মানব মন্ডল

গল্প - সির্ধান্ত

মানব মন্ডল
শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬ অন্যান, জীবনবাদী

হঠাৎই  ঘুমে ভেঙেগেলো  আমার।  কাল একটা ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। আশাবাদী ছিলাম  চাকুরীটা হয়ে যাবে। কিন্ত  ওরা বলে দিলো  আমার  বয়সটা অনেকটাই বেশি হয়ে গেছে।হতাশায়  কয়েকটা বন্ধুকে ফোন  করলাম।  ওরা বললো হঠাৎই  চাকুরীর  ছাড়ার সিদ্ধান্তটা  আমার  ভুল  ছিলো।
কিন্ত  জানেন  সেইদিন  আমি  সিদ্ধান্ত  নিয়েছিলাম  হঠাৎই  আসলে পরিস্থিতি অন্যছিলো।
বাংলার পরিস্থিতি এখন  বদলেছে। তাই  আমার হৃদয়ের ব্যাথাটা কেউ হয়তো অনুভব  করতে পারবেন  না। আবুধাবিতে  গিয়ে  আমার  রুম  মেট হলো সিরাজ।  টাকার  পয়সা আয় করে সবে ঘর  বানিয়েছে। রোজ  কিছু না কিনে  ঘর সাজানোর  চেষ্টা করছে। আর সেই গুলো  দেখায় ও আমাকেও  ভিডিও  কল  করে। অনিচ্ছা শর্তেও দেখি।আর দেখতে দেখতে দুই একটা টুকরো কথা বলতে বলতে ওর  ঘরের  সবাই  আমার  চেনা হয়ে গেছে।
আমার মাসির বাড়ি আছে বৃন্দাবনে। এবার বাড়িতে গিয়ে,ওখানে থেকে বাবাকে  পুস্করে নিয়ে যাবো পরিকল্পনা করেছিলাম । কথাটা সিরাজদাকে ভুল করে ফেলেছি। আসলে ওসব কথা বলে সিরাজদার দুঃখ ওর বড় ভাই সৌদিতে কাজ করে, ওদের কাউকে না বলে ওমরাহ করে এসেছে।ওর দুঃখ ওর বাবাকে করতে ওমরাহ করাতে পারল না।
সেদিন ওর বাবা আমার সাথে কথা বলল। বয়স্ক মানুষটি এই খুব অনুরোধ করলেন আমাকে। উনাকে যেন আমি আজমীর শরীফে নিয়ে যাই। কারণ আজমীর শরীফ আর পুষ্কর কাছাকাছি।

উনি বলেন উনি ছোটোবেলা থেকে পাঁচবার নামাজ পড়েন। কোন হারাম কাজ করেননি। ছোট বেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে মাবাবা ভাই বোনের প্রতি সব কর্তব্য পালন করেছেন। তবুও আল্লাহ তাকে হজ করার দূয়া করলেন না।হজ বা ফরজ ইবাদতের  সুযোগ দিলেন না।
হজ বা ফরজ ইবাদতে না করতে পারুন।জিয়ারততো করতে পারেন।
আজমীর শরীফে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির মাজার, যা সুন্নি মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান।মানুষ আধ্যাত্মিক শান্তি, দোয়া এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এখানে আসেন, যা ‘জিয়ারত’ বা দর্শন হিসেবে গুরুত্ব পূরণ। উনার বয়স হয়ছে বলে সিরাজ দাও একা কোথাও নিয়ে যেতে ভয় পায়
তাই আমি দুম করে কথা দিয়ে ফেলাম একসাথে সাইন অফ করবো।
দুর্ভাগ্যের বিষয় সেদিনকে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠেই দেখি সিরাজ ভাই খুব কাঁদছে। তারপর দেখলাম ভিডিও কলে ওর বাবাকে । শেষ অবস্থা। আমি কাজে চলে গেলাম কারণ প্রবাসী হলেও আমরা শ্রমিক। ওকেও কাজে যোগদান করতে হলো।
সন্ধ্যার আর ফ্রি সিরাজ ভাই তাড়াতাড়ি ফোন করলো কিন্তু ততক্ষণে ওর বাবা মৃত তাড়াতাড়ি। আমরা ছোটাছুটি শুরু করলাম ওর ছুটির জন্য। ওর ছুটি এপ্রুভ হয়ে গেল । কিন্তু দুর্ভাগ্য বিষয় কিন্তু চপার তো আসবে না রাফ সি।ওকে, আরও একটা দিনও অপেক্ষা করতে হবে। দেশে যেতে যেতে আরো দুদিন। ওরা মুসলিম তিন দিনে কাজ। যেতে যেতে মাটি দেওয়া হয়ে যাবে। শেষ দেখাটাও দেখতে পাবে না ও ওর বাবার। খুব হতাশ হলাম আমরা।
মাত্র ১০-২০ হাজার টাকা মাইনে বেশি পাই আমরা বিদেশে থেকে কিন্তু আত্মীয়-স্বজন পরিজন সবার থেকে দূরে খুব অসহায় লাগছিল। আমাদের সবার। কথাটা শুনলে আপনারা হয়তো আমাকে ভাববেন আমি বামপন্থী, কিন্তু সত্যিকারের নআবুদাবি হোক কিংবা পশ্চিমবঙ্গ। সব জায়গা কার  শ্রমিকরা খুব অসহায়। তারা শুধুমাত্র উৎপাদন করে কিন্তু সেই উৎপাদনের উপর তাদের থাকে না কোন অধিকার। না, এমনকি তাদের জীবনের ওপর ও তাদের কোন অধিকার থাকে না কারণ সামান্য শ্রমের বিনিময়ে তাদের জীবনের অধিকাংশ সময়টাই। তারা বিক্রি করে দেয় তাদের মালিকের কাছে।

আমি অনেকদিন বাবার সাথে কথা বলি না। তোমার বাবা একটা সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন  ভাগ্য ক্রমে। আমিও ছোটবেলা থেকে খুব গাছ পুততে ভালবাসতাম। মানে বাগান করাটা আমার একটা শখ ছিল বলতে পারেন। রিটারমেন্টে যা টাকা পেলেন বাবা, তা দিয়ে দুম করে গ্রামের দিকে বেশ কয়েক বিঘা জমি কিনে ফেললেন।
আমার জীবন নিয়ে ওনার একটা বড় সিদ্ধান্ত এই জমিতে কেনার পিছনে কাজ করছিল। উনি বলছিলেন আমাকে একজন পেশাদার কৃষক হতে। পেশাদার কৃষক কথাটা অবাক করা না। আসলে আপনারা যেসব কৃষক দেখেছেন তারা প্রত্যেকেই চাষ করে আপনাদের পেট ভরাতে এবং নিজেদের পেট ভরাতে। ব্যবসা করতে নয়। উনি অনেক প্রোজেট মতো করেছিলেন। একটা জমিতে পশুপালন, মাছ চাষ, এবং ফসল চাষ এক সাথে হবে। কিন্তু সমাজে কৃষকদের কোনো সম্মান নেই। তাই বিদেশ চাকরিটাই আমি বেছে নিলাম।

আসলে কৃষকদের জীবনের যে ছবিটা আমি দেখেছি, সেটা খুবই অসহায় লাগে। আজ আপনার একটা কাজ না  ভাল লাগলে বা আপনি যে কাজে যুক্ত আছেন সেখানে আপনি উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা না পেলে, আপনি চাকরিটা ছেড়ে দেবেন আবার নতুন কোন চাকরি সন্ধানে বেরিয়ে পড়বেন। কিন্তু চাষী জীবনটা একটা অদ্ভুত আমি দেখেছি বেশিরভাগ চাষীরা তাদের জমিকে বড় বেশি ভালোবাসে। বছর তারা খুব যত্ন করে ফসল ফলায়। ফসল ভালো না পড়লেও বিপদ ফসল বেশি পড়লেও বিপদ। প্রচুর বেশি পড়লে ফললে দাম পাবে না। না ফলে দেনা শোধ করতে পারবে না। আমি তাই চাষী হবার ঝুকিটা নিতে পারি নি।

বাবা একটা চাষীর ছেলে ছিলেন। দেশ ভাগ হতে লক্ষ লক্ষ অসহায় হিন্দু পরিবার এলো এ দেশে। জমি দরকার পূর্ণ বাসনের জন্য।পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন এলো, ১৯৫৫, যা পরিবারের সদস্য সংখ্যার উপর নির্ভর করে ২.৫ থেকে ৭ স্ট্যান্ডার্ড হেক্টর পর্যন্ত কৃষি জমির সর্বোচ্চ মালিক হতে পারবে।

এদেশের আইন মাকশাড়ার জালের মতন। ছোট ছোট কিট পতঙ্গ গুলো ধরা পরে। রাঘব বোয়ালেরা ধরা পরে না। জমির দলিল ছিল আমার ঠাকুরদার নামেই। কিন্তু বিএল আর খাতায় জমি মালিক জমিদার। জমিদার তাঁর  বিক্রি করে দাগের জমিগুলোকেই ভেস্টেড ল্যান্ড  হিসাবে ঘোষণা করলেন।
পশ্চিমবঙ্গে ভেস্টেড ল্যান্ড  বা অর্পিত জমি বলতে সেই জমিকে বোঝায় যা পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন, ১৯৫৫ বা এস্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর অধীনে ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে সরকারের অধীনে চলে এসেছে। সহজ কথায়, ঠাকুর দা জমি গুলো তখন সরকারি সম্পত্তি।
ঠাকুরদা আত্মাহত্যা করলেন। আমার এক পিসী বিনা চিৎকাসায় মরা গিয়েছিলো কিছুদিন আগে। সেই আঘাতটাই উনি সহ্য করতে পারি নি। তাই বাবার অদ্ভুত একটা স্বপ্ন ছিল। বাবা সুযোগ পেলে আবার চাষী জীবনে ফিরে যাবে। এই স্বপ্নটাই পূরণ করতে চেয়েছিল আমার মাধ্যমে।
আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। বাবার বা চোখটা বাদামি রঙের নেই আর সাদা হয়ে গেছে। তিন মাস অন্তরে আমি একমাস ছুটিতে বাড়িতে আমার অবস্থা এখন বাড়িতে অতিথির মত।  কোন দায়িত্বই নিই না বাড়ির। চাকর বাকর দিয়ে বাবাকে বা সেবা হয় না। আমি আমার  ভাইকে দোষ দিতে পারিনি না। সেও চাকরিজীবী বরঞ্চ আরও দায়িত্ব বেশি কারণ সেই লেবার সুপারভাইজার । শেষ পর্যন্ত নিজে কাজ করে না শুধু। লোককে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হয় তাকে। ওর মাঝে মাঝে রবিবারও ছুটি নেই। অবেহলা নয় সময় অভাবেই বাবার চোখ নষ্ট হতে বসেছে। বাবার চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে।  ডাক্তারের ভুলে ডাক্তারের ভুলে চোখটা নষ্ট হয়েছে কিন্তু আমাদের অপরাধ সেদিন ভাইয়ের হঠাৎ শহর থেকে বাইরের যেতে হয়েছিল চাকরি বাঁচাতে। ভাই উপস্থিত ছিল না সেটাই আমাদের দোষ। আবার করা এক লক্ষ টাকা খরচ করলে যদিও বলেছে চোখটা ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দুই ভাই যেদিনকে একসঙ্গে ছুটি পাব সেদিনকেই বাবার আবার অপারেশনটা হবে। কোন দিন আমরা একসাথে ছুটি পাব সেটা আমরা নিজেরাও জানিনা কারন শ্রমিকদের ছুটি নেবার অধিকার নেই নিজের ইচ্ছায়।
পাগলামি করে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। এখন তুমি বলছো বিয়ে করতে। সেইদিন চাকরি ছিলো না তাই তোমাকে বিয়ে করতে হয়েছিলো অনিচ্ছায়। কিন্তু তোমার ডিভোর্স পেতে পেতে তো অনেক দেরি হয়ে গেলো।এখন বুঝতে পারছি চাকরি ছাড়া সিদ্ধান্তটা ভুল হয়েছে। কারণ চাকরি ছাড়া সংসার করা আর স্বপ্ন দেখা তো উচিত নয়। জানি, সেদিনকের সিদ্ধান্তটা বড় হটকারী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন প্রথম কোনো সিদ্ধান্ত আমি মাথা থেকে নিই নি। নিয়ে ছিলাম হৃদয় থেকে। হৃদয়কে সে এতো যন্ত্রনা দেবে আমি ভাবতেও পারি নি।

পরে পড়বো
২৬
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন