে চিৎকার করে উঠল। দেখল সেই পদুমাল কিছুটা দূরে বসে আছে। আর তার ভালো থাকা হাতটি দাউদাউ করে জ্বলছে। আর তার কাছ থেকেই শব্দটি আসছে। সুজয় আরও চমকে গেল এই ভেবে যে, ‘ওকে তো আমি আমার নাম বলিনি, তাহলে আমার নাম ও জানল কিভাবে?’ সুজয় যত ভাবছে, তত শিউরে শিউরে উঠছে।
সুজয় ভাবছে, ‘ট্রেন থেকে নেমে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ট্রেন চলছে। ট্রেন থামলে পরের স্টেশনে নেমে পড়বে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে পরের স্টেশন বাসুলডাঙাতে ট্রেন থামল না। একি হচ্ছে! স্টেশনে ট্রেন থামল না! সব ট্রেন এই স্টেশনে থামে। তাহলে এখন থামল না কেন! এমন সময় পদুমাল বলল — ‘ভয় পেয়েছেন নাকি? সবাই আমাকে ভয় পায়। কিন্তু আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
ভয় ভয় করে সুজয় বলল
— ‘তোমার হাতে আগুন লাগল কিভাবে? তোমার জ্বালা বা কষ্ট হচ্ছে না? আর তুমি ট্রেনে উঠলেই বা কখন?’
— ‘ওই তো দিপু আমার হাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। জ্বালা করছে তো, খুব জ্বালা করছে। কিন্তু এই জ্বালাতে আমার কিছু হয় না। প্রতি রাতেই আমার হাতে আগুন লাগিয়ে দেয় দিপু। এইভাবেই তো আগুন লেগে আমার মাথার সব চুল পুড়ে টাক হয়ে গিয়েছে।’
পদুমালের কথা শুনে সুজয়ের হৃদপিণ্ডের ধুকধুকানি আরও বেড়ে গেল। কি বলছে ! প্রতি রাতেই হাতে আগুন দিয়ে দেয়! মানে? কিছুই বুঝতে পারছিল না — কি করবে। দেখল পরের স্টেশনেও ট্রেন থামল না। আরও ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
পদুমাল বলল — ‘চিন্তা করবেন না। ধামুয়া আসলে ট্রেন ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে।’
সুজয় জিজ্ঞাসা করল — ‘তুমি কিভাবে জানলে আমি ধামুয়াতে নামব। আর তুমি ট্রেনে করে কোথায় যাচ্ছো?’
— ‘আমাকে সব কিছু জানতে হয়। আমি আগে থেকেই সব কিছু জানি। আর আমি শিয়ালদাতে যাচ্ছি।’
ও আগে থেকেই সব কিছু জানে, মানে? কিভাবে? সুজয় পদুমালের থেকে যত শুনছে, জানছে, তত চমকে চমকে উঠছে।
হঠাৎ পদুমাল বলে উঠল, ‘ধামুয়া এসে গিয়েছে, নেমে পড়ুন।’
সুজয় তাকিয়ে দেখে ধামুয়া স্টেশনে ট্রেন থামছে। অবাক হয়ে গেল সুজয়। পূর্বের ভবিষ্যৎবাণী কিভাবে সম্ভব হল!!
পদুমাল বলল — ‘সাবধানে যাবেন।’
পদুমালের কথার উত্তরে কি বলবে ঠিক করে উঠতে পারছিল না সুজয়। ইতস্তত করে বলল — অ্যা..অ্যা..হ্যা.. ট্রেন ছেড়ে দিল। সুজয় ট্রেন থেকে নেমে কিছুটা শান্তি পেল। জ্বলন্ত লোকের সঙ্গে একই ট্রেনে যাত্রা — ভাবতেই পারছে না সুজয়। সুজয় ভাবল — ‘যাই হোক, আপদ বিদায় হয়েছে। এবার বাড়ি ফেরা যাক।’ সুজয় গ্যারেজ থেকে সাইকেল নিয়ে সাইকেলের উপরে চড়ে বসল। জোরে সাইকেল চালাচ্ছি সুজয়। কখন সে বাড়ি পৌঁছাতে পারবে — এই চিন্তাই সে করছে। অনেকটা যাওয়ার পরে সুজয় দেখতে পেল — দু-তিনটে কুকুর রুদ্ধশ্বাস গতিতে তার দিকে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসছে। সুজয় কি করবে বুঝে ওঠার আগেই কুকুরগুলো সুজয়ের একেবারে কাছে চলে আসল। কুকুরগুলো এত হিংস্র ছিল যে একজনের পক্ষে মোকাবিলা করা কখনো সম্ভব নয়। সুজয় অসহায় হয়ে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল — বাঁচাও! বাঁচাও! তখনই একটা বিকট ভয়ানক অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। সেই অস্পষ্ট শব্দের মধ্যে শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল — ‘হেই, হেই, পালা পালা।’ অবিশ্বাস্যভাবে সেই চিৎকারে কুকুরগুলো দূরে চলে গেল। সুজয় সাইকেল চালাতে চালাতে পাশে তাকিয়ে দেখল — সেই পদুমাল সুজয়ের পাশেই দুহাত জ্বলন্ত অবস্থায় সাইকেল চালাচ্ছে। সুজয় কুকুরের ভয়ের থেকে শতগুণ বেশি ভয় পেয়ে চিৎকার করে কুঁকিয়ে উঠল।
পদুমাল বলল — ‘আপনার ভয় নেই। আমি এসে গেছি। আমাকে দেখে আপনি ভয় পাবেন না।’
সুজয় চিৎকার করে উঠল এই ভেবে যে, পদুমাল তো ট্রেনে করে শিয়ালদাতে যাচ্ছিল, তাছাড়া সে তো ট্রেন থেকে নামেনি। সুজয়ের স্পষ্ট মনে আছে — পদুমাল জ্বলন্ত হাত নিয়ে ট্রেনের মধ্যেই বসে ছিল, আর ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল। তাহলে কিভাবে সম্ভব? কিভাবে পদুমাল আমার পাশে সাইকেল চালাতে পারে? তাছাড়া পদুমাল সাইকেল কোথায় পেল? এইসব ভেবে সুজয় ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।দরদর করে ঘাম ঝরছিল শীতের রাতে। পদুমাল সাইকেল চালাতে চালাতে যখন সুজয় এইসব ভাবছিল, ঠিক তখনই পদুমাল বলল — ‘আপনি কোনো চিন্তা না করে বাড়ি চলে যান। আর কোনো সমস্যায় আপনাকে পড়তে হবে না। আমি এখানেই থামব। এখানেই এক আত্মীয়ের বাড়ি আছে। আজ রাতটা ওখানে কাটাব। বাই।’
সুজয় কিছু না বলে শুধু জোরে সাইকেল চালাতে লাগল। অবশেষে সুজয় বাড়ি পৌঁছাল। কিন্তু কিছু প্রশ্ন তার মাথা থেকে যেতে চাইছিল না — পদুমাল আসলে কে? কিভাবে সে জ্বলন্ত হাত নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কিভাবে গুরুদাসনগর থেকে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরেও পদুমাল ট্রেনে উঠেছিল? কিভাবে ধামুয়াতে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরেও সে নামতে পারল? দুটো হাত জ্বলন্ত অবস্থায় সে সাইকেল চালাচ্ছিল? এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না সুজয়। তবে এটা ভেবে আরও বেশি অবাক হল সুজয় — পদুমাল কিন্তু তার একটুও ক্ষতি করেনি বা ক্ষতি করার চেষ্টাও করেনি। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ল।
হাতপোড়া পদুমাল
৯৬

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন